Skip to main content
RSS Feed পরিচয় সাইন-ইন
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার · ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আনুপূর্বী আনুপূর্বী
অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে
আসন্ন অনুষ্ঠান 20 Sep 2026
EXPLORING CRITICAL LIVES: FERNANDO PESSOA AND PHILOSOPHY
Dr. Bartholomew Ryan
লেখা পাঠান
বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সেকাল একাল
14 মিনিট পাঠ

বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সেকাল একাল

আধুনিক বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল নয়; ঔপনিবেশিক নীতি, রাজনৈতিক স্বার্থ, পরিচয়ভিত্তিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে তা ক্রমশ গভীর হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের বৌদ্ধিক বিতর্ক থেকে শুরু করে মুসলিম লীগের উত্থান, বেঙ্গল প্যাক্ট, ১৯৪৬-এর কলকাতা ও নোয়াখালির দাঙ্গা এবং দেশভাগ—এই দীর্ঘ পর্ব বাংলার সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্বাধীনতার পরেও ভোটব্যাংক-কেন্দ্রিক রাজনীতি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগে সেই দ্বন্দ্ব নতুন রূপে অব্যাহত থাকে। এই ইতিহাসের মূল শিক্ষা—তুষ্টীকরণ নয়, সমান আইন, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক শাসনের ভিত্তিতেই বহুত্ববাদী সমাজের স্থায়িত্ব সম্ভব।
Rakesh Das
লেখক
ভাদ্র ১৪৩৩
অক্ষরের মাপ:
শেয়ার ও ফিড: RSS

আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলার স্থান যথেষ্ট ব্যতিক্রমী। একদিকে সমাজ সংস্কারমূলক নানাবিধ ঘটনা, আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ, এবং জাতীয়তার জাগরণের অন্যতম পীঠস্থান বাংলা; অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সর্বাধিক পুরোনো ও সবচেয়ে স্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাজনের সময়ে পাঞ্জাব ও বাংলা সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক নৃশংসতার শিকার হয়েছিল। বাংলায় এই প্রক্রিয়া ধীরে, স্তরে স্তরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে বিকশিত হয়েছিল। বাংলায় সাম্প্রদায়িক ভাবধারার প্রতিষ্ঠা হয়েছে আগে । সেই ভাবধারার হাত ধরে গণ-সংগঠন তৈরি হয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদের বদলে নানা ভাবে আপসের মানসিকতার মাধ্যমে সংঘর্ষের পূর্বপীঠিকা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক হিসাব বারবার নৈতিকতাকে অবদমিত করেছে।

বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উৎকট প্রদর্শন আকস্মিক ঘটনা নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আদর্শহীনতা, বৌদ্ধিক দুর্বলতা, ঔপনিবেশিক নীতি, নির্বাচনী কৌশল, সাংস্কৃতিক বিরোধ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এই সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা সমাজের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছে। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা ও উত্তেজনাকে উপলব্ধি করতে হলে বিগত কয়েক দশক ধরে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা বিচ্ছিন্ন হিন্দুবিরোধী দাঙ্গার দিকে নয়, বাংলার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

সেন বংশের পতনের পরে বখ্তিয়ার খিলজির হাত ধরেই বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজ বপন হয়েছিল। চৈতন্য পূর্ববর্তী ও চৈতন্য সমসাময়িক বিবিধ সাহিত্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মুসলিম শাসকের অত্যাচার ও নিপীড়নের নানাবিধ সাহিত্যিক উল্লেখ ও নিদর্শন অত্যন্ত সুলভ।

বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইতিহাস কেবল বিভেদের ইতিহাস নয়—এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা, নৈতিক আপস এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার এক দীর্ঘ দলিল।

আধুনিক যুগে–ঊনবিংশ শতকে–এই সাম্প্রদায়িক সমস্যাকে প্রথম সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছিলেন চন্দ্রনাথ বসু। কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম বা নীতির মধ্যে নয়, বৌদ্ধিক চিন্তনে। ১৮৯২ সালে চন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘হিন্দুত্ব: হিন্দুর প্রকৃত ইতিহাস’ গ্রন্থে ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটির প্রয়োগ করেন। চন্দ্রনাথ এই শব্দটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেননি; তিনি এই শব্দটিকে ব্যবহার করেছিলেন বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাকে বোঝানোর জন্য–যার মধ্যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, সামাজিক রীতি, নৈতিক মূল্যবোধ এবং হিন্দু সমাজের সমষ্টিগত স্মৃতি অন্তর্ভুক্ত। তিনি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেননি, বরং তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন আত্মরক্ষার বিষয়ে। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের পক্ষপাত ও বাংলার জনবিন্যাসের দ্রুত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয় এবং ঔপনিবেশিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। তাঁর এই আশঙ্কা ধর্মতাত্ত্বিক ছিল না, ছিল সামাজিক এবং রাজনৈতিক। এবং তাঁর এই আশঙ্কা অমূলক ছিল না। এই আশঙ্কার পিছনে ছিল তাঁর গভীর ইতিহাসের অধ্যয়ন। তিনি যথার্থভাবেই দেখিয়েছিলেন, যখন ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন সহাবস্থান আর স্বাভাবিক থাকে না, শর্তসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। সমসাময়িক চিন্তকবর্গের মধ্যে কয়েকজন এই সতর্কতাকে অতিরঞ্জিত মনে করলেও পরবর্তী ইতিহাস তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করেছে।


বাংলার রাজনীতিতে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চন্দ্রনাথ বসুর আশঙ্কা সত্যতা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথমদিকে মুসলিম লীগ আপাত দৃষ্টিতে অভিজাত সংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে, যার লক্ষ্য ছিল প্রশাসন, শিক্ষা ও আইনসভায় মুসলমানদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু ভিতরে ভিতরে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল ইসলামের ভিত্তিতে বাংলার সমাজে একটি রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করা। মুসলিম লীগ তৈরির এই পদক্ষেপটি ছিল গভীর ও নির্ধারক। রাজনীতিতে আঞ্চলিক স্বার্থ ও জনকল্যাণের স্থান নিল কঠোর সাম্প্রদায়িক গণিত। আদর্শের জায়গা নিল পরিচয়, আলোচনার জায়গা নিল দরকষাকষি। বাংলার সূক্ষ্ম সামাজিক বুনন ক্রমে ছিঁড়ে যেতে থাকে। এই বুননকে যে সুতো ধরে রেখেছিল সেটি ছিল ভারতবর্ষের প্রবহমান সংস্কৃতি। মুসলিম লীগ সরাসরি এই সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করে বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রতি আত্মসমর্পণ করে এই সুতোকে ছিঁড়ে ফেলে। প্রসঙ্গতঃ, তিতুমীরের ওয়াহাবি আন্দোলন ছিল বাংলার বুকে এই বৈদেশিক আরবীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। কিন্তু, ইতিহাসের প্রতি অবিচার করে এই আন্দোলনকে বলপূর্বক এবং অযথার্থ ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের নাম দেওয়া হয়েছে।

যাই হোক, এই সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ থামানোর একটি প্রয়াস করেন। দেশবন্ধু বিশ্বাস করতেন যে হিন্দু সমাজ মাত্রাতিরিক্ত ভাবে নিজেদের সুযোগ সুবিধা ত্যাগ করে মুসলমান সমাজের তুষ্টীকরণ করলে মুসলমান সমাজের বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব এবং তার মাধ্যমেই মুসলিম লীগের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা প্রশমিত হবে। এই চুক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য জনসংখ্যার তুলনায় বেশি আইনসভা আসন, সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার এবং সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত দাবির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দেশবন্ধুর চোখে এগুলি ছিল প্রাদেশিক ঐক্যের নৈতিক বিনিয়োগ। কিন্তু এই চুক্তির একটি মৌলিক দুর্বলতা ছিল—পারস্পরিক নিশ্চয়তা ছাড়া দেওয়া অনৈতিক সুযোগ সুবিধা আস্থার বদলে অন্যায় প্রত্যাশা তৈরি করে। হিন্দু নেতৃত্ব এই চুক্তিকে কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ হিসাবে দেখলেন, আর মুসলমান নেতৃত্ব একে ভবিষ্যৎ দাবির ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করলেন। বলা বাহুল্য এই চুক্তি সফলতা পেল না। অথচ এই প্রয়াস হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের বদলে একটি তিক্ততা রেখে গেল এবং বাংলার রাজনীতিতে এই বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল যে, সাম্য নয়, একতরফা তুষ্টীকরণই সাম্প্রদায়িক আনুগত্যের পথ।

এরপর সাংস্কৃতিক রাজনীতির মেরুকরণ ঘটতে শুরু করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকায় ‘বন্দে মাতরম্’ শব্দবন্ধের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে মুসলিম ছাত্রদের আন্দোলন কেবল একটি গানের বিরোধিতা ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলিকে সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত করে দেওয়ার পরম্পরার সূচনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা একসময় জাতীয় সংহতির কেন্দ্র ছিল, পরিণত হয় বিচ্ছিন্নতার রাজনীতির মঞ্চে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাউকে অসন্তুষ্ট না করার বিপজ্জনক নীতি নিয়ে নীরব নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম লীগের বিচ্ছিন্নতার প্রয়াস প্রথম সফলতার আলো দেখল।


ঔপনিবেশিক বাংলার শেষ পর্যায়ে জোট সরকারগুলিও শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ফজলুল হকের জোট সরকার রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এই দুই নেতৃত্বের মধ্যে আদর্শগত ঐক্যের অভাব অত্যন্ত প্রকট ছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আশা করেছিলেন যে সরকারে থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক উগ্রতা সংযত করতে পারবেন। কিন্তু ফজলুল হকের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ক্রমশ মুসলিম সংহতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ক্রমে শাসনের চেয়ে নির্বাচনী অঙ্কের দ্বারা নির্ধারিত হতে থাকে। এই জোট দেখিয়ে দেয়—নৈতিক ঐকমত্য ছাড়া ক্ষমতার ভাগাভাগি টেকসই হয় না।

শেষ পর্যন্ত ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-এর মাধ্যমে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সফলতা লাভ করল। এই দিনটি কলকাতার ইতিহাসে রক্তের আখরে চিরকাল উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে। বিশ্বের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ নৃশংস গণহত্যার সাক্ষী হয় কলকাতা। সমকালীন বিবরণে স্পষ্ট—এই হিংসা আকস্মিক ছিল না। সংগঠিত জনসমাবেশ, উসকানিমূলক ভাষণ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা একত্রিত হয়ে বিপর্যয় ডেকে আনে। রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিংসাকে চাপ সৃষ্টির বৈধ মাধ্যম হিসেবে যুক্তি দেয়। এই দিন বাংলায় সহাবস্থানের শেষ বিশ্বাসটুকুও ভেঙে দেয়। গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং বাংলাকে রক্তাক্ত করে তোলে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, অঞ্চলের পর অঞ্চল জনশূন্য হয়ে যায়, আতঙ্ক দৈনন্দিন জীবনের নিয়মে পরিণত হয়। নোয়াখালি ও অন্যান্য অঞ্চলের হত্যাযজ্ঞ প্রমাণ করে যে বাংলায় হিন্দু বিরোধী দাঙ্গা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই দাঙ্গা একটি রূঢ় বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়েছে। সমকালীন সরকারি ও বেসরকারি নথিতে সুনির্দিষ্ট আক্রমণ ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই অবস্থায় ঐক্যের পক্ষে থাকা নেতারাও উপলব্ধি করেন—অখণ্ড বাংলায় সহাবস্থান আর সম্ভব নয়। দেশভাগ তখন আর বিকল্প থাকল না, একটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপে রূপান্তরিত হল।

এই বিপর্যয়ের জন্য ব্রিটিশ শাসনের দায় অস্বীকার করা যায় না। তারা সাম্প্রদায়িক সংগঠনের গভীরতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, বিচ্ছিন্নতাকামী রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি অতিরিক্ত সহনশীলতা দেখায় এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের তাড়নায় নাগরিক সুরক্ষাকে উপেক্ষা করে।

১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি লক্ষ লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নির্মূল করেনি। নতুন রাজ্য অর্থনৈতিক চাপ, জনবিন্যাসগত ভারসাম্যহীনতা ও মানসিক ক্ষত নিয়ে যাত্রা শুরু করে। দেশভাগ সীমানা নির্ধারণ করেছিল বটে, কিন্তু রাজনৈতিক গতিপথের পরিবর্তন ঘটায়নি।


স্বাধীনতার পরেও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি রূপ বদল করে টিকে থাকে। বিভাজনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম তু্ষ্টীকরণ ভোটে জেতার সহজ উপায় রূপে আত্মপ্রকাশ করে। দীর্ঘ বামফ্রন্ট শাসনে শ্রেণীভিত্তিক রাজনীতির আড়ালে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের উপর নির্ভরতা ক্রমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশের মাধ্যমে হিন্দু হোমল্যাণ্ড পশ্চিমবঙ্গেরও অনেক জেলার জনবিন্যাস পাল্টে গিয়েছে। আইনের প্রয়োগে মধ্যে ঢুকে পড়েছে নির্বাচনী হিসাব। তসলিমা নাসরিনের নির্বাসন থেকে শুরু করে মা কালীর বিগ্রহকে প্রিজন ভ্যানে তোলা পর্যন্ত নানা ধরণের ঘৃণ্য ও ভয়াবহ কাণ্ড এই দ্বন্দ্বের প্রতীক। পশ্চিমবঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থাপনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

সাম্প্রতিক দুই দশকে দেগঙ্গা, ধুলাগড়, বসিরহাটসহ নানা অঞ্চলের সংঘর্ষ প্রমাণ করে যে বাংলার সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। সমস্যার মূল বৈচিত্র্য নয়; সমস্যা হল নাগরিককে নাগরিক হিসেবে নয়, ভোটব্যাংক হিসেবে দেখার রাজনীতি। সমস্যা হল ভারতবর্ষের চির প্রবহমান সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করে বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রতি সমর্পণ, এবং ছিন্নমূল মিশ্র সংস্কৃতিকে বাংলার নিজস্বতা রূপে তুলে ধরার বালখিল্য অপচেষ্টা।

বাংলায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইতিহাস কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণার ইতিহাস নয়; ধারাবাহিক ব্যর্থতার দলিল। ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সতর্কতা উপেক্ষা করেছে, সমঝোতার নামে সামাজিক ভারসাম্য ধ্বংস করেছে, হিংসা ও নৃশংসতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, ঝুটা সম্প্রীতির দোহাই দিয়ে জবাবদিহি করা বন্ধ করেছে। এই ইতিহাস নৈরাশ্যের আহ্বান নয়—একটি চরম সতর্কবার্তা। বহুত্ববাদকে টিকিয়ে রাখার উপায় তুষ্টীকরণ নয়। বরং সমান আইন, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং নৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তথ্যঋণ

১. চন্দ্রনাথ বসু, হিন্দুত্ব: হিন্দুর প্রকৃত ইতিহাস, কলকাতা, ১৮৯২।

২. ভারত সরকার, মরলি–মিন্টো সংস্কার সংক্রান্ত নথি, ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি আর্কাইভ।

৩. চিত্তরঞ্জন দাস, ভাষণ ও রচনা, কংগ্রেস কমিটি নথি, ১৯২৩।

৪. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট কার্যবিবরণী, ১৯২০–২১।

৫. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, লিভস ফ্রম আ ডায়েরি, কলকাতা, ১৯৫০।

৬. স্টার অব ইন্ডিয়া (কলকাতা), আগস্ট ১৯৪৬।

৭. লর্ড ওয়াভেল, দ্য ভাইসরয়’স জার্নাল, ১৯৪৬।

৮. বঙ্গ সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রিপোর্ট, ১৯৪৬–৪৭।

৯. পশ্চিমবঙ্গ সরকার, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি, ১৯৯৪।

গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব। এসব বক্তব্য বা মতামত Poorvam-এর নীতি, অবস্থান বা মতামতকে প্রতিফলিত করে না।
স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International (CC BY-NC-ND 4.0) লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
creative commons

আমরা তথ্যের অবাধ মুক্ত প্রবাহে বিশ্বাসী

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইনে বা প্রিন্টে পুনঃপ্রকাশ করুন।

Rakesh Das
লেখক পরিচিতি
পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল ও রচনাবলি →

Rakesh Das

ড. রাকেশ দাস সংস্কৃত ও দর্শনের বিশিষ্ট অধ্যাপক, গবেষক ও লেখক। তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সংস্কৃত ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র সংস্কৃত ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, বেদান্ত, সংস্কৃত সাহিত্য ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা। তিনি একাধিক গ্রন্থের সম্পাদক, অনুবাদক ও রচয়িতা এবং দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গবেষণামূলক বক্তৃতা ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন।

সংযোগ: