দু-বার কলিংবেল বাজানোর পরেও সাড়া নেই। তিনবার বাজানোর ঠিক আগে দরজা একটু ফাঁক হল। সেই বিষণ্ণ মুখ চোখ, এলোমেলো এক মাথা চুল। স্থির দুটো চোখ, কোনো প্রশ্ন নেই সেখানে। মুন্নির এসব বহু পরিচিত, তাই অবাক হয় না। কোনো দিনই হয়নি অবশ্য কেনই-বা হবে, এই রকমই তো হবার কথা।
-কী করছিলে? তিনবার বেল বাজালাম...
-তিন কোথায়, দু-বার!
-বাব্বা, টনটনে জ্ঞান! দরজা খুলবে, না ফিরে যাব?
-তোর ইচ্ছে... বলতে বলতেই দরজা হাট করে খুলে দেয় শুভাশিস। দরজা পুরো খোলার পর একটু যেন অবাক হয় সে, মুন্নির সঙ্গে আর একজন রয়েছেন, বাঁ-দিকে। শুভাশিস আগে দেখতে পায়নি।
মুন্নি যেন মুখচোখে আলো জ্বেলে বলল, আজ তোমার একজন অতিথি এসেছে। আমার বন্ধু মালিনী। ও তোমাকে দেখতে চাইছিল। শুভাশিস হেসে বলে, আমি বাঘ-সিংহ নাকি রে?
-না না, বাঘ-সিংহ তো চিড়িয়াখানায়। ও ঘরবন্দি এক আজব চিড়িয়া দেখতে এসেছে।
-দেখবি আয়। তবে রতন আজ নেই। তোদেরই সব করতে হবে, চা-যা... আর যা ইচ্ছে...
দশ পনেরো মিনিট বৃষ্টির পর অপরাহ্নের মায়াবি আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। অবশ্য চরাচর বলতে বিশ্বজগতের যে বিশাল ব্যাপ্তির কথা প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে, সেরকম তো নয়। ছোটো মফস্সল থেকে বড়ো শহর হয়ে ওঠা এবং ক্রমশ আরও বড়ো হওয়ার সাধনায় উন্মত্ত এক জনপদের যতটুকু দেখা যায়, সেখানে এখন এক অপার্থিব আলো এসে পড়েছে। একটা বড়ো দিঘিকে ঘিরে চারপাশে উঁচু নীচু অনেক বাড়ি। দিঘির চারদিকে রাস্তা, লোক চলাচল। তার ওপরে বৃষ্টির পর অপসৃয়মান ধূসর মেঘের আড়াল থেকে নীল আকাশ রঙিন হয়ে উঠবে ক্রমে। শুভাশিস অন্যমনস্ক হয়ে এসবই দেখে এখন। দিঘির উত্তর পাড়ে তার বাড়ি। ঠাকুরদা শেষ বয়সে করেছিল। তারপর বাবা-মা পেরিয়ে এখন সে। দোতলায় থাকে। একা। একতলায় দুটো দোকান, ওষুধ ও মনোহারির। নীচের কোলাপসিবল গেট দিনের বেলা খোলা থাকে। সহকারী রতন ওপরের বন্ধ দরজা খোলে। শুভাশিস এসব থেকে মুক্তি পায়। আজ রতন নেই। শুভাশিস তার পিসতুতো বোনকে অ্যাপ্যায়ন করলো। সঙ্গেঁ ওর বান্ধবী, কী নাম বলল যেন, মালিনী। নামটা একটু যেন প্রাচীন গন্ধ মাখা, তাই না? তুমি খুশি হয়েছ কি, শুভাশিস? অন্তরাত্মা উত্তর দেয়, হ্যাঁ, একটুখানি। তাই তো আজ বৃষ্টির পর অপরাহ্ণের এই মায়া রোদ্দুর। কীসের মায়া, শুভা? কোনো উত্তর দেয় না আর।
আগেকার দিনের লোকেরা একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে চাইতেন। ঘর, দরজা জানলা, বাইরের বারান্দায় সেইসবের চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। বাথরুম যেন একটা বসার ঘর। সেই হিসেব ওপরে তিনটে ঘর, ছাদের চিলেকোঠা, দিঘির পাড়ে ছাদ, অনায়াসে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট বসানো যায়। কিন্তু কে বসাবে? মানুষ তো এখন একজন। ওঁরা, মানে পূর্বপুরুষেরা এরকম কল্পনা করতে পারেননি। কিন্তু এই পুরোনো শহরের বহু বিশাল বাড়ি খাঁ খাঁ করে। একজন প্রহরী থাকে নাম কা ওয়াস্তে পাহারায়। রাতের আঁধারে বাড়িগুলোর দিকে তাকালে গা-ছম ছম করে। এর বিপরীতে শহরের চারপাশ ঘিরে আকাশ ছুঁতে চাইছে অসংখ্য পায়রার খোপ। সেখানে নবযুগের মানুষেরা বেশ ছিমছাম আদব কায়দায় থাকলেও, পুরোনো দিনের লোকেরা ওগুলোকে পায়রার খোপ বলে। যদিও পায়রার বকবকম ওখানে কখনও শোনা যাবে না।
শুভাশিস একা হয়ে গেছে সাত বছর আগে, যখন মা চলে গেল। খুব কষ্ট হয়েছিল। মাতৃ বিয়োগে তো হওয়ারই কথা। কিন্তু দেড়-দু-বছর সে এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারে নি। গভীর রাতেও সে দিঘির দিকে বারান্দার অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকত। ঘুম আসে না কিছুতেই, অদ্ভুত নির্জন গা ছমছম করা বাড়িতে।
মুন্নি, মানে মিতালি আসত, প্রথম দিকে পিসিকে নিয়ে, প্রায়ই! এখন বেশিরভাগ একা, সপ্তাহে এক-দু-দিন তো বটেই।
-তোমার জন্যে খুব মনখারাপ করে আমার, জানো?
মুচকি হাসে শুভাশিস, বিষাদের চিহ্ন মাখা হাসি, না তো, কেন?
-আমার জন্যে করে না তোমার?
অবিকল একই রকম হাসে শুভাশিস, না তো, কেন করবে?
-কেন করবে না তোমার? আমার তো সবসময় করে।
বিষণ্ণ মুচকি হাসি ছাড়া আর কিছু নেই শুভাশিসের কাছে। সে বাইরের বারান্দায় চলে যায়। কিছুক্ষণ পর মুন্নি দু-কাপ চা নিয়ে যায় ওখানে। তিনটে চেয়ার আছে বারান্দায়। দু-টো চেয়ারে পাশাপাশি বসে থাকে দুজনে, চুপচাপ। একটা চেয়ার ফাঁকা, কারোর কি আসার কথা আছে? অদৃশ্য, অচেনা তার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে অন্ধকার নামে। কেউ আসে না...
চলে যাওয়ার সময় মুন্নি বলে, রতন চলে গেলে নীচের গেটে তালা লাগাবে মনে করে।
-কী হবে, যদি খোলা থাকে?
কটমট করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মুন্নি। শুভাশিস না হেসে ফেলা পর্যন্ত মুন্নি যায় না। শুভারও মনখারাপ হয়। সত্যি।
চা নয়, কফি আর কিছু নোনতা বিস্কুট নিয়ে মুন্নি আর ওর বান্ধবী পুকুরের দিকে বড়ো বড়ো জানলায়ালা ঘরে এল।
-কিছুই তো নেই তোর ঘরে। টিফিন করিস কী দিয়ে। গেস্ট এলে চা খাইয়ে বিদেয় করে দিস?
-ওসব রতন দেখে। আজও সকালে রান্না করে দিয়ে চলে গেছে। তুই তো নীচে থেকে কিছু আনলে পারতিস।
-ওসব পোষাবে না। এক গায়িকা বন্ধুকে মামার বাড়িতে এনে শুধু কফি আর নোনতা বিস্কুট। ইজ্জত বলে কিছুর রইল না আর।
শুভাশিস মালিনীর দিকে তাকায়, বেশ উজ্জ্বল চোখ, ঠোঁটে আলগা হাসি, ঢেউ খেলানো চুল, ছিপ ছিপে গড়ন...
শুভাশিস চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে, ইনি গায়িকা?
মুন্নি হাসে, ইনি নয়, ও আমার থেকে ছ-মাসের ছোটো। দাঁড়া, কফি খেয়ে গান শোনাবে তোকে, তখন বুঝবি গানের গুঁতো কাকে বলে।
কথায় কথায় বাইরের অপরাহ্ণের আলো আর একটু গাঢ় হয়। এক মালিনী সম্পর্কেও কিছু জানা যায়। একবছর আগে ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছে এক ডাক্তারের সঙ্গে। মালিনী নার্সিং স্টাফ মেডিকেল কলেজে। কিন্তু গান ওর নিশ্বাসবায়ু। মুন্নির সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ত। মুন্নি প্রথম দু-তিন বছর একটা কলেজে পার্ট টাইমের পর স্কুলের চাকরিটা পেয়েছে, কাছেই, যাওয়া আসার খুব একটা...
হঠাৎ মালিনী গেয়ে ওঠে বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে। আমার নিভৃত নব জীবন পরে...
স্তব্ধ হয়ে গেল অপরাহ্ণের আলো! এরকম ভাবেনি শুভাশিস। গান শেষে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর আবার... সুখে আমায় রাখবে কেন, রাখো তোমার কোলে। যাক-না গো সুখ জ্বলে।
আবার কিছুক্ষণ নৈঃশব্দ্যের পর- হৃদয়ে ছিলে জেগে, দেখি আজ শরৎ মেঘে।
অন্ধকার নেমে আসছে। শুভাশিস ভেবে পায় না, কার জন্য অকস্মাৎ এই আয়োজন আজ। সে তো স্বপ্নেও ভাবেনি, শুধু তার জন্যেই আজ বিকেলটা অদ্ভুত হয়ে উঠবে।
-তুমি খুব ভালো গান করো, মালিনী। আমি এরকম আশা করিনি।
বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। কেমন যেন গা ছম ছম করছে। এই বাড়িতে যারা থাকত, তারা সবাই কি এসেছিল?
এইসব অতীন্দ্রিয় অনুভূতি, পরলোক, পরজন্ম এসবে কোনো বিশ্বাস নেই তার। কোনোদিনই ছিল না, ওসব তাকে ছোঁবে বলেও ভাবোনি। মনখারাপ তোমার শুভা, বিষাদের অপরাহ্ণ তোমাকে ঘিরে ফেলছে! এরপর রাত ঘনাবে।
সন্ধের পর ওরা দুজন যাওয়ার সময় শুভাশিস দরজা পর্যন্ত যায়। মালিনী বলে, আবার আমি আসবো দাদা। আমি গান করি, কিন্তু সবার জন্যে নয়। কোনো অনুষ্ঠানে নয়, রেকর্ডিং হয় না। মুন্নি সব জানে। আসব আবার।
ওরা দুজন নীচে নেমে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পরেই মুন্নি আবার ফিরে আসে। শুভাশিস তাকিয়ে আছে দেখে মুন্নি বলল, ফোন ফেলে গেছি।
-কোথায়?
-জানি না, খুঁজতে হবে।
ফোন সহজেই পাওয়া গেল। হয়তো ফেলে যায়নি, রেখে গিয়েছিল। বেসিনে অনেকক্ষণ ধরে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে চোখ লাল করে ফেলে।
শুভাশিস ইশারায় জানতে চায়, কী ব্যাপার।
মুন্নি বলে, মনখারাপ, যাওয়ার ইচ্ছে নেই। মালিনীকে পৌঁছে দিয়ে আবার আসছি আমি।
আজ আর আসতে হবে না তোকে।
- না, আজই...
কোনো ঘরেই আলো না জ্বেলে শুভাশিস চুপচাপ শুয়ে থাকে। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে অন্য মানুষ ও মনে হয় এখন প্রায়ই। এটা কাটিয়ে উঠতে হবে তোকে। না পারলে কী হবে সে জানে। এত অসহায় তো সে ছিল না। কী করে, কবে হলো?
আধ ঘণ্টারও কম সময়ে মুন্নির গলা, যেন বিপন্ন, বেগে উঠল, আমি এসেছি আলো কই?
শুভাশিস ওঠে, আলো জ্বালে। মুন্নি দরজার সামনেই ছিল। ওইরকমই বিপন্ন গলায় বলে, দরজা খুলে রেখেছ? অত করে বললাম।
-হ্যাঁ, আমি এখন ডিফেন্সহারা।
-পাগল কোথাকার!
-হইনি এখনও। হয়ে যেতে পারি। দূরে দূরে থাকবি!
-দূরে কেন? আরও কাছে...
-চা কর বেশ জমিয়ে। যেন সুগন্ধ ছড়ায়...
মুন্নি যখন একুশ, আর শুভাশিস সাতাশ, দুটো বাড়িতেই যেন বিনা মেঘে বাজ পড়ল। ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। মুন্নি সোচ্চার, শুভা নীরব। মুন্নির ফরসা গালে ওর বাবার পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ এখনও দেখা যায়। অন্য কেউ দেখতে পায় না, মুন্নি স্পষ্ট দেখে। তাই সে আর কখনোই আয়নায় সামনে বেশিক্ষণ থাকে না। মুন্নির থেকে চার বছরের ছোটো ভাই বাইক দুর্ঘটনায় মারা গেছে তার দেড় বছর আগেই। দুটো ঘটনায় হইচইয়ের বাড়িটা নীরব হয়ে গেল। বাবা কদাচিৎ মুন্নির সঙ্গে কথা বলে। মা বিষাদগ্রস্ত।
এদিকে ইঞ্জিনিয়ার শুভাশিস চাকরি পেয়ে বাইরে, অর্থাৎ ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাবা দিলখোলা, বুঝতে দেয় না কিছু। মা একটু যেন লজ্জিত বা অপরাধী ভাব নিয়ে থাকে।
এর চার বছর পর শুভাশিস চাকরি ছেড়ে দেবে। বাবা বিনা নোটিশে না ফেরার দেশে। তারপর মা, বিনা নোটিশে নয় অবশ্য, আটদিন ভোগার পর। ওদিকে মুন্নি চাকরি পেয়েছে। আর কোনো পরিবর্তন নেই...। মেয়ে মত বদলানোর চেয়ে আরও বেশি কট্টর।
-চা খুব ভালো করেছ, তোমারই মতো সুগন্ধময়। আচ্ছা, চাকরিটা ছেড়ে আমি কি ভুল করেছি। মানুষের তো কাজ দরকার। তাই এত-
-কোনো ভুল করোনি। যাদের টাকার দরকার, তাদের চাকরি করতেই হবে। তোমার তো টাকার অভাব নেই। নিজের মতো জীবন কাটাও।
-আমার নিজের জীবনে তো তুমিও আছ।
পুকুরের পূর্ব পাড়ের আকাশে একটা আলো খসে পড়ল। মুন্নি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে, মা-কে ফোন করেছিলাম। আজ ফিরব না। মা বলল, ফিরে আয়, ওরকম করিস না। তোর বাবাকে কী বলব?
শুভাশিস বলে, হ্যাঁ, অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় না।
মুন্নি আরও একটু ঘন হয় শুভাশিসের আমাদের কী হবে?
-কিছুই হবে না। আমরা থাকব, চুল পেকে যাবে, স্মৃতি হারিয়ে ফেলব। ভয়ে লজ্জায় যেমন বহু মানুষ সারা জীবন কাটিয়ে একদিন পরপারে অস্ত যায়...
মুন্নির কণ্ঠে যেন গানের সুর, কিংবা যদি ভয়ংকর কোনো বিস্ফোরণ, সব দেয়াল, সব বাধা বিপত্তি... আমি বেশিদিন অপেক্ষা করতে রাজি নই। এটা তো অতি সামান্য ব্যাপার।
শুভাশিস অনেকক্ষণ পর বলে, তুমি কী করবে আজ?
-জানি না। এখন আমাকে জড়িয়ে ধরো, ভয় করছে।
-কীসের ভয়?
-অতৃপ্ত আত্মার।