ভারতীয় আস্তিক দর্শনের এক সুপ্রাচীন পরম্পরা হলো, যে কোনো শাস্ত্রের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে মঙ্গলাচরণ করা। মঙ্গলাচরণ অর্থাৎ মঙ্গল-আচরণ — রচনাকার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবার জন্য এই আচরণ পালিত হয়, এই বিশ্বাসে যে তা কার্যের সমস্ত বিঘ্ন নাশ করবে। সাংখ্যদর্শন অনুসারে বিঘ্ন তিন প্রকার — আধিভৌতিক (চুরি, ডাকাতি, সর্পদংশন বা অন্য হিংস্র জন্তুর আক্রমণের মতো ভূতজগতের প্রতিবন্ধকতা), আধিদৈবিক (বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পের মতো দৈবশক্তিজনিত বাধা), এবং আধ্যাত্মিক (জ্বর, অবসাদের মতো শরীর-মনজনিত বাধা)। এই ত্রিবিধ দুঃখ থেকে মুক্তিকেই শাস্ত্রে মোক্ষ বলা হয়, আর যে শাস্ত্র সেই মুক্তিলাভে সহায়তা করে, তাকেই মোক্ষশাস্ত্র আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই বক্তৃতারও একটি মঙ্গলাচরণ থাকা সমীচীন। তাই সূচনায় স্মরণ করি —
গুরুব্রহ্মং চ সংস্মৃত্য আত্মানং পরমেশ্বরম্। ক্রিয়াযোগং প্রবক্ষ্যামি সিদ্ধ্যর্থং মঙ্গলায় চ॥
অন্বয় করলে দাঁড়ায় — (অহম্) গুরুব্রহ্মং চ আত্মানং পরমেশ্বরং সংস্মৃত্য সিদ্ধ্যর্থং মঙ্গলায় চ ক্রিয়াযোগং প্রবক্ষ্যামি। বাংলায় ভাবার্থ করলে — "গুরুব্রহ্ম ও পরমাত্মাকে স্মরণপূর্বক, আমি বক্তব্যসিদ্ধি ও সার্বিক কল্যাণার্থে প্রকৃষ্টরূপে ক্রিয়াযোগ বর্ণনা করছি।"
এই মঙ্গলাচরণটি মিশ্রপ্রকৃতির। একদিকে গুরু, যিনি স্বয়ং ব্রহ্মস্বরূপ, এবং পরমাত্মার স্মরণপূর্বক বক্তব্যসিদ্ধি ও জগৎকল্যাণার্থে আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়েছে; অন্যদিকে 'ক্রিয়াযোগং প্রবক্ষ্যামি' বাক্যবন্ধের দ্বারা আজকের আলোচনার বিষয়বস্তুও সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হয়ে যাচ্ছে — বিষয় ক্রিয়াযোগ। এই মঙ্গলাচরণের চেতনা নিয়েই, গুরুপরম্পরার শ্রীচরণে প্রণতিপূর্বক, আজকের আলোচনা আরম্ভ করছি।
এই শিরোনামে তিনটি শব্দ আছে — পথ, পরম্পরা, বিজ্ঞান। এই তিনটি শব্দ আপাতদৃষ্টিতে পৃথক মনে হলেও, ক্রিয়াযোগের ক্ষেত্রে তারা একটিমাত্র সত্যের তিনটি মুখ। পথ বলতে বোঝায় সেই সাধনার দিশা, যা মানুষকে সসীম থেকে অসীমের দিকে নিয়ে যায়। পরম্পরা বলতে বোঝায় সেই গুরুশিষ্যক্রম, যার হাত ধরে এই পথ যুগে যুগে সঞ্চারিত হয়ে এসেছে। আর বিজ্ঞান বলতে বোঝায় — এবং এইখানেই ক্রিয়াযোগের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য নিহিত — এই সাধনা কোনো অন্ধ বিশ্বাস বা কল্পনাপ্রসূত অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট, ক্রমবদ্ধ, পরীক্ষণযোগ্য পদ্ধতি, যার ফল প্রতিটি সাধকের নিজস্ব অনুভূতির মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ হয়। আজকের আলোচনায় আমরা এই তিনটি পর্বেই প্রবেশ করব।
প্রথম পর্ব: পথ
তথ্য ও তত্ত্ব: একটি পূর্বকথা
আলোচনার প্রবেশমুখেই একটি পারিভাষিক প্রশ্ন তুলে রাখা আবশ্যক — তথ্য ও তত্ত্বের মধ্যে প্রভেদ কী? তথ্য বলতে বোঝায় যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, যার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণযোগ্য অস্তিত্ব আছে — দুই ও দুইয়ে চার হয়, জল একশো ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফোটে, এসব তথ্য। অপরপক্ষে তত্ত্ব বলতে বোঝায় কোনো বস্তুর স্বরূপ, তার অন্তর্নিহিত ও অপরিবর্তনীয় সত্য, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, কেবল উপলব্ধিসাপেক্ষ। আগুনে হাত দিলে যে উত্তাপ অনুভূত হয়, তা তথ্য; কিন্তু আগুনের অন্তর্নিহিত তেজস্তত্ত্ব, যা এই উত্তাপের মূল কারণ, তা তত্ত্ব। তথ্য ব্যাবহারিক জ্ঞানের প্রতিনিধি, তত্ত্ব পারমার্থিক জ্ঞানের ধারক।
এই প্রভেদ স্মরণে রাখা জরুরি এই কারণে যে, যে যোগসাধনা পরম ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার প্রদান করে, তা কোনো পরোক্ষ মাধ্যমে — গ্রন্থপাঠ, বক্তৃতাশ্রবণ, এমনকি আপ্তোপদেশেও — সম্পূর্ণরূপে সাধিত হয় না। পতঞ্জলির যোগসূত্র শতবার পাঠ করলেও, বা গীতার পাতা মুখস্থ করলেও, ব্রহ্মজ্ঞান অধরাই থেকে যায়, যদি না তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাধনা যুক্ত হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে — আজ আমি যা বলতে চলেছি, তা যদি নিছক তথ্যই থেকে যায়, তবে এই আলোচনার তাৎপর্য কোথায়?
এর উত্তর নিহিত আছে দ্বিতীয় একটি পারিভাষিক যুগলে — সিদ্ধান্তপক্ষ ও সাধনপক্ষ।
সিদ্ধান্তপক্ষ ও সাধনপক্ষ
যোগবিদ্যা মূলত গুরুমুখী বিদ্যা, এবং তার একটি সিদ্ধান্তপক্ষ (তাত্ত্বিক দিক) ও একটি সাধনপক্ষ (ব্যবহারিক দিক) আছে। সাধনপক্ষ বলতে বোঝায় সাধনার উপায়, প্রয়োগকৌশল; সিদ্ধান্তপক্ষ বলতে বোঝায় সেই প্রয়োগের দ্বারা অর্জিত পরম সত্য। সিদ্ধান্তপক্ষের প্রশ্ন — "কী লব্ধব্য", সাধনপক্ষের প্রশ্ন — "কীরূপে"। পতঞ্জলির যোগে সিদ্ধান্তপক্ষ কৈবল্য, সাধনপক্ষ অষ্টাঙ্গযোগ। বেদান্তে সিদ্ধান্তপক্ষ চারটি মহাবাক্যের সত্যতা, সাধনপক্ষ শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই দুটিকে যথাক্রমে বলেছেন 'মত' ও 'পথ'। সাধনা যদি ক্রিয়া হয়, সিদ্ধান্ত তাহলে জ্ঞান — এই দুইয়ের কোনো একটিকে বাদ দিয়ে পরম সত্য উপলব্ধি সম্ভব নয়।
তাহলে আজকের এই বক্তৃতা কোন পক্ষের আলোচনা? সরল উত্তর — এ সিদ্ধান্তপক্ষেরই আলোচনা, একে বলা যায় ক্রিয়াযোগের একটি তাত্ত্বিক সারাংশ, যা পরোক্ষভাবে এর দর্শনকে অধ্যয়ন করায়। এই আলোচনা সাজানো হয়েছে সেই অধিকারীর কথা ভেবেই — দীক্ষিত হোন বা অদীক্ষিত, প্রাথমিক হোন বা উত্তম, যাঁর মধ্যে সত্যজিজ্ঞাসা আছে, তিনিই এই আলোচনার প্রকৃত অধিকারী।
ক্রিয়া শব্দের ব্যাকরণগত ব্যুৎপত্তি
এবার আসি ক্রিয়াযোগ শব্দের প্রকৃত ব্যুৎপত্তিতে, যা কেবল একটি ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল নয়, বরং এই সাধনার স্বরূপ বোঝার একটি চাবিকাঠি। ক্রিয়াযোগ শব্দটি সংস্কৃত দুটি ধাতু থেকে উৎপন্ন — √কৃ এবং √যুজ্। 'ক্রিয়া' শব্দের মূল √কৃ ধাতু, অর্থ 'করা' বা 'সম্পাদন করা'; এর সঙ্গে '-য়া' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে 'ক্রিয়া' শব্দটি গঠিত হয়, যা সক্রিয় কর্ম বা সচেতন অনুশীলনকে নির্দেশ করে। এখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উল্লেখযোগ্য — 'করুণা' শব্দটিও এই একই √কৃ ধাতু থেকেই উৎপন্ন, অর্থাৎ কর্ম ও করুণার ভাষাগত শিকড় অভিন্ন। অপরদিকে 'যোগ' শব্দ √যুজ্ ধাতু থেকে আগত, অর্থ 'যুক্ত করা' বা 'সংযুক্ত করা' — জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন, অথবা চিত্তবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মস্বরূপে অবস্থান তথা সমাধিপ্রাপ্তি। তৎপুরুষ সমাসে গঠিত 'ক্রিয়াযোগ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় — 'ক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ', অর্থাৎ সক্রিয় অনুশীলনভিত্তিক যোগসাধনা।
এই ব্যুৎপত্তি থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় — ক্রিয়াযোগ নিষ্ক্রিয় চিন্তন বা নিছক দার্শনিক তর্ক নয়, এ এমন এক যোগ, যা সক্রিয় কর্মের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। আর সেই কর্ম কী, তার উত্তর স্বয়ং পতঞ্জলি দিয়েছেন — সেই প্রসঙ্গেই আমরা এবার প্রবেশ করি।
পতঞ্জলির সংজ্ঞা ও তার যুক্তি
মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রের সাধনপাদে ক্রিয়াযোগকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন —
তপঃস্বাধ্যায়েশ্বরপ্রণিধানানি ক্রিয়াযোগঃ॥ (যোগসূত্র ২/১)
তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান — এই তিনটি মিলে ক্রিয়াযোগ। পরবর্তী সূত্রে তিনি এর উদ্দেশ্যও স্পষ্ট করেছেন —
সমাধিভাবনার্থঃ ক্লেশতনূকরণার্থশ্চ॥ (যোগসূত্র ২/২)
সমাধির জন্য এবং ক্লেশ ক্ষীণ করার জন্য। লক্ষণীয় যে ক্রিয়াযোগ এখানে কোনো নিছক তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ফলাফলযুক্ত ব্যবহারিক সাধনপদ্ধতি।
কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে — তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান, এই তিনটিকে বহু ভাষ্যকার ও যোগী প্রধানত আত্মনির্যাতনমূলক পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছেন — কৃচ্ছ্রসাধন, কণ্টকশয়ন, দীর্ঘ উপবাস, প্রখর রৌদ্রে দণ্ডায়মান থাকা। প্রশ্ন হলো, যোগশাস্ত্রে কি প্রকৃতপক্ষে এরূপ আত্মনির্যাতন বিহিত? এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্য সাংখ্য-যোগ দর্শনের মূল কাঠামোয় ফিরে যাওয়া আবশ্যক।
সাংখ্য দর্শনে পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈতবাদ স্বীকৃত — পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ, নিষ্ক্রিয় সাক্ষী; প্রকৃতি জড়, সক্রিয়, সমস্ত সৃষ্টির মূল, এবং সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ এই তিন গুণে গঠিত। মানুষের দুঃখের মূল কারণ পুরুষের এই ভ্রান্তি যে সে নিজেকে প্রকৃতি বলে মনে করে — এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় পঞ্চক্লেশ: অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ। এই পঞ্চক্লেশ নাশের উপায় হিসেবেই পতঞ্জলি তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধান উত্থাপন করেছেন।
পতঞ্জলি স্বয়ং বলেছেন — কায়েন্দ্রিয়সিদ্ধিরশুদ্ধিক্ষয়াত্তপসঃ (যোগসূত্র ২/৪৩) — অশুদ্ধিক্ষয় হলে তপঃ দ্বারা শরীর ও ইন্দ্রিয়ের সিদ্ধি হয়। এখানে 'সিদ্ধি' শব্দটিই প্রমাণ করে যে তপঃ শরীরকে অসংবেদনশীল করে তোলা নয় — তা তমোগুণবৃদ্ধি হতো — বরং তপঃ সত্ত্বগুণবৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যার ফলে শরীর-ইন্দ্রিয় আরও সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। গীতায় সাত্ত্বিক তপের যে বর্ণনা আছে — দেবতা-গুরু-ব্রাহ্মণপূজা, শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা (গীতা ১৭/১৪-১৫) — সেখানেও 'সরলতা' শব্দটি লক্ষণীয়; তপের অর্থ আত্মনির্যাতন নয়, জীবনের জটিলতা পরিহার। জীবন সরল হলে আকাঙ্ক্ষা কমে, আকাঙ্ক্ষা কমলে রাগ-দ্বেষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ক্ষীণ হয় — এ কোনো বলপূর্বক দমন নয়, স্বাভাবিক পরিণতি।
তপঃ দ্বারা চিত্ত যখন স্থির ও স্বচ্ছ হয়, তখনই স্বাধ্যায় সম্ভব হয় — কারণ অস্বচ্ছ, রজঃ-তমোঽচ্ছন্ন চিত্তে আত্মপর্যবেক্ষণ অসম্ভব। পতঞ্জলি বলেছেন, স্বাধ্যায়াদিষ্টদেবতাসম্প্রয়োগঃ (যোগসূত্র ২/৪৪) — স্বাধ্যায় থেকে ইষ্টদেবতার সঙ্গে সংযোগ ঘটে। স্বাধ্যায়ের লক্ষ্য বিবেকখ্যাতি — পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদজ্ঞান। পতঞ্জলি বলেন, বিবেকখ্যাতিরবিপ্লবা হানোপায়ঃ (যোগসূত্র ২/২৬) — অটল বিবেকখ্যাতিই ক্লেশনাশের উপায়। "আমি পুরুষ, প্রকৃতি নই" — এই জ্ঞান জাগ্রত হলে অবিদ্যা স্বতই বিলুপ্ত হয়, এবং অবিদ্যার বিলোপে অস্মিতাও বিলীন হয়, কারণ অস্মিতা হলো "আমি কর্তা, আমি ভোক্তা" এই অহংবোধ।
অবশেষে ঈশ্বরপ্রণিধান — সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরে অর্পণ, কর্তৃত্বাভিমানের ত্যাগ। পতঞ্জলি বলেন, সমাধিসিদ্ধিরীশ্বরপ্রণিধানাৎ (যোগসূত্র ২/৪৫) — ঈশ্বরপ্রণিধান থেকে সমাধিসিদ্ধি হয়। যখন "আমি" সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়, তখনই সমাধি ঘটে, কারণ সমাধির একমাত্র বাধা অহং। এইভাবে তপঃ সত্ত্বগুণ আনে, স্বাধ্যায় আনে বিবেক, ঈশ্বরপ্রণিধানের পরিণামে অহংয়ের লোপ ঘটে — এবং এই ত্রিবিধ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল সমাধি তথা কৈবল্য।
এই তপঃ-স্বাধ্যায়ের যুগলবন্দি নিছক যোগশাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ভারতীয় সাহিত্যেরও গভীরে প্রোথিত। বাল্মীকি রামায়ণের প্রথম শ্লোকেই আমরা দেখি, বাল্মীকিকে বর্ণনা করা হয়েছে "তপঃস্বাধ্যায়নিরতম্" বলে — তপঃ ও স্বাধ্যায়ে নিরত। আর সমগ্র রামায়ণ রচনার পশ্চাতে বাল্মীকির নিজের কোনো কর্তৃত্বাভিমান ছিল না; ঐতিহ্য অনুসারে তিনি নিমিত্তমাত্র, স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে আবিষ্ট হয়ে এই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। ফলে গ্রন্থের সূচনাতেই তপঃ ও স্বাধ্যায়ের উপস্থিতি, এবং সমগ্র রচনাকর্মটিই যেন বাল্মীকির নিজস্ব ঈশ্বরপ্রণিধান — এই সংযোগ কোনোভাবেই আকস্মিক মনে হয় না। বরং এ থেকে বোঝা যায়, তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধানের এই ত্রিবিধ ভাব ভারতীয় চেতনায় এতটাই সহজাত যে, তা শাস্ত্র থেকে কাব্যে, যোগ থেকে সাহিত্যে অনায়াসে সঞ্চারিত হয়ে গেছে।
কিন্তু পতঞ্জলির যোগসূত্র মূলত সিদ্ধান্তপক্ষের গ্রন্থ — সেখানে কী করতে হবে বলা আছে, কীভাবে করতে হবে তার বিস্তারিত বিবরণ নেই। পতঞ্জলির দ্বিতীয় ইঙ্গিত পাওয়া যায় প্রাণায়াম-সূত্রে — তস্মিন্ সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ (যোগসূত্র ২/৪৯), আসনসিদ্ধি হলে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতিবিচ্ছেদই প্রাণায়াম। এখানে পতঞ্জলি ইঙ্গিত করছেন যে ক্রিয়াযোগের মূল কৌশল প্রাণায়াম — কিন্তু কোন নির্দিষ্ট প্রাণায়াম, কতবার, কোন ক্রমে, এ বিষয়ে তিনি নীরব। এই শূন্যস্থানই পূরণ করেছে গুরুপরম্পরা — প্রতিটি যুগে গুরুবর্গ নিজ নিজ শিষ্যদের উপযুক্ত সাধনপক্ষের কৌশল প্রদান করেছেন। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে এই যোগবিদ্যা তিনি পূর্বে বিবস্বান, মনু ও ইক্ষ্বাকুকে দিয়েছিলেন, কিন্তু কালক্রমে তা লুপ্ত হয়ে যায় (গীতা ৪/২)। এই লুপ্ত সাধনপক্ষই পুনরুদ্ধার করেন মহাবতার বাবাজী মহারাজ, এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা প্রদান করেন শ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে।
একটি সুপ্রাচীন বিজ্ঞানের পুনরুত্থান
ক্রিয়াযোগ কোনো নতুন উদ্ভাবিত পদ্ধতি নয় — এ এক সুপ্রাচীন সাধনবিজ্ঞানের পুনরুত্থান। মহাবতার বাবাজী মহারাজ স্বয়ং লাহিড়ী মহাশয়কে বলেছিলেন, "উনবিংশ শতাব্দীতে তোমার মাধ্যমে আমি জগৎকে যে ক্রিয়াযোগ প্রদান করছি, তা সেই বিদ্যারই পুনরুজ্জীবন, সহস্র বৎসর পূর্বে যা কৃষ্ণ অর্জুনকে দিয়েছিলেন, এবং যা পরবর্তীকালে পতঞ্জলি, খ্রিস্ট, সেন্ট জন, সেন্ট পল এবং তাঁদের অন্যান্য শিষ্যদের জানা ছিল।" এই একটি বাক্যেই বোঝা যায়, ক্রিয়াযোগ কোনো একটিমাত্র সম্প্রদায় বা কালের সম্পত্তি নয় — এ এক সর্বজনীন, সনাতন বিজ্ঞান, যা কালে কালে বিস্মৃত হয়ে যায়, আবার কোনো যুগে কোনো মহাপুরুষের মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশিত হয়।
ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে, জ্ঞানযোগে, আমরা পাই —
অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাপরে। প্রাণাপানগতী রুদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ॥ (গীতা ৪/২৯)
অর্থাৎ, অন্য যোগীগণ অপানবায়ুতে প্রাণবায়ু এবং প্রাণবায়ুতে অপানবায়ুর আহুতি দিয়ে, প্রাণ ও অপানের গতি রুদ্ধ করে প্রাণায়ামপরায়ণ হন। এই শ্লোকেই ক্রিয়াযোগের মূল প্রক্রিয়ার আভাস নিহিত আছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে, ধ্যানযোগে, শ্রীকৃষ্ণ পুনরায় বলছেন —
সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ। সম্প্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্॥ (গীতা ৬/১৩)
মেরুদণ্ড, গ্রীবা ও মস্তক সরল ও নিশ্চলভাবে ধারণ করে, নাসিকাগ্রে দৃষ্টি স্থির রেখে, কোনো দিকে না তাকিয়ে যোগী স্থির থাকবেন — এই যে আসনস্থিতি ও দৃষ্টিস্থিরতার নির্দেশ, তা আজও প্রতিটি ক্রিয়াসাধকের অনুশীলনের প্রথম ধাপ।
মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে অষ্টাঙ্গযোগের কথা বলেছেন — যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। ক্রিয়াযোগের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, এই অষ্টাঙ্গের প্রতিটি স্তর ক্রমানুসারে পার না করেও, গুরুকৃপায় একজন নিষ্ঠাবান ক্রিয়াবান নির্বিকল্প সমাধি লাভ করতে পারেন, যা পতঞ্জলি-প্রণীত যোগদর্শনের সর্বোচ্চ পর্যায়। এই কারণেই পরমহংস হরিহরানন্দ বলেছিলেন, ক্রিয়াযোগ পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রের শেষ চারটি অঙ্গ দিয়ে গঠিত — প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। সদ্গুরুর কাছে ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত হলে অত্যল্প সময়েই সাধকের কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়।
শ্রীযুক্তেশ্বরজী এই বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, "ক্রিয়াযোগ এমন এক উপকরণ, যার মাধ্যমে মানুষের বিকাশকে ত্বরান্বিত করা যায়। প্রাচীন যোগীরা আবিষ্কার করেছিলেন যে মহাচৈতন্যের গুপ্ত রহস্য শ্বাস-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এ বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে ভারতের অনন্য ও অমর অবদান।" এই একটি বাক্যে যোগবিজ্ঞানের গোটা দর্শনটি ধরা পড়ে — শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ শুধু শরীরের নয়, চেতনার নিয়ন্ত্রণ।
কেন এই বিদ্যা লুপ্ত হয়েছিল, কেন তা প্রয়োজন হয়েছিল পুনরুদ্ধারের
কঠোপনিষদে আমরা পাই —
যদা সর্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়স্যেহ গ্রন্থয়ঃ। অথ মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যেতাবদ্ধ্যনুশাসনম্॥ (কঠোপনিষদ্ ২/৩/১৫)
যখন হৃদয়ের সমস্ত গ্রন্থি ছিন্ন হয়, তখন মর্ত্য মানুষ অমৃত হয়ে ওঠে। বেদান্তের ভাষায় এই ত্রিগ্রন্থি হলো অবিদ্যা, কাম ও কর্ম — অজ্ঞান, বাসনা ও কর্মবন্ধন। এই গ্রন্থিত্রয় ছেদন করাই যোগসাধনার লক্ষ্য, এবং এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রাচীন ঋষিরা জানতেন। কিন্তু কালক্রমে, যেমন প্রতিটি গভীর বিদ্যারই ভবিতব্য, এই সাধনপদ্ধতি ক্রমে লুপ্ত হয়ে যায় — কেবল তত্ত্বকথা অবশিষ্ট থাকে, প্রকৃত সাধনপক্ষ হারিয়ে যায়। মানুষ শাস্ত্র পাঠ করে, তর্ক করে, কিন্তু সেই তর্ক-শাস্ত্রজালেই বিমোহিত হয়ে থাকে। ভগবান মহাদেব যোগবীজে বলেছেন —
অনেকশতসংখ্যাভিস্তর্কব্যাকরণাদিভিঃ। পতিতা শাস্ত্রজালেষু প্রজ্ঞয়া তে বিমোহিতাঃ॥ (যোগবীজ, ৮)
শত-শত তর্কশাস্ত্র ও ব্যাকরণাদির অনুশীলন করে মানুষ শাস্ত্রজালে পতিত হয়ে কেবল বিমোহিত হয়। প্রকৃত জ্ঞান যোগাভ্যাস ব্যতীত উৎপন্ন হয় না। এই কারণেই প্রয়োজন হয়েছিল এমন একজন মহাপুরুষের, যিনি এই লুপ্ত সাধনপক্ষকে পুনরুদ্ধার করে মানবজাতির সামনে উন্মুক্ত করবেন। সেই মহাপুরুষই হলেন যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়। ঠিক যেমন ভগীরথ গঙ্গাকে হিমালয় থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছিলেন, তেমনই লাহিড়ী মহাশয় ক্রিয়াযোগ সাধনাকে পুনরায় হিমালয় থেকে নিম্নভূমিতে বহন করে এনেছিলেন।
এখানেই আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করার সময় এসেছে — কীভাবে, কাদের হাত ধরে এই পথ পুনরুজ্জীবিত হলো।
দ্বিতীয় পর্ব: পরম্পরা
মহাবতার বাবাজী — কালাতীত সত্তা
ক্রিয়াযোগের পরম্পরার শীর্ষে আছেন মহাবতার বাবাজী মহারাজ — এক কালাতীত, চিরযুবক দিব্য অস্তিত্ব। তিনি কখনও নিরাকার থাকেন, কখনও নিজের ইচ্ছানুসারে যে কোনো রূপে শিষ্যদের সামনে আবির্ভূত হয়ে মানবতাকে সাংসারিক বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। তাঁকে প্রেমভরে মহামুনি, ত্র্যম্বক বাবা, শিব বাবা কিংবা বড়ুয়া বাবা নামেও ডাকা হয়। তাঁর জন্ম, পরিচয় বা জীবনের ঐতিহাসিক তথ্য নির্ণয় করা যায়নি — কালও তাঁর রহস্য উন্মোচনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি হিমালয়ের গভীর অরণ্যে, গুহায়, হিমাচ্ছাদিত শিখরে ধ্যানমগ্ন থাকেন, অথচ পরমতত্ত্বের পথের প্রতিটি নিষ্ঠাবান সাধকের প্রতি তাঁর দৃষ্টি অবিচল থাকে।
মহাবতার বাবাজীর জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা তাঁর করুণা ও দিব্যতার পরিচয় বহন করে। একবার এক আমেরিকান ভক্ত হিমালয়ের দুর্গম শিলাখণ্ডে বাবাজীর সন্ধানে ঘুরছিলেন। বাবাজীর দর্শন পেয়ে তাঁর মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি শিষ্যত্ব প্রার্থনা করলে বাবাজী কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তখন সেই ভক্ত হঠাৎ পাথরের খাদে ঝাঁপ দিলেন। বাবাজী তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দিলেন দেহ সংগ্রহ করতে, এবং নিজের দিব্যস্পর্শে সেই ভক্তকে পুনর্জীবিত করে তাঁকে শিষ্যত্ব দান করলেন। আরেকটি বিখ্যাত ঘটনা — কুম্ভমেলায় বাবাজী লাহিড়ী মহাশয়ের প্রিয় শিষ্য প্রিয়নাথকে (যিনি পরে স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর নামে পরিচিত হবেন) "স্বামীজি" বলে সম্বোধন করেছিলেন — এক ভবিষ্যৎবাণী, যা পরে সত্য হয়েছিল।
মহাবতার বাবাজী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি সমগ্র মানবজাতির মুক্তির জন্য কখনও দেহত্যাগ করবেন না। তাঁরই করুণাবলে পরমহংস যোগানন্দ ও পরমহংস হরিহরানন্দের মাধ্যমে ক্রিয়াযোগের বার্তা পাশ্চাত্য জগতে পৌঁছেছে।
লাহিড়ী মহাশয়ের জীবন ও দীক্ষা
এবার আসি এই পরম্পরার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে — যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়। তৎকালীন বঙ্গদেশের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী ঘূর্ণি গ্রামে, আনুমানিক ১৮২৮ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর, এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারে, পিতা গৌরমোহন লাহিড়ী ও মাতা মুক্তকেশীর কনিষ্ঠতম সন্তানরূপে শ্যামাচরণ লাহিড়ীর জন্ম হয়। শিশু শ্যামাচরণ শিবপূজার সময় গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে যেতেন। শৈশবেই তিনি মাতৃহারা হন। এরপর জলঙ্গী নদীর প্রবল বন্যায় লাহিড়ী পরিবারের ভিটে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে, পিতার সঙ্গে তিনি কাশীবাসী হন। কাশীতেই তাঁর ছাত্রজীবন শুরু হয় — উর্দু, হিন্দি, বাংলা, সংস্কৃত, ফরাসি, ইংরেজি এবং বেদের শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন। কাশীমণি দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়, এবং তাঁদের দুই পুত্র ও তিন কন্যা জন্মায়। ১৮৫১ সালে তিনি ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন।
এরপর ঘটে সেই যুগান্তকারী ঘটনা, যা ক্রিয়াযোগের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কয়েক বছর পর শ্যামাচরণের হঠাৎ বদলি হয় হিমালয়ের পাদদেশে, নৈনিতালের কাছে রানিখেতে। সেখানে তাঁবুতে থাকতেন তিনি। অফিসের কাজ করার সময় তিনি স্পষ্ট শুনতেন, কেউ যেন তাঁর নাম ধরে ডাকছে — "শ্যামাচরণ... শ্যামাচরণ, আমি তোমার প্রতীক্ষায় আছি, তুমি আমার কাছে এসো।" প্রথমে তিনি একে মনের ভ্রম ভেবে কাজে মন দিতেন, কিন্তু ডাক ক্রমশ তীব্রতর হতে থাকে। কিছুদিন পর তিনি স্থির করলেন, এই ডাকের উৎস অনুসন্ধান করবেন। সন্ধ্যায় অফিসের কাজ শেষে সেই কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে দ্রোণগিরি পর্বতে আরোহণ করলেন। সূর্যাস্ত হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। হঠাৎ তিনি দেখলেন, পর্বতের একটি গুহা থেকে এক অদ্ভুত আলো চারদিক আলোকিত করে তুলেছে। সেই আলো অনুসরণ করে গুহার কাছে পৌঁছে দেখলেন, এক দিব্যকান্তি যুবা সন্ন্যাসী গুহায় বিরাজমান। শ্যামাচরণ তাঁর দিকে তাকাতেই সন্ন্যাসী বললেন, "শ্যামাচরণ, আমিই তোমাকে ডাকছি, ভেতরে এসো।"
শ্যামাচরণ ভেতরে প্রবেশ করলেও তাঁর মনে সংশয় জাগে — এই সন্ন্যাসী তাঁর নাম জানলেন কীভাবে? অন্তর্যামী সন্ন্যাসী তাঁর মনের অবস্থা বুঝে এগিয়ে এসে তাঁর মেরুদণ্ড স্পর্শ করলেন, আর সেই স্পর্শমাত্রেই শ্যামাচরণ নিজের গুরুকে চিনে ফেললেন। সন্ন্যাসী গুহার ভেতরে একটি আসন ও কমণ্ডলু দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "শ্যামাচরণ, দেখো তো চিনতে পারো কি না?" তখন শ্যামাচরণ সহজেই চিনে ফেললেন — এ তাঁর পূর্বজন্মের সাধনস্থল, তাঁর নিজেরই আসন, এবং তাঁর জীবন্মুক্ত গুরুদেব — স্বয়ং শ্রীবাবাজী মহারাজ। তাঁর মনে পূর্বজন্মের সমস্ত স্মৃতি জেগে উঠল — কীভাবে তিনি এই গুহাতেই সন্ন্যাসী হয়ে গুরুর সান্নিধ্যে সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন, পরে দেহত্যাগ করেছিলেন। তিনি গুরুর চরণ স্পর্শ করে আকুল প্রার্থনা জানালেন যে তিনি পুনরায় সন্ন্যাস গ্রহণ করে এই গুহাতেই থেকে যেতে চান, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কাছে ফিরতে চান না।
গুরুদেব সান্ত্বনার স্বরে বোঝালেন যে তাঁরই যোগবিভূতির বলে শ্যামাচরণ সংসারে আবদ্ধ হয়েছেন এবং রানিখেতে বদলি হয়ে এসেছেন — এবং ক্রিয়াযোগকে নিম্নভূমিতে গৃহস্থ ভক্তদের হিতার্থে প্রচার করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গুরুদেব শ্যামাচরণের শরীর শুদ্ধ করে কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁকে দেবদুর্লভ ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত করলেন। ১৮৬১ সালের এই শুভক্ষণ কেবল শ্যামাচরণের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য এক বিশেষ শুভক্ষণ হয়ে চিহ্নিত হয়ে রইল। লুপ্ত ক্রিয়াযোগ হিমালয় থেকে পুনরায় নিম্নভূমিতে ধর্মপিপাসু মানুষের কাছে ফিরে এলো।
ত্রৈলঙ্গ স্বামী, কাশীর 'চলতে-ফিরতে বিশ্বনাথ' নামে পরিচিত মহাযোগী, লাহিড়ী মহাশয়কে 'যোগিরাজ' সম্বোধন করে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেছিলেন — কারণ লাহিড়ী মহাশয় যে যোগমার্গে আরোহণ করেছিলেন, তা তাঁর সমকালীন কোনো যোগীর কাছে বোধগম্য ছিল না। সেই থেকেই তিনি যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় নামে পরিচিত হন — গৃহস্থদের কাছে "গৃহস্থদের ভগবান।" পরমহংস যোগানন্দের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ Autobiography of a Yogi প্রকাশিত হওয়ার পরই সমগ্র বিশ্ব যোগিরাজ লাহিড়ী মহাশয়ের নাম ও তাঁর প্রদর্শিত ক্রিয়াযোগের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হয়।
পরম্পরার ধারাবাহিকতা
লাহিড়ী মহাশয়ের পরে এই পরম্পরা এগিয়ে যায় জ্ঞানাবতার শ্রীযুক্তেশ্বর গিরির মাধ্যমে, যিনি ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের সমন্বয়ে গ্রন্থ রচনা করেন এবং পরমহংস যোগানন্দকে দীক্ষিত করেন। যোগানন্দজীর মাধ্যমেই ক্রিয়াযোগ পাশ্চাত্য জগতে পৌঁছায়, এবং তাঁর আত্মকথা আজ বিশ্বের অন্যতম পঠিত আধ্যাত্মিক গ্রন্থ। এই ধারায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম — পরমহংস হরিহরানন্দ, যাঁর কাছে ১৯৪৯ সালে পুরীর করার আশ্রমে স্বয়ং মহাবতার বাবাজী আবির্ভূত হয়ে তাঁকে পাশ্চাত্যে ক্রিয়াযোগ প্রচারের প্রেরণা দিয়েছিলেন।
এই যে গুরুপরম্পরা — বাবাজী থেকে লাহিড়ী মহাশয়, লাহিড়ী মহাশয় থেকে শ্রীযুক্তেশ্বর, শ্রীযুক্তেশ্বর থেকে যোগানন্দ ও হরিহরানন্দ — এই ধারা আজও অবিচ্ছিন্ন। কারণ ক্রিয়াযোগের একটি মৌলিক শর্ত এই যে, এই সাধনার প্রকৃত কৌশল কোনো গ্রন্থে সম্পূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ করা যায় না — তা কেবল গুরু থেকে শিষ্যে সঞ্চারিত হয়। একেই আমরা প্রথম পর্বে বলেছি, যোগবিদ্যা মূলত গুরুমুখী বিদ্যা। এই একটি কথাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ক্রিয়াযোগের আলোচনা যতটা পথ ও পদ্ধতির, ততটাই গুরুর — কারণ গুরু ব্যতীত এই পথ অর্থহীন থেকে যায়।
আজকের এই আলোচনাও তো শুরু হয়েছিল গুরুপ্রণাম দিয়েই — নিবেদনের প্রথম কথাতেই আমরা মহাবতার বাবাজী, লাহিড়ী মহাশয়, শ্রীযুক্তেশ্বর ও হরিহরানন্দের শ্রীচরণে প্রণতি জানিয়েছি, গুরুবর্গকে স্মরণ করে। ক্রিয়াসাধনার প্রতিটি অনুশীলনও ঠিক এইভাবেই আরম্ভ হয় — গুরুপ্রণাম দিয়ে, গুরুবর্গের স্মরণ দিয়ে। তাহলে এই পরম্পরার কথা বলার আগে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় — যাঁকে আমরা বারবার প্রণাম জানাই, স্মরণ করি, তিনি প্রকৃতপক্ষে কে? গুরু বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? এই প্রশ্নের মীমাংসা না হলে পরম্পরার প্রকৃত মর্মই অধরা থেকে যায়।
গুরুতত্ত্ব: রূপ ও চমৎকারের অতীত এক সত্য
অধিকাংশ শ্রোতা যখন মহাবতার বাবাজীর কথা শোনেন, তাঁদের কৌতূহল কেন্দ্রীভূত হয় তাঁর দৈহিক রূপ ও চমৎকার-কাহিনির চারপাশে — তিনি দেখতে কেমন, তাঁর বয়স কত, তিনি কীভাবে শিষ্যকে পুনর্জীবিত করলেন ইত্যাদি। এই কৌতূহল স্বাভাবিক, কিন্তু পরম্পরার প্রকৃত মর্ম বুঝতে হলে রূপ ও চমৎকারের স্তর ছাড়িয়ে গুরুতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করা আবশ্যক — শাস্ত্রে যে তত্ত্বের সুবিস্তৃত আলোচনা আছে।
শাস্ত্রে প্রথমেই স্পষ্ট করা হয়েছে — গুরু ও সদ্গুরু একই বস্তু, অসদ্গুরু বলে কিছু নেই; পার্থক্য কেবল বোঝাবার সুবিধার জন্য করা হয়। যাঁর কৃপায় পূর্ণ সত্যের রূপ এমনভাবে প্রত্যক্ষ হয় যে তারপর আর কোনো আবরণ অবশিষ্ট থাকে না, তিনিই সদ্গুরু। প্রকৃত প্রস্তাবে গুরু একমাত্র ভগবান্, দ্বিতীয় কেউ নন। কিন্তু জীব সরাসরি তাঁকে ধরতে পারে না বলেই তিনি যোগ্য আচার্যের দেহকে আশ্রয় করে শিষ্যোদ্ধারের জন্য আত্মপ্রকাশ করেন। দুর্গাপ্রতিমায় যেমন মহাশক্তি জগদম্বার অধিষ্ঠান হয় বলে প্রতিমাকেও দুর্গা বলা হয়, তেমনই যে দেহকে আশ্রয় করে নিত্য গুরুশক্তি কার্য করে, সেই দেহকেই গুরু বলে বর্ণনা করা হয় — ইহাই আচার্যদেহ। কিন্তু আচার্যের সঙ্গে পরমেশ্বরের সাক্ষাৎ অথবা পরম্পরাগত যোগ স্থাপিত না হলে আচার্য ভগবানের প্রতিনিধিরূপে গুরুকার্যে সমর্থ হন না। আচার্য জীবোদ্ধারের নিমিত্তমাত্র; প্রকৃত গুরুরূপী ভগবানই যথার্থ উদ্ধারকর্তা।
এই দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, মনুষ্যগুরু — অর্থাৎ লাহিড়ী মহাশয়ের মতো মানবদেহধারী আচার্য — মূলত একটি আধার বা মাধ্যম, যাঁর ভিতর দিয়ে সেই এক গুরুশক্তি কাজ করে, যিনি নিজে দেহাতীত। শাস্ত্রে গুরুতত্ত্বের এই ক্রম বহু স্তরে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে — সর্বোচ্চে পরমশিব বা মন্ত্রমহেশ্বর স্বয়ং, যাঁর থেকে ক্রমে মন্ত্রেশ্বর, রুদ্র, দেব, মুনি, এবং অবশেষে মনুষ্যগুরু পর্যন্ত এই একই গুরুশক্তি ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হন। এই সমগ্র ক্রমকে সংক্ষেপে তিনটি স্তরেও বলা যায় — দিব্যগুরু, সিদ্ধগুরু ও মনুষ্যগুরু — এবং শাস্ত্রই জোর দিয়ে বলে যে এঁরা ভিন্ন ভিন্ন হলেও এঁদের গুরুশক্তি অভিন্ন। সাধারণ যোগ্য শিষ্য মনুষ্যগুরু থেকেই জ্ঞান লাভ করে, কারণ সাক্ষাৎ দিব্যগুরু লাভ করবার অধিকার বিরল। কিন্তু মনুষ্যগুরুর মধ্যে যদি প্রকৃত গুরুতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা থাকে — অর্থাৎ তিনি যদি জগৎগুরুর সঙ্গে নিজের অভিন্নতা অনুভব করেন — তাহলে সেই গুরুদেহের মধ্য দিয়েই জগৎগুরুর ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এইজন্যই লাহিড়ী মহাশয় নিজেকে কখনো স্বতন্ত্র গুরুরূপে জাহির করেননি; তিনি সর্বদা মহাবতার বাবাজীর প্রতি ও সেই অখণ্ড গুরুতত্ত্বের প্রতি সমর্পিত থেকেছেন। এই একই কারণে, প্রতিটি ক্রিয়া-অনুশীলনের শুরুতে গুরুবর্গকে স্মরণ করা নেহাত আনুষ্ঠানিকতা নয় — তা এই অখণ্ড গুরুশক্তির প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করার একটি সচেতন সাধনা।
গুরুর প্রকৃত কাজ কী? শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তা হলো জ্ঞাননেত্রের উন্মীলন — অজ্ঞানতিমিরান্ধ শিষ্যের চক্ষু জ্ঞানরূপ অঞ্জনশলাকা দ্বারা উন্মোচন করে দেওয়া, যাতে সে অখণ্ডমণ্ডলাকার চরাচর-ব্যাপী পরমপদ প্রত্যক্ষ করতে পারে। এই কাজ সিদ্ধ হয় গুরুশক্তির দ্বারা, যা ঈশ্বরের নিজেরই শক্তি — আর্ত ও অজ্ঞানী জীবকে উদ্ধার করবার জন্য প্রযুক্ত। তাই চমৎকার, দিব্যদর্শন বা অলৌকিক ঘটনা এসব গুরুতত্ত্বের বহিরঙ্গ প্রকাশ মাত্র, সারবস্তু নয়। প্রকৃত সাধকের কাছে গুরুতত্ত্বের গুরুত্ব এইখানেই নিহিত — মহাবতার বাবাজী দেখতে কেমন, কতদিন দেহ ধারণ করে আছেন, বা কী কী অলৌকিক কাজ করেছেন, তা গৌণ প্রশ্ন; মুখ্য প্রশ্ন হলো, সেই এক অখণ্ড গুরুশক্তি কীভাবে লাহিড়ী মহাশয়ের দেহের মধ্য দিয়ে এবং তাঁর পরবর্তী শিষ্যপরম্পরার মধ্য দিয়ে আজও অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
কেন? — এই প্রশ্নের উত্তরেই আমরা প্রবেশ করব আমাদের তৃতীয় পর্বে, যেখানে আমরা দেখব ক্রিয়াযোগ কেন গুরুমুখী বিদ্যা, এবং এর পেছনে কী বৈজ্ঞানিক যুক্তি নিহিত আছে।
তৃতীয় পর্ব: আত্মানুভূতির বিজ্ঞান
এখন আমরা প্রবেশ করছি আজকের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে — কেন ক্রিয়াযোগকে "বিজ্ঞান" আখ্যা দেওয়া হয়। পরমহংস যোগানন্দ ও পরমহংস হরিহরানন্দ উভয়েই ক্রিয়াযোগকে বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়েছেন। গণিতশাস্ত্র বা বিজ্ঞানের অন্য শাখায় যেমন নিয়মের ব্যতিক্রমের কোনো সম্ভাবনা নেই, তেমনই ক্রিয়াযোগ-বিজ্ঞান দ্বারা বিভিন্ন অনুভূতির মধ্য দিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ারও কোনো ব্যতিক্রম নেই। পাত্রভেদে কারো কম সময় লাগতে পারে, কারো বেশি — কিন্তু সদ্গুরুর কাছে দীক্ষাপ্রাপ্তির পর অধ্যবসায়ের সঙ্গে গুরুনির্দেশিত পথে সাধনা করলে মোক্ষপ্রাপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া নিশ্চিত।
প্রাণ-অপানের মিলন: ক্রিয়ার মূল প্রক্রিয়া
ক্রিয়াযোগের প্রাণায়ামে যখন প্রাণকে অপানে এবং অপানকে প্রাণে আহুতি দেওয়া হয়, তখন প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে? এই প্রশ্নের একটি ক্রমবদ্ধ উত্তর গ্রন্থে দেওয়া আছে।
প্রথমত, ঊর্ধ্বগামী প্রাণবায়ু ও অধোগামী অপানবায়ু পরস্পরবিরুদ্ধ দিকে কাজ করে, ফলে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। এই ভারসাম্যে শ্বাসপ্রশ্বাস স্তব্ধ হয়ে যায় বা অত্যন্ত মন্থর হয়, যাকে কুম্ভক বলা হয়। দ্বিতীয়ত, এই ভারসাম্যে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর প্রবাহ সমান হয়ে যায়, ফলে সুষুম্না নাড়ী উন্মুক্ত হয়। তৃতীয়ত, প্রাণশক্তি ইন্দ্রিয় থেকে প্রত্যাহৃত হয়ে মেরুদণ্ডে কেন্দ্রীভূত হয়। চতুর্থত, এই কেন্দ্রীভূত শক্তি চক্রসমূহে আবর্তিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে কুণ্ডলিনী জাগ্রত করে। পঞ্চমত, আয়ুর্বেদিক পরিভাষায় বলতে গেলে, প্রাণশক্তি ও তেজশক্তি একত্রিত হয়ে ওজঃশক্তিকে ঊর্ধ্বগামী করে — শারীরিক শক্তি রূপান্তরিত হয় আধ্যাত্মিক তেজে।
আমাদের মেরুদণ্ডে তিনটি প্রধান নাড়ী আছে — ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না। সুষুম্না মেরুদণ্ডের ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়, এবং এর ভেতরে আরও সূক্ষ্ম নাড়ী — বজ্রা ও চিত্রিণী। ইড়া মেরুদণ্ডের বাম দিক দিয়ে, পিঙ্গলা ডান দিক দিয়ে সর্পিলাকারে ওঠানামা করে। ইড়া চন্দ্রনাড়ী, শীতল, স্ত্রৈণশক্তি, বাম নাসারন্ধ্রের সঙ্গে যুক্ত। পিঙ্গলা সূর্যনাড়ী, উষ্ণ, পুরুষশক্তি, ডান নাসারন্ধ্রের সঙ্গে যুক্ত। স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাসপ্রশ্বাস ইড়া বা পিঙ্গলা দিয়ে চলে — কখনও বাম নাক দিয়ে বেশি, কখনও ডান নাক দিয়ে, প্রতি দেড় থেকে দুই ঘণ্টায় এই পরিবর্তন হয়। কিন্তু সুষুম্না সাধারণত অবরুদ্ধ থাকে। যোগসাধনায়, বিশেষত প্রাণায়ামে, যখন ইড়া ও পিঙ্গলার প্রবাহ সমান হয়, তখন সুষুম্না খুলে যায় এবং প্রাণশক্তি সরাসরি চক্রে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থাতেই মন স্বতঃস্ফূর্তভাবে শান্ত হয়, শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, এবং সাধক গভীর ধ্যান বা সমাধিতে প্রবেশ করেন।
সপ্তচক্র ও কুণ্ডলিনী
আমাদের শরীরে সাতটি চক্র আছে — মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা ও সহস্রার। সাধারণত আমাদের মন মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান ও মণিপুর চক্রেই ভ্রমণ করতে থাকে — অর্থাৎ ভয়, কামনা ও ক্ষমতার স্তরে। ক্রিয়াসাধনার মাধ্যমে আমাদের মন ক্রমশ উচ্চতর চক্রে, অর্থাৎ অনাহত (প্রেম), বিশুদ্ধ (সৃজন) ও আজ্ঞাচক্রের (বিবেক) ভূমিতে আরোহণ করে। অবশেষে যখন কুণ্ডলিনীশক্তি মস্তিষ্কস্থ সহস্রদলপদ্মযুক্ত সহস্রার চক্রে আরোহণ করে, তখন সাধক তাঁর সাধনার চরমবিন্দুতে পৌঁছান। কুণ্ডলিনী যখন এই চক্রগুলি ভেদ করে ঊর্ধ্বগামী হয়, তখন সাধক বিভিন্ন অলৌকিক অনুভূতি ও ক্ষমতা লাভ করেন — কিন্তু এগুলি লক্ষ্য নয়, পথের সংকেতমাত্র।
ক্রিয়ার ছয়টি স্তর ও তাদের অনুভূতি
লাহিড়ী মহাশয় যে ক্রিয়াযোগ প্রদর্শন করেছিলেন, তা ছয়টি স্তরে বিভক্ত — প্রথম ক্রিয়া থেকে ষষ্ঠ ক্রিয়া পর্যন্ত। প্রতিটি ক্রিয়াই গুরুর কাছ থেকে শিখে অভ্যাস করতে হয়, এবং প্রতিটি স্তরের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অনুভূতি আছে — যা গ্রন্থে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা সম্ভবত এর পূর্বে কোনো গ্রন্থে এইভাবে প্রকাশিত হয়নি।
প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি নির্দিষ্ট নামাঙ্কিত সমাধি-অবস্থা আছে, যা সাধকের অভ্যাসের ফলে ক্রমান্বয়ে লব্ধ হয়। এই ছয়টি সমাধির নাম ও তাদের অন্তর্নিহিত অনুভূতি একত্রে দেখা যাক।
প্রথম ক্রিয়া ও শুভেচ্ছা-সমাধি
প্রথম ক্রিয়ার অনুশীলনে সাধকের মন শান্ত হয়ে চৈতন্যে রূপান্তরিত হয়, শরীর সুস্থ হয়, বুদ্ধি উন্নত হয়, এবং সমগ্র মেরুদণ্ড জুড়ে দিব্যজ্যোতি, দিব্যধ্বনি ও দিব্যস্পন্দনের অনুভূতি জাগ্রত হয়। এই স্তরের সমাধির নাম শুভেচ্ছা-সমাধি — শুভেচ্ছা অর্থাৎ আত্মানুশীলনের প্রতি সেই আন্তরিক ইচ্ছা, যা প্রথমবার দিব্যানুভূতির রূপে সাধকের শরীরে প্রতিভাত হয়।
প্রথম ক্রিয়ার অন্তর্গত চারটি পৃথক সাধনরীতি আছে, প্রতিটিরই স্বতন্ত্র ফল:
● প্রথম রীতি (মহামুদ্রা) — এর দ্বারা মন-অহংকার-বুদ্ধি-চিত্ত তথা দেহবোধ ও বিশ্ববোধ দূরীভূত হয়, জ্ঞান বিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়, চিত্ত শান্ত-সাম্য-স্থির হয়ে একনিষ্ঠ ধ্যানে (single-minded meditation) স্থিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে সর্বাঙ্গে ভগবানের প্রাণশক্তি ও কম্পনশক্তি অনুভূত হয়, ইষ্টমন্ত্রের অনাহত ধ্বনি স্বতঃই শোনা যায় — মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না — এবং সাধক ব্রহ্মজ্ঞানে ও ব্রহ্মজ্যোতিতে অতি অল্প সময়েই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন।
● দ্বিতীয় রীতি (প্রণাম-সাধনা) — জমি চাষ না করে বীজ বপন করলে যেমন ফলের আশা করা যায় না, তেমনি স্থূল শরীরের মায়া-মোহ-ভ্রান্তি অপসারিত না করে আত্মজ্ঞানের উন্মেষ হয় না। এই রীতির অনুশীলনে দেহের নানা রোগের উপশম হয়, মস্তিষ্কে প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ হয়, স্মৃতি ও ধৃতি বৃদ্ধি পায়, ফলে সাধক সহজেই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন — এমন আত্মস্থ অবস্থায় কোনো বীভৎসতা মনে জাগতে পারে না।
● তৃতীয় রীতি (প্রাণায়াম ও ঈশ্বরার্পণ) — ফুল-বেলপাতা-ধূপ-দীপ সহযোগে যে পূজা, তা প্রকৃত পূজা নয়; "আমার বলিতে কিছু নাই প্রভু, সকলই তোমারই দান" — এই বোধে অন্তরের ও বাহিরের সমস্ত কিছু, এমনকি আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত ভগবানে সমর্পণ করাই প্রকৃত পূজা। তখন উপলব্ধি হয়, আমাদের মস্তিষ্ক-মুখ-হৃদয় প্রকৃতপক্ষে তাঁরই, তিনিই আমাদের মধ্য দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন — ভোজনতৃষ্ণা, যৌনকামনা, অর্থবাসনা, হৃদয়কল্পনা সমস্তই তখন ভগবানে অর্পিত হয়, এবং সাধক বিশ্ববোধরহিত, অবাঙ্মনসোগোচর অবস্থায় উপনীত হন।
● চতুর্থ রীতি (যোনিমুদ্রা/জ্যোতিমুদ্রা) — মেরুদণ্ডের মধ্যেই নিহিত থাকে প্রতিটি মানুষের প্রকৃত 'ঠিকুজি-কোষ্ঠি' — ছয় মাস উত্তরায়ণ ও ছয় মাস দক্ষিণায়নের ধারায় বারো রাশি ও গ্রহনক্ষত্রের প্রতীকী উপস্থিতি, যার ভিত্তিতে প্রতিটি মানুষের কর্মসংস্কার অনুযায়ী আকৃতি-প্রকৃতি-জ্ঞান-গুণ-দুঃখ-কষ্ট ভিন্ন ভিন্ন হয়। এই রীতির দ্বারা মনপ্রাণের রূপান্তর ঘটিয়ে ভাগ্য সুপ্রসন্ন করা যায়, গ্রহদোষ দূর হয়, সাম্য-মৈত্রী-করুণা জাগ্রত হয়, শান্ত-দান্ত অবস্থা আসে, মনের যাবতীয় খেয়াল-উদ্বেগ দূরীভূত হয়ে ধৈর্য-দয়া-ক্ষমা-সেবা-প্রেমে চিত্ত পূর্ণ হয়ে যায়। সাধক তখন সমাহিত, উপরত ও বৈরাগ্যযুক্ত হয়ে সমস্ত চক্রবৃত্তি ভগবানে অর্পণ করে দ্বিদলপদ্মের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠিত হতে পারেন।
এছাড়া প্রথম ক্রিয়াতেই খেচরীমুদ্রার অভ্যাসে মন চিন্তাশূন্য হয়, ফলে ক্রিয়াবান সদা আনন্দে অবস্থান করেন, এবং কুণ্ডলিনী মহাশক্তির জাগরণ এই স্তর থেকেই আরম্ভ হয়।
দ্বিতীয় ক্রিয়া ও বিচরণী সমাধি
দ্বিতীয় ক্রিয়ার অনুশীলনে শরীরের প্রতিটি চক্রে পৃথক পৃথক ধ্বনি-জ্যোতি-স্পন্দন অনুভূত হয়। এই অনুভূতি ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী হতে হতে প্রতিটি চক্রে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ধ্বনি শ্রুত হয়, এবং যখন এই ধ্বনি-অনুসরণে মেরুদণ্ড বেয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছানো যায়, তখন অদৃশ্যলোক থেকে সপ্তবিধ দিব্যধ্বনি এসে মস্তিষ্ককে পূর্ণ করে দেয় এবং সাধক ঈশ্বরবোধে বিভোর হয়ে পড়েন। এই স্তরের সমাধিকে বলা হয় বিচরণী সমাধি। কুম্ভকের সময়সীমাও স্বাভাবিকভাবে, কষ্ট ছাড়াই, বৃদ্ধি পায়; সহস্রারে কুম্ভকরত অবস্থায় চতুর্দিকের দর্শন হয়। এই অবস্থায় উত্তেজনা, বীভৎসতা, ভোগবিলাস, দম্ভ, দর্প, হিংসা, দ্বেষ প্রভৃতি থেকে মন বহু ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, সাম্যভাব জাগ্রত হয়, মেরুদণ্ডের প্রতিটি চক্রের ভাবধারায় ব্রহ্মপ্রতিষ্ঠা ঘটে — ক্রিয়াবান শরীরবোধ ভুলে ব্রহ্মস্বরূপের উপলব্ধি করেন এবং শান্ত-সমাহিত হয়ে স্বরূপানন্দ ভোগ করতে থাকেন।
তৃতীয় ক্রিয়া ও তনুমনসা সমাধি
নিয়মিত ধ্যানাভ্যাসী সাধক তৃতীয় ক্রিয়ার অনুশীলনে তাঁর প্রতিটি পার্থিব অনুভূতির বৃত্তির মধ্যে ভগবৎ-উপলব্ধি ও ভগবৎ-আস্বাদন লাভ করেন। জীবে-শিবে অভেদ ঘটে, রাধা-কৃষ্ণের যুগলমিলন অনুভূত হয় — দেহ রাধা, দেহী কৃষ্ণ, এবং দেহ-দেহীকে একাকার-রূপে উপলব্ধি করাই এই যুগলমিলনের তাৎপর্য। স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে মনকে সহস্রারে রেখে মস্তিষ্কের মধ্যস্থিত সহস্রার চক্রের ঘূর্ণন করতে হয়, জ্যোতি ও ধ্বনি আরও তীব্র হয়, এবং ধ্বনি যত তীব্র হয়, মন তত লীন হতে থাকে। এই স্তরে সাধক অনুভব করেন, আত্মা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, তিনি যেন বিশ্বচৈতন্যের মহাসমুদ্রে ভাসমান; জাগতিক কর্মকাণ্ডের সময় তাঁর মনে হয় এক বিশেষ শক্তি তাঁর মধ্য দিয়ে কাজ করছে, অথচ তিনি নিজে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। এই সমাধিকে বলা হয় তনুমনসা সমাধি — মন তখন আর জীবজগতে বিচরণ না করে অতীন্দ্রিয় জগতে বিচরণ করে, সাধক দিব্যচৈতন্য লাভ করেন এবং উপলব্ধি করেন যে মন-অহংকার-বুদ্ধি ইত্যাদির যা কিছু প্রকাশ, তা সবই আত্মার স্বয়ংপ্রকাশ। একেই বলা হয় কেন্দ্রে স্থিতি — একপ্রকার অন্তর্মুখী (introvert) অবস্থা, যেখানে সাম্য-মৈত্রী-করুণা জাগ্রত হয় এবং সাধক সকলের মধ্যে নিজ অস্তিত্বের উপলব্ধি করে অভেদ অবস্থা লাভ করেন।
চতুর্থ ক্রিয়া ও অসংসক্তি সমাধি
চতুর্থ ক্রিয়ার অনুশীলনকালে সাধক পালস্, থ্যালেমাস, হাইপোথ্যালেমাস, পিনিয়াল ও পিটুইটারি গ্রন্থিসমূহের মধ্যে আত্মার বিশেষ স্পন্দন অনুভব করেন। তাঁর মনে হয়, একটি জ্যোতি মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে — কুম্ভকসহ মনকে সহস্রারে রেখে এই ঘূর্ণন প্রক্রিয়া চলতে থাকে, শুভ্র জ্যোতি সহস্রার থেকে নির্গত হয়ে মহাকাশের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে এমন উপলব্ধি হয়। এই স্তরের সমাধিকে বলা হয় অসংসক্তি সমাধি — সাধক তখন সাম্যে সংলীন হয়ে নির্দোষ অবস্থায় উপনীত হন, নিম্নবৃত্তিসমূহকে সম্পূর্ণরূপে বলিদান করে সর্বত্র ভগবানের উপস্থিতি উপলব্ধি করেন; ক্রিয়াবানের মন সদা ঊর্ধ্বে বিচরণ করে, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি অত্যধিক কমে যায়, মধ্যে মধ্যে শরীরবোধ লুপ্ত হয়ে যায় — একেই এই স্তরের প্রাণায়াম বলা হয়।
পঞ্চম ক্রিয়া ও সত্তোৎপত্তি সমাধি
পঞ্চম ক্রিয়ায় সাধক লঘুমস্তিষ্কে (cerebellum) দিব্যানুভূতি লাভ করেন। তিনি ক্রমে পিনিয়াল গ্রন্থির সন্নিকটে উপনীত হন এবং তার অভ্যন্তরে প্রবেশের যথাসাধ্য প্রয়াস করেন। এই অবস্থাকে বলা হয় সত্তোৎপত্তি সমাধি — সত্তা অর্থাৎ পরম সত্তা বা পরমাত্মার উপলব্ধির উন্মেষ। এই স্তরে দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণের পর যথাসম্ভব কুম্ভকে থাকতে হয়; সাধক দীর্ঘসময় শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়াই সহজে থাকতে পারেন। শরীরবোধ থাকলেও মন কূটস্থে অবস্থান করে — এ প্রাণায়াম ও একাগ্রতার তীব্রতম অবস্থা, যেখানে সাধক ব্যষ্টিসত্তা থেকে ক্রমে সমষ্টিসত্তার উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হন।
ষষ্ঠ ক্রিয়া ও পরাবস্থা
ষষ্ঠ ক্রিয়ায় বিশেষ শ্বাসপ্রক্রিয়ায় পূরক ও রেচক করতে হয়, কুম্ভক থাকে না — পাঁচ-ছয় বার, সম্ভব হলে সাত থেকে দশবার ক্রমান্বয়ে পূরক-রেচক অভ্যাসের পর সাধক পরাবস্থা লাভ করেন। পূর্ববর্তী পাঁচটি ক্রিয়ার সমাধিগুলি — শুভেচ্ছা, বিচরণী, তনুমনসা, অসংসক্তি ও সত্তোৎপত্তি — এই স্তরে এসে যেন একীভূত হয়ে যায়, এবং সাধক ছয়টি ক্রিয়ার সমাপ্তিতে চূড়ান্ত মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হন।
গ্রন্থে বলা হয়েছে, "ক্রিয়াযোগ এমন এক প্রদীপশিখা, যার দীপ্তি পাপী বা পুণ্যবানের ভেদ করে না" — অর্থাৎ এই বিজ্ঞান সর্বজনের জন্য উন্মুক্ত, পাত্রতা যাচাই না করেই এর দ্বার সকলের সামনে খোলা।
কেন গুরু অপরিহার্য — বিজ্ঞানসম্মত কারণ
এখানে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে — যদি এ এতই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, তবে কেন এটি কোনো গ্রন্থে সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করে সাধারণ মানুষকে স্বাধীনভাবে অভ্যাস করতে দেওয়া হয় না? এর উত্তরও বিজ্ঞানসম্মত।
চক্রজাগরণ ও কুণ্ডলিনী উত্থান একটি সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী প্রক্রিয়া। ভ্রান্ত পদ্ধতিতে বা অপ্রস্তুত শরীর-মনে এই প্রক্রিয়া শুরু করলে বিপদ ঘটতে পারে — শারীরিক (অত্যধিক তাপ, স্নায়বিক সমস্যা), মানসিক (অস্থিরতা, বিভ্রম), অথবা আধ্যাত্মিক (অহংবৃদ্ধি, সিদ্ধিতে আসক্তি)। সাধারণ মানুষের শরীর একটি পঞ্চাশ ওয়াটের বাতির মতো, যা ক্রিয়ার অত্যধিক অভ্যাসে জাগ্রত বিপুল শক্তি ধারণ করতে পারে না। তাই ক্রমিক ও নিয়মিত বৃদ্ধির মাধ্যমেই শরীরকে প্রস্তুত করতে হয় — প্রাথমিক সাধক দিনে দুইবার মাত্র চোদ্দ থেকে আঠাশ বার ক্রিয়া অভ্যাস করেন, ধীরে ধীরে শরীর-মন যখন এই শক্তি ধারণে সক্ষম হয়, তখন অভ্যাসের মাত্রা বাড়ে।
শাস্ত্রে বারবার বলা হয়েছে, এই সাধনা অবশ্যই সদ্গুরুর তত্ত্বাবধানে করতে হবে। গুরু জানেন শিষ্যের শরীর-মন-প্রাণ কতটা প্রস্তুত, কোন চক্রে কাজ করা নিরাপদ, এবং কতটা শক্তির জাগরণ সহনীয়। তাঁরা ক্রমানুসারে শিষ্যকে প্রস্তুত করেন — প্রথমে যম-নিয়মের দ্বারা নৈতিক ভিত্তি, তারপর আসনের দ্বারা শারীরিক স্থিরতা, প্রাণায়ামের দ্বারা প্রাণশক্তি নিয়ন্ত্রণ, প্রত্যাহারের দ্বারা ইন্দ্রিয়সংযম, এবং তারপরই ধারণা-ধ্যান-সমাধির উচ্চতর স্তরে। হঠযোগপ্রদীপিকায় বলা হয়েছে — শরীরশুদ্ধি ব্যতীত প্রাণায়াম বিপজ্জনক। দীক্ষার সময় গুরু শিষ্যকে কেবল কৌশল শেখান না, একটি আধ্যাত্মিক সংযোগও দান করেন, যা সাধনায় অপরিহার্য।
এইভাবে তত্ত্ব ও সাধনা, জ্ঞান ও অনুশীলন, শাস্ত্র ও অভিজ্ঞতা — সবকিছু একসূত্রে গ্রথিত হয়ে ক্রিয়াযোগের পূর্ণতা আনে। কারণ সাধনা ব্যতীত তত্ত্ব নিষ্ফল, আর তত্ত্ব ব্যতীত সাধনা অন্ধ।
চতুর্থ পর্ব: বর্তমান যুগে প্রাসঙ্গিকতা
এবার আমরা প্রশ্ন করি — আজকের যুগে, এই দ্রুতগতির যান্ত্রিক জীবনে, ক্রিয়াযোগের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?
ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন —
চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্। তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্॥ (গীতা ৬/৩৪)
হে কৃষ্ণ, আমার মন অত্যন্ত চঞ্চল, প্রবল এবং ইন্দ্রিয়ে বিক্ষেপ সৃষ্টিকারী — একে সংযত করা বাতাসকে বন্দি করার মতোই দুঃসাধ্য। শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলছেন — অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা মনকে সংযত করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীসের অভ্যাস? এবং আমাদের বিষয়াসক্ত মনে যেখানে সদাসর্বদা নতুন চিন্তা ও বাসনার উদয় হচ্ছে, সেখানে বৈরাগ্য প্রাপ্তি কীভাবে সম্ভব? বিশেষত আধুনিক দ্রুতগতির যান্ত্রিক জীবনে এই বৈরাগ্য আনা প্রায় অসম্ভবই মনে হয়। এইখানেই আসে লাহিড়ী মহাশয়-প্রবর্তিত ক্রিয়াযোগের প্রয়োজনীয়তা।
লাহিড়ী মহাশয় তাঁর গুরু মহাবতার বাবাজীর কাছ থেকে প্রাপ্ত ক্রিয়াযোগকে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারের জন্য ছয়টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। এই ক্রিয়াযোগ যদি ক্রিয়াপ্রচারে আদেশপ্রাপ্ত কোনো সদ্গুরুর কাছ থেকে গ্রহণ করে নিয়মিত অভ্যাস করা যায়, তবে সেই ব্যক্তির মনঃসংযম ত্বরান্বিত হয়, শ্রীকৃষ্ণ কথিত সেই বৈরাগ্যের জন্ম হয় মনে, এবং সদ্গুরুর কৃপায় সমস্ত বাসনা-কামনার নিবৃত্তি হয়ে আত্মদর্শন ঘটে।
গৃহস্থ-সাধনার বার্তা
লাহিড়ী মহাশয়ের প্রবর্তিত ক্রিয়াযোগের একটি বিশেষত্ব এই যে, এতে কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক কষ্টসাধ্য পদ্ধতি নেই। প্রাণায়ামেও দীর্ঘ সময় শ্বাস আটকে রাখার (কুম্ভক) কষ্টকর প্রক্রিয়া নেই। এমন কোনো আচার নেই, যা আধুনিক যুগের সাধারণ মানুষের পালন করা কঠিন। যে কোনো মানুষ নিজের ঘরে, নির্জনে এই সাধনা করতে পারেন।
ভারতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ ও সাধক-সাধিকা সন্ন্যাসী বা সম্পূর্ণ সংসারবিমুখ ছিলেন। এতে সংসারধর্ম পালনকারী গৃহস্থ নর-নারীদের মধ্যে এই ধারণা স্বাভাবিক যে, সর্বোচ্চ স্তরের ব্রহ্মানুভূতি লাভের জন্য তাঁরা হয়তো উপযুক্ত নন। প্রকৃতপক্ষে এই কারণেই, পরমাত্মার ইচ্ছায় লাহিড়ী মহাশয়কে সংসারে আবদ্ধ রাখা হয়েছিল — যাতে তাঁকে দেখে, তাঁর পবিত্র চরিত্রের সান্নিধ্যে এসে, বা তাঁর জীবনকথা শুনে গৃহস্থরাও এই নিশ্চয়তা লাভ করেন যে তাঁদের পক্ষেও সর্বোচ্চ স্তরের আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভ সম্ভব। যোগিরাজ লাহিড়ী মহাশয়ের সর্বপ্রধান কীর্তি এই যে, তিনি যোগের দ্বার সমস্ত মুমুক্ষু নর-নারীর জন্য — সংসারী হোক বা সন্ন্যাসী — উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
লাহিড়ী মহাশয় সমস্ত ধর্মমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর বাণী ছিল — "কোনো ভগবন্নামে অশ্রদ্ধা কোরো না।" সমস্ত ধর্মই একই পরমাত্মায় পৌঁছানোর বিভিন্ন পথ, যেমন বিভিন্ন নাম ও পথে প্রবাহিত নদীগুলি একই সাগরে গিয়ে মেশে। ক্রিয়াযোগ কোনো একটি ধর্মের সম্পত্তি নয়, সমগ্র মানবতার ঐতিহ্য। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান — যে কোনো ধর্মের অনুসারীই নিজ নিজ উপাসনা অব্যাহত রেখে ক্রিয়াযোগ অভ্যাস করতে পারেন।
শান্তির সন্ধান ও ক্রিয়াযোগের ভূমিকা
গীতার সাংখ্যযোগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ বর্ণনা করে বলছেন —
আপূর্যমাণমচলপ্রতিষ্ঠং সমুদ্রমাপঃ প্রবিশন্তি যদ্বৎ। তদ্বৎ কামা যং প্রবিশন্তি সর্বে স শান্তিমাপ্নোতি ন কামকামী॥ (গীতা ২/৭০)
যেমন নদীর জলে পরিপূর্ণ অচঞ্চল সমুদ্রে আরও জলরাশি এসে মিশে গেলেও সমুদ্র অবিচল থাকে, তেমনই যে মহাত্মায় বিষয় প্রবেশ করেও চিত্তবিক্ষেপ ঘটায় না, তিনিই শান্তি লাভ করেন। এই প্রসঙ্গে ভগবান বুদ্ধের কথা স্মরণীয় — এক সম্রাট তাঁকে কটুবাক্য বললেও তিনি অবিচলিত থাকেন, কারণ তিনি সেই বাক্য গ্রহণই করেননি। আমাদের প্রশ্ন হতে পারে — বুদ্ধের মতো অবতারতুল্য পুরুষের জন্য যা সম্ভব, তা কি আমাদের জন্যও সম্ভব? নিয়মিত ক্রিয়াভ্যাসের মাধ্যমে গীতোক্ত এই অবস্থা আমরাও নিজেদের মধ্যে অনুভব করতে পারি — এই আশ্বাসই ক্রিয়াযোগের কেন্দ্রীয় বার্তা।
নিয়মিত ক্রিয়াসাধনার ফলে সাধক ক্রমশ অনুভব করতে পারেন যে তাঁর মন একাগ্র হচ্ছে। তাঁর মুখমণ্ডলে সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন আসে, এবং কিছুকাল পরে তাঁর আশেপাশের মানুষও তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারেন। কিন্তু এই বাহ্য পরিবর্তনগুলি ক্রিয়াসাধনার মূল উদ্দেশ্য নয়। ক্রিয়াযোগ সাধনার মূল উদ্দেশ্য শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে মনকে এমনভাবে একাগ্র করা, যাতে মন সম্পূর্ণভাবে লয়প্রাপ্ত হয় এবং জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে — একটি জ্ঞান, যা প্রত্যক্ষ, সাধকের নিজস্ব অনুভূতিযুক্ত। কেবল শাস্ত্রপাঠ বা যজ্ঞাদির মাধ্যমে এই জ্ঞান লাভ করা যায় না।
মহাবতার বাবাজী মহারাজ অভয়বাণী উচ্চারণ করেছেন — "স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ" — এই ধর্মের অতি অল্প অনুশীলনেও তুমি বিপুল ভয় থেকে পরিত্রাণ পাবে। যোগিরাজ লাহিড়ী মহাশয় সমস্ত ক্রিয়াবানদের আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি সর্বদা আশীর্বাদ দানের জন্য উপস্থিত থাকবেন। পরমহংস যোগানন্দের ভাষায়, অন্যান্য সাধনপথে যদি বলদগাড়ির গতিতে সাধক অগ্রসর হন, তবে ক্রিয়াযোগের গতি যেন বিমানের গতি — এতটাই ত্বরান্বিত হয় আধ্যাত্মিক অগ্রগতি।
পঞ্চম পর্ব: অধিকারীত্ব
এখন ক্রিয়া কার জন্য এই প্রশ্নটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এ জন্যেও কারণ সমস্ত ভারতীয় বিদ্যাই সকলের জন্য নয়। অধিকারীভেদে শাস্ত্র ও শাষণ আলাদা হয়। এবং সেটাই স্বাভাবিক। যার অধিকার সাংখ্যে তিনি বস্তবাদের দিকে যাবেনই বা কেন? সেভাবেই যিনি রসিক মানুষ, যার কৌতূহল নাট্যে তাকে আমরা যোগে সাধারণত কম দেখি। চিন্তা নেই, এই কথাটির মাধ্যমে আমি নিজেকেই একটু টিজ করলাম। অনেকেই জানেন আমার মূল কৌতূহলের বিষয়টিই নাট্যশাস্ত্র। যাই হোক। চিত্তবৃত্তিবিলাসের প্রতি কৌতূহল যার সে চিত্তবৃত্তিনিরোধের কথা ভাববে না স্বাভাবিক। তাহলে আমাদের আগে এটা জানার প্রয়োজন যে সাধারণত অধিকারীর লক্ষণ কী ও যোগের বিশেষ করে অধিকারী কে?
এখানে অধিকারীর প্রশ্নটিকে দুই স্তরে ভাগ করে বলা যেতে পারে — প্রথমে সাধারণ অধিকার, তারপর যোগ-বিশেষে অধিকার। এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটিয়েই ক্রিয়ার নিজস্ব উত্তরে পৌঁছনো সাধারণ অধিকারী-লক্ষণ
শাস্ত্রের ভাষায় অধিকারী শব্দটি এসেছে অধি + কৃ ধাতু থেকে — অধিকার অর্থে যোগ্যতা, প্রস্তুতি। অধিকারী তিনিই, যাঁর এই বিশেষ জ্ঞান গ্রহণ করবার সামর্থ্য প্রস্তুত হয়েছে। প্রশ্নটি তাই আইনি অধিকারের নয়, প্রস্তুতির।
কাশ্মীরী শৈব দার্শনিক অভিনবগুপ্ত এই বিষয়ে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন — জিজ্ঞাসাই প্রকৃত অধিকারীর প্রথম চিহ্ন। তিনি অর্জুনের কথা স্মরণ করান — অর্জুনের সেই স্বীকারোক্তি, "আমি জানি না, আমাকে শেখাও" — এই স্বীকারোক্তিই তাঁকে গীতা পাবার যোগ্য করে তুলেছিল। গীতা তো ছিলই, কিন্তু তা গীতা হয়ে উঠল তখনই, যখন একজন প্রকৃত অধিকারী এসে জিজ্ঞাসা করলেন। এ এক গভীর প্রত্যাঘাত সাধারণ ধারণার প্রতি — আমরা ভাবি শিক্ষক জ্ঞান দান করেন, শিষ্য গ্রহণ করেন। কিন্তু শাস্ত্র বলে উল্টো কথা — শিষ্যের প্রস্তুতিই শিক্ষাকে আহ্বান করে।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রদ্ধা — শ্রৎ (সত্য/হৃদয়) ও ধা (স্থাপন করা) থেকে গঠিত, অর্থাৎ হৃদয়কে শিক্ষার দিকে স্থাপন করা। এ অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং এমন একটি গ্রহণক্ষমতা, যা জ্ঞানকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়। যে শিষ্য শাস্ত্রের প্রতি প্রতিপক্ষের মতো দাঁড়ায় — ভুল ধরবার জন্য, তর্ক করবার জন্য — সে শিখতে পারে না। শাস্ত্র দুর্বল বলে নয়, তার নিজের ভঙ্গিমাই তাকে গ্রহণে অক্ষম করে তোলে।
আর তৃতীয় লক্ষণ বিবেক — নিত্য ও অনিত্যের, সারবস্তু ও আপাত-আকর্ষণের মধ্যে প্রভেদ করবার ক্ষমতা। বিবেক সংশয়বাদ নয়, এ দৃষ্টির প্রখরতা। বিবেক ছাড়া শিক্ষার্থী কেবল তথ্য সংগ্রহ করে যায়, প্রজ্ঞা স্পর্শ করতে পারে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় যম-নিয়মের ভিত্তি — অহিংসা, সত্য, অস্তেয়ের মতো সংযম এবং শৌচ, সন্তোষ, তপস্যার মতো নিয়ম। এ কোনো নীতিবাগীশতা নয়, বরং মনোবিজ্ঞান — যে চিত্ত নিয়ত দ্বন্দ্ব, মিথ্যাচার বা লোভে বিক্ষিপ্ত, সে শাস্ত্রীয় অধ্যয়নের জন্য প্রয়োজনীয় একাগ্রতা ধরে রাখতে পারে না।
বেদান্তে আরও নির্দিষ্টভাবে এই লক্ষণগুলিকে একত্র করা হয়েছে সাধন-চতুষ্টয় নামে — নিত্যানিত্যবস্তুবিবেক (নিত্য ও অনিত্যের বিচার), ইহামুত্রফলভোগবিরাগ (ইহলোক-পরলোক উভয় ফলভোগেই বৈরাগ্য), শমাদিষট্কসম্পত্তি (শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা, শ্রদ্ধা, সমাধান — এই ছয় গুণের সম্পদ), এবং সবশেষে আবার মুমুক্ষুত্ব — যা তালিকা শুরুও করে, শেষও করে। এই পুনরাবৃত্তিই বলে দেয়, মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই সমস্ত সাধনার প্রবেশদ্বার এবং গভীরতম ভিত্তি, দুই-ই।
আর এইখানে একটি কথা না বললেই নয় — এই ঐতিহ্য স্পষ্ট ভাষায় বলে, অধিকার নির্ধারিত হয় প্রস্তুতি দিয়ে, জন্ম দিয়ে নয়, জাতি দিয়ে নয়, লিঙ্গ দিয়ে নয়, সামাজিক অবস্থান দিয়ে নয়। অধিকারী তিনিই, যাঁর মধ্যে এই গুণগুলি বিকশিত হয়েছে, বা বিকশিত হচ্ছে। এ কোনো রুদ্ধ ব্যবস্থা নয়, ক্রমবিকাশমান ব্যবস্থা। যাঁর শ্রদ্ধা এখনও পূর্ণ নয়, তিনি তা গড়ে তুলতে পারেন। যাঁর বিবেক এখনও পরিণত নয়, তিনি তা চর্চা করতে পারেন। ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা তাই প্রকৃতপক্ষে সমগ্র মানবজাতির — একে সঠিকভাবে বুঝলে এ কোনো দ্বাররক্ষীর ব্যবস্থা নয়, এ এক নিমন্ত্রণ।
যোগ-বিশেষে অধিকারী
সাধারণ অধিকারের এই চিত্রের পর প্রশ্ন ওঠে — যোগ নির্দিষ্টভাবে কার জন্য? পতঞ্জলি এখানেও জন্ম-জাতি-বৃত্তির প্রশ্ন তোলেননি, তিনি মাপকাঠি রেখেছেন সংবেগ ও প্রযত্নের তীব্রতায়। যোগসূত্রে বলা হয়েছে —
তীব্রসংবেগানামাসন্নঃ॥ (১.২১)
অর্থাৎ, যাঁদের অন্তরের বেগ তীব্র, সমাধি তাঁদেরই নিকটতম।
আর পরের সূত্রে এই তীব্রতাকেও তিনি মৃদু, মধ্য ও অধিমাত্র — এই তিন স্তরে ভাগ করেছেন (১.২২)। ব্যাসভাষ্য এই প্রসঙ্গে সাধকেরও একটি চতুর্বিধ শ্রেণিবিভাগ দেন — প্রথমকল্পিক, মধুভূমিক, প্রজ্ঞাজ্যোতিঃ ও অতিক্রান্তভাবনীয়। লক্ষ করবার বিষয়, এ কিন্তু কাউকে পথ থেকে বাদ দেবার শ্রেণিবিভাগ নয় — এ কেবল দেখিয়ে দেয়, সাধক পথের ঠিক কোন বিন্দুতে দাঁড়িয়ে।
আর এর সঙ্গে একটি সুন্দর প্রতিসাম্য যোগ করা যায় হঠযোগপ্রদীপিকা থেকে —
যুবা বৃদ্ধোঽতিবৃদ্ধো বা ব্যাধিতো দুর্বলোঽপি বা।
অভ্যাসাৎ সিদ্ধিমাপ্নোতি সর্বযোগেষ্বতন্দ্রিতঃ॥ (১.৬৪)
যুবক, বৃদ্ধ, অতি-বৃদ্ধ, এমনকি ব্যাধিগ্রস্ত বা দুর্বল ব্যক্তিও — নিষ্ঠাসহকারে অভ্যাস করলে সিদ্ধি লাভ করেন।
এই শ্লোকটি সেই ধারণাকে ভেঙে দেয়, যা মনে করে যোগ কেবল তরুণ, সুস্থ বা সন্ন্যাসীর জন্য।
তাহলে সব মিলিয়ে ছবিটা এই দাঁড়ায় — অধিকারভেদ বাস্তব, শাস্ত্র তাকে অস্বীকার করে না, যেমন আমি নিজেকে নিয়ে একটু আগেই তামাশা করলাম। কিন্তু যোগে, এবং বিশেষভাবে ক্রিয়াযোগে, সেই ভেদের মাপকাঠি জন্ম নয়, জাতি নয়, বৃত্তি নয় — সেই মাপকাঠি অন্তরের ব্যাকুলতা আর নিষ্ঠাসহকারে অভ্যাস করবার ইচ্ছা। এই কারণেই ক্রিয়াযোগ কোনো সম্প্রদায়ের, কোনো বর্ণের বা কোনো বিশেষ জীবনধারার সম্পত্তি নয় — কেবল প্রয়োজন সেই মুমুক্ষুত্ব, আর তা লালন করবার আন্তরিকতা।
আচ্ছা কারুর মনে কী এই প্রশ্নটি এলো যে আমি হঠাৎ করে কেন হঠযোগপ্রদীপিকা থেকে ক্রিয়ার প্রমাণ তুলে আনলাম? পতঞ্জলি তো বোঝা গেল সাধনপাদের প্রথম সূত্রেই তিনি ক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হঠযোগপ্রদীপিকা কেন? এর উত্তর আমি আশাবাদী প্রকৃত অধিকারী নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবেন। উহা তো নাথ পরম্পরার শাস্ত্র। এটুকুই হিন্টই যথেষ্ট হবে তার জন্মুমুক্ষুত্ব
মুমুক্ষুত্ব — মুচ্ ধাতুর ইচ্ছার্থক রূপ, অর্থাৎ মুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু কী থেকে মুক্তি? নিশ্চয়ই তার মানে কোনও বন্ধন আছে? এখন এই বন্ধন দুই প্রকার! অবশ্যই এক বাহ্যিক। এবং দুই চেতনার। চেতনার বন্ধনের কথা আমরা আগের পর্বে কিছুটা আলোচনা করেছিলাম। বলেছিলাম বিবেকজ্ঞানের দ্বারা পুরুষের আত্মস্বরূপত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং তার ফলে সে কৈবল্য লাভ করে। তার প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে নিজেকে প্রকৃতি বলে ভাবা এক প্রকারের বন্ধন। দ্বিতীয় প্রকারের বন্ধন হলো ত্রিবর্গ। ত্রি বর্গ অর্থাৎ ধর্ম- অর্থ ও কাম। বাৎস্যায়ন কামসূত্রের প্রারম্ভেই এই তিনটিকে একত্রে বলেছেন ত্রিবর্গসাধনম্ — সাংসারিক জীবনের ত্রিবিধ পুরুষার্থ সাধনের উপায়। লক্ষণীয়, এই তিনটি জিনিস কিন্তু শাস্ত্রে নিন্দিত নয়। মনুসংহিতা থেকে শুরু করে সাধারণ ধর্মশাস্ত্রীয় অবস্থান এই যে, ধর্ম, অর্থ ও কামকে সুষম রাখতে হয় — ধর্মই অর্থ ও কামকে নিয়ন্ত্রণ করবে; অর্থ বা কামের অনিয়ন্ত্রিত অনুসরণই তখন অধর্মে পরিণত হয়। অর্থাৎ ত্রিবর্গ-বন্ধন মানে এই নয় যে সাংসারিক জীবন মন্দ। বরং সবচেয়ে ধর্মনিয়ন্ত্রিত, সবচেয়ে সুশৃঙ্খল অর্থ-কাম সাধনাও শেষ পর্যন্ত সংসারেরই সীমার মধ্যে আবর্তিত হয়। এ এক সুশাসিত বন্ধন বটে, কিন্তু বন্ধনই।
আর এই কারণেই ন্যায়দর্শনসহ বৃহত্তর শাস্ত্রীয় ব্যবহারে ত্রিবর্গের বিপরীতে একটি চতুর্থ শব্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে — অপবর্গ। অপবর্গ অর্থাৎ বর্গ থেকে মুক্তি, এই ত্রিবিধ চক্র থেকেই মুক্তি। শব্দের গঠনই বলে দেয়, ত্রিবর্গকে শাস্ত্র কখনও চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে ধরেনি — একে অতিক্রম করবারই বিষয় বলে ধরেছে। মহাভারতের শান্তিপর্বে যখন এই তিনের সঙ্গে মোক্ষকে যুক্ত করে চতুর্বর্গের কথা বলা হয়, তখন মোক্ষ কিন্তু ধর্ম-অর্থ-কামের সমগোত্রীয় চতুর্থ সঙ্গী নয় — বরং সেই বিন্দু, যেখানে গোটা ত্রিবর্গ-ব্যবস্থাটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ ত্রিবর্গ তো কাজ করে কেবল তার উপরেই, যে নিজেকে ফলভোগী বলে মনে করে।
তাহলে আমরা দুটি বন্ধনের ছবি পেলাম। এক, চেতনার বন্ধন — যেখানে পুরুষ নিজেকে প্রকৃতি বলে ভুল করে, আর যার সমাধান বিবেকজ্ঞান ও কৈবল্য। দুই, বাহ্যিক বন্ধন — যেখানে জীবন আবর্তিত হয় ধর্ম-অর্থ-কামের সুশৃঙ্খল অথচ সসীম বৃত্তে, আর যার সমাধান অপবর্গ বা মোক্ষ, সেই চতুর্থ পুরুষার্থ যা ত্রিবর্গকে অতিক্রম করে।
এই দুই ধরনের বন্ধনকে সামনে রেখেই এবার আমরা ব্যক্তির দুটি পর্যায়ের কথায় আসতে পারি। এক ত্রিবর্গে অনুরক্ত ব্যক্তির পথ ভাবের। এই জগতকে আমরা ভব, সেই ভব থেকেই ভাব। আর এই ত্রিবর্গে বিরক্ত ব্যক্তির পথ ভাবনার। বিরক্ত মানে সাধারণ বাংলায় অবশ্য আমরা ইরিটেশন বুঝি। কিন্তু এখানে সেই অর্থ হচ্ছে না। একটা উদাহরণ দিলে অবস্থাটা পরিষ্কার হবে। তথাগত বুদ্ধের কথা মনে করুন। কিংবা বোধিসত্বের কথা। তাঁরা আসলে বিরক্ত হয়ে সমাজ ছেড়েছেন। কিন্তু মনে করুণা। সেই করুণা ও ক্রিয়ার সংযোগের কথা বলেছিলাম আগের দিন ঠিক এই কারণেই। এই ত্রিবর্গে কর্মবন্ধনে বিরক্ত আমিও একদিন লকডাউনের কালে পৌঁছে গেছিলাম আমার গুরুদেবের ঠিকানায়। আমার এখনও মনে বেলঘরিয়ার তার সেই ফ্ল্যাটে আমার প্রথম যাওয়া। মকর সংক্রান্তির পরের দিন। ছেড়া জিনস পরে, ধুলো মাখা একটা রাইডিং জ্যাকেট, মুখে মাস্ক, কেবল চোখ টুকু দেখা যাচ্ছে আমার গোটা শরীরে। জীবনের টালমাটাল সামলাতে না পারা একজন যুবক, মনে যার অজস্র সংশয়! সংশয় এত যে বেঁচে থাকাটাই যার কাছে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। তিনি আমার গুরু স্বরূপানন্দ ব্রহ্মচারী! জীবন্মুক্তের সাক্ষাৎ উদাহরণ। নির্বিকল্প সমাধি প্রাপ্ত যোগী। তিনি আমাকে দীক্ষা দেন। এই যা বলছি আজ। যেটুকু ঠিক বলছি। এ তাঁরই কৃপা। গুরু শিষ্যের সম্পর্কটা বাবা-মায়ের সম্পর্কের চেয়েও গভীর! বাবা-মা-এর সঙ্গে সম্পর্ক শুধু এই জন্মের। গুরুর সঙ্গে জন্মান্তরের! আমি প্রথম পর্বে আগের দিন তার পরিচয় সজ্ঞানে দিইনি এই ভেবে কারণ ছিল এই অধিকারীতত্ত্ব! যা নিয়ে আজ আলোচনা করলাম। দ্বিতীয়ত তিনি ভীষণ নিভৃতে থাকতে পছন্দ করেন। আর মানুষের আচরণে আমার সত্যিই তেমন ভরসা কম।
বিশ্বাস করুন, ক্রিয়া সম্বন্ধে আমার ধারণা সেদিন ইউটিউবের ভিডিও গুলোর চেয়ে বেশি ছিল না। আমিও অলৌকিককে তখন চমৎকার বলেই চিনেছি তখন। যতক্ষণ না পর্যন্ত অলৌকিকের আসল অনুভব হয়!
একমাত্র যোগের দ্বারাই এই অলৌকিকের সাক্ষাৎ হয় একথা বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি নয়। কিন্তু এই অলৌকিক কী? অনেকেই অলৌকিক বলতে ভাবেন চমৎকার। পরশপাথরের স্পর্শে পাথরের সোনা হয়ে ওঠা। প্রচলিত এই বিশ্বাস আমি ভাঙতে চাই না। কিন্তু শাস্ত্রে এবং সত্যিই অলৌকিক-এর অর্থ ও ব্যাপ্তি অনেকটাই বেশি। লৌকিকের লক্ষণ হয়, তাই তার সংজ্ঞাও হয়। কিন্তু অলৌকিকের কোনও লক্ষণ নেই। তাই লৌকিক লক্ষণের অতীত যা তাকেই আমরা অলৌকিক বলে জানি। সহজ করে বলি।
এই জগত খুব সাধারণভাবে দ্বিমাত্রিক মনে হয়। দ্বিমাত্রিক অর্থাৎ সাইকোসোমাটিক। কিন্তু ভারতবর্ষ একে ত্রিমাত্রিক চিনেছে। এবং বাস্তবিক ত্রিমাত্রিক চেনার পর আবার চতুর্থ আরেক আয়ামের কথাও বলেছে। কিন্তু সেই চতুর্থ আয়ামের কথা আজ আমরা বলব না। আমরা আজ ত্রিমাত্রিক আয়ামের কথাই জানব। ত্রিমাত্রিক কিন্তু দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা নয়। বরং স্থুল সূক্ষ্ম ও কারণ। এক যা ট্যাঞ্জিবল, দুই যা ইন্ট্যাঞ্জিবল এবং তিন যা এই ট্যাঞ্জিবল-ইন্ট্যাঞ্জিবলের অতীত। একটি আমাদের ছুঁয়ে ছেনে দেখার দুনিয়া। ইট কাঠ বালি পাথরের দুনিয়া। দ্বিতীয়টি আমাদের বিশ্বাসের, কল্পনার, সিনেমার, সাহিত্যের দুনিয়া এবং তৃতীয় দুনিয়াটি তার যা এই বাস্তবকে ও বিশ্বাসকে মূল্য দেয়। কারণ জোগায়। আমরা আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিকতার কথা জানি। আমি এই দুটি ত্রয়ীকে এইভাবে মিলিয়ে দেখছি। অবশ্য উদ্দেশ তথা নাম আলাদা কারণ লক্ষণভেদ আছে। কিন্তু আধ্যাত্মিকতাই জীবনের আসল অলৌকিকতা। রাবণের দশ মাথার উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। রাবণের দশ মাথাকে যদি আপনি দশটি শাস্ত্রের বা দশ রকমের বিদ্যার লক্ষণ হিসেবে ধরেন তাহলে তা আপনার বিশ্বাসের জায়গা। রামায়ণের আধিদৈবিক মূল্যায়ন। কিন্তু তাকেই যদি আমি মণিপুর চক্রের দশটি পদ্মদলের সঙ্গে তুলনা করি, তাই হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক। অলৌকিক। কারণ শরীরের অভ্যন্তরস্থ চক্রের কথা অলৌকিক। শরীরের ছেদনে কোথাও আপনি কোনও চক্র পাবেন না। হনুমানকে পবনপুত্র বলার কারণের পিছনেও তাই এক অলৌকিকতা আধ্যাত্মিকতা রয়েছে। যোগ আমাদের সেই অলৌকিকের সাক্ষাৎ করায়।
এবার তাহলে আমরা ক্রিয়ার বিষয় সম্বন্ধে জানলাম। জানলাম ক্রিয়ার প্রয়োজনের কথা। জানলাম তার অধিকারী কে। অতএব পরে রইল সম্বন্ধ। অনুবন্ধ চতুষ্টয়ের কথা ধরলে, এই চারটির নিরূপণ করলে তবেই কোনও বিদ্যার এক সম্যক ধারণা তৈরি হয়। তাহলে ক্রিয়া এই বিষয়-প্রয়োজন-অধিকারীর মধ্যে সম্বন্ধটা কী? না ধ্যান-ধ্যাতা-ধ্যেয় সম্বন্ধ। জ্ঞান-জ্ঞাতা-জ্ঞেয় নয় কিন্তু। ক্রিয়া অভ্যেসের জিনিস, কেবল বিদ্যার জিনিস নয়। কেবল স্বধ্যায়ের দ্বারা যোগ হয় না। তার জন্য প্রয়োজন তপেরও এবং অবশ্যই ঈশ্বরপ্রণিধান। যদি আমরা গীতা নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে কর্ম সম্বন্ধিত বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ঈশ্বরপ্রণিধানের কথা বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ আসবে।
ॐ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্যং করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ॥ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥