Skip to main content
২০ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার · ৬ নভেম্বর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
আসন্ন অনুষ্ঠান 22 Nov 2026
Exploring Enduring Colonialism: Classical Presences and Modern Absences in Indian Philosophy
A Raghuramraju
লেখা পাঠান

রাত্রির কান্না

প্রবেশক ঘূর্ণিঝড় আয়লার পর সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত গ্রামের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায় মিনতি ও তার পরিবারের। নোনা জলে নষ্ট হয়ে যায় চাষের জমি, হারিয়ে যায় জীবিকার অবলম্বন। তার ওপর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার ক্রমশ গ্রাস করতে থাকে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা। প্রতিবাদ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয় মিনতির স্বামী চন্দন। একসময় তাঁদের অস্তিত্ব, সম্মান ও নিরাপত্তা যখন ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ে, তখন মেয়েকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিতে বাধ্য হয় তারা।
রাত্রির কান্না
AIচিত্রটি প্রতীকী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় নির্মিত

সেই যে সেই বছর এক বড় ঝড় হল। নাম রেখেছিল আয়লা। তছনছ হয়ে গেল সব। দিন দুপুরে চারিদিক অন্ধকার করে উঠল প্রবল ঝড়। বাড়ি ভাঙল, বাঁধ ভাঙল, জল ঢুকল, কত লোক ভেসে গেল। গোরু, বাছুর ভেসে গেল। পাড়ার কুকুরগুলো গেল মরে। প্রায় এক সপ্তাহ সেই সব পশুপাখির শবদেহ ভাসতে থাকল জলে। ফুলে ঢোল হয়ে ভাসতে থাকল। নোনা জল ঢুকে জমি গেল মরে।

বহুদিন শহুরে বাবুরা এসে খাবার, জল, কাপড় দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল মিনতিদের গ্রামের প্রায় দেড়শ খানা পরিবারকে। মিনতি পরে জেনেছিল যে, ওদের মত ঝড়ে সর্বস্ব খোয়ানো মানুষগুলিকে খাওয়ানোর জন্য যে জল, খাবার, কাপড় শহর থেকে এসেছিল– তার অনেকখানি নাকি জাহাঙ্গির গিলে ফেলেছিল।

হাভাতে জাহাঙ্গির। পাড়ার কয়েকটা বখাটে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের প্রান্তে বসে মদ গাঁজা খেত। তার পরে কেমন করে যেন কোন এক নেতা মানুষের হাত ধরে হেমগঞ্জের বাজার থেকে চাঁদা তোলা শুরু করল। মিনতির বরের একটা ছোট্ট দোকান ছিল হেমগঞ্জের বাজারে। মনোহারি দোকান। কলকাতা থেকে সিঁদুর, আলতা, কাঁচ-প্লাস্টিকের চুড়ি, ইমিটেশনের গয়না, পাউডার, সেণ্ট, সাবান, শ্যাম্পু এনে বিক্রী করত মিনতির বর চন্দন।

নিজের গর্ভে থাকা অদেখা প্রাণটিকে সেদিন সেই পূর্ণযৌবন পুরুষটির থেকে আলাদা করতে পারেনি মিনতি।

কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল মিনতির। মাত্র ১৯-এ পড়তে না পড়তেই। চন্দন তখন ২১। চন্দনের মা বেঁচেছিল তখন। ক্যান্সার হয়েছিল চন্দনের মায়ের। মরার আগে নাতির মুখ দেখতে চেয়েছিল। সেজন্য তড়িঘড়ি বিয়ে। কিন্তু ইচ্ছা পূরণ হয়নি তার। মিনতি যখন ৫ মাসের পোয়াতি তখন তার শ্বাশুড়ি চলে গেল না ফেরার দেশে। চন্দন খুব কেঁদেছিল সেদিন। গ্রামশুদ্ধ লোকের সামনে মিনতিকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত কেঁদেছিল। প্রায় দিন রাতে যে পুরুষটির বলিষ্ঠ বাহুর আলিঙ্গন আর ঘামের গন্ধ মিনতির নারীসুলভ উদগ্র কামনাকে জাগিয়ে তুলত, সেই পুরুষটিই সেই দিন মিনতির হৃদয়ে হঠাৎ বাঁধভাঙ্গা বাৎসল্যের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল। নিজের গর্ভে থাকা অদেখা প্রাণটিকে সেদিন সেই পূর্ণযৌবন পুরুষটির থেকে আলাদা করতে পারেনি মিনতি। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে পরম মমতায় চন্দনের কোঁকড়া চুলে বিলি কেটে সান্ত্বনা দিয়েছিল তাকে।

কয়েক মাস পরে মিনতির মেয়ে হল। ফুটফুটে মেয়ে। মিনতির মতই শ্যামলবরণ মেয়ে। চন্দনের গায়ের রং কিন্তু ফরসা। গ্রীষ্মের জ্যোৎস্না ধোওয়া পূর্ণিমার রাতে সেদিন মৃদুমন্দ হাওয়া আসছিল নদীর দিক থেকে। বেড়ার ঘরের জানালার মত ফোকর দিয়ে পাঁকমাটি আর বেলিফুলের মিশ্রিত গন্ধ নিয়ে জ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয়ে ঢুকছিল চাঁদের আলো। ছোট্ট তক্তপোশের উপর চন্দন আর মিনতির মাঝে শুয়েছিল রজনী– চন্দন আর মিনতির মেয়ে। মিনতি তখন মেয়েকে দুধ খাওয়াচ্ছে। চন্দন নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়েছিল মেয়ের দিকে। মিনতি বলেছিল, “অমন করে তাকিয়ে থাকো কেন? লাজ লাগে না আমার?” দুষ্টুমির হাসিতে ভরে উঠেছিল চন্দনের মুখ। সেই হাসিতে ম্লান হয়ে গিয়েছিল বড় গোল চাঁদের আলোটুকুও। চন্দন বলেছিল, “লাজ লাগে বুঝি?” মিনতির কালো মুখেও লজ্জার লালিমা ফুটে উঠেছিল স্পষ্ট। প্রসঙ্গ ঘোরাতেই বলেছিল, “মেয়েটা আমার মত রং পেল! তোমার মত ফরসা হলে কত ভাল হত!” চন্দন স্নিগ্ধ স্বরে বলেছিল, “কেন? তুমি কি ফরসা? তোমাকে কি আমি ফরসা দেখে ভালবেসেছি?” মিনতি আর কিছু বলেনি। ঘুমন্ত মেয়েকে পাশে সরিয়ে ঘন হয়ে এসেছিল চন্দনের দিকে। চন্দনের হাতখানা টেনে কঠিন বাহুর উপর মাথা রেখে তার বুকে মুখ গুঁজে দিয়েছিল।

মিনতির মেয়ে রজনী বড় হতে লাগল। দিনকাল বদলাল। একদিন ঝড় উঠল। বাড়ি ভাঙল, মিনতির পোষা ছাগলগুলো মরল। বহু দিন অন্যের দয়ায় জীবন বাঁচল মিনতিদের। সামান্য একফালি জমিতে যেটুকু চাষ হত সেটাও বন্ধ হল। নোনা জলে নষ্ট হল মাটি। চন্দনের দোকানের আয়ে ঘর চালানো মুশকিল হল। মিনতিকেও কাজে লাগতে হল। নদীর নোনা জলে বুক পর্যন্ত ডুবে কাঠি ধরা শিখল মিনতি। মিনতি জানে, কাঠি যখন বড় হয়ে বাগদা হয় তখন তার অনেক দাম। কিন্তু, কাঠির দাম তত নয়। তবু কিছু তো উপার্জন বাড়ত পরিবারের। চাষ তো বন্ধ। এতদিনের সংসারে এত ঝড় ঝাপটার মধ্যেও চন্দনের সঙ্গে মিনতির কোনদিন ঝগড়া হয়নি। গ্রামের দশটা জোয়ান মদ্দ ছেলের থেকে চন্দন একটু আলাদা। সে মদ খায় না। মাঝেমধ্যে বিড়ি খায়। তাও বাড়িতে নয়। দোকানে বা দোকান থেকে ফেরার পথে বিড়ি খেয়ে আসে সে। গন্ধে টের পায় মিনতি। চন্দনের সঙ্গে ঝগড়া করার মত কোন কারণ পায় না মিনতি। শুধু যখন মেয়েকে নিয়ে পুকুর ঘাটে হুটোপুটি করে জল ঘাঁটে চন্দন তখন তার রাগ হয় চন্দনের উপর। চন্দন কি ছোট্ট ছেলেটি নাকি? কিন্তু চন্দনের উপর রাগ করে যেই না মিনতি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় দুই কথা শুনিয়ে দেওয়ার জন্য, তখনই চন্দনের সেই দিনের মুখটা মনে পড়ে যেত– যেদিন মায়ের শোকে ছোট্ট শিশুর মত মিনতিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল চন্দন। মিনতির রাগ গলে জল হয়ে যেত। ভারি শান্তির জীবন তার।

কিন্তু, সেই শান্তির নীড় একদিন আবার নতুন করে ঝড় উঠল। বর্ষার রাত। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি পড়েছে অনেক। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বৃষ্টির তোড়। শেষ খেয়া এসে লেগেছে ঘাটে। কিন্তু চন্দন ফেরেনি। মিনতির ভারি ভয় হয়েছে। কোথায় চন্দন? অত রাতে অত বৃষ্টি মাথায় করে ছোট্ট রজনীকে ঘরে রেখে বেরোনোর সাহস পায়নি মিনতি। সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। ঠাকুরকে ডেকেছে বিছানায় শুয়ে। পরের দিন সকালে বৃষ্টি থেমেছে। মিনতি ছুটে গেছে ঘাটে। থমথমে মুখে মাঝি বলেছে, “তুমি একবার বাজার পানে চল বৌদি। কাল রাতে বৃষ্টিতে আর তোমাকে খবর দিতে পারিনি। চন্দনের শরীরটা ভাল নয়। হাসপাতালে ভর্তি।”

বুকের রক্ত জমাট বেঁধেছে মিনতির। কী হয়েছে চন্দনের? প্রশ্ন করলেও উত্তর দেয়নি মাঝি। উত্তর দেয়নি নৌকার নিত্যযাত্রীদের কেউই। মিনতিকে বিনা পয়সায় পার করে দিয়েছে কেবল। ওপারে নামিয়ে বলেছে, “ওখান থেকে গাড়ি ধরে হাসপাতালে যাও। সেখানেই হাসপাতালের ডাক্তারবাবু সব বলে দেবে তোমাকে।” দমাদম হাতুড়ির বাড়ি পড়েছে মিনতির হৃৎপিণ্ডে। ভয়ে পাণ্ডুর মুখ নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেখতে পেয়েছে চন্দনকে। সারা গায়ে কালশিটে। মাথায় সাদা পট্টির উপর রক্তের দাগ। শক্ত বাহুতে ধারাল অস্ত্রের কোপের চিহ্ন।

অবস্থা দেখে মূর্ছা যেতে যেতেও নিজেকে সামলে নিয়েছে মিনতি। হঠাৎ বাৎসল্যের জোয়ার উজ্জীবিত করে তুলেছে চিরন্তন মাতৃহৃদয়কে। জাহাঙ্গিরের চাঁদা তোলার অত্যাচারের প্রতিবাদের চিহ্ন সারা শরীরে মেখে শুয়ে থাকা পুরুষটিকে স্নেহে ভালবাসায় সেবায় সারিয়ে তোলার ভাবনা সঞ্জীবনীর কাজ করেছে। প্রায় দুই মাস মনোহারি দোকান খুলতে পারেনি চন্দন। পঞ্চায়েতের বাবুদের কাছে একশ দিনের কাজের আর্জি নিয়ে গিয়েছে মিনতি। পঞ্চায়েত অফিসের গৌতম হাজরা বলেছে, “জাহাঙ্গির ভাইয়ের কাছে যাও।” পঞ্চায়েত অফিস থেকে বেরিয়ে ঘৃণায় এক দলা থুথু ছুঁড়ে দিয়েছে রাস্তায়। বাড়ি ফিরে পরের দিন চন্দনকে ঠেলে পাঠিয়েছে দোকান খুলতে। দুই মাস পরে চন্দন হেমগঞ্জের বাজারে গিয়ে দেখেছে যে, তার দোকানটা আর তার নেই। শুনেছে, এই বাজার এখন ‘জাহাঙ্গির বাজার’ হয়ে গেছে। বাজারের মালিক জাহাঙ্গির। চন্দনের দোকানের মালিকানা বদল হয়ে গিয়ে হয়ে গেছে ‘আশরফ ইমিটেশন সেণ্টার’। উল্টোদিকের রঞ্জনের দোকানের দিকে তাকিয়ে চন্দন দেখল সেই দোকানেরও নাম বদলে হয়েছে, ‘আলমগীর টেলিকম’। রঞ্জনের খোঁজ করার চেষ্টা করেনি চন্দন। পরাজিত সৈনিকের মাথা নীচু করে কালু মিঞার চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে ফেরার সময় কালু মিঞা ডেকেছে তাকে। বসিয়ে এক কাপ চা হাতে ধরিয়ে জর্দায় কালো হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলেছে, “যাও একবার জাহাঙ্গির ভাইয়ের কাছে। দয়া করে যদি বাজারের ওই প্রান্তটায় বসতে দেয় তো দেখো।” চায়ের পয়সা দিতে গেছে চন্দন। দেঁতো হাসি হেসে বারণ করেছে কালু।

মাটিতে মিশে যেতে যেতে জাহাঙ্গিরের কাছে গেছে চন্দন। জাহাঙ্গিরের দেখা পায়নি। জাহাঙ্গিরের সঙ্গী নারায়ণ সর্দার বলেছে, “ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব বললেই কি দেখা হয়? দুই দিন পরে আয়। দেখি যদি কিছু করা যায়।” বাড়ি গিয়ে মিনতিকে কিছু বলতে পারেনি চন্দন। বলেছে, “দোকান তো এতদিন বন্ধ। নতুন করে খোলা কি সহজ কথা। সময় লাগবে।” পরের দিন সকাল বেলায় বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। সারাদিন ঘাটের ধারে বসে থেকে সন্ধ্যায় শেষ খেয়ায় বাড়ি ফিরেছে। মিনতিকে আসল কথাটা বলতে পারেনি সাহস করে। দুই দিন পরে জাহাঙ্গিরের আড্ডায় আবার গেছে চন্দন। নারায়ণ সর্দার বেজার মুখে বলেছে, “জাহাঙ্গির ভাই নেই। যা বলার তার ভাই লাদেন ভাইকে বল।” জাহাঙ্গিরের ছোট ভাই লাদেনের কাছে গিয়ে বাজারের এক প্রান্তে একটুখানি জায়গা চেয়েছে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে। লাদেন বলেছে, “জাহাঙ্গির ভাইকে বলে দেখি। দুই দিন পরে এসো।” দুই দিন পরে জাহাঙ্গিরের আড্ডায় যেতে নারায়ণ সর্দার বলেছে, “ভাগ্য ভাল তোমার। জাহাঙ্গির ভাই অনুমতি দিয়েছে। কোন পাকা ঘর করতে পারবি না। প্লাস্টিক টাঙিয়ে বসবি। মাসে মাসে ৩০০ টাকা করে দিবি।”

চন্দন বেরিয়ে এসেছে জাহাঙ্গিরের আড্ডা থেকে। খুশি হবে, না দুঃখ করবে বুঝতে পারেনি। প্লাস্টিক টাঙিয়ে কী ব্যবসা করবে, আর কী করে মাসে ৩০০ টাকা চাঁদা দেবে সেই চিন্তায় ডুবে নৌকায় ভেসে কোনক্রমে বাড়ি এসে পৌঁছেছে। আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি মিনতির কাছে। মিনতি তার শেষ আশ্রয়। টলটলে চোখে শুকনো মুখে সব জানিয়েছে মিনতিকে।

সেই যে নোনা জল ঢুকে মরে গেছিল যে জমি, সেই জমি এখন জাহাঙ্গিরের দখলে। নদীর নোনা জল ঢুকিয়ে মাছ চাষ হয় সেখানে। চন্দনের মত গ্রামের প্রায় সকলের জমি এখন বেদখল। বিশাল চাষের জমি এখন বাঁওড়ের মত জলে টইটম্বুর। মাঠের ধারে মাঝে মাঝে ছোট ছোট চালাঘর। সেখানে রাতের বেলায় টিমটিম করে আলো জ্বলে প্রায়ই। সন্ধ্যার পরে গ্রামের পথে ভিন্ গাঁয়ের যুবতী মেয়েদের দেখতে পায় চন্দন। হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর। সঙ্গে থাকে কখনও গৌতম হাজরা, কখনও নারায়ণ সর্দার, কখনও বা জাহাঙ্গিরের অন্য কোন শাকরেদ। নিশুতি রাতের তৃতীয় প্রহরে চাঁদের আলো যখন হলুদ হয়ে আসে তখন সেই পথ দিয়েই ফিরে যায় মেয়েগুলি। বিনিদ্র, নিস্তব্ধ রজনীতে সেই মেয়েদের হাতের শাঁখা-পলা-লোহার ঠোকাঠুকির রিনরিনে আওয়াজে দম বন্ধ হয়ে আসে চন্দনের। আড় চোখে তাকায় পাশে শোওয়া মিনতির দিকে। বুঝতে পারে মিনতিরও চোখে ঘুম নেই। মিনতি আবার ঘন হয়ে আসে চন্দনের। তার বাহুতে মাথা রেখে বুকে মুখ গুঁজে দেয়। চন্দন বোঝে সেই জ্যোৎস্নালোকিত রাতের মত প্রেমে নয়– একটা উৎকট, বীভৎস ভয়ে তাকে জড়িয়ে ধরছে মিনতি।

একদিন রাতে সেই বিভীষিকা মূর্তি ধরে। গভীর রাতে টোকা পড়ে চন্দন আর মিনতির দরজায়। দরজা খুলে চন্দন দেখে জাহাঙ্গিরের শাকরেদ হাসান দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। প্রচণ্ড মদের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে চন্দনের। তার জড়ানো গলা থেকে যে শব্দগুলি বেরোয় সেগুলি চন্দনের কানে গরম সীসার মত ঢোকে। নির্বাক স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়।

শেষ রাতে বিধ্বস্ত সত্তা নিয়ে ছেঁড়া শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে ঘরে ঢোকে মিনতি। লুটিয়ে পড়তে যায় মেঝেতে। চন্দন ধরে ফেলে তাকে। শেষ রাতের ফিকে অন্ধকারে পুকুরে নিয়ে যায়। ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত পুকুরের জলে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকে মিনতি। সারা শরীর গামছা দিয়ে ঘসে ঘসে মুছে ফেলতে চায় ভেড়ির ধারের ঘরের আঁশটে গন্ধ ভরা ক্লেদ। পাখির ডাকে ঘোর ভাঙ্গে। বুঝতে পারে, হাজার পুকুরের জলে জগতর সবথেকে দামি সাবান দিয়ে ধুলেও এই নারকীয় গন্ধ যাবে না। মড়ার মত নিস্তেজ চোখে উঠে আসে পুকুর থেকে। সেই গভীর দৃষ্টিতে গভীর দীঘির মত টলটলে জল নেই, রয়েছে মজা কুঁয়োর অতল অন্ধকার। ঘরে ফিরে চন্দন আর মিনতির চোখ যায় বিছানায়। নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে রজনী। মিনতির চোখে এবার নামে বাঁধভাঙ্গা জল। নিজের দেহ মনের কষ্টকে ছাপিয়ে তার মনে উঁকি দেয়, রজনীর জীবনে ঘনিয়ে আসা অমাবস্যার রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের ভয়াল বিভীষিকা।

চুপিসাড়ে দুই দিন পরে সন্ধ্যার শেষ খেয়া ধরে চন্দন আর মিনতি বেরিয়ে পড়ে দুটি পোঁটলায় সংসার বেঁধে। সঙ্গে মেয়ে রজনী। তাদের কোন ঠিকানা নেই। চতুর্দিকের গভীর অন্ধকারের মধ্যে কোনক্রমে হাতড়ে হাতড়ে চলে মেয়েটিকে নরকের দরজা থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে যেতে চায় মিনতি।

এক পক্ষ কেটেছে। অজানা, অচেনা শহরে পূতিগন্ধময় বস্তির এক কোণে চার দেওয়ালের মধ্যে সংসার পেতেছে তার নতুন করে। এই শহরের ভাষা জানে না মিনতি, জানে না এখানকার রীতিনীতি। এখানকার বাজারে ঝিঙে পটোল দেখতে পায় না সে। শুধু জানে, তারই বিশাল দেশের সুদূর দক্ষিণে সাগরের ধারে কোন এক শহর এটি।  চন্দন এখানে মজুরি করে সারাদিন। দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরে। তার চোখে নিরাশতার অন্ধকার দেখতে পায় মিনতি। তার হৃদয়ে বাৎসল্যের জোয়ার আসে। গভীর মমতায় নিজের বুকের মধ্যে চন্দনের মাথাটা জড়িয়ে ধরে সে। নীরব চোখের জলে মিনতির বুকের কাপড় ভিজে যায়।

একদিন চন্দন শোনে মিনতির গর্ভে নতুন সন্তান এসেছে। খুশি হবে, না দুঃখ করবে বুঝতে পারেনি চন্দন। তার স্তম্ভিত মুখের দিকে তাকিয়ে মিনতি বলেছে, “ডাক্তারের খোঁজ নাও। এই পাপ বীজ আমি রাখব না।” হাসপাতালে গিয়ে পাপের ফসল খসিয়ে এসেছে মিনতি। একটা নতুন সত্য আবিষ্কার করেছে সে। বাৎসল্যময়ী মাতৃহৃদয় যে গর্ভপাত করে আনন্দে বিভোর হয়ে উঠতে পারে– সেই সত্য তার জানা ছিল না। বহুদিন পরে রাতের আঁধারে এঁদো নর্দমার গন্ধ ভরা ঘরের মধ্যে চন্দনের দিকে ঘন হয়ে আসে মিনতি। তার কঠিন বাহুতে মাথা রেখে মুখ গুঁজে দেয় বুকে– ভয়ে নয়, অনাবিল প্রেমের নির্ভরতায়।

Rakesh Das R
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Rakesh Das

Associate Professor • Ramakrishna Mission Vivekananda Educational and Research Institute

ড. রাকেশ দাস সংস্কৃত ও দর্শনের বিশিষ্ট অধ্যাপক, গবেষক ও লেখক। তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সংস্কৃত ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র সংস্কৃত ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, বেদান্ত, সংস্কৃত সাহিত্য ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা। তিনি একাধিক গ্রন্থের সম্পাদক, অনুবাদক ও রচয়িতা এবং দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গবেষণামূলক বক্তৃতা ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন।

সংযোগ:

মন্তব্য ও পাঠক প্রতিক্রিয়া 0টি মন্তব্য

এই রচনার বিষয়ে আপনার সুচিন্তিত মতামত, পর্যালোচনা বা প্রশ্ন জানান।

আনুপূর্বী বাংলা — অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল

সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রামাণ্য ভিডিও ও সাক্ষাৎকার দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন।

সাবস্ক্রাইব
স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি CC BY-NC-ND 4.0 লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব; তা Poorvam-এর নীতি বা অবস্থান প্রতিফলিত করে না।
সম্পর্কিত
বিভাগের আরও রচনা
লেখক সংগ্রহ

Rakesh Das-এর আরও লেখা

লেখকের সমস্ত রচনা