চতুশ্লোকি মনুস্মৃতি | নীতিন শ্রীধর | বিতস্তা পাবলিকেশন | ISBN: 978-8119670918
স্বাধীনতার ‘অমৃতকাল’ পেরিয়ে, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যে কারণেই হোক, ভারতীয় সমাজ এখন ‘বেস্ট প্র্যাক্টিসেস’-এর অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি মগ্ন, লৌকিক অবজারভেশনে এমন প্রমাণই প্রতীত হয়। জ্ঞানচর্চায় আমরা একে উত্তর ঔপনিবেশকতার অনুসন্ধান বলে থাকি! বিদ্যাক্ষেত্রে কলোনিয়াল পিরিয়ডের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনা ভারতের অধিবাসীদের অমূলক নয়, কারণ ভারতবর্ষের বিদ্যাচর্চার ইতিহাস কেবল অনাদি না, বরং তা সাধারণ মেধাকে দেশকালকে ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। আমাদের বর্তমান আলোচ্য বই, নিতিন শ্রীধর বিরচিত ‘চতুশ্লোকি মনুস্মৃতি’ সেই উত্তর ঔপনিবেশিকতার তথা সামাজিক বেস্ট প্র্যাক্টিসেস-এরই এক অনুসন্ধান, একটি উত্তম প্রয়াস। বইটি মনুস্মৃতির প্রথম চার্টই শ্লোকের পাঠ ও অনুবন্ধ চতুষ্টয় নির্ণয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ গ্রন্থটির বিষয়কে নবীন পাঠকের কাছে তুলে ধরে। উদ্দেশ ধারণা করা যেতে পারে, মনুস্মৃতি সংক্রান্ত যে একটি কালেক্টিভ ট্রমা আমাদের স্মৃতিতে রয়েছে (প্রকাশ্য রাস্তায় মনুস্মৃতি গ্রন্থটি জ্বালানোর ঘটনা স্মর্তব্য), তাঁর কিছুটা উপশম। তবে যেকোনো ভারতীয় বিদ্যা ও তার অধিকার যেহেতু অনুবন্ধ চতুষ্টয়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়, তাই আমরা এই গ্রন্থের আলোচনাটিকে সেই ফ্রেমওয়ার্কেই রাখার চেষ্টা করে দেখতে পারি।
সব বিদ্যা সবার জন্য নয়, এই কথাটা আপাতভাবে কিছুটা অগণতান্ত্রিক শোনালেও, মূলত চর্চার মাধ্যমে আধার নির্মাণের প্রতি জোর দেওয়া এর মূল লক্ষ্য। কারণ সেই পূর্ব উল্লিখিত দেশকাল। যে বিদ্যা পৌরুষেয়, তা একটি নির্দিষ্ট দেশকালের জন্য রচিত। তাই সেই নির্দিষ্ট দেশকালের নির্দিষ্ট বিদ্যায় পারদর্শী আধিকারীই সে বিদ্যার মর্মার্থ অনুধাবন করতে সক্ষম। তাহলে কি আজ থেকে দুহাজার বছর আগের রচিত কোনও শাস্ত্রের বর্তমান পাঠের কোনও অধিকার নেই মানুষের? এই প্রশ্ন জাগলে, তাঁর এক সহজ উত্তর আসে, আছে, এবং অবশ্যই তার জন্য কিছু পূর্ব নির্ধারিত শর্ত পালন করতে হয়। শ্রদ্ধা ও কৌতূহলের বাইরে আরেকটি সহজ প্রয়োজন থাকে অধিকারী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তা হলো, নিজের ভিতরে থাকা কিছু প্রোথিত কন্ডিশনের উপরে উঠে নিজেকে রিসেপ্টিভ করে তোলা। ঠিক এমনই একটি উদাহরণ আমরা দেখতে পাই প্রশ্নোপনিষদে, বেদাভ্যাস সম্পন্ন হওয়া তপস্বী জিজ্ঞাসুদেরও পিপ্পলাদ মুণির কাছে একবছর নিরন্তর তপ ও সাধনায় নিরত হয়ে যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর মেলে। মনুস্মৃতির ক্ষেত্রে তাই অধিকারী হওয়ার প্রাথমিক গুণটিই হলো যে মুনি কনশাসনেস-এর সঙ্গে পরিচিত, এবং দ্বিতীয়ত ধর্ম সম্বন্ধে শ্রদ্ধাবান(শ্রদ্ধা কথাটি রেস্পেক্ট হিসেবে ধরে নিলে ভুল হতে পারে, এর সংস্কৃত অনুবাদ কিছুটা এরকম হতে ধী বা হৃদয়কে উক্ত বিষয়ের সামনে সমর্পিত করে দেওয়া)। আসলে ভারতীয় আস্তিক সম্প্রদায়ের তর্কও আমাদের দেশকালের অতীত হওয়ার শিক্ষা দেয়। মোক্ষপ্রাপ্তি যেখানে মূল উদ্দেশ্য, পরীক্ষায় পাশ করা নয়, সেখানে এই চর্চা কিছুটা এলিয়েন বোধ হতে পারে, এই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই বলা।
নিতিন জানেন, তাঁর বইটির পাঠক, এই মুনি কনশাসনেস-এর সঙ্গে পরিচিত নয়। উপরন্তু তিনি চেয়েছেন মনুস্মৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত মিডিয়া ধারণার বিপ্রতীপে গিয়ে আর্গুমেন্টটিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা। অনুবন্ধ চতুষ্টয়ের আরেকটি ফ্যাকাল্টি যে ‘প্রয়োজন’, লেখক হিসেবে নিতিনের একটি প্রয়োজন যে তাই, গ্রন্থটি পাঠের পর সে ধারণা হয়। কারণ তাঁর বইয়ের রিডার বা অধিকারী সেই সমস্ত মানুষ যারা কোনোওদিন গুরুকুলে গিয়ে শাস্ত্র অধ্যয়ন করেননি, বরং মিলেনিয়ালস এবং জেন জি, এবং হয়ত আগামীর জেন আলফা। তাদের ভিতরে কৌতূহল জাগরণের মধ্যে দিয়ে, ধর্মশাস্ত্র-এর অধিকারী করে তোলাই নিতিনের দ্বিতীয় প্রয়োজন। তাই বোধ হয় এই গ্রন্থের পাঠক বৃহৎ অর্থে সেই সামাজিক যার ভারতীয় শাস্ত্র সম্বন্ধে কৌতূহল আছে, কিন্তু গুরুকুল বা ইন্সটিটিউশনাল অধ্যয়নের উপায় নেই। সেক্ষেত্রে ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে নিজের কৌতূহল নিবারণ, এবং ধর্মশাস্ত্রের আঙিনায় প্রবেশ লাভ পাঠকের প্রয়োজন বলে ধরা যেতে পারে। কেউ যদি এখন নিতিনের এই গ্রন্থ রচনার অধিকার সম্বন্ধে জানতে চান, তাহলে সেক্ষেত্রে গ্রন্থের শুরুতেই প্রিফেসে নিতিনের স্বীকারোক্তি উল্লেখযোগ্য।
অধিকারী, প্রয়োজন এবং এই দিয়ের পারস্পরিক সম্বন্ধটি আলোচনার পর আমরা এরপর বিষয় ও বিষয়ের সঙ্গে বাকি দুই ফ্যাকাল্টির সম্বন্ধ সম্পর্কে আলোচনা যুক্তিসঙ্গত বোধ হয়। তবে তার আগে পৌরুষেয় ও অপৌরুষেয় দুটি বিষয় সম্বন্ধে কিছু কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন, নইলে শ্রুতি ও স্মৃতির ক্যাটেগোরাইজেশনটা সঠিক পরিষ্কার হবে না। সাধারণত আমরা যেভাবে কোনও একটি বই পড়ি, শাস্ত্র অধ্যয়ন সেভাবে ঠিক হয় না। আজকের দিনে বা পাশ্চাত্য পরম্পরায় একটি বই-এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় একটি নির্দিষ্ট দেশকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ একজন বিশেষ মানুষ কোনও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর তাঁর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী রচনা করেন। বই-লেখক-পাঠক (এবং বর্তমান দিনে প্রকাশক) ভারতীয় শাস্ত্র রচনার ক্ষেত্রে এই ফ্রেমওয়ার্ক কাজ করেনি। এখানে শাস্ত্র কোনও ইন্ডিভিজুয়ালের কাজ নয়, বরং একটি বিদ্যা সংক্রান্ত একটি সম্প্রদায়ের বহু বছরের সাধনার ফল। তাই সেখানে বিশেষ কোনও লেখকের নাম কখনও থাকতই না। যিনি কম্পাইল করছেন সেই সমস্ত জ্ঞান তিনি যদি কোনও একজন বিশেষ ব্যক্তিও হয়ে থাকেন, তাহলেও তিনি নিজের নামের বদলে রচয়িতা হিসেবে একটি চেতনার উল্লেখ করে দিয়ে যান। পুরাণের ক্ষেত্রে আমরা এর ভীষণ ভালো উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাই, ব্যাস পরবর্তী সময়ের পুরাণগুলিতেও আমরা লেখক হিসেবে যে ব্যাসদেবের নাম পাই, তা আসলে ব্যাস চৈতন্যের কথা বলে।
তবে এই ফ্রেমওয়ার্ক মেইন্টেন করতে হলে তাঁর প্রিজার্ভেশনেরও প্রয়োজন আছে। পরম্পরাগতভাবে জ্ঞানের এই স্রোতপ্রবাহে প্রয়োজন ক্ষয়কে যথাসম্ভব ন্যুনতম করার। ক্ষয়কে স্বীকার করে নিয়েই তাই শ্রুতি ও স্মৃতির ক্যাটেগোরাইজেশন ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরায় একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রত্যক্ষ শ্রুতির ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে ন্যুনতম, এমনকি দাবি করা হয়ে থাকে, তা কয়েক হাজার বছর পরেও যার মধ্যে সত্যিই কোনও পরিবর্তন নেই, স্মৃতির ক্ষেত্রে এমনটা দাবি করা কখনওই সম্ভব নয় (স্মৃতিশাস্ত্রের লক্ষ্য বা উদ্দেশ তা নয়ও যদিও)। আবার জ্ঞানকে মানব মনের একটি ফ্যাকাল্টি না বলে, তাকে উচ্চতর কনশাসনেস এর একটা অংশ যা মানব মানসে সঞ্চারিত হয় ধরে নেওয়ার মধ্যেও ইন্ডিভিজুয়ালিটির বিপ্রতীপ অবস্থান ধরা পড়ে। যেখান থেকে সেই পরম জ্ঞান মানব মানসে সঞ্চারিত হয় তাকে আমরা নামে স্মৃতি শাস্ত্রে জানি ব্রহ্মা বলে। সেই ব্রহ্মার রচনা শ্রুতি, যেখানে জ্ঞান-এর ক্ষয় ন্যুনতম, তাই তাকে আমরা সেলফ রিয়েলাইজড তথা আত্মজ্ঞান প্রাপ্ত মানবের উপদেশ হিসবে আপ্তবাক্য তথা শব্দ প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়েছি। স্মৃতির ক্ষেত্রে এই জ্ঞান সরাসরি ব্রহ্মার থেকে আসে না, বরং তা আমরা প্রাপ্ত হই পরম্পরাক্রমে। গ্রন্থটির বর্তমান রচয়িতা একে কালেক্টিভ মেমরি-র জ্ঞানগহ্বর থেকে রচনা করেছেন। তাই এটি স্মৃতি। মনু গ্রন্থের বহু শ্লোকে ব্রহ্মার কথাকে সরাসরি উদ্ধৃত না করে তাঁর ইন্টারপ্রিটেশনের মাধ্যমে মুনিদের কাছে পরিবেশন করছেন। মনু (মানব কনশাসনেস) যিনি নিজে সেলফ রিয়েলাইজড, এবং সেলফ রিয়েলাইজড বলে তাঁর কাছে মুনিরা (মুনি কনশাসনেস) এসে ধর্মোপদেশ গ্রহণ করছেন, তাঁর বাক্য আপ্তোপদেশ হলেও, আমরা তাকে যথার্থত না পেয়ে পাচ্ছি ক্ষয়ের দ্বারা। আবার যেহেতু এর জ্ঞান বেদের উপর আধারিত হলেও যেহেতু দেশকালাতীত নয় তাই স্মৃতি শাস্ত্রও শব্দও প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। এমতাবস্থায় এই মনুর কাছে মুনিরা এসে চতুর্বণের উপযোগী ধর্মের (রিলিজিয়ন নয়, বরং সামান্য বিশেষ ও আপাতকালীন ধর্ম হিসেবে বোঝা যেতে পারে) স্বরূপ সম্বন্ধে প্রশ্ন করেন, এবং সেই কৌতূহলের যাবতীয় উত্তর রয়েছে মনুসংহিতার দ্বাদশ অধ্যায় জুড়ে। আবার সেই সমস্ত বিষয়ের সার আমরা পাই, প্রথম অধ্যায়ের প্রথম চারটি কারিকায় লুকিয়ে থাকা অনুবন্ধ চতুষ্টয় নির্ণয়ের মাধ্যমে। নিতিনের আলোচ্য গ্রন্থটি এই প্রথম চারটি কারিকাকে বিচার বিশ্লেষণ করে মনু সংহিতার যাবতীয় আলোচ্য বিষয় আমাদের সামনে তুলে ধরে।
গ্রন্থটির মূলত দুটি অংশ, প্রথমৎ ইন্ট্রোডাকশন, যা আবার তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত, যা মনুসংহিতার উৎপত্তি, লেখক পরিচয় এবং পরম্পরা তথা দেশকাল ও সামগ্রিক ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে আলোচনা করে। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে বইটির মূল অংশ প্রথম চারটি কারিকার বিশ্লেষণ। এছাড়া রয়েছে তিনটি অ্যাপেন্ডিক্স।
এই ধরণের শাস্ত্র বিষয়ক লক্ষণগ্রন্থ অন্য ভাষায় রচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সঠিক গ্লোসারি। কারণ সংস্কৃতে রচিত যেকোনো দার্শনিক শাস্ত্র-এর নিজস্ব কিছু কিওয়ার্ড থাকে, সেই কিওয়ার্ডগুলির উপযুক্ত সমার্থক শব্দ একটি ভিন্ন ভাষায় খুঁজে না পেলে সম্পূর্ণ বাক্যের উদ্দেশ্য পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন শব্দ প্রমাণের শব্দ আসলে ইংরেজিতে ওয়ার্ড নয়। তেমনই দ্বিতীয় অধ্যায়ের দশম কারিকা অন্তিম পাদে “তে সর্বার্থেস্বমীমাংস্যে তাভ্যাং ধর্মো হি নির্বভৌ" কথাটিতে মীমাংসার অতীত যা তা কিন্তু ‘do not deserved to be criticised’ বললে রচনার উদ্দেশ পরিষ্কার হয় না। স্মৃতিশাস্ত্রগুলি মূলত উপদেশ। যেহেতু উপদেশ তাই তাকে আমরা জ্ঞান-জ্ঞাতা-জ্ঞেয় এই ট্রায়াডে দেখি, প্রমাণ-প্রমেয়-প্রমা-র দ্বারা নয়। নিতিন ধর্মশাস্ত্রকে শব্দ প্রমাণ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, তাঁর পিছনে যথেষ্ট কারণও তিনি দিয়েছেন। কিন্তু সেই শব্দকে তিনি অনুবাদ করেছেন ইংরেজি শব্দ ‘ওয়ার্ড’ হিসেবে। পাঠক এই গ্রন্থ অধ্যয়ন করে সম্পূর্ণ মনুসংহিতা পাঠে আগ্রহী হবেন এবং তারপর বিচার করবেন এটিই নিতিনেরও কাঙ্ক্ষিত। তিনি চান ভারতীয় সমাজে ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধীয় আলোচনা পুনরায় প্রাসঙ্গিক হোক।