গৌড়ীয় বৈষ্ণব সিদ্ধান্তে শ্রীচৈতন্যদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার। তিনি রাধার ভাব ও কান্তি (বর্ণ) ধারণ করে কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন।[1] এই প্রসঙ্গে গোস্বামী কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে মহাভারতের বিষ্ণুসহস্রনামস্তোত্র থেকে দুটি পংক্তিৃ উদ্ধৃত করেছেন।[2] চৈতন্যদেব অবতারত্বের বিষয়ে মতভেদ থাকলেও সংস্কৃত শাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের কথা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন। বিভিন্ন শাস্ত্রকারের সঙ্গে তাঁর শাস্ত্রীয় আলোচনার উল্লেখ তাঁর বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে পাওয়া যায়। শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন সমকালিক সময়ের শ্রেষ্ঠতম পণ্ডিতদের অন্যতম। যদিও তিনি তৎকালীন সময়ে প্রচলিত প্রথা অনুসারে পাণ্ডিত্যের দিগ্বিজয় যাত্রা করেননি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর শাস্ত্রীয় সংবাদের উল্লেখ একাধিক জায়গায় পাওয়া যায়।
চৈতন্যদেবের বিবিধ রচনার উল্লেখ পাওয়া গেলেও বর্তমানে কেবল তাঁর একটি কবিতাই পাওয়া যায়। তাঁর কবিতা ‘শিক্ষাষ্টকম্’ অবলোকন করলে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের খানিকটা অনুমান করা যায়। শ্রীচৈতন্যদেব অচিন্ত্যভেদাভেদ দর্শনের প্রবর্তক হিসেবে সুপরিচিত এবং দার্শনিক সমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত। কিন্তু বর্তমান প্রবন্ধের বিষয় তাঁর সাহিত্যশাস্ত্রের পারদর্শিতা। তিনি ব্যাকরণ ও দর্শনশাস্ত্রের পাশাপাশি সাহিত্যশাস্ত্রেও বিশেষ পারঙ্গম ছিলেন। কাশ্মীরীয় কেশবভট্টের সহিত তাঁর শাস্ত্রালোচনার প্রসঙ্গে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের আদিলীলার ষোড়শ পরিচ্ছেদের ২৬ থেকে ১০৮ তম পদ্যে এই ঘটনার বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। এতদ্ব্যতীত শ্রীল বৃন্দাবনদাস তাঁর চৈতন্যভাগবত গ্রন্থেও এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।[3] তিনি বর্ণনা করেছেন যে, শ্রীচৈতন্যদেব বাল্যকাল থেকেই অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন।[4] সেই সময় দূর-দূরান্তের পণ্ডিতসমাজে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের খ্যাতি বিস্তৃত ছিল। তিনি কোনো সভায় উপস্থিত হলে সকলেই বিনা তর্কে তাঁর মত গ্রহণ করতেন। যেন এক অপূর্ব মায়াশক্তির দ্বারা সকলে তাঁর বশবর্তী হয়ে থাকতেন। তিনি নিজে কৃপা না করলে তাঁকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা কারও ছিল না।[5] এইভাবে তিনি সকল সভাতেই মধ্যমণিরূপে বিরাজ করতেন।
শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর চতুষ্পাঠীতে মূলতঃ ব্যাকরণশাস্ত্রের পাঠ দিতেন। তিনি তাঁর ছাত্রদেরকে কলাপ ব্যাকরণ পড়াতেন।[6] এক শুক্লপক্ষের সন্ধ্যায় শ্রীচৈতন্যদেব গঙ্গার তীরে বসে শিষ্যদের সঙ্গে ব্যাকরণ আলোচনা করছিলেন। সেই সময় দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশবভট্ট সেখানে উপস্থিত হন। অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়নের পূর্বে প্রাথমিক পাঠ রূপে ব্যাকরণ শিক্ষা প্রয়োজন বলে অনেকেই ব্যাকরণকে বাল্যশাস্ত্র বলে উল্লেখ করে থাকেন। ব্যাকরণের মধ্যেও কলাপ-ব্যাকরণ অপেক্ষাকৃত সহজ। কেশবভট্ট লোকমুখে এই বিষয় জেনেছিলেন। কেশব ভট্ট মনে করতেন যে, বহু শাস্ত্রে পারদর্শী ব্যক্তিই প্রকৃত পণ্ডিত; একটি বা দুটি শাস্ত্রের জ্ঞান থাকলেও কাউকে পণ্ডিত উপাধি দেওয়া চলে না। সেজন্য ব্যাকরণের অধ্যাপক নিমাই পণ্ডিতকে কেশবভট্ট একজন সাধারণ চতুষ্পাঠীর অধ্যাপকের অধিক কিছু মনে করেননি। এমতাবস্থায় শ্রীচৈতন্যদেবকে শিষ্যদের সঙ্গে কলাপ-ব্যাকরণ আলোচনা করতে দেখে কেশবভট্ট বেশ অবজ্ঞার সুরেই বলেন যে, অত্যন্ত সহজ কলাপ ব্যাকরণের অধ্যাপক নিমাইকে ‘পণ্ডিত’ বলা চলে না।[7]
কেশবভট্টের এই অবজ্ঞাসূচক কথায় বিচলিত না হয়ে শ্রীচৈতন্যদেব আপাত ভাবে তাঁর মতকেই স্বীকার করে নেওয়ার ভান করে নিজের অল্পজ্ঞতার কথা বিনয়ের সঙ্গে প্রকাশ করলেন। এরপর কেশবভট্টের ভূয়সী প্রশংসা করে শ্রীচৈতন্যদেব তাঁকে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন শ্লোকের মাধ্যমে গঙ্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। কেশবভট্ট ছিলেন ঘটিকাশতক,[8] তিনি এক ঘটিকা বা চব্বিশ মিনিট সময়ের মধ্যে মুখে মুখেই ঝড়ের বেগে একশত শ্লোক রচনা করে ফেললেন।
চৈতন্য়দেব সেই একশত শ্লোকের মধ্য় থেকে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে তার অর্থ বর্ণনা করতে বললেন। শ্লোকটি এইরূপ—
“মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা।
দ্বিতীয়শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা ভবানীভর্ত্তুর্যা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা॥৩॥”
সদ্যোবিরচিত একশত শ্লোকের মধ্যে একটি শ্লোককে চয়ন করে তার নির্ভুল উচ্চারণ[9] শুনে কেশবভট্ট বিস্মিত হলেন।[10] কেশবভট্ট শ্লোকটির অর্থ এইভাবে বর্ণনা করলেন—শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী যাঁর চরণকে দেবতা ও মনুষ্যগণ দ্বিতীয় লক্ষ্মীর চরণের ন্যায় পূজা করেন, যিনি ভবানীভর্তা অর্থাৎ মহাদেবের মস্তকে বিরাজিত হয়ে অদ্ভুতগুণশালিনী হয়েছেন, সেই গঙ্গার মহিমা নিরন্তর নিশ্চিতভাবে দেদীপ্যমান রয়েছে।
শ্লোকের অর্থ শ্রবণ করে চৈতন্যদেব কেশবভট্টকে অনুরোধ করলেন, এই শ্লোকে বিদ্যমান কাব্যতত্ত্বগত গুণ ও দোষ বিচার করার জন্য। কেশবভট্ট উত্তর দিলেন যে, তাঁর শ্লোকে দোষের আভাসমাত্রও নেই। বরং এতে উপমা, অনুপ্রাস প্রভৃতি অলঙ্কার এবং কিছু গুণ বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রসঙ্গেই শ্রীচৈতন্যদেবকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, কেবল ব্যাকরণশাস্ত্রই আলোচনায় যিনি প্রবৃত্ত তাঁর পক্ষে অলঙ্কারশাস্ত্রের অনুসারে কাব্যের দোষ-গুণ নির্ণয় করা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। উপরন্তু, তিনি বলেন যে, উক্ত শ্লোকটিই সমস্ত কাব্যের সারভূত। অতএব, এই শ্লোকের দোষ-বিচার করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এর উত্তরে চৈতন্যদেব শান্তভাবে জানান যে উক্ত শ্লোকে পাঁচটি স্থলে দোষ এবং পাঁচটি স্থলে গুণ রয়েছে[11], এবং তিনি সেগুলিকে ক্রমশ উল্লেখ করতে শুরু করেন।
পঞ্চদোষ
কেশবভট্টের রচিত শ্লোক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চৈতন্যদেব পাঁচটি স্থানে দোষ নির্দেশ করেছেন। যা কিছু রসের অপকর্ষক তাকেই সাহিত্যশাস্ত্রের পরিভাষায় দোষ বলা হয়। এই দোষ রসের আস্বাদনকে স্থগিত করে।[12] উক্ত শ্লোকের দুটি স্থানে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষ রয়েছে এবং অবশিষ্ট তিনটি স্থানে যথাক্রমে বিরুদ্ধমতি, ভগ্নক্রম ও পুনরাত্ত দোষ বিদ্যমান।[13] আমরা সাহিত্যশাস্ত্রের আলোকে এই দোষগুলির লক্ষণ এবং উক্ত শ্লোকে তাদের সমন্বয় বিস্তারে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
‘শিখরিণী’[14] ছন্দে শ্লোকটি রচিত হয়েছে।
এই শ্লোকে ‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ ইদম্’ এবং ‘দ্বিতীয়-শ্রীলক্ষ্মীঃ’ —এই দুটি স্থানে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষ রয়েছে। ‘ভবানীভর্তুঃ’ পদে বিরুদ্ধমতি দোষ, ‘যদেষা’ প্রভৃতি স্থানে ভগ্নক্রম দোষ, এবং ‘অদ্ভুতগুণা’ প্রভৃতি স্থানে পুনরাত্ত দোষ লক্ষ্য করা যায়।
অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষ - দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশবভট্টের শ্লোক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চৈতন্যদেব প্রথম যে দোষটির কথা উল্লেখ করেছেন, তা হল অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষ। সাহিত্যদর্পণ গ্রন্থে এর লক্ষণ বলা হয়েছে— “বিধেয়স্য় বিমর্শাভাবেন গুণীভূতত্বম্ অবিমৃষ্টবিধেয়াংশত্বম্।”[15] অর্থাৎ, বাক্যে যে পদটি বিধেয় বা প্রধান বক্তব্য নির্দেশ করে, তাকে যদি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ না করে গৌণভাবে প্রকাশ করা হয়, তবে সেখানে অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ দোষ ঘটে। জ্ঞাত বস্তুকে অনুবাদ এবং অজ্ঞাত বস্তুকে বিধেয় বলে। অলঙ্কারশাস্ত্রের নিয়ম অনুসারে প্রথমে অনুবাদ এবং পরে বিধেয়ের উল্লেখ করা উচিত। এই স্বাভাবিক ক্রম ভঙ্গ হলে, অর্থাৎ আগে বিধেয় এবং পরে অনুবাদ থাকলে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষের উদ্ভব হয়।
‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ’ ইত্যাদি শ্লোকে কেশবভট্ট গঙ্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। কিন্তু শ্লোকের সমগ্র বক্তব্য জানা না থাকলে গঙ্গার যে মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হচ্ছে, তা প্রথমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। ফলে ‘মহত্ত্ব’ এখানে অজ্ঞাতবস্তুজ্ঞাপক বিধেয়।[16] শ্লোকের পরবর্তী অংশে গঙ্গার সেই মহত্ত্বের বর্ণনা করা হয়েছে, তাই চৈতন্যদেব এই ‘মহত্ত্ব’কে ‘মূল বিধেয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। ‘মূল বিধেয়’ বলতে সেই বিধেয়কে বোঝায়, যা বাক্যের প্রধান বক্তব্য বা মূল তাৎপর্য বহন করে। অথবা, উপাদেয় হওয়ার কারণে বিধেয়াংশের প্রাধান্য থাকে। তাই বিধেয়াংশকে প্রধান হিসেবে নির্দেশ করার জন্যই এখানে বিধেয়কে ‘মূল বিধেয়’ বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, শ্লোকে ‘ইদং’ শব্দটি জ্ঞাতবস্তু নির্দেশ করে, অতএব এটি অনুবাদ। অলঙ্কারশাস্ত্রের বিধান অনুসারে অনুবাদ প্রথমে এবং বিধেয় পরে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু এখানে তার বিপরীত ঘটেছে—প্রথমে বিধেয় ‘মহত্ত্ব’ এবং পরে অনুবাদ ‘ইদং’ এসেছে। ফলে বিধেয়াংশ গৌণ হয়ে গেছে এবং সেখানে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষ সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে শ্লোকে অর্থবোধের ক্ষেত্রেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।[17]
উক্ত শ্লোকে ‘দ্বিতীয়-শ্রীলক্ষ্মীঃ’ এই স্থলেও অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায়। শ্রীলক্ষ্মীদেবী যে ভগবান নারায়ণের অঙ্কলক্ষ্মী এবং দেবতা ও মানুষের দ্বারা পূজিতা—এই বিষয়টি সকলেরই জানা। তাই ‘শ্রীলক্ষ্মী’ শব্দটি এখানে অনুবাদ। কিন্তু, ‘দ্বিতীয়’ শব্দের দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে, তা অজ্ঞাত। সেজন্য এখানে ‘দ্বিতীয়’ শব্দটি হল বিধেয়। কেশবভট্ট ‘দ্বিতীয়’ ও ‘শ্রীলক্ষ্মী’—এই দুটি শব্দের সমাস করে ‘দ্বিতীয়-শ্রীলক্ষ্মী’ পদটি ব্যবহার করেছেন। শ্লোকে ‘দ্বিতীয়-শ্রীলক্ষ্মীরিব’ এই বাক্যের অর্থ হয়েছে ‘দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীর মতো’। এখানে বিধেয় ‘দ্বিতীয়’ শব্দটি অনুবাদ ‘শ্রীলক্ষ্মী’ শব্দের পরে থাকা উচিত ছিল। সমাসের কারণে ‘দ্বিতীয়’ শব্দটি আগে এসে পড়েছে এবং এর ফলে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সামান্যভাবে বাক্যের প্রধান বা বিধেয় অংশটি গৌণভাবে প্রকাশ পেলে সেখানে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষ হয়। পণ্ডিত কেশবভট্টের শ্লোকে আমরা দেখি, ‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদম্’ ও ‘দ্বিতীয়শ্রীলক্ষ্মীঃ’ —এই দুটি অংশে উক্ত দোষ দেখা দিয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, উক্ত দুটি স্থলের মধ্যে এক জায়গায় সমাস হয়েছে এবং অপর জায়গায় সমাস হয়নি। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, প্রধান বস্তুর এই গৌণীভাব সমাসের দ্বারাও হতে পারে আবার বাক্যে পদক্রম পরিবর্তনের ফলেও সম্ভব। গৌড়ীয় সিদ্ধান্তে সাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ক অন্যতম প্রামাণ্য় গ্রন্থ অলঙ্কারকৌস্তুভ, সেখানে সমাসের দ্বারা প্রধান বস্তুর গৌণীভাব এবং তার ফলে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশের বেশ কিছু উদাহরণ আলোচনা করা হয়েছে।[18]
এখানে অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ দোষের সাথে সাথে অর্থগত সমস্যাও দেখা দিয়েছে। শ্লোকে ‘সুরনরৈরর্চ্যচরণা’ পদ থেকে বোঝা যায় যে গঙ্গাদেবীও শ্রীলক্ষ্মীদেবীর ন্যায় দেবতা ও মানুষের দ্বারা পূজিতা। অর্থাৎ, কেশবভট্টের অভিপ্রায় ছিল গঙ্গাকে লক্ষ্মীর সমতুল্য হিসেবে প্রকাশ করা। যদি তিনি ‘শ্রীলক্ষ্মীঃ দ্বিতীয়া ইব’ এইভাবে বাক্যগঠন করতেন, তাহলে গঙ্গা লক্ষ্মীর সমান—এই অর্থটি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেত এবং অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ দোষও ঘটত না।
কিন্তু ‘দ্বিতীয়-শ্রীলক্ষ্মীঃ ইব’ ব্যবহারের ফলে গঙ্গা ও লক্ষ্মীর সমতা যথার্থভাবে প্রকাশিত হয়নি। এখানে বরং ‘গঙ্গা দ্বিতীয়লক্ষ্মীর মতো’—এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে। ‘দ্বিতীয় লক্ষ্মী’ শব্দের দ্বারা লক্ষ্মীকে বোঝানো হয় না; বরং লক্ষ্মীর ন্যায় গুণবিশিষ্ট অন্য কাউকে বোঝায়। ফলে লক্ষ্মীর সঙ্গে সমতার পরিবর্তে একপ্রকার গৌণতা বা অল্পতার ইঙ্গিত প্রকাশ পায়। অতএব, ‘দ্বিতীয়’ শব্দের সমাসবদ্ধ প্রয়োগের ফলে একদিকে অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশ দোষের সৃষ্টি হয়েছে এবং অন্যদিকে লক্ষ্মীর সঙ্গে গঙ্গার প্রত্যাশিত সমতাভাবও নষ্ট হয়েছে।[19] এর ফলে শব্দার্থ গৌণ হয়ে গিয়ে মূল ভাবপ্রকাশে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে।
বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ - উক্ত শ্লোকে ‘ভবানীভর্তুঃ’ পদে চৈতন্যদেব বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ নির্দেশ করেছেন।[20] ‘বিরুদ্ধমতিকৃৎ’ শব্দের অর্থ হল—বিরুদ্ধ বা প্রতিকূল বুদ্ধির জনক। আলঙ্কারিকরা এই দোষের লক্ষণ বলেছেন— “প্রকৃতার্থজ্ঞান-প্রতিবন্ধকীভূতাপ্রকৃতার্থ-জ্ঞানজনকত্বম্”।[21] অর্থাৎ, যদি কোনও শব্দ বা বাক্য অন্য শব্দের সাথে অন্বয়ের ফলে প্রকৃত অর্থের বিরুদ্ধ বা প্রতিকূল অর্থ প্রকাশ করে, তাহলে সেখানে বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ হয়।
উক্ত শ্লোকে ‘ভবানীভর্তুঃ’ পদে এইরূপ দোষের উপস্থিতি দেখা যায়। এখানে ‘ভবানীর ভর্তা’ —এই অর্থে ষষ্ঠীতৎপুরুষ সমাস হয়েছে। ‘ভবানী’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘ভব’-এর অর্থাৎ মহাদেবের পত্নী। ‘ভর্তা’ শব্দের অর্থ পতি। ভবানীভর্তা শব্দের অর্থ শিবের পত্নীর পতি। এর দ্বারা ভব বা মহাদেব ব্যতীত ভবানীর অন্য কোনও ভর্তা বা স্বামীর একটি আভাস তৈরি হয়। সাধারণতঃ ‘শিবপত্নীর স্বামী’ এই ধরণের বাক্য শুনলে মনে হতে পারে, শিব ব্যতীত শিবপত্নীর অপর একজন ভর্তা বা স্বামী আছেন। কিন্তু এইরূপ অর্থ প্রকৃত অর্থের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ বা প্রতিকূল। বাস্তবে শিব বা মহাদেব ব্যতীত শিবপত্নী ভবানীর অন্য কোনও স্বামী নেই, শিবই তাঁর একমাত্র স্বামী। ‘শিবপত্নীর ভর্তা’ বা ‘ভবানীর ভর্তা’ বললে এইরূপ প্রকৃত অর্থের প্রতিকূল অর্থ প্রকাশ পায়।[22] এখানে ‘ভবানী’ শব্দের সাথে ‘ভর্তৃ’ শব্দের অন্বয়ের কারণেই এই ধরণের বিরুদ্ধ অর্থের বোধ হয়, তাই এখানে বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ দেখা দিয়েছে।
‘ভবানীভর্তৃ’ শব্দের ন্যায় যে সকল শব্দ বিরুদ্ধ অর্থের বোধক হয়, বাক্যরচনায় সেই সকল শব্দের প্রয়োগ বর্জনীয়। চৈতন্যদেব এর অনুরূপ একটি উদাহরণ দিয়েছেন— “ব্রাহ্মণপত্নীর ভর্তার হস্তে দেহ দান”।[23] এই বাক্যের অর্থ দাঁড়ায়—ব্রাহ্মণের যে স্ত্রী, তাঁর স্বামীর হাতে দান করবে। কিন্তু এখানে ‘ব্রাহ্মণপত্নীর ভর্তা’ বললে মনে হতে পারে যে ব্রাহ্মণ ব্যতীতও ব্রাহ্মণপত্নীর অন্য কোনও ভর্তা বা স্বামী আছে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। একইভাবে ‘ভবানীভর্তা’ বললেও এমন ধারণা জন্মাতে পারে যে ভব বা মহাদেব ব্যতীতও ভবানীর অন্য কোনও ভর্তা বা স্বামী রয়েছেন, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা সত্য নয়। এইভাবে বিরুদ্ধার্থক বোধের সম্ভাবনার কারণেই উক্ত স্থলে বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ দেখা যায়।
সামান্যভাবে, কোনও শব্দ বা বাক্য বিশেষ কিছু শব্দ বা বাক্যের সাথে অন্বয়ের ফলে এমন অর্থ প্রকাশ করে যা প্রকৃত অর্থের বিরুদ্ধ বা প্রতিকূল। এই অবস্থাতেই সেখানে বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষের উদ্ভব হয়। কিন্তু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ্রসিদ্ধ অর্থে শব্দ প্রয়োগ করা হলেও এই দোষ দেখা যায়। এইরূপ অবস্থায় পাঠকগণ সাধারণত সেখানে প্রসিদ্ধ ও অনিষ্ট অর্থেরই গ্রহণ করেন। এবং এর ফলে বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ হয়ে থাকে। অলঙ্কারকৌস্তুভ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে উদাহরণ সহকারে বিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।[24]
পুনরাত্ত দোষ - পূর্বোক্ত শ্লোকের ‘বিভবত্যদ্ভুতগুণা’ পদে চৈতন্যদেব পুনরাত্ত দোষ নির্দেশ করেছেন।[25] অলঙ্কারশাস্ত্র অনুসারে, ক্রিয়া, কারক বা বিশেষণ প্রভৃতির পারস্পরিক অন্বয়ের মাধ্যমে কোনো বাক্য সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর যদি সেই বাক্যের অন্তর্গত কোনো পদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অন্য কোনো পদ পুনরায় প্রয়োগ করা হয়, তবে সেখানে পুনরাত্ত দোষ ঘটে।[26]
উক্ত শ্লোকে ‘বিভবত্যদ্ভুতগুণা’ অংশে ‘বিভবতি’ ক্রিয়াপদ রয়েছে। এই ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘ভবানীভর্তুর্যা শিরসি’ এই অংশের ‘যা’ পদের অন্বয় হয়েছে। এর ফলে ‘যা ভবানীভর্তুঃ শিরসি বিভবতি’ —এইরূপ একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠিত হয়েছে, যার অর্থ— ‘যিনি মহাদেবের মস্তকে বিরাজিত’। এখানে স্পষ্ট যে, ‘বিভবতি’ ক্রিয়াপদের দ্বারাই বাক্যটি সম্পূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু এরপর আবার ‘অদ্ভুতগুণা’ পদটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পূর্বোক্ত বাক্যের ‘যা’ পদের বিশেষণ। এইরূপ বাক্যসমাপ্তির পরেও পুনরায় ‘অদ্ভুতগুণা’ বিশেষণ পদের প্রয়োগের ফলে এখানে পুনরাত্ত দোষ হয়েছে।
ক্রিয়া, কারক, বিশেষণ প্রভৃতির পারস্পরিক অন্বয়ের ফলে বাক্যার্থ সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এরপরও যদি বাক্য়ে অন্তর্বর্তী কোনো পদের সাথে অন্বয়যুক্ত অন্য একটি পদের প্রয়োগ হয়, তবে সেখানে পুনরাত্ত দোষ ঘটে। কিন্তু এর কিছু ব্যতিক্রম স্থলও রয়েছে। অলঙ্কারকৌস্তুভে এই দোষের আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে—বিবাদ, বিস্ময়, হর্ষ, কোপ, দৈন্য, অবধারণ, প্রসাদন, উদ্দেশ্য-প্রতিনির্দ্দেশ্য ও অনুক্রম্য প্রভৃতি স্থলে পুনরুক্তি দোষ হয় না।[27] অর্থাৎ, এই স্থলগুলিতে পুনরুক্তি থাকলেও তা দোষ হিসেবে গণ্য হবে না। অলঙ্কারকৌস্তুভে এ প্রসঙ্গে উদাহরণ সহকারে বিস্তৃত আলোচনা দেখা যায়।[28]
ভগ্নক্রম দোষ - পূর্বোক্ত শ্লোক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চৈতন্যদেব সেখানে ভগ্নক্রম দোষও নির্দেশ করেছেন।[29] অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনও রচনার শুরুতে যে ক্রম বা শৈলী অবলম্বন করা হয়, তা যদি পরবর্তী অংশে বিঘ্নিত হয়, তবে তাকে ভগ্নক্রম দোষ বলা হয়।[30] অর্থাৎ, রচনার আদ্যোপান্ত একই রীতি বা বিন্যাস বজায় না থাকলে এই দোষের উদ্ভব ঘটে।
সাধারণত একটি শ্লোকে চারটি পাদ থাকে। আলোচ্য শ্লোকেও চারটি পাদ রয়েছে। এখানে ‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ’ থেকে ‘নিতরাং’ পর্যন্ত অংশটি প্রথম পাদ, ‘যদেষা’ থেকে ‘সুভগা’ পর্যন্ত দ্বিতীয় পাদ, ‘দ্বিতীয়’ থেকে ‘চরণা’ পর্যন্ত তৃতীয় পাদ এবং ‘ভবানীভর্তুঃ’ থেকে শুরু করে ‘অদ্ভুতগুণা’ পর্যন্ত অংশটি চতুর্থ পাদ। এই শ্লোকের প্রথম, তৃতীয় এবং চতুর্থ পাদে অনুপ্রাস অলঙ্কার লক্ষ্য করা যায়। প্রথম পাদে ‘ত’ বর্ণের অনুপ্রাস, তৃতীয় পাদে ‘র’ বর্ণের অনুপ্রাস এবং চতুর্থ পাদে ‘ভ’ এর অনুপ্রাস রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় পাদে এই ধরণের কোনও অনুপ্রাস নেই। এইভাবে, শ্লোকের তিনটি পাদে অনুপ্রাস থাকলেও একটি পাদে তার অনুপস্থিতি রচনার ধারাবাহিকতা বা শৈলীকে ভঙ্গ করেছে। অর্থাৎ, শ্লোকটির আদ্যোপান্ত একই রীতিতে গঠিত হয়নি। এই কারণে শ্লোকে পর্যায়গত ভগ্নক্রম দোষ দেখা দিয়েছে।
এখানে যদি দ্বিতীয় পাদেও অনুপ্রাস অলঙ্কার থাকত, অথবা শ্লোকের কোনও পাদেই অনুপ্রাস না থাকত, তবে এই অসামঞ্জস্য দেখা দিত না এবং ভগ্নক্রম দোষের কোনও অবকাশও থাকত না।
পূর্বোক্ত স্থলে অলঙ্কারের দিক থেকে ক্রমভঙ্গ দেখা দিয়েছে, তাই এখানে ভগ্নক্রম দোষ হয়েছে। একইভাবে কারক, বচন ও পর্যায়াদির ক্রমভঙ্গ হলেও এই দোষ দেখা যায়।[31] অলঙ্কারকৌস্তুভ গ্রন্থে এর কিছু উদাহরণ আলোচনা করা হয়েছে।[32] ভগ্নক্রম দোষের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল, যেখানে আরম্ভ থেকেই কোনো ক্রম থাকে না সেখানে এই দোষ হয় না।[33]
পূর্বোক্ত শ্লোকটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চৈতন্যদেব একদিকে যেমন পাঁচটি স্থলে বিভিন্ন দোষ নির্দেশ করেছেন, তেমনই অপরদিকে শ্লোকটিতে পাঁচটি অলঙ্কারের উপস্থিতিও নির্দেশ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, উক্ত দোষগুলির কারণে এই পাঁচটি অলঙ্কারের সৌন্দর্য যথাযথভাবে প্রকাশ পায়নি। অর্থাৎ, অলঙ্কার উপস্থিত থাকলেও দোষের প্রাবল্যে তাদের গুণ অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।[34]
এই প্রসঙ্গে চৈতন্যদেব একটি উদাহরণ দিয়েছেন[35]—যেমন একটি সুন্দর দেহ বহু অলংকারে সুশোভিত হলেও যদি তাতে শ্বেতকুষ্ঠের একটি মাত্র দাগ থাকে, তবে সেই দেহ নিন্দনীয় বলে বিবেচিত হয়; তেমনই একটি শ্লোকে বহু অলঙ্কার থাকলেও যদি তাতে একটি দোষ থাকে, তবে সেই দোষের কারণেই অলঙ্কারগুলির সামগ্রিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
পঞ্চ অলঙ্কার
আলোচ্য শ্লোকটিতে যে পাঁচটি অলঙ্কার নির্দেশ করা হয়েছে, সেগুলি হল—অনুপ্রাস, পুনরুক্তবদাভাস, উপমা, বিরোধাভাস এবং অনুমান। এর মধ্যে প্রথম দুটি শব্দালঙ্কার, তিনটি অর্থালঙ্কার।[36] এখন এগুলির সম্বন্ধে বিস্তারে আলোচনা করা যাক।
অনুপ্রাস - আলোচ্য শ্লোকের প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ—এই তিনটি পাদে অনুপ্রাস অলঙ্কার আছে।[37] অনু পশ্চাৎ, প্রাস প্রকৃষ্টরূপে নিক্ষেপ (স্থাপন) অর্থাৎ যেখানে সজাতীয় বর্ণের পরে সজাতীয় বর্ণান্তরের স্থাপনা করা হয় তাকে অনুপ্রাস বলে।[38] সাহিত্য়দর্পণগ্রন্থে এই অলঙ্কারের লক্ষণ বলা হয়েছে—“অনুপ্রাসঃ শব্দসাম্যং বৈষম্যেঽপি স্বরস্য যৎ”।[39] অর্থাৎ, স্বরবর্ণের বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও ব্যঞ্জনবর্ণের পুনরাবৃত্তির ফলে শব্দসাদৃশ্যের সৃষ্টি হলে সেখানে অনুপ্রাস অলঙ্কার হয়। স্বরবর্ণ অপেক্ষা ব্যঞ্জনবর্ণের সাদৃশ্যই এখানে বেশি প্রাধান্য পায় এবং এই ব্যঞ্জনবর্ণগত সাদৃশ্যের কারণেই কাব্যে একপ্রকার বিশেষ চমৎকার ফুটে ওঠে।
পূর্বোক্ত শ্লোকের তিনটি পাদে এই অনুপ্রাস অলঙ্কারের প্রয়োগ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। প্রথম পাদ অর্থাৎ ‘মহত্ত্বং গঙ্গায়াঃ সততমিদমাভাতি নিতরাং’ এই অংশে ‘ত’ বর্ণের একাধিক পুনরাবৃত্তির ফলে শব্দগত সাদৃশ্য সৃষ্টি হয়েছে। ‘দ্বিতীয়শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্চ্যচরণা’ —এই তৃতীয় পাদে ‘র’ বর্ণের বারংবার প্রয়োগের মাধ্যমে অনুরূপ শব্দসাদৃশ্য প্রকাশ পেয়েছে। একইভাবে, ‘ভবানীভর্ত্তুর্যা শিরসি বিভবত্যদ্ভুতগুণা’—এই চতুর্থ পাদে ‘ভ’ বর্ণের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়। এখানে চারবার ‘ভ’-কারের উচ্চারণ হয়েছে, যার ফলে স্বরবর্ণে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্যঞ্জনবর্ণের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে শব্দগত সাদৃশ্য প্রকাশ পেয়েছে। এখানে তকারাদি বর্ণের পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি হওয়ায় বৃত্ত্যনুপ্রাস হয়েছে।
সামান্যভাবে ব্যঞ্জনবর্ণের সাদৃশ্যকে এখানে অনুপ্রাস বলা হয়েছে। কিন্তু এই সাদৃশ্য একবারও হতে পারে আবার একাধিকবারও হতে পারে। এই পুনরাবৃত্তিগত সংখ্যার উপর নির্ভর করেই অনুপ্রাসকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়—ছেকানুপ্রাস ও বৃত্ত্যনুপ্রাস। উক্তক্রমে একবারমাত্র বর্ণবিন্যাস দেখা গেলে তা হয় ছেকানুপ্রাস[40]। এই ছেকানুপ্রাসই যখন মাধুর্যব্যঞ্জক বর্ণের দ্বারা সংঘটিত হয়, তখন তাকে উপনাগরিকা বৃত্তি বলা হয়।[41] অপরদিকে একটি বর্ণ অথবা অনেক বর্ণের যদি পুনঃ পুনঃ অভ্যাসক্রমে বিন্যাস দেখা যায় তাহলে সেখানে বৃত্ত্যনুপ্রাস ঘটে।[42] পূর্বোক্ত কেশবভট্টের শ্লোকে তকারাদি বর্ণের একাধিকবার সাদৃশ্য থাকার কারণে এখানে বৃত্ত্যনুপ্রাস হয়েছে।
পুনরুক্তবদাভাস - আলোচ্য শ্লোকের ‘শ্রীলক্ষ্মী’ এই অংশে চৈতন্যদেব পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার নির্দেশ করেছেন।[43] অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো বাক্যে যদি এমন দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় যাদের আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের পর্যায়বাচী বলে মনে হয় এবং একই অর্থের পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—তাহলে সেখানে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার ঘটে।[44] অর্থাৎ, যেখানে অর্থের পুনরুক্তি হয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না, সেই অবস্থাকেই পুনরুক্তবদাভাস বলা হয়। সাধারণত এই অলঙ্কারে ভিন্ন ভিন্ন শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে এইরূপ আভাস সৃষ্টি হয়।[45]
উক্ত শ্লোকে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ এই অংশটি পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কারের উদাহরণ। ‘শ্রী’ শব্দের একটি অর্থ ‘লক্ষ্মী’। তাই ‘শ্রীলক্ষ্মী’ বললে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন ‘লক্ষ্মী’ শব্দই দুইবার উচ্চারিত হয়েছে—একবার ‘শ্রী’ শব্দের মাধ্যমে এবং আবার ‘লক্ষ্মী’ শব্দে। এইভাবে, ‘শ্রী’ শব্দের ‘লক্ষ্মী’ অর্থ ধরলে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ শব্দে পর্যায়বাচী দুটি শব্দ পাওয়া যায়। ফলে এটি একই অর্থের পুনরাবৃত্তি বলে বোধ হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে পুনরুক্তি হয়নি। কারণ, এই স্থলে ‘শ্রী’ শব্দটি লক্ষ্মী অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং ‘সৌন্দর্য’ বা ‘শোভা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই দৃষ্টিতে ‘শ্রীলক্ষ্মী’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায়—শ্রীযুক্ত বা শোভাযুক্ত লক্ষ্মী। অতএব, এখানে ‘শ্রী’ এবং ‘লক্ষ্মী’ শব্দ দুটি বাস্তবে সমার্থক নয়, বরং ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এই কারণে প্রকৃত অর্থে কোনও পুনরুক্তি দোষ ঘটে না। তবে আপাতদৃষ্টিতে পুনরুক্তির আভাস পাওয়া যায় বলেই এই স্থলে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার প্রকাশ পেয়েছে।
পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কারে সাধারণত দুটি পর্যায়বাচী শব্দের ব্যবহার দেখা যায় এবং একই অর্থের পুনরুক্তি হয়েছে বলে মনে হয়। যেমন প্রকৃত শ্লোকে ‘শ্রী’ ও ‘লক্ষ্মী’ এই দুটি পর্যায়বাচী শব্দের পুনরাবৃত্তি হয়েছে এবং লক্ষ্মীরূপ অর্থেরও পুনরুক্তি ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে গৌড়ীয় সিদ্ধান্তের প্রমাণিক গ্রন্থ অলঙ্কারকৌস্তুভে বলা হয়েছে যে এই পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার দুই প্রকার হতে পার—শব্দনিষ্ঠ ও শব্দার্থনিষ্ঠ।[46] যেখানে কেবলমাত্র দুটি পর্যায়বাচী শব্দের পুনরুক্তি ঘটে, অর্থের কোন পুনরুক্তি থাকে না সেখানে শব্দনিষ্ঠ পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়।[47] আর যেখানে শব্দের সাথে সাথে অর্থেরও পুনরুক্তির আভাস দেখা যায়, সেখানে শব্দার্থনিষ্ঠ পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার হয়। প্রকৃত শ্লোকের ‘শ্রীলক্ষ্মী’ এই অংশে দুটি পর্যায়বাচী শব্দের সাথে সাথে তাদের অর্থেরও পুনরুক্তির আভাস পাওয়া যায়, তাই এখানে শব্দার্থনিষ্ঠ পুনরুক্তবদাভাস বলে বুঝতে হবে।
উপমা - কেশবভট্টের রচিত শ্লোকের ‘লক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্যচরণা’ এই অংশে উপমা অলঙ্কার রয়েছে।[48] অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী, যখন দুটি বস্তুর মধ্য়ে কোনও একটি সমান ধর্ম বা গুণের ভিত্তিতে তাদের তুলনা করা হয়, তখন সেখানে উপমা অলঙ্কার প্রকাশ পায়।[49] এই অলঙ্কারের লক্ষণ সম্বন্ধে সাহিত্যদর্পণগ্রন্থে বলা হয়েছে—“সাম্যং বাচ্যমবৈধর্ম্যং বাক্য়ৈক্য উপমা দ্বয়োঃ।।”[50] অর্থাৎ, একটি বাক্যে মধ্যে যদি দুটি পদার্থের বাচ্যার্থগত সাদৃশ্য প্রকাশ পায় এবং তাদের মধ্যে কোনও বিরুদ্ধ ধর্মের উল্লেখ না থাকে, তবে সেখানে উপমা অলঙ্কার লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃত বস্তু, যার মধ্যে অন্যবস্তুর সাদৃশ্য দেখানো হয় তাকে বলে উপমেয়, আর অন্যবস্তুটিকে বলে উপমান।
আলোচ্য শ্লোকে ‘লক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চ্যচরণা’ এই অংশে উপমা অলঙ্কারের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, দেবতা ও মানুষ যেমন দেবী লক্ষ্মীর চরণ পূজা করেন, তেমনই গঙ্গার চরণও অর্চনা করেন। এখানে উপমান হলেন লক্ষ্মী এবং উপমেয় হলেন গঙ্গা। উভয়ের মধ্যেই ‘অর্চনীয়তা’ বা পূজ্যতারূপ একটি সমান ধর্ম রয়েছে। এই সমান ধর্মের ভিত্তিতেই গঙ্গার সঙ্গে লক্ষ্মীর তুলনা করা হয়েছে। এইভাবে, লক্ষ্মী এবং গঙ্গার মধ্যে অর্চনীয়ত্বরূপ সমান ধর্ম থাকার কারণে ‘লক্ষ্মীরিব’ অংশে উপমালঙ্কার প্রকাশ পেয়েছে।
উপমা অলঙ্কারের সাধারণত চারটি অঙ্গ থাকে—উপমান, উপমেয়, সাধারণ ধর্ম ও সাদৃশ্য-বাচক ইব প্রভৃতি শব্দ। কোন উপমা অলঙ্কারে এই চারটি অঙ্গই যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে তাকে পূর্ণোপমা বলা হয়। পূর্বোক্ত অংশটি হল পূর্ণোপমার উদাহরণ। এখানে লক্ষ্মীর চরণ হল উপমান, গঙ্গার চরণ হল উপমেয়, অর্চনীয়ত্ব হল সাধারণ ধর্ম ও ইব হল সাদৃশ্য়-বাচক শব্দ। এইভাবে, এখানে চারটি অঙ্গেরই উল্লেখ থাকার কারণে এটিকে পূর্ণোপমা বলা হয়। উপমা অলঙ্কারে এই চারটির কোন একটি, দুটি বা তিনটি অঙ্গের উল্লেখ না থাকলে তাকে লুপ্তোপমা বলা হয়।[51]
সাধারণত উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে যে কোন প্রকারের সমান ধর্মের দ্বারা সম্বন্ধ থাকলে তাকে উপমা বলা হয়। এ প্রসঙ্গে অলঙ্কারকৌস্তুভ গ্রন্থে একটি বিশেষ তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সেটি হল, সাধর্ম্য দুটি বস্তু অর্থাৎ উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে সর্বাংশে থাকলে তা উপমা হিসেবে গণ্য় হয় না। এখানে সাধর্ম্য় কিছুটা অংশে সাধর্ম্য থাকতে হবে, তবেই তা উপমা হিসেবে গণ্য হবে।[52]
বিরোধাভাস - আলোচ্য শ্লোকের ‘এষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা’ এই বাক্যের ‘কমলোৎপত্তিসুভগা’ অংশে বিরোধাভাস অলঙ্কার নির্দেশ করা হয়েছে।[53] অলঙ্কারশাস্ত্র অনুসারে, যখন আলোচ্য বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনও বিরোধ না থাকলেও আপাতদৃষ্টিতে বিরোধ আছে বলে মনে হয়, তখন সেখানে বিরাধাভাস অলঙ্কার হয়। সাহিত্যদর্পণগ্রন্থে এই অলঙ্কারের লক্ষণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—জাতি, গুণ, ক্রিয়া বা দ্রব্যের সাথে জাতির, গুণ প্রভৃতি তিনটির সাথে গুণের, ক্রিয়া বা দ্রব্যের সাথে ক্রিয়ার অথবা দ্রব্যের সাথে দ্রব্যের আপাতদৃষ্টিতে পারস্পরিক বিরোধ প্রতীয়মান হলে, সেখানে বিরোধ অর্থাৎ বিরোধাভাস অলঙ্কার হয়।[54]
উক্ত শ্লোকের ‘এষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলোৎপত্তিসুভগা’ এই অংশটির অর্থ হল—শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল থেকে উৎপন্ন হওয়ার কারণে গঙ্গা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী। এখানে ‘কমলোৎপত্তি’ পদে বিরোধাভাস অলঙ্কার প্রকাশ পেয়েছে। পূর্বোক্ত বাক্যে বলা হয়েছে যে, বিষ্ণুর চরণরূপ কমলে জলরূপা গঙ্গার উৎপত্তি। কিন্তু সাধারণভাবে পদ্ম বা কমল জলে জন্মায়, কখনও কমলের মধ্যে জলের জন্ম হয় না। সুতরাং, কমলে গঙ্গার জন্ম হয়েছে বললে তা বাস্তব সত্যের পরিপন্থী বলে মনে হয়।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে কোনও বিরোধ নেই। কারণ, সাধারণ কমলে সাধারণ জলের জন্ম অসম্ভব হলেও ঈশ্বরের অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে শ্রীবিষ্ণুর চরণরূপ কমলে জলরূপা গঙ্গার জন্ম সম্ভব হয়েছে। এইভাবে, সাধারণ জাগতিক নিয়মের সঙ্গে এই উক্তির আপাত বিরোধ থাকলেও ধর্মীয় ও কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা গ্রহণযোগ্য। এই স্থলে, জল থেকে পদ্মের উৎপত্তি এবং পদ্ম থেকে জলের উৎপত্তি—এই দুটি ক্রিয়ার বিরোধ প্রকাশ পেয়েছে। অতএব, এখানে ক্রিয়ার সাথে ক্রিয়ার বিরোধ হয়েছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, গঙ্গা হলেন জলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং তাঁকে জলেরই রূপ বলে কল্পনা করা হয়। সেই অর্থে এই শ্লোকাংশে ‘জল’ অর্থেই ‘গঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য়দিকে, জলে পদ্মের উৎপত্তি হয়—এটিই হল সর্বজনবিদিত সত্য। তাই, শ্লোকে যখন বলা হয় যে বিষ্ণুর চরণরূপ পদ্ম থেকে জলরূপা গঙ্গার জন্ম হয়েছে তখন এই অদ্ভুত উক্তিতে এক প্রকার চমৎকার সৃষ্টি হয়, এবং এই চমৎকার বাক্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে বলে এটিকে অলঙ্কার বলা হয়েছে। এখানে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধ আছে বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তা বিরোধ নয়, বরং বিরোধের আভাসমাত্র। এই কারণেই এই অলঙ্কারকে বিরোধাভাস নামে অভিহিত করা হয়েছে।
বিরোধাভাস অলঙ্কারে আপাতভাবে বিরোধ মনে হলেও বাস্তবে কোনো প্রকৃত বিরোধ থাকে না। সাধারণভাবে বিরোধ বলতে অন্তত দুটি বস্তুর মধ্যে সংঘাত বোঝায়। এই দুটি বস্তুর প্রকৃতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে আলঙ্কারিকরা দশ ধরনের সংযোগস্থল নির্দিষ্ট করেছেন।[55] এগুলি হল—জাতির সঙ্গে জাতির, জাতির সঙ্গে গুণের, জাতির সঙ্গে ক্রিয়ার, জাতির সঙ্গে দ্রব্যের, গুণের সঙ্গে গুণের, গুণের সঙ্গে ক্রিয়ার, গুণের সঙ্গে দ্রব্যের, ক্রিয়ার সঙ্গে ক্রিয়ার, ক্রিয়ার সঙ্গে দ্রব্যের এবং দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের। অলঙ্কারকৌস্তুভাদি গ্রন্থে এই প্রতিটি সংযোগস্থল উদাহরণসহ বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।[56]
অনুমান - উক্ত শ্লোকের প্রথম দুটি পাদে চৈতন্যদেব অনুমান অলঙ্কার নির্দেশ করেছেন।[57] সাধনের দ্বারা যখন সাধ্যকে প্রতিপাদন করা হয় তখন তাকে অনুমান বলে। এখানে যে বিষয়টি প্রতিপাদিত বা প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে সাধ্য এবং যার দ্বারা সেই বিষয়টি প্রতিপাদিত বা প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে সাধন বলে। কাব্যে এই সাধ্য ও সাধনের উল্লেখের ফলে যদি বাক্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেখানে অনুমান অলঙ্কার হয়। অনুমানের মতো এখানেও সাধ্য, সাধন ও হেতু এই তিনটি উপাদান বিদ্যমান থাকায় এই অলঙ্কারকে অনুমান অলঙ্কার বলা হয়।[58] এই অলঙ্কারের লক্ষণ বিষয়ে সাহিত্যদর্পণগ্রন্থে বলা হয়েছে—“অনুমানং তু বিচ্ছিত্ত্যা জ্ঞানং সাধ্যস্য় সাধনাৎ।”[59] অর্থাৎ, সাধনের দ্বারা চমৎকারভাবে প্রকাশিত সাধ্যের জ্ঞানই হল অনুমান।
আলোচ্য শ্লোকের প্রথম দুটি পাদে অনুমান অলঙ্কারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। শ্লোকটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল গঙ্গার মহত্ত্ব। সুতরাং, গঙ্গার মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করাই হল এই শ্লোকের প্রধান উদ্দেশ্য। এই কারণে গঙ্গার মহত্ত্বকেই এখানে সাধ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গঙ্গার এই মহত্ত্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁর বিষ্ণুপাদোৎপত্তি, অর্থাৎ শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্ম থেকে তাঁর উৎপত্তি। অতএব, বিষ্ণুর পাদপদ্ম থেকে উৎপত্তিই হল গঙ্গার মহত্ত্বের কারণ বা সাধন। কাব্যে সাধনের দ্বারা সাধ্যের জ্ঞান এবং তাতে চমৎকার সৃষ্টি হলেই অনুমান অলঙ্কার প্রকাশ পায়। উক্ত শ্লোকাংশে বিষ্ণুর পাদপদ্ম থেকে উৎপত্তিরূপ সাধনের দ্বারা গঙ্গার মহত্ত্বরূপ সাধ্যের জ্ঞান লাভ করা যায়। এবং এই সাধ্য-সাধন সম্পর্কের চমৎকার প্রকাশ কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। অতএব, আলোচ্য শ্লোকের প্রথম দুটি পাদে অনুমান অলঙ্কার সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এইভাবে চৈতন্যদেব কেশবভট্টের রচিত শ্লোকটির বিশদ বিশ্লেষণ করে তাতে পাঁচটি স্থলে দোষ এবং পাঁচটি স্থলে অলঙ্কারের উপস্থিতি নির্দেশ করেন। এরপর তিনি একথাও উল্লেখ করেন যে, পণ্ডিত কেশবভট্ট দেবতার অনুগ্রহে এক বিশেষ অলৌকিক প্রতিভার অধিকারী। এই প্রতিভার বলেই তিনি প্রায় বিচার-বিবেচনা ছাড়াই অনর্গল কাব্য রচনা করতে সক্ষম হন। তবে চৈতন্যদেব ইঙ্গিত করেন যে, বিচারবোধের অভাবের কারণে কাব্যে কোনও না কোনও দোষ থাকা স্বাভাবিক। সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে উক্ত শ্লোকটিতে আরও অনেক দোষ ও গুণ আবিষ্কার করা যেতে পারে। তাই, কাব্য রচনার ক্ষেত্রে দোষ-গুণ বিচার করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ, দোষশূন্য কাব্যে যদি যথার্থ অলঙ্কারের সংযোজন ঘটে, তবে তা অধিকতর নির্মল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়।[60]
অন্যদিকে, চৈতন্য়দেবের সাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ে অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখে পণ্ডিত কেশবভট্ট বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন—যে নিমাই পণ্ডিত কেবলমাত্র সরল কলাপ-ব্যাকরণ পাঠদান করেন এবং অলঙ্কারশাস্ত্রাদি কখনও অধ্যয়ন করেছেন বলে মনে হয় না, সেই বালকই কীভাবে তাঁর মতো দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতের রচিত শ্লোকের এমন সূক্ষ্ম বিচার করতে পারলেন! এই চিন্তায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তাঁর মনে সন্দেহ জাগে যে দেবী সরস্বতী হয়তে তাঁর প্রতি বিরূপ হয়েছেন। কারণ, নিমাই পণ্ডিত যে ধরণের গভীর ও সূক্ষ্ম ব্য়াখ্যা করেছে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, মনে হয় যেন স্বয়ং সরস্বতীই নিমাইয়ের মুখ দিয়ে এই ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছেন।[61] এই ভেবে কেশবভট্ট অত্যন্ত লজ্জিত হন এবং তাঁর দীর্ঘদিনের গর্ব ও অহংকার ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।
এই সময়ে দিগ্বিজয়ীর পরাজয়ে শিষ্যরা হাসতে উদ্যত হলে চৈতন্যদেব তাদের বারণ করেন[62] এবং কেশবভট্টের অন্তরের এই পরিবর্তন অনুধাবন করতে পেরে তাঁকে সান্ত্বনা দেন। তিনি কেশবভট্টের অলৌকিক প্রতিভার প্রশংসাও করেন।[63] তিনি দিগ্বিজয়ীর উদ্দেশ্যে সবিনয়ে বলেন যে, বালকসুলভ চপলতার বশে তিনি তাঁর সঙ্গে কিছু বাচালতা করেছেন এবং তাঁর মতো মহাকবির রচিত শ্লোকের দোষ-গুণ বিচার করার স্পর্ধা দেখিয়েছেন। বাস্তুবে তাঁর নিজের সেই যোগ্যতা নেই, বরং তিনি কেশবভট্টের শিষ্যেরও তুল্য নন। জ্ঞান ও বয়স উভয় দিক থেকেই কেশবভট্ট তাঁর চেয়ে বড়, তাই তিনি যেন তাঁর এই বালকোচিত আচরণ ক্ষমা করেন।
এই কথোপকথনের পর উভয়েই স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। সেই রাত্রিতে কেশবভট্ট দেবী সরস্বতীর আরাধনা করে তাঁর চরণে নিজের অন্তরের বেদনা নিবেদন করেন। দেবী সরস্বতী তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে স্বপ্নে তাঁকে দর্শন দেন এবং যথাযথ উপদেশ প্রদান করেন। দেবী বলেন যে, শ্রীচৈতন্যদেব অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের স্বামী, আর তিনি নিজে তাঁর পাদপদ্মে বিরাজমান এক নিত্য দাসী।[64] যিনি সহস্র জিহ্বা দ্বারা বেদ ব্যাখ্যা করেন, সেই পরম ভগবানের সম্মুখে তাঁর শক্তির কোনো কার্যকারিতা থাকা সম্ভব নয়।[65] দেবীর উপদেশেই কেশবভট্ট জানতে পারেন যে নিমাই পণ্ডিত কোনো সাধারণ মানব নন, তিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর—স্বয়ং ভগবান। দেবী সরস্বতীর কৃপা ও উপদেশের ফলে কেশবভট্টের অন্তরের গর্ব-অহঙ্কারাদি সকল কালিমা সম্পূর্ণভাবে দূর হয়ে যায়।[66] পরদিন প্রাতঃকালে তিনি চৈতন্যদেবের কাছে এসে তাঁর চরণে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাঁর শরণাপন্ন হন। চৈতন্যদেবও তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়ে তাঁকে কৃপা করেন এবং নিজের চরণে স্থান দেন। এইভাবেই দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশবভট্টের জীবনে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি সংসার-বন্ধন থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হন।[67]
উপসংহার - ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর লীলাসহচারিণী শ্রীরাধার যুগলরূপ হিসেবেই শ্রীচৈতন্যদেব ধরাধামে অবতীর্ণ হন। তাঁর প্রবর্তিত ভক্তি আন্দোলন সমকালীন ভারতবর্ষে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। ভক্তিমার্গের প্রবর্তক হিসেবে তিনি সমগ্র বিশ্বে বন্দনীয়, তাই তাঁর এই পরিচয় সকলেরই জানা।
কিন্তু, তাঁর বিদ্বত্তার দিকটি সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পরিচিত নয়। চৈতন্যদেব যে সময়ে আবির্ভূত হন, তখন নবদ্বীপ সমগ্র ভারতের অন্যতম প্রধান শাস্ত্রচর্চার কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে ন্যায় ও ব্যাকরণ শাস্ত্রের আলোচনায় নবদ্বীপের বিশেষ খ্যাতি ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চৈতন্যদেব এই দুই শাস্ত্রের একজন উৎকৃষ্ট পণ্ডিত ছিলেন, এ বিষয়ে পণ্ডিতসমাজে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্যশাস্ত্রেও তাঁর যে গভীর পাণ্ডিত্য ছিল, সেটিই এই আলোচনার মূল বিষয়। সংস্কৃত শাস্ত্রে সাধারণত একটি বিষয়ে পারদর্শিতা থাকলে অন্য বিষয়েও কিছু জ্ঞান থাকে, কিন্তু প্রতি পদে পদে দোষ, গুণ ও অলঙ্কারের বিচার করতে হলে সাহিত্যশাস্ত্রে গভীর দক্ষতার প্রয়োজন হয়। এখানে দেখা যায়, চৈতন্যদেব একটি সংস্কৃত শ্লোকের পাঁচটি স্থলে দোষ ও পাঁচটি স্থলে অলঙ্কার নির্ণয় করেছেন। উল্লেখ্য, শ্লোকটির রচয়িতা ছিলেন দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত কেশবভট্ট। এত বড়ো পণ্ডিতের রচিত শ্লোক বিশ্লেষণ করতে হলে সাহিত্যশাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন। এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, চৈতন্যদেব সাহিত্যশাস্ত্রেও একজন উৎকৃষ্ট মানের বিদ্বান ছিলেন।
আবার, এত বড়ো পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যেভাবে কেশবভট্টকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, তাতে তাঁর উদার মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে তিনি যেন শিক্ষা দিয়েছেন যে, পাণ্ডিত্যের শিখরে পৌঁছালেও মানুষের মধ্যে অহংকার থাকা উচিত নয়। চৈতন্যদেব হলেন যুগাবতার, তাই তাঁর মধ্যে এইরূপ উদারতা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও এর মাধ্যমে তিনি যেন মানুষকে অহঙ্কার ত্যাগেরও শিক্ষা দিয়েছেন।
***
Kṛṣṇadāsa Kavirāja Gosvāmī. Śrī Śrī Caitanyacaritāmṛta (Ādilīlā, Second Part). Ed. Radhagovinda Nath. Kolkata: Sadhana Prakashani, 2006, 7th Edition.
Vrindavandas. Śrīśrīcaitanyabhāgavata. Ed. Baridvaran Ghosh. Kolkata: Dey’s Publishing, 1995, First Dey’s Edition.
- “রাধা কৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতির্হ্লাদিনী শক্তিরস্মাদেকাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ।
- চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্দ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ১.১.৫
- অর্থাৎ, শ্রীমতী রাধারাণী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য প্রেমের এক বিশেষ রূপ, তিনি তাঁর অন্তরঙ্গা আনন্দদায়িনী শক্তি, অর্থাৎ হ্লাদিনী শক্তি। মূলত রাধা ও কৃষ্ণ এক ও অভিন্ন সত্তা; কিন্তু দিব্য লীলার রস আস্বাদনের জন্য তাঁরা অনাদিকাল থেকে দুটি পৃথক দেহে প্রকাশিত হয়েছেন। পরবর্তীকালে সেই রাধা ও কৃষ্ণ পুনরায় একত্রিত হয়ে, রাধাভাবের দ্যুতিতে উদ্ভাসিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। ↑
- “…। সন্ন্যাসকৃচ্ছমঃ শান্তো নিষ্ঠা শান্তিঃ পরায়ণঃ॥
- সুবর্ণবর্ণো হেমাঙ্গো বরাঙ্গশ্চন্দনাঙ্গদী।…॥” —মহাভারত ১৩.১৪৯.৭৫,৯২
- এখানে প্রথম পঙ্ক্তিটির ভাষ্যে বলদেবাচার্য উক্ত ছয়টি শব্দেরই চৈতন্যপরক ব্যাখ্যা করেছেন—“সন্ন্যাসং পরিব্রজ্যং করোতীতি সন্ন্যাসকৃৎ। শময়ত্যালোচয়তি রহস্যং হরেরিতি শমঃ।... শাম্যত্যুপরমতি কৃষ্ণান্যবিষয়াদিতি শান্তঃ। নিতিষ্ঠন্ত্যস্যাং হরিকীর্তনপ্রধানা ভক্তিযজ্ঞা ইতি নিষ্ঠা।...শাম্যন্ত্যনয়া ভক্তিবিরোধিনঃ কেবলাদ্বৈতপ্রমুখা ইতি শান্তিঃ। মহাভাবান্তানাং ভাবভেদানাং পরমময়নমিতি পরায়ণম্।” অর্থাৎ, সন্ন্যাস বা পরিব্রাজক জীবন পালন করেন বলে শ্রীচৈতন্যদেব ‘সন্ন্যাসকৃৎ’। হরি-সম্পর্কীয় তত্ত্ব আলোচনা করেন বলে তিনি ‘শম’; কৃষ্ণভিন্ন যাবতীয় বিষয় থেকে বিরত থাকেন বলে তিনি ‘শান্ত’। হরিকীর্তন-প্রধান সকল ভক্তিযজ্ঞের ভিত্তি হওয়ায় তিনি ‘নিষ্ঠা’; কেবলাদ্বৈত প্রভৃতি বেদান্তমত তাঁর দ্বারা শান্ত হয় বলে তিনি ‘শান্তি’; এবং মহাভাব পর্যন্ত সকল প্রকার ভাবের উৎকৃষ্ট পথ হওয়ায় তিনি ‘পরায়ণ’।
- বলদেবাচার্য দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটিরি এইরূপ ব্যাখ্যা করেছেন—“সুবর্ণস্যেব বর্ণো রূপমস্যেতি সুবর্ণবর্ণঃ। হেমবৎ স্পৃহণীয়ানি বর্ণাধিষ্ঠানানি অঙ্গানি যস্য় স হেমাঙ্গঃ। বরাণি সৌন্দর্যবন্তি অঙ্গানি অস্যেতি বরাঙ্গঃ। চন্দনে ভক্তচিত্তাহ্লাদকে অঙ্গদে অস্যেতি চন্দনাঙ্গদী।” অর্থাৎ, শ্রীচৈতন্যদেবের দেহকান্তি সুবর্ণের ন্যায়, তাঁর অঙ্গসমূহও তদ্রূপ স্পৃহণীয়। তাঁর সমগ্র শরীর অত্যন্ত মনোহর, এবং চন্দনরূপ অলঙ্কার ভক্তজনের চিত্তকে গভীরভাবে আহ্লাদিত করে। ↑
- “...। নিমাঞি পণ্ডিত হয় বড় বিদ্যাবান্॥
- দিগ্বিজয়ী হারিয়া চলিলা যাঁর ঠাঞি।
- এত বড় পণ্ডিত আর কোথা শুনি নাঞি॥” —(বৃন্দাবন দাস, শ্রী শ্রী চৈতন্যভাগবত, পৃ. ৭৬) ↑
- “প্রভুর পাণ্ডিত্য-বুদ্ধি শিশুকাল হৈতে।…॥ —শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, পৃ. ৭০ ↑
- “তথাপিহ হেন তান মায়ার বড়াই।
- বুঝিবারে পারে তানে হেন জন নাই॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, পৃ. ৭০ ↑
- “ব্যাকরণমধ্যে জানি পঢ়াহ কলাপ।…॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ১.১৬.৩০ ↑
- “...। দিগ্বিজয়ী কহে, মনে অবজ্ঞা করিয়া—॥
- ব্যাকরণ পড়াহ নিমাই পণ্ডিত তোমার নাম।
- বাল্যশাস্ত্র লোক তোমার কহে গুণগ্রাম॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ১.১৬.২৮-২৯ ↑
- ‘ঘটিকাশতক’ একটি বিশেষ উপাধি। প্রাচীনকালে পণ্ডিতদের বিদ্বত্তা ও কবিত্বশক্তি পরীক্ষা করার জন্য এক ধরনের বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। সেই পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এক ঘটিকা, অর্থাৎ প্রায় চব্বিশ মিনিটের মধ্যে, একশটি সংস্কৃত শ্লোক রচনা করতে হত।
- যে পণ্ডিত এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একশটি শ্লোক রচনা করতে সক্ষম হতেন, তাঁকে তাঁর অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ঘটিকাশতক’ উপাধিতে সম্মানিত করা হত। এই উপাধি মূলত তৎকালীন পণ্ডিতসমাজে কবিত্বশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও তৎক্ষণাৎ রচনাশক্তির বিশেষ পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হত। ↑
- চৈতন্যদেব ‘শ্রুতিধর’ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। যিনি কোনো বিষয় একবার শোনামাত্রই তা সহজে গ্রহণ করতে এবং দীর্ঘকাল স্মরণে রাখতে সক্ষম হন, তাঁকে ‘শ্রুতিধর’ বলা হয়। এই বিশেষ গুণের কারণেই শ্রীচৈতন্যদেবের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর; তিনি কোনো শাস্ত্র বা আলোচনা একবার শুনলেই তা সহজে আয়ত্ত করতে পারতেন এবং যথাযথভাবে স্মরণে রাখতে সক্ষম হতেন। ↑
- “...। বিস্মিত হৈয়া দিগ্বিজয়ী প্রভুরে পুছিল—॥
- ঝঞ্ঝাবাত প্রায় আমি শ্লোক পঢ়িল।
- তার মধ্যে শ্লোক তুমি কৈছে কণ্ঠে কৈল?॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ১.১৬.৩৯-৪০ ↑
- “পঞ্চ দোষ এই শ্লোকে, পঞ্চ অলঙ্কার।” —শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ১.১৬.৫১ ↑
- “রসোপকর্ষকো দোষঃ। অপকর্ষকঃ স্থগনকারী।” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, ১০.১ ↑
- “অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ দুই ঠাঁই চিহ্ন।
- বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রম পুনরাত্ত দোষ তিন॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ১.১৬.৫২ ↑
- ‘শিখরিণী’ ছন্দের লক্ষণ হল— “রসৈ রুদ্রৈশ্ছিন্না যমনসভলাগঃ শিখরিণী”, বৃত্তরত্নাকর ৩.১২৩ ↑
- সাহিত্যদর্পণ, পৃ.৪৭৯ ↑
- “গঙ্গার মহত্ত্ব শ্লোকে মূল বিধেয়।
- ইদং শব্দ অনুবাদ পাছে অবিধেয়॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৫৩ ↑
- “বিধেয় আগে কহি, পাছে কহিলে অনুবাদ।
- এইলাগি শ্লোকের অর্থ করিয়াছে বাদ॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৫৪ ↑
- উদাহরণ যেমন— “অকৃতং সুকৃতং কিঞ্চিদতপ্তঞ্চ তথা তপঃ।
- ভবেয়ং যেন তে নাথ করুণালবভাজনম্॥”
- এর অর্থ, হে নাথ! যাতে আমি তোমার করুণাকণাভাজন হতে পারি, এরূপ কোন সুকৃতও অকৃত, তপঃ-ও অনাচরিত। এখানে নিষেধার্থক নঞের প্রাধান্য রয়েছে, কিন্তু সমাসে তা গৌণ হয়ে গেছে। একইভাবে, এখানে করুণালব অর্থাৎ করুণাকণার-ই প্রাধান্য থাকা উচিত কিন্তু তাও সমাসে গৌণ হয়ে গেছে। ফলে এখানে অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ দোষ হয়েছে। এখানে শ্লোকে যদি সমাসের প্রয়োগ না থাকত তাহলে এই দোষ হত না। অর্থাৎ—
- “ন কৃতং সুকৃতং কিঞ্চিন্ন তপ্তং চ তথা তপঃ।
- ময়ি যেন ভবেন্নাথ করুণায়া লবোঽপি তে॥”
- এইরূপ শ্লোকরচনা করা হলে, সেখানে নঞর্থ বা করুণাকণা—উভয় অর্থেরই প্রাধান্য বজায় থাকে। এবং এই অবস্থায় অবিমৃষ্ট-বিধেয়াংশের কোন অবকাশ থাকে না। আবার যেখানে নঞের সাথে সমস্ত পদার্থের বিশেষ অভিধান করা প্রয়োজনীয় হয়, সেখানে নঞের সাথে সমাস হলেও কোন দোষ হয় না। এর উদাহরণ যেমন—
- “অনাসক্তঃ কর্ম কুর্বন্নসক্তো বিষয়ান্ জুষন্।
- অপ্রমত্তো ভজন্ কৃষ্ণং ন স তৈস্তৈর্নিবধ্যতে॥”
- অর্থাৎ, যিনি অনাসক্ত হয়ে কর্মাচরণ, অলিপ্ত হয়ে বিষয় সেবন, অপ্রমত্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণভজন করেন, তাঁকে ঐ ঐ ব্যাপারে নিবদ্ধ হতে হয় না। এখানে নঞের সাথে আসক্ত প্রভৃতি পদার্থের বিশেষ অভিধান করা প্রয়োজনীয়। তাই এখানে নঞের সাথে সমাস হওয়ার সত্ত্বেও কোন দোষ হয়নি।—দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ.পৃ. ৭২৫-৭২৮ ↑
- “দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মী ইহাঁ দ্বিতীয় বিধেয়।
- সমাসে গৌণ হইল, শব্দার্থ গেল ক্ষয়॥
- দ্বিতীয় শব্দ বিধেয়, তাহা পড়িল সমাসে।
- লক্ষ্মীর সমতা অর্থ করিল বিনাশে॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৫৫-৫৬ ↑
- “ভবানীভর্তৃ-শব্দ দিলে পাইয়া সন্তোষ।
- বিরুদ্ধমতিকৃৎ নাম এই মহা দোষ॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৫৮ ↑
- দ্রষ্টব্য, সাহিত্যদর্পণ, লক্ষ্মীটীকা, পৃ.৪৭৮ ↑
- “ভবানী-শব্দে কহে মহাদেবের গৃহিণী।
- তার ভর্তা কহিলে দ্বিতীয় ভর্তা জানি॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৫৯ ↑
- শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬১ ↑
- উদাহরণ যেমন— “সমাংসমীনাবলিচারয়দ্ভির্গবাং কুলং বল্লববালবৃন্দৈঃ।
- বৃন্দাবনে কৌতুককেলিলোলঃ পুনাতু বঃ শ্রীব্রজরাজসূনুঃ॥”
- এর অর্থ, বৃন্দবনে সমাংসমীনাবলিবিশিষ্ট গো-কুলের চারণে তৎপর গোপ বালকগণের সাথে যিনি কেলি-কৌতুকে সতত সমুৎসুক, সেই ব্রজতনয় তোমাদিগকে রক্ষা করুন। প্রতিবর্ষে যে গাভী প্রসব করে, তার শ্রেণীকে ‘সমাংসমীনাবলিবিশিষ্ট’ বলা হয়। এখানে এই অর্থের উক্ত পদটি ব্য়বহার করা হয়েছে। কিন্তু পাঠকগণের মনে এই পদ থকে ‘মাংস-মীনাবলি সহিত’ এইরূপ অর্থেরই উদয় হয়। যার ফলে এখানে বিরুদ্ধমতিকৃৎ দোষ দেখা দেয়।—দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৭৩১ ↑
- “বিভবতি ক্রিয়ায় বাক্যসাঙ্গ পুন বিশেষণ—
- অদ্ভুতগুণা এই পুনরাত্ত-দূষণ॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬২ ↑
- দ্রষ্টব্য, সাহিত্যদর্পণ, পৃ.৪৯৭ ↑
- “বিষাদে বিস্ময়ে হর্ষে কোপে দৈন্যেঽবধারণে।
- উদ্দেশ্যে প্রতিনির্দ্দেশ্যে বিষয়ে চ প্রসাদনে।
- অনুক্রম্যাদিকে চাপি পৌনরুক্তং ন দুষ্যতীতি॥” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ.৭৯২ ↑
- উদ্দেশ্যে-প্রতিনির্দ্দেশ্যের উদাহরণ যেমন—
- “ন ভজতি তপসা ক্লমঃ ক্লমত্বং বিষয়ভবং ন সুখং সুখত্বমেতি।
- বিষমপি চ বিষস্য় নাশকং স্য়ান্ন হি সদৃশে সদৃশত্বমেব নিত্যম্॥”
- অর্থাৎ, তপোজনিত ক্লেশ কখনও বৈষয়িক ক্লেশের সাথে তুলনাযোগ্য হতে পারে না, বৈষয়িক সুখ কখনও পারমার্থিক সুখের সমান হতে পারে না। আবার বিষও কদাচিৎ বিষের নাশক হয়ে থাকে—তাই সদৃশ বস্তুতে সাদৃশ্যই সর্বদা থাকবে, এরূপ কোন নিয়ম নেই। এখানে ক্লমাদি বস্তুসমূহকে উদ্দেশ্য করে তাদের মধ্যে অক্লমত্বাদি ধর্ম নির্দেশ করা হয়েছে। এই ধরণের স্থলে পুনরুক্তি গুণই হয়, দোষ হয় না। দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৭৯৩ ↑
- “তিন-পাদে অনুপ্রাস দেখি অনুপম।
- এক-পাদে নাহি—এই দোষ ভগ্নক্রম॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬৩ ↑
- দ্রষ্টব্য, সাহিত্যদর্পণ, পৃ.৫১৪ ↑
- “স চ কারকবচনপর্য্যায়াদি-ক্রমাঙ্গাদিত্বেন বহুধা ভবতি।” —দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৭৯০ ↑
- কারক ও বচনের ক্ষেত্রে ক্রমভঙ্গের উদাহরণ যেমন—
- “কাচিদ্বীণাং মুরজমপরা কাপি বংশীং দধানা
- কাশ্চিত্তালং করকিশলয়ে তালধারিত্বমাপ্তাঃ।
- চক্রুঃ সঙ্গীতকবিরচনাং রাসমধ্যে কয়াচিদ্
- গানং নানাস্বরপরিমলং মোদমুচ্চৈর্বিতেনে॥”
- অর্থাৎ, কেউ বীণা, কেউ মুরজ, কেউ বা বংশী ধারণ করে ও কারও বা করপল্লবে তালপ্রদানপূর্বক তালধারিণীত্ব ধর্ম প্রাপ্ত হয়ে রাসমধ্যে সঙ্গীতগোষ্ঠী রচনা করেছেন। কোন কামিনীকর্তৃক নানা স্বরপরিমল পূর্ণ সঙ্গীত আরব্ধ হয়েছে এবং প্রচুর প্রমাদামৃত পরিবেশিত হচ্ছে। এখানে ‘কয়াচিদ্’ এই স্থলে কারকের এবং ‘কাশ্চিদ্’ এই স্থলে বচনের ক্রমভঙ্গ হয়েছে।—দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৭৯০ ↑
- “যত্র তু আরম্ভ এব ক্রমো নাস্তি তত্র ভগ্নক্রমদোষো নাস্তি।” —দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ.৭৯৩ ↑
- “যদ্যপি এই শ্লোকে আছে পঞ্চ অলঙ্কার।
- এই পঞ্চ দোষে শ্লোক কৈল ছারখার॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬৪ ↑
- “দশ অলঙ্কারে যদি এক শ্লোক হয়।
- এক দোষে সব অলঙ্কার হয় ক্ষয়॥
- সুন্দর শরীর যৈছে ভূষণে ভূষিত।
- এক শ্বেতকুষ্ঠে যৈছে করয়ে বিগীত॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬৫-৬৬ ↑
- “পঞ্চ অলঙ্কারের এবে শুনহ বিচার।
- দুই শব্দালঙ্কার, তিন অর্থ-অলঙ্কার॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬৭ ↑
- “শব্দালঙ্কার, —তিন পাদে আছে অনুপ্রাস। …॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬৮ ↑
- “অনুপ্রাস্যত ইত্যর্থেঽনুপ্রাসো বর্ণসাম্যতঃ।
- সজাতীয়ং বর্ণমনু সজাতীয়বর্ণান্তরং প্রকর্ষেণ অস্যত ইতি ব্য়ুৎপত্তিঃ” —দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৪৫৪ ↑
- সাহিত্যদর্পণ ১০.৩ ↑
- ছেকানুপ্রাসের উদাহরণ যেমন—
- “ধাম শ্যামমিদং শ্রীদং জগতো বিরতোদয়ং।
- ধ্যেয়ং গেয়ং চ সর্বেষাং দৃশোঃ প্রেম যশোময়ম্॥”
- অর্থাৎ, ত্রিভুবনের সৌন্দর্য্যসম্পাদক সর্বদা সমুদিত এই শ্যামধাম ধ্যেয়, গেয়, যশোময় ও নিখিল নেত্রের প্রেমনিলয়। এখানে মকার ও যকারের একবারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, তাই এখানে ছেকানুপ্রাস হয়েছে। —দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৪৫৫ ↑
- “মাধুর্যব্যঞ্জকত্বেন স এব হ্যুপনাগরঃ।” অর্থাৎ, মাধুর্যব্যঞ্জকবর্ণের দ্বারা যখন ছেকানুপ্রাস হয় তখন তাকে উপনাগরিকা বৃত্তি বলা হয়। এর উদাহরণ যেমন—
- “অনঙ্গমঙ্গলারম্ভে সম্ভেদঃ স্বেদকম্পয়োঃ।
- শঙ্কে পঙ্কেরুহদৃশো ন রস্যানন্দমত্ততা॥”
- অর্থাৎ, অনঙ্গদেবের মঙ্গলময় আরম্ভেই যখন স্বেদ ও কম্পনের সঙ্গম নিরীক্ষণ করছি, তখন সরোরুহাক্ষীর এই আনন্দমত্ততা সুন্দর রসাবহ হবে বলে বোধ হচ্ছে না। এই শ্লোকে ঙকার, গকার, দকার প্রভৃতি বর্ণের একবার করে পুনরাবৃত্তি হওয়ায় ছেকানুপ্রাস হয়েছে। এবং এই বর্ণগুলি মাধুর্যগুণের ব্যঞ্জক হওয়ার এখানে ছেকানুপ্রাসকে উপনাগরিকা বৃত্তি বলা হবে। —দ্রষ্টব্য, অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৪৫৫ ↑
- “স চ দ্বেধা চ্ছেকবৃত্তিভেদাৎ। একবারানুন্যাসেন চ্ছেকঃ স্যাৎ।… একস্যাপ্যথবানেকস্য়াম্রেড়িততয়া যদি ন্য়াসঃ স্য়াদ্বৃত্ত্যনুপ্রাসঃ।” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৪৫৪ ↑
- “...। শ্রীলক্ষ্মী-শব্দে পুনরুক্তবদাভাস॥
- শ্রী-শব্দে লক্ষ্মী-শব্দে এক বস্তু উক্ত।
- পুনরুক্তপ্রায় ভাসে, নহে পুনরুক্ত॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৬৮,৭১ ↑
- “পুনরুক্তবদাভাসঃ পুনরুক্তবদেব যঃ॥” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৫০৩ ↑
- দ্রষ্টব্য, সাহিত্যদর্পণ, পৃ.৬০৭ ↑
- “অয়ং শব্দার্থনিষ্ঠোঽপি ভবতি॥” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৫০৪ ↑
- এর উদাহরণ যেমন—
- “তব তনু শরীরসদৃশীং কাঞ্চন কনকস্য় বীরুধং নেক্ষে।
- রাধে সুমুখি ভবত্যা মুখবদনঙ্কোঽপি শুভ্রাংশুঃ॥”
- অর্থাৎ, অয়ি সুমুখি রাধে! তোমার তনুতরশরীর যষ্টির সদৃশ কোন কনকলতা আমি দেখি নাই এবং তোমার মুখের মতো নিষ্কলঙ্ক সুধাংশুও কোথাও লক্ষ্য করি নাই। এই শ্লোকে আপাতভাবে ‘মুখ’ ও ‘বদন’ এই দুটি পর্যায়বাচী শব্দের পুনরুক্তি হয়েছে বলে বোধ হয়। কিন্তু এখানে ‘মুখবৎ অনঙ্কঃ’ এইরূপ পদবিচ্ছেদ হওয়ায় বাস্তবে কোন পুনরুক্তি হয়নি। —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৫০৩ ↑
- “লক্ষ্মীরিব অর্থালঙ্কার উপমা প্রকাশ। …॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৭৩ ↑
- “যথাকথঞ্চিৎ সাধর্ম্যমুপমা॥” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৫০৭ ↑
- দ্রষ্টব্য, সাহিত্যদর্পণ, পৃ.৬৫২ ↑
- লুপ্তোপমার উদাহরণ যেমন—
- “ব্যূঢ়োরস্কো বৃষস্কন্ধঃ শালপ্রাংশুর্মহাভুজঃ।
- আত্মকর্মক্ষমং দেহং ক্ষাত্রো ধর্ম ইবাশ্রিতঃ॥”—[রঘুবংশ ১.১৩]
- অর্থাৎ, তাঁর (রাজা দিলীপের) বক্ষঃস্থল ছিল প্রশস্ত, স্কন্ধদেশ বৃষের ন্যায় স্থূল, বাহুযুগল ছিল আজানুলম্বিত এবং তিনি শালবৃক্ষের ন্যায় উন্নত ছিলেন; তাঁকে দেখলেই বোধ হত যেন স্বয়ং মূর্তিমান ক্ষত্রিয়ধর্ম নিজ কার্যসম্পাদনের উপযুক্ত শরীর ধারণ করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন।
- এই শ্লোকে ‘বৃষস্কন্ধঃ’ পদের বিগ্রহ হল— ‘বৃষস্য় স্কন্ধঃ ইব স্কন্ধো যস্য সঃ’। বিগ্রহবাক্য থেকে বোঝা যায়, এখানে সাদৃশ্য়বাচক ‘ইব’ শব্দের, এবং সাধারণধর্মবাচক ‘বলবত্ত্ব’ প্রভৃতি শব্দের লোপ হয়েছে। ‘শালপ্রাংশুঃ’ পদের বিগ্রহবাক্য হল— ‘শালঃ ইব প্রাংশুঃ শালপ্রাংশুঃ’। এখানে কেবল সাদৃশ্যবাচক ‘ইব’ শব্দেরই লোপ হয়েছে। ↑
- “স (সাদৃশ্যসম্বন্ধঃ) চ অংশেন ন তু সর্বৈরংশৈঃ সর্বাংশত্বেন অভেদাদুপমানোপমেয়ভাব এব ন ভবতীতি।” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৫০৭ ↑
- “...। আর অর্থালঙ্কার আছে, নাম বিরোধাভাস॥
- ঈশ্বর-অচিন্ত্যশক্ত্যে গঙ্গার প্রকাশ।
- ইহাতে বিরোধ নাহি বিরোধ-আভাস॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৭৩,৭৬ ↑
- “জাতিশ্চতুর্ভির্জাত্যাদ্যৈর্গুণো গুণাদিভিস্ত্রিভিঃ॥
- ক্রিয়া ক্রিয়াদ্রব্যাভ্য়াং যদ্দ্রব্যং দ্রব্যেণ বা মিথঃ।
- বিরুদ্ধমিব ভাসেত বিরোধোঽসৌ…॥” সাহিত্যদর্পণ ১০.৬৭-৬৮ ↑
- “বিরোধঃ স বিরোধাভঃ জাতির্জাত্যাদিভির্গুণৈঃ।” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৩১৫ ↑
- ক্রিয়ার সাথে ক্রিয়ার বিরোধ যেমন—
- “জীবয়তি চ মূর্ছয়তি চ পীনয়তি চ সূক্ষ্ময়ত্যপি চ।
- তব মুরলীরবখুরলী নো জানে কিং বিজানাতি॥”
- অর্থাৎ, জানি না, তোমার তীক্ষ্ণ বেণুরব কী আশ্চর্য জ্ঞান ধারণ করে—কখনও প্রাণ সঞ্চার করে, কখনও মূর্ছিত করে, কখনও স্থূল করে আবার কখনও সূক্ষ্ম করে। এখানে একটি ক্রিয়ার সাথে অপর ক্রিয়ার বিরোধ স্পষ্ট, কিন্তু বেণরবের আশ্চর্য ক্ষমতার কারণে উক্ত চার ধরণের ক্রিয়াই সম্ভব হয়ে ওঠে। ফলে ক্রিয়াগুলির মধ্যে আপাত বিরোধ প্রতীয়মান হলেও বাস্তবে তাদের কোন বিরোধ নেই। এই কারণেই এখানে বিরোধাভাস অলঙ্কার হয়েছে। —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৩১৬ ↑
- “গঙ্গার মহত্ত্ব সাধ্য, সাধন তাহার—।
- বিষ্ণুপাদোৎপত্তি—অনুমান অলঙ্কার॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৭৭ ↑
- “সাধ্যসাধনসদ্ভাবেঽনুমানমনুমানবৎ।
- অনুমানে যথা ত্রিবিধো হেতুস্তথাত্রাপি॥” —অলঙ্কারকৌস্তুভ, পৃ. ৬২৫ ↑
- সাহিত্যদর্পণ ১০.৬৩ ↑
- “প্রতিভা-কবিত্ব তোমার দেবতাপ্রসাদে।
- অবিচার-কবিত্বে অবশ্য পড়ে দোষ-বাদে॥
- বিচারি কবিত্ব কৈলে হয় সুনির্মল।
- সালঙ্কার হৈলে—অর্থ করে ঝলমল॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৭৯,৮০ ↑
- “পঢ়ুয়া বালক কৈল মোর বুদ্ধিলোপ।
- জানি সরস্বতী মোরে করিয়াছেন কোপ॥
- যে ব্যাখ্যা করিল, সে মনুষ্যের নহে শক্তি।
- নিমাইর মুখে রহি বোলে আপনে সরস্বতী॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৮৩,৮৪ ↑
- “দিগ্বিজয়ী যদি পরাভবে প্রবেশিলা।
- শিষ্যগণ হাসিবারে উদ্যত হইলা॥
- সভারেই প্রভু করিলেন নিবারণ।
- বিপ্র-প্রতি বলিলেন মধুর বচন॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, পৃ. ৭০ ↑
- “শাস্ত্রের বিচার ভাল মন্দ নাহি জানি।
- সরস্বতী যে বোলায়, বলি সেই বাণী॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.৮৮ ↑
- “সরস্বতী বোলেন শুনহ বিপ্রবর!
- বেদ-গোপ্য কহি, এই তোমার গোচর॥
- …যার ঠাঞি তোমার হৈল পরাজয়।
- অনন্ত-ব্রহ্মাণ্ড-নাথ তিহোঁ সুনিশ্চয়॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, পৃ. ৭৩ ↑
- “আমি সে বলিয়ে বিপ্র! তোমার জিহ্বায়।
- তাহার সম্মুখে শক্তি না বসে আমায়॥
- আমার কি দায় শেষ-দেব ভগবান্।
- সহস্র-জিহ্বায় বেদ যে করে ব্যাখ্যান॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত, পৃ. ৭৪ ↑
- “সরস্বতী স্বপ্নে তারে উপদেশ কৈল।
- সাক্ষাৎ ঈশ্বর করি প্রভুকে জানিল॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.১০০ ↑
- “প্রাতে আসি প্রভু-পদে লইল শরণ।
- প্রভু কৃপা কৈল, তাঁর খণ্ডিল বন্ধন॥
- ভাগ্যবন্ত দিগ্বিজয়ী সফলজীবন।
- বিদ্যাবলে পাইল মহাপ্রভুর চরণ॥” —শ্রীশ্রীচৈতন্য়চরিতামৃত ১.১৬.১০১,১০২ ↑