কলকাতার কোলাহল থেকে এসে এই নিস্তব্ধতা প্রথম প্রথম অর্কের বেশ ভালোই লাগত। কিন্তু দিন কয়েকের মধ্যেই সে বুঝতে পারল, প্রকৃতির এই সুন্দর রূপ আসলে এক ধরনের মানসিক পরীক্ষা। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু পাইন আর দেবদারুর জঙ্গল। কুয়াশা একটু ঘন হলেই দিনের বেলাতেও মনে হতো, যেন বিকেল নেমে এসেছে। ঘরের একমাত্র রেডিওটায় খড়খড়ে আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ত না। রাত বাড়লে পাহাড়ি হাওয়া পাইনের পাতায় ধাক্কা মারত, আর মনে হতো হাজার চেনা-অচেনা কণ্ঠস্বর একসঙ্গে ফিসফিস করছে। ওই একাকী রাতগুলোতে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও কখনো কখনো অর্কের কাছে অচেনা লাগত। আলো নিভিয়ে খাটে শুয়ে সে প্রায়ই ভাবত—এই বিশাল শূন্যতায় যদি কোনোদিন সে হারিয়ে যায়, কেউ কি জানতেও পারবে?
প্রথম কয়েকটা দিন ভালোই কাটল। টাওয়ারের ওপরে ছোট্ট একটা ঘর। একটা খাট, একটা ওয়াকিটকি, আর রান্নার জন্য গ্যাসের স্টোভ। নিচে শুধু স্তব্ধ জঙ্গল, আর পাইন বনের অবিরাম শাঁ-শাঁ শব্দ। প্রতি রাতে অর্কের একটাই নিয়ম ছিল—আগে টাওয়ারে থাকা নাইট-ভিশন দূরবীনটা দিয়ে চারদিক একবার খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া, তারপর ওয়াকিটকিতে নিচের ফরেস্ট অফিসে রিপোর্ট করা— "অল ক্লিয়ার, ওভার।" প্রতিবারই ওপাশ থেকে মৈনাকদার গলা ভেসে আসত— "রজার। অল ক্লিয়ার। ওভার।" সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনলেই অর্কের মনে হতো, এই নির্জন পাহাড়ে সে পুরোপুরি একা নয়। কখনো কখনো টাওয়ারের নিচের জঙ্গলটার দিকে তাকালে অর্কের অকারণ অস্বস্তি হতো। কারণটা সে নিজেও বুঝত না। নাইট-ভিশন দূরবীন দিয়ে চারপাশ খুঁটিয়ে দেখেও কিছুই পেত না। শেষ পর্যন্ত নিজের মনকেই বোঝাত—নির্জনতা মানুষকে অনেক কিছুই ভাবায়।
বিভ্রাটটা শুরু হলো তৃতীয় সপ্তাহের একটা মাঝরাতে। বাইরে তখন ঝড়ের তাণ্ডব। ঘরের কাচের জানলাগুলো ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে থরথর করে কাঁপছিল। রাত তখন আনুমানিক দুটো। ঠিক তখনই অর্কের মনে হলো, নিচের জঙ্গল থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে। শুকনো কাঠের ওপর ভারী বুটের চাপ পড়লে যেমন শব্দ হয়—মড়... মড়... ক্র্যাঁচ...। অর্ক দূরবীনটা তুলে জানলার কাছে এগিয়ে গেল। জানলার কাচ বেয়ে বৃষ্টির ধারা নেমে আসছে। প্রথমে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কয়েক সেকেন্ড পর বিদ্যুতের এক ঝলক আলোয় টাওয়ারের ঠিক নিচে একটা কালো অবয়ব চোখে পড়ল। প্রথম দেখায় মানুষ বলেই মনে হয়েছিল। অর্ক দূরবীনটা চোখ থেকে নামিয়েও চোখ সরাতে পারছিল না। ঝড়ে পাইনগাছগুলো দুলছে। বৃষ্টি তিরের মতো আছড়ে পড়ছে। অথচ টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা একচুলও নড়ছে না। ঠিক তখনই বিদ্যুতের আরেকটা ঝলক আকাশ চিরে চলে গেল। সেই এক মুহূর্তে বিদ্যুতের ঝলকে অবয়বটার দুটো চোখ অস্বাভাবিকভাবে চকচক করে উঠল।
অর্কের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। টেবিলে ভর দিতে গিয়েই সে বুঝল, তার হাত কাঁপছে। মুহূর্তের মধ্যে জলের গ্লাসটা উল্টে গেল। শব্দটা ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়তেই নিচের অবয়বটা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। অর্ক ভয় পেয়ে ওয়াকিটকিটা তুলে নিল—“হ্যালো, মৈনাকদা? ফরেস্ট অফিস শুনতে পাচ্ছেন? টাওয়ারের নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ওভার।” কয়েক সেকেন্ড শুধু খড়খড়ে শব্দ। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় মৈনাকদা বললেন—"অর্ক... দরজা-জানলা লক করে রাখো। এই আবহাওয়ায় ওখানে কারও থাকার কথা নয়। কোনো অবস্থাতেই নিচে নামবে না। আমরা ভোর হতেই রওনা দেব।" তীব্র শব্দে কথাটা শেষ হওয়ার আগেই যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ভয়ে অর্কের বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। সে টাওয়ারের লোহার সিঁড়ির দিকে যাওয়ার ভারী কাঠের দরজাটায় বড় লকটা লাগিয়ে দিল। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল, সেই কালো ছায়াটা আর নিচে নেই। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে, এমন সময় একটা আওয়াজ তার রক্ত জল করে দিল। ‘ঠক... ঠক... ঠক...’
শব্দটা নিচে নয়; শব্দটা হচ্ছে ঠিক অর্কের মাথার ওপর, টাওয়ারের টিনের ছাদে! ভারী কিছু একটা ছাদের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। পাইন বনের ঝোড়ো হাওয়ার শব্দের মাঝেই ছাদের ওপর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এলো— ঠিক যেন কোনো পশুর যন্ত্রণার ডাক, কিন্তু তার মধ্যে মানুষের গলার ছোঁয়া! অর্ক ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিল। তারপর খাটের নিচে ঢুকে নিজের মুখটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল। সে জানত, একটুও আওয়াজ করা যাবে না। হঠাৎ বিকট শব্দে জানলার কাচটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভেতরে ছিটকে এল। বাইরের ঝোড়ো হাওয়া ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ভাঙা জানলার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে একটা লোমশ হাত ভেতরে ঢুকল। অস্বাভাবিক লম্বা আঙুল। ডগায় বাঁকানো নখ। হাতটা ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল, যেন গন্ধ শুঁকে কিছু খুঁজছে। অর্ক খাটের নিচে পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে নিজের শ্বাসটুকুও আটকে রেখেছে। হাতটা টেবিলে রাখা জলের বোতলটাকে এক ঝটকায় ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে বোতলটা ভেঙে যেতেই হাতটা মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ঠিক তখনই জানলার বাইরে থেকে একটা বিকট হিসহিস শব্দ শোনা গেল; যেন শিকার হাতছাড়া হওয়ায় কেউ রেগে গেছে।
কয়েকটা অন্তহীন মুহূর্ত কেটে গেল। তারপর হাতটা ধীরে ধীরে জানলার বাইরে সরে গেল। ছাদের ওপর দিয়ে ভারী পায়ের শব্দটা আবার নিচের দিকে নামতে লাগল। অর্ক সারা রাত খাটের নিচ থেকে বেরোয়নি। ভয়ে তার শরীর অবশ হয়ে আসছিল, কিন্তু বাঁচার তাগিদে সে চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের নাম জপ করছিল। পরদিন সকালে যখন কুয়াশা কেটে হালকা রোদ উঠল, তখন ফরেস্ট অফিসের জিপ গাড়ি এসে পৌঁছাল টাওয়ারের নিচে। মৈনাকদা আর তিন-চারজন ফরেস্ট গার্ড ওপরে উঠে এসে অর্ককে প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করলেন। নিচে নামার সময় মৈনাকদা অর্কের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন—“অর্ক, কাল রাতে কী হয়েছিল সেটা বলতে পারবে?” অর্ক কাঁপতে কাঁপতে কাল রাতের সব ঘটনা বলে গেল। অর্কের কথা শুনতে শুনতে মৈনাকদার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। মৈনাকদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে দেশলাই বার করে সিগারেট ধরালেন। তারপর কাঁপানো গলায় বলতে শুরু করলেন—“এই পাহাড়ে একটা পুরনো কথা চালু আছে। গভীর পাইন বনে এক ধরনের অদ্ভুত আদিম জীব ঘোরে; স্থানীয় পাহাড়িরা একে ‘বন মানুষ’ বা ‘বুন মাঞ্চি’ বলে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে, যখন এই টাওয়ারটা নতুন তৈরি হয়েছিল, তখন এক বুড়ো নেপালি গার্ড এখানে পোস্টিং পেয়েছিল। এমনই এক ঝড়ের রাতে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরের দিন সকালে এই ঘরের জানলার কাচগুলো এভাবেই ভাঙা পাওয়া গিয়েছিল, আর ঘরের মেঝেতে ছিল শুধু চারটে গভীর নখের আঁচড়। সেই বুড়ো গার্ডের আর কোনোদিন খোঁজ পাওয়া যায়নি। সবাই ভেবেছিল ওটা হয়তো চিতাবাঘের কাজ, কিন্তু পাহাড়ের বুড়োরা বলত— বুন মাঞ্চি একা মানুষকে গন্ধ শুঁকে খুঁজে বের করে। এখন মনে হচ্ছে, সেদিনও হয়তো এমন কিছু হয়েছিল। কাল রাতে তুমি বরাতজোরে বেঁচে গেছ অর্ক, ও তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ ও টের পায়নি।”
সেই ঘটনার পর আর এক রাতও টাওয়ারে থাকার সাহস হয়নি অর্কের। সেইদিনই সে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের চাকরি ছেড়ে কলকাতার ট্রেনে উঠে পড়েছিল। কিন্তু আজও, কলকাতার বুকে কোনো ঝড়ের রাতে যখন ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া বয়, অর্কের মনে হয় সে শুনতে পাচ্ছে— কোনো এক নির্জন পাইন বনের ওয়াচ টাওয়ারের টিনের ছাদের ওপর থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসা ঠক... ঠক... ঠক...