ভূমিকা
শাশ্বত জ্ঞানরাশি বেদ নামে পরিচিত। বেদ নিত্য। অর্থাৎ, এই শাশ্বত জ্ঞানরাশির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই। বেদ পরমেশ্বরের নিঃশ্বাস স্বরূপ। নিঃশ্বাস যেমন কোন বিশেষ প্রচেষ্টা ছাড়া নিজে থেকেই প্রবাহিত হয়, তেমনই সত্য ও জ্ঞান স্বরূপ পরমেশ্বর থেকে জ্ঞান রূপী বেদ নিজে থেকেই প্রকাশিত হয়। এই কারণে বেদকে অপৌরুষেয় বলা হয়। কারণ, বেদ কোন পুরুষ (ব্যক্তি) কর্তৃক রচিত বা সৃষ্ট নয়– স্বয়ং প্রকাশিত। সময়ে সময়ে সেই জ্ঞানরাশি ঋষিদের তপস্যার প্রভাবে তাঁদের সম্মুখে প্রস্ফুরিত হয়। তাঁরা সেই জ্ঞানকে শব্দের বাঁধনে বেঁধে জগতের কল্যাণের জন্য প্রকাশ করেন।
বেদের প্রমুখ দুইটি অংশ– মন্ত্র বা সংহিতা এবং ব্রাহ্মণ। বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য অনুসারে বেদের আরও দুইটি ভাগ করা হয়– আরণ্যক এবং উপনিষদ্। বেদের যে অংশে সৃষ্টির মূল সূত্র বা ব্রহ্মতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত চর্চা রয়েছে সেই অংশকে বলা হয় উপনিষদ্। যে অংশে ব্রহ্মতত্ত্ব বা সত্য সাক্ষাৎকারের উপযোগী উপাসনা প্রভৃতির বিস্তারিত চর্চা রয়েছে সেই অংশকে আরণ্যক বলা হয়। মূলতঃ, বনে বা অরণ্যে বসবাসকারী বানপ্রস্থীরা এই উপাসনা অংশের অধ্যয়ন এবং চর্চা করতেন বলে এর নাম দেওয়া হয়েছে আরণ্যক। উপনিষদ এবং আরণ্যক মূলতঃ ব্রাহ্মণেরই অংশ। কয়েকটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে সংহিতা ভাগেও উপনিষদ্ বা ব্রহ্মতত্ত্বের চর্চা থাকলেও মূলতঃ ব্রাহ্মণ অংশেই উপনিষদ্ রয়েছে।
এই সংহিতা এবং ব্রাহ্মণ অংশ মিলিয়েই বেদ। সংহিতা অংশে প্রধানতঃ বিভিন্ন দেবতার স্তুতি এবং যজ্ঞে প্রযুক্ত বিভিন্ন মন্ত্র রয়েছে। কোন মন্ত্র কোন যজ্ঞে বা কোন কর্মে বিনিয়োগ করতে হবে, কোন কামনা পূর্তির জন্য কোন যজ্ঞ করতে হবে, কোন যজ্ঞে কোন দ্রব্য কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে– এই সমস্ত বিষয় ব্রাহ্মণ অংশে চর্চিত হয়েছে। এগুলি ছাড়াও ব্রাহ্মণে নানা কাহিনী ও উপাখ্যান, বিভিন্ন যজ্ঞ বা ক্রিয়ার প্রশংসা, অকর্তব্য ক্রিয়ার নিন্দা প্রভৃতিও পাওয়া যায়।
বেদের অর্থ অনুধাবনের জন্য ছয়টি বেদাঙ্গের সহায়তা প্রয়োজন হয়–
১. শিক্ষা– উচ্চারণের খুঁটিনাটি সংক্রান্ত আলোচনা।
২. ব্যাকরণ– শব্দের নিষ্পত্তি সংক্রান্ত আলোচনা।
৩. নিরুক্ত– শব্দের অর্থ সংক্রান্ত আলোচনা।
৪. জ্যোতিষ– কাল নির্ণয় সংক্রান্ত শাস্ত্র।
৫. ছন্দ– বেদের রচনাশৈলী বা ছন্দের চর্চা।
৬. কল্প– কল্প চারটি অংশে বিভাজিত। ধর্মসূত্রে আচরণীয় কর্তব্য বা ধর্ম, শ্রৌতসূত্রে যজ্ঞ প্রক্রিয়ার বর্ণনা, গৃহ্যসূত্রে ব্রহ্মচর্য প্রভৃতি চার আশ্রমে পালনীয় ধর্ম এবং কর্তব্য, শুল্বসূত্রে যজ্ঞবেদী নির্মাণের পদ্ধতি সংক্রান্ত আলোচনা।
এই ছয়টি বেদাঙ্গের সাহায্যেই বেদের অর্থ বোঝা সম্ভব। বেদের প্রতিটি মন্ত্রের একাধিক ব্যাখ্যা সম্ভব। নানা ব্যক্তি নিজ নিজে মানসিক ও বৌদ্ধিক স্তরের নিরীখে বেদের একই মন্ত্রের নানা অর্থ উপলব্ধি করেন। বেদের ভাষ্যকাররা এই বেদাঙ্গগুলির সাহায্যে বেদের ভাষ্য রচনা করেছেন। নিজ নিজ উপলব্ধি অনুসারে মন্ত্রগুলির অর্থ তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন।
ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বেদবাহ্য এমন কথা শ্রীমৎ স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ব্যতীত কোন আচার্যই কখনও বলেননি। ঠিক কোন যুক্তিতে ব্রাহ্মণ গ্রন্থকে বেদবাহ্য বলেছিলেন সেটি স্পষ্ট নয়। কিন্তু, বর্তমানে দয়ানন্দজীর যে সমস্ত তথাকথিত ভক্তবৃন্দ ব্রাহ্মণকে বেদবাহ্য বলে চালানোর চেষ্টা করছেন তাদের কাছে দৃঢ়তর যুক্তি বা প্রমাণ কিছুই নেই। যজুর্বেদের একটি মন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে, মন্ত্র ব্রহ্মের উপদেশ। সেটি ব্রাহ্মণকে বেদ বলে স্বীকার না করা ব্যক্তির নিকট প্রমাণ হলেও সাধারণের নিকট প্রমাণ নয়। কারণ বেদের যে কোন বচনকেই মন্ত্র বলাই সম্প্রদায় প্রসিদ্ধ প্রথা।
আবার ‘মন্ত্র’ শব্দটি বহু ক্ষেত্রে সংহিতা-য় উপচরিত। উপচার– লক্ষণা বৃত্তির দ্বারা শব্দের অর্থান্তরে প্রয়োগ। এই অর্থান্তর সঙ্কোচ, বিস্তার প্রভৃতির দ্বারা হতে পারে। এখানে মন্ত্র শব্দ উপচারে সঙ্কুচিত হয়ে আপেক্ষিকভাবে প্রধান সংহিতাকে বোঝাচ্ছে। ‘মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্’ ইত্যাদি বচনে ‘মন্ত্র’ শব্দ সংহিতায় উপচরিত।
ব্রাহ্মণ প্রসঙ্গে প্রাচীন মনীষীদের মত
বেদবিদ্বান্ প্রাচীন আচার্যরা সকলেই ব্রাহ্মণকে বেদ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। কেউই ব্রাহ্মণকে পৌরুষেয় কিংবা আধুনিকদের লিখিত গ্রন্থ বলেননি। মহর্ষি পতঞ্জলি, কাশিকাকার প্রমুখ প্রামাণিক মনীষিবর্গ ব্রাহ্মণকে বেদ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। অর্থাৎ ব্যাকরণ বেদাঙ্গে ব্রাহ্মণের বেদত্ব স্বীকৃত। কল্প নামক বেদাঙ্গেও একাধিক স্থানে ব্রাহ্মণকে বেদ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ছে। কল্পেরই প্রখ্যাত বচন– মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্।
কিছু অর্বাচীন মনে করে যে, এই বচনটি কোন প্রধান কল্পসূত্রে পাওয়াই যায় না। এটি কাত্যায়ন প্রতিজ্ঞা পরিশিষ্ট নামক অত্যন্ত অপ্রধান একটি গ্রন্থের বচন।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায় যে, তৈত্তিরীয় শাখার প্রামাণিক কল্পসূত্রগুলির মধ্যে অন্যতম আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রের ২৪তম প্রশ্নের প্রথম পটলে যজ্ঞের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানকার আলোচনার সার এরকম– বিভিন্ন যজ্ঞ, সেখানে বেদমন্ত্রের প্রয়োগের পদ্ধতি, তিন বেদের তিন ঋত্বিক ইত্যাদি বিবরণ দেওয়ার পরে বলা হয়েছে–
মন্ত্রব্রাহ্মণে যজ্ঞস্য প্রমাণম্– মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ যজ্ঞের বিষয়ে প্রমাণ। (৩০)
মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্– মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের নাম বেদ। (৩১)
কর্মচোদনা ব্রাহ্মণানি– ব্রাহ্মণ হল কর্মের প্রেরক। (৩২)
ব্রাহ্মণশেষোঽর্থবাদো নিন্দা প্রশংসা পরকৃতিঃ পুরাকল্পশ্চ– কর্মপ্রেরণার অতিরিক্ত ব্রাহ্মণের বিষয় হল অর্থবাদ, নিন্দা, প্রশংসা, পরকৃতি এবং পুরাকল্প। (৩৩)
অতোঽন্যে মন্ত্রাঃ– ব্রাহ্মণ ব্যতিরিক্ত বেদ ভাগ হল মন্ত্র। (৩৪)
বোধায়ন– যিনি সমকোণী ত্রিভুজের বাহুর মান নির্ণয়ের সূত্র প্রদান করেছিলেন– তিনি নিজের গৃহ্যসূত্রে একই কথা লিখেছেন। বোধায়নীয় গৃহ্যসূত্রের দ্বিতীয় প্রশ্নে জাতকর্ম, উপনিষ্ক্রমণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকর্ম, উপনয়নের বর্ণনার পরে ষষ্ঠ অধ্যায়ে সমাবর্তন বর্ণনা প্রসঙ্গে দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হয়েছে–
মন্ত্রব্রাহ্মণং বেদ ইত্যাচক্ষতে– মন্ত্র ও ব্রাহ্মণকে বেদ বলা হয়। (২)
মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্– মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের নাম বেদ। (৩)
মন্ত্রব্রাহ্মণে যজ্ঞস্য প্রমাণম্– মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ যজ্ঞের বিষয়ে প্রমাণ। (৪)
তৈত্তিরীয় শাখার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিরণ্যকেশি শ্রৌতসূত্র নামে পরিচিত সত্যাষাঢ় বিরচিত শ্রৌতসূত্রেও প্রথম প্রশ্নের প্রথম অধ্যায়ে একই কথা বলা হয়েছে।
ভাষ্যকার সায়ণাচার্যও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনমন্ত্রব্রাহ্মণাত্মকো বেদঃ (তৈত্তিরীয় সংহিতা ভাষ্যের উপোদ্ঘাত)।
ন্যায়সূত্রের ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন “পাত্রচয়ান্তানুপপত্তেশ্চ ফলাভাবঃ” (ন্যায়সূত্র ৪/১/৬১) এই সূত্রের ভাষ্যে বলেছেন
“য এব মন্ত্রব্রাহ্মণস্য দ্রষ্টারঃ প্রবক্তারশ্চ তে খল্বিতিহাসপুরাণস্য ধর্মশাস্ত্রস্য চেতি। বিষয়ব্যবস্থাপনাচ্চ যথাবিষয়ং প্রামাণ্যম্। অন্যো মন্ত্রব্রাহ্মণস্য বিষয়োঽন্যচ্চেতিহাসপুরাণধর্মশাস্ত্রাণাম্ ইতি। যজ্ঞো মন্ত্রব্রাহ্মণস্য। লোকবৃত্তম্ ইতিহাসপুরাণস্য। লোকব্যবহারব্যবস্থাপনং ধর্মশাস্ত্রস্য বিষয়ঃ। তত্রৈকেন ন সর্বং ব্যবস্থাপ্যত ইতি যথাবিষয়ম্ এতানি প্রমাণানীন্দ্রিয়াদিবদ্ ইতি।”
অনুবাদ– যাঁরা মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের দ্রষ্টা এবং প্রবক্তা তাঁরাই ইতিহাস, পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্রের প্রবক্তা। বিষয়ের ব্যবস্থার কারণে নিজ নিজ বিষয়ে সেই সেই গ্রন্থের প্রামাণিকতা। মন্ত্রব্রাহ্মণের বিষয় ভিন্ন। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মশাস্ত্রের বিষয় ভিন্ন। মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের বিষয় যজ্ঞ। লোকবৃত্ত (লৌকিক ইতিহাস) ইতিহাস ও পুরাণের বিষয়। লোকব্যবহারের ব্যবস্থাপন ধর্মশাস্ত্রের বিষয়। সমস্ত কিছুই একটি গ্রন্থ দিয়ে ব্যবস্থাপিত হয় না। নিজ নিজ বিষয়ে তারা প্রামাণিক। যেমন ইন্দ্রিয়সমূহ নিজ নিজ বিষয়ে প্রামাণিক।
প্রসঙ্গতঃ, বাৎস্যায়নের ভাষ্যকে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী মহাশয়ও প্রামাণিক গ্রন্থ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। বাৎস্যায়নের উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঋষিরা মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের দ্রষ্টা এবং তাঁরাই লোকে এর প্রচার করেছেন। ব্রাহ্মণকে পৌরুষেয় কৃতি বলে বাৎস্যায়নও স্বীকৃতি দেননি।
স্মৃতিকার মহামতি মনুও ব্রাহ্মণকে শ্রুতি বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
উদিতেঽনুদিতে চৈব
সময়াধ্যুষিতে তথা।
সর্বথা বর্ততে যজ্ঞ
ইতীয়ং বৈদিকী শ্রুতিঃ॥ (মনুস্মৃতি ২/১৫)
সূর্য উদিত হলে, অনুদিত থাকলে কিংবা সূর্য ও নক্ষত্রের অনুপস্থিতির সময়ে যজ্ঞের নির্দেশ শ্রুতি দিয়েছেন। সেজন্য যজ্ঞ এগুলির অন্যতম যে কোন সময়ে কর্তব্য। এটাই বৈদিক শ্রুতি।
এই শ্লোকটির তাৎপর্য হল, অগ্নিহোত্রের কাল বিষয়ে কোথাও বলা হয়েছে “উদিতে জুহোতি” (ঐতরেয়ব্রাহ্মণ ৫/২৯); কোথাও আবার বলা হয়েছে, “অনুদিতে জুহোতি” (কৌষীতকীব্রাহ্মণ ২/৯) এই ব্রাহ্মণশ্রুতিকেই মনু বৈদিক শ্রুতি বলে নির্দেশ করেছেন। সুতরাং, মহামতি মনুও ব্রাহ্মণকে শ্রুতিই বলেছেন।
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে একই শ্রেণীভুক্ত গ্রন্থ বলে স্বীকার করতে হয়। কারণ, সংহিতা এবং ব্রাহ্মণের ভাষা একই ধরণের। লৌকিক সংস্কৃতের সঙ্গে একই ধরণের পার্থক্য সংহিতা ও ব্রাহ্মণ– উভয় গ্রন্থের ভাষাতেই পাওয়া যায়। এই ধরণের প্রয়োগ– যেগুলি লৌকিক সংস্কৃততে দেখা যায় না– সেগুলি পাণিনি বিরচিত ব্যাকরণের বৈদিক প্রয়োগের সূত্র দিয়ে সিদ্ধ করা যায়। সুতরাং, সংহিতা ও ব্রাহ্মণের ভাষায় পাণিনীয় ব্যাকরণের বৈদিক প্রয়োগের সূত্রগুলি সমান ভাবেই প্রযুক্ত হয়। এই ভাষাতাত্ত্বিক সাম্যের দ্বারাও সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে বেদ বলা চলে।
সংহিতা ভাগে ব্রাহ্মণত্ব নিষেধ– পরিহার
এই প্রসঙ্গে কিছু অর্বাচীন শুক্লযজুর্বেদের একটি মন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, মন্ত্রভাগ পরমেশ্বর কর্তৃক উপদিষ্ট। কিন্তু ব্রাহ্মণ সম্পর্কে এমন কোন বচন যেহেতু বেদে অর্থাৎ সংহিতা ভাগে পাওয়া যায় না সেজন্য ব্রাহ্মণ বেদবাহ্য। আলোচ্য মন্ত্রটির স্বরূপ–
প্র নূনং ব্রহ্মণস্পতির্মন্ত্রং বদত্যুক্থ্যম্।
যস্মিন্নিন্দ্রো বরুণো মিত্রো অর্যমা দেবা ওকাংসি চক্রিরে॥ (শুক্লযজুর্বেদ ৩৪/৫৭)
সায়ণাচার্য এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় বলেছেন– ব্রহ্মণস্পতি দেবতা উক্থ্য অর্থাৎ শস্ত্রের যোগ্য মন্ত্রকে হোতার মুখে উপস্থিত হয়ে উচ্চারণ করে থাকেন। এই মন্ত্রে ইন্দ্রাদি দেবতারা বাস করেন।
মন্ত্রটিকে উবট ব্যাখ্যা করছেন এই ভাবে– যে মন্ত্রে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অর্যমা প্রভৃতি দেবতারা নিবাস করেছেন সেই উক্থ্য মন্ত্রকে ব্রহ্মণস্পতি উপদেশ করেছেন।
মহীধর ব্যাখ্যা করেছেন– যে মন্ত্রে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অর্যমা প্রভৃতি দেবতারা নিবাস করেছেন সেই উক্থ্য মন্ত্রকে ব্রহ্মণস্পতি উপদেশ করেছেন। সর্বদেবতার আধারভূত উক্থ্য মন্ত্রের মতই পাঠ করতে হবে।
দয়ানন্দ সরস্বতী মন্ত্রটির ব্যাখ্যায় বলেছেন– যে পরমাত্মাতে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অর্যমা প্রভৃতিরা নিবাস করেন সেই পরমাত্মা উক্থ্য অর্থাৎ মন্ত্রকে উপদেশ করেছেন।
এই মন্ত্রে সায়ণ, উবট ও মহীধরের ভাষ্য প্রায় একই রকম। সকলেই বলেছেন যে, যে মন্ত্রে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অর্যমা প্রভৃতি দেবতারা নিবাস করেছেন সেই উক্থ্য মন্ত্রকে ব্রহ্মণস্পতি উপদেশ করেছেন। এখানে সায়ণাদির ব্যাখ্যার সঙ্গে দয়ানন্দজীর ব্যাখ্যার মৌলিক পার্থক্য একটিই। সেই পার্থক্য হল উক্থ্য শব্দের ব্যাখ্যায়। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় বলেছেন, যে পরমাত্মাতে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অর্যমা প্রভৃতিরা নিবাস করেন সেই পরমাত্মা প্রশংসনীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মন্ত্রকে উপদেশ করেছেন।
দয়ানন্দজীর এই ব্যাখ্যা দিয়ে কিছু অর্বাচীন বিধি ও পারিশেষ্যন্যায়ে দুটি জিনিস প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে,
১. বেদের মন্ত্রভাগ পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট
২. ব্রাহ্মণ পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট নয় (সুতরাং, ব্রাহ্মণ বেদ নয়)
প্রসঙ্গতঃ, এই দুটি কথার প্রসঙ্গে আমরা একটি কথার পুনরাবৃত্তি করি। যদি ব্রাহ্মণকে বেদবাহ্য বলে সিদ্ধান্ত করে নেওয়া হয় তবেই কিন্তু এই অর্থ প্রতিপন্ন হয়। অন্যথা সংহিতা-ব্রাহ্মণ-নির্বিশেষে সমস্ত মন্ত্রই পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট এমন বলতে হয়।
সেই সঙ্গে আরও একটি কথা বলতে হয়, “মন্ত্রভাগ পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট” অর্থাৎ মন্ত্রভাগ ব্যতীত অন্য কোন ভাগ রয়েছে। সেটি বা সেগুলি কী? স্বাভাবিক ভাবেই ব্রাহ্মণাদি বেদভাগের কথা বলতে হয়। এর দ্বারাও এটাই সিদ্ধ হয় যে, ব্রাহ্মণাদিও বেদেরই ভাগ।
যাই হোক। আমরা এই হালকা ধরণের আপাতরমণীয় বালখিল্য তর্কে সময় নষ্ট করব না। আমরা সরাসরি আরেকবার মন্ত্রের অর্থটি বোঝার চেষ্টা করব।
মন্ত্রটির উবট, মহীধর, দয়ানন্দজীর ব্যাখ্যানুসারে অর্থ আমরা দিয়েছি। এই মন্ত্রে একটি শব্দ আছে– উক্থ্য। উবট এবং মহীধর এই উক্থ্য শব্দটির অর্থ করেছেন– ‘শস্ত্র’। কেউ যেন মনে করবেন না যে, শস্ত্র মানে Weapon। শস্ত্র শব্দ প্রশংসার্থক শস্-ধাতু নিষ্পন্ন। বেদে দুই ধরণের স্তুতি প্রসিদ্ধ– প্রগীতমন্ত্রসাধ্য এবং অপ্রগীতমন্ত্রসাধ্য। প্রগীতমন্ত্রসাধ্য স্তুতিকে শস্ত্র বলা হয়, অপ্রগীতমন্ত্রসাধ্য স্তুতিকে স্তোত্র বলা হয়। সামবেদে আম্নাত কিছু শস্ত্র মন্ত্রকে উক্থ্য মন্ত্র বলা হয়। অর্থাৎ সহজ কথায় উক্থ্য শব্দটি কিছু মন্ত্রবিশেষের সংজ্ঞা। উবট এবং মহীধর এখানে উক্থ্য শব্দের অর্থ করেছেন শস্ত্র মন্ত্র। এটি একেবারেই সমুচিত এবং শাস্ত্রানুমোদিত অর্থ। সুতরাং এই মন্ত্রের উবট ও মহীধর ভাষ্য অনুসারে ‘মন্ত্রভাগ পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট’ এমন অর্থ সিদ্ধ হয় না।
সুতরাং, অগত্যা দয়ানন্দজীর ভাষ্য অনুযায়ী এর অর্থ করা হল ‘মন্ত্রভাগ পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট’। কিন্তু এখানে দয়ানন্দজীর ভাষ্যে উক্থ্য শব্দটির অর্থ স্পষ্ট করা হয়নি। দয়ানন্দজী বলেছেন, উক্থ্য মানে ‘প্রশংসনীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’। যদিও এই অর্থ আদৌ বেদাঙ্গসম্মত কিনা তা পরীক্ষণীয়।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। এই একই মন্ত্রকে দয়ানন্দজী দুই ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যজুর্বেদের ৩৪/৫৭মন্ত্রে যে ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেটা উপরে দেখানো হয়েছে। এই সমানানুপূর্বী বিশিষ্ট মন্ত্র ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ৪০তম সূক্তে পঞ্চম মন্ত্র। সেখানে দয়ানন্দজী ব্যাখ্যা করেছেন, “বৃহৎ জগৎ বা বেদের ন্যায়াধীশ স্বামী বেদমন্ত্রসমূহকে উপদেশ করেন। যে মন্ত্রসমূহ বলার বা শোনার যোগ্য ঋগ্বেদাদিতে বর্তমান। যে জগদীশ্বরে ইন্দ্র (বিদ্যুৎ), বরুণ (চন্দ্রতারাদিসমূহ), মিত্র (প্রাণ), অর্যমা (বায়ু), দেবতা (পৃথিবী প্রভৃতি লোকসমূহ অথবা বিদ্বান্ গণ নিবাস করেছেন।”
অর্থাৎ, দয়ানন্দজী দুই জায়গাতে একই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় ব্রহ্মণস্পতি, উক্থ্য, অর্যমা, দেবাঃ এই চারটি শব্দের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন দেখিয়েছেন।
পাণিনীয় ব্যাকরণ অনুসারে উক্থ্য শব্দটির অর্থ হল উক্থ। উক্থ শব্দের উত্তর স্বার্থে যৎ-প্রত্যয় করে উক্থ্য শব্দ নিষ্পন্ন হয়। এই প্রসঙ্গে অষ্টাধ্যায়ীর ‘লোহিতান্মণৌ’ (৫/৪/৩০) সূত্রের পতঞ্জলিকৃত মহাভাষ্য এবং অষ্টাধ্যায়ীরই ‘পাদার্ঘাভ্যাং চ’ (৫/৪/২৫) সূত্রের কাশিকা দ্রষ্টব্য। এখন উক্থ শব্দের অর্থ বিচারণীয়। উক্থ শব্দটি বচ পরিভাষণে ধাতুর উত্তর থক্-প্রত্যয়ের যোগে নিষ্পন্ন হয়। এই প্রসঙ্গে ‘পাতৄতুদিবচিরিচিসিচিভ্যস্থক্’ (উণাদি ২/০০৭) সূত্র অনুসন্ধেয়। উণাদিকোশে উক্থ শব্দের অর্থ করা হয়েছে সামভেদ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সামমন্ত্র। দয়ানন্দজীও গ্রন্থান্তরে (উণাদিকোষঃ, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী) উক্থ শব্দের দুই প্রকার অর্থ করেছেন। একটি অর্থ সামবেদ, আরেকটি অর্থ– যা কিছুই বলা হয় তা-ই উক্থ। (উচ্যতে পরিতো ভাষ্যতে যৎ তৎ উক্থং, সামবেদো বা)। কিন্তু প্রকৃত মন্ত্রের ব্যাখ্যাকালে তিনি উক্থ্য শব্দের অর্থ করলেন ‘প্রশংসনীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’। এখানে স্পষ্টতঃই দয়ানন্দজী কোন বিশেষ অভিসন্ধিতে উক্থ্য শব্দের ব্যাকরণ (বেদাঙ্গ) প্রসিদ্ধ অর্থ পরিত্যাগ পূর্বক ব্যাখ্যা করেছেন।
উক্থ্য শব্দটির নির্বচন প্রসঙ্গে অষ্টাধ্যায়ীর ‘পাদার্ঘাভ্যাং চ’ (৫/৪/২৫) সূত্রের কাশিকাতে বলা হয়েছে– “তাদর্থ্য ইত্যেব। পাদার্ঘশব্দাভ্যাং চতুর্থীসমর্থাভ্যাং তাদর্থ্যেঽভিধেয়ে যৎ-প্রত্যয়ো ভবতি। পাদার্থমুদকম্ পাদ্যম্। অর্ঘ্যম্। অনুক্তসমুচ্চয়ার্থশ্চকারঃ। যথাদর্শনমন্যত্রাপি প্রত্যয়ো ভবতি। এষ বৈ ছন্দস্যঃ প্রজাপতিঃ। বসু, অপস্, ওক, কবি, ক্ষেম, উদক, বর্চস্, নিষ্কেবল, উক্থ, জন, পূর্ব, নব, সূর, মর্ত, যবিষ্ঠ ইত্যেতেভ্যঃ ছন্দসি স্বার্থে যৎ-প্রত্যয়ো ভবতি। অপস্যো বসানাঃ। ….উক্থ্যং শংসতি….”
এর বঙ্গানুবাদ এরকম–
তাদর্থ্য ইত্যেব– তাদর্থ্যেই (আগের সূত্র থেকে (৫/৪/২৪) তাদর্থ্যে এই অর্থপরক শব্দটির অনুবৃত্তি হবে। এই সূত্রে বিহিত যৎ প্রত্যয়ের অর্থ হবে তাদর্থ্য।)
পাদার্ঘশব্দাভ্যাং চতুর্থীসমর্থাভ্যাং তাদর্থ্যেঽভিধেয়ে যৎ-প্রত্যয়ো ভবতি– চতুর্থ্যন্ত সমর্থ পাদ এবং অর্ঘ শব্দের উত্তর তাদর্থ্য অর্থ বোঝাতে যৎ-প্রত্যয় হবে।
পাদার্থমুদকম্ পাদ্যম্। অর্ঘ্যম্।– পাদার্থ উদক হল পাদ্য। এরকম অর্ঘ্য।
অনুক্তসমুচ্চয়ার্থশ্চকারঃ– অনুক্তের সমুচ্চয়ের উদ্দেশ্যে চ-কারের প্রয়োগ হয়েছে। (অর্থাৎ, সূত্রে যে ‘চ’ অব্যয়টির প্রয়োগ হয়েছে তার তো কোন অর্থ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে তার প্রয়োজন কী? অনুক্ত সমুচ্চয়। অর্থাৎ, যা বলা হয়নি সেটাকেও বোঝানোর জন্য ‘চ’ শব্দের প্রয়োগ)
যথাদর্শনমন্যত্রাপি প্রত্যয়ো ভবতি– দর্শনানুসারে অন্যত্রও প্রত্যয় হয়। (দর্শন অনুসারে অর্থাৎ প্রয়োগদর্শন অনুসারে অর্থাৎ যেমন প্রয়োগ দেখা যায় সেই অনুসারে অন্যত্রও প্রত্যয় হয়। অন্যত্র মানে তাদর্থ্যব্যতিরিক্ত অর্থে যৎ প্রত্যয় হবে এবং পাদ, অর্ঘ এই প্রকৃতি ব্যতিরিক্ত প্রকৃতির উত্তরও যৎ-প্রত্যয় হবে।)
এষ বৈ ছন্দস্যঃ প্রজাপতিঃ– (বৈদিক মন্ত্রের উদাহরণ। ছন্দস্যঃ শব্দটি ছন্দস্ শব্দের উত্তর যৎ-প্রত্যয় করে নিষ্পন্ন হয়েছে সেটা এই উদাহরণের তাৎপর্য। এর আগে যে অন্যত্র যৎ-প্রত্যয়ের কথা বলা হল তার উদাহরণ এটি।)
বসু, অপস্, ওক, কবি, ক্ষেম, উদক, বর্চস্, নিষ্কেবল, উক্থ, জন, পূর্ব, নব, সূর, মর্ত, যবিষ্ঠ ইত্যেতেভ্যঃ ছন্দসি স্বার্থে যৎ-প্রত্যয়ো ভবতি– বসু, অপস্ প্রভৃতি প্রকৃতির উত্তর স্বার্থে যৎ প্রত্যয় হবে। (অর্থাৎ বসু অপস্ প্রভৃতি শব্দের উত্তর যৎ হবে এবং সেই যৎ-প্রত্যয়ের অর্থ হবে স্বার্থ। অর্থাৎ প্রকৃতির যে অর্থ সেই অর্থই থাকবে। মানে প্রত্যয় যোগ করে কেবল শব্দ পরিবর্তন হবে, অর্থ বদলাবে না)
অগ্নিরীশে বসব্যস্য। অপস্যো বসানাঃ। ….উক্থ্যং শংসতি….– (আগে যে স্বার্থে যৎ বলা হল তার উদাহরণ। বসব্য শব্দে বসু শব্দের উত্তর যৎ, অপস্য শব্দে অপস্ শব্দের উত্তর যৎ। এরকম করে উক্থ্য শব্দে উক্থ শব্দের উত্তর যৎ। সেই যৎ প্রত্যয়ের কোন বিশেষ অর্থ নেই। উক্থ এবং উক্থ্য সমানার্থক।
সুতরাং, এই মন্ত্রটির সায়ণাদির ভাষ্যও বেদাঙ্গসম্মত। সেই ব্যাখ্যায় কোন ভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে না। দয়ানন্দজীর ভাষ্যেও কোথাও ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষিদ্ধ হয়নি। সেজন্য এই মন্ত্রটির আধারে এই সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল যে, ‘মন্ত্র পরমাত্মা কর্তৃক উপদিষ্ট, ব্রাহ্মণ নয়। সেজন্য ব্রাহ্মণ বেদ নয়’। এখানে কোথাওই সরাসরি ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষেধ হয় না। এমনকি দয়ানন্দজীও এখানে মন্ত্রের উপদেশ করেছেন এমনটিই বলেছেন। একে ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষেধক বলেননি। পূর্বাচার্যদের কথা মত ব্রাহ্মণকে যদি বেদের অংশ ধরে নেওয়া হয় এবং ব্রাহ্মণবচনও মন্ত্রই হয় তবে এই মন্ত্রের সঙ্গে ব্রাহ্মণের বেদাংশতার কোন বিরোধ হয় না। এই ‘প্রশংসনীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মন্ত্র’ কেবল সংহিতাকেই বোঝাবে ব্রাহ্মণকে বোঝাবে না এটা না শ্রুতিতে কোথাও বলা হয়েছে, না দয়ানন্দজীর ভাষ্যে বলা হয়েছে। যিনি এই মন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করতে চান যে, এখানে মন্ত্র উপদেশ করার কথা বলা হয়েছে, সুতরাং ব্রাহ্মণের উপদেশ করেছেন এটা বোঝাচ্ছে না– তিনি আগে থেকেই হঠ করে বসে আছেন যে, ব্রাহ্মণ বেদ নয়। যদি কোন ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে বেদ বলেই মানেন এবং ব্রাহ্মণবচনকেও মন্ত্র বলেই মানেন তবে প্রকৃত এই মন্ত্রটি ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষেধক কোন ভাবেই হয় না।
ব্রাহ্মণ ভাগে ব্রাহ্মণত্ব নিষেধ– পরিহার
এবার আসতে হবে বেদের অপেক্ষাকৃত অপ্রধান ব্রাহ্মণ অংশে। পূর্বোল্লিখিত অর্বাচীন ব্রাহ্মণের বেদবাহ্যতা প্রমাণকারীরা গোপথ ব্রাহ্মণের একটি মন্ত্র উদ্ধৃত করে দেখান যে গোপথ ব্রাহ্মণের মতে ব্রাহ্মণ বেদের অংশ নয়। অভিপ্রেত মন্ত্রটি নিম্নরূপ–
“বিচারী হ বৈ কবন্ধী কবন্ধস্যাথর্বণস্য পুত্রো মেধাবী মীমাংসকোঽনূচান আস স হ স্বেনাতিমানেন মানুষং বিত্তং নেয়ায় তং মাতোবাচ ত এবৈতদ্ অন্নম্ অবোচংস্ত ইম এষু কুরুপঞ্চালেষ্বঙ্গমগধেষু কাশিকৌশল্যেষু শাল্বমৎস্যেষু শবশোশীনরেষূদীচ্যেষ্বন্নম্ অদন্তীতি অথ বয়ং তবৈবাতিমানেনাদ্যাঃ স্মঃ বৎস বাহনম্ অন্বিচ্ছেতি স মান্ধাতুর্যৌবনাশ্বস্য সার্বভৌমস্য রাজ্ঞঃ সোমং প্রসূতম্ আজগাম স সদোঽনুপ্রবিশ্যার্ত্বিজশ্চ যজমানং চামন্ত্রয়ামাস তদ্ যাঃ প্রাচ্যো নদ্যো বহন্তি যাশ্চ প্রতীচ্যো যাশ্চোদীচ্যস্তাঃ সর্বাঃ পৃথঙ্নামধেয়া ইত্যাচক্ষতে তাসাং সমুদ্রম্ অভিপদ্যমানানাং ছিদ্যতে নামধেয়ং সমুদ্র ইত্যাচক্ষত এবম্ ইমে সর্বে বেদা নির্মিতাঃ সকল্পাঃ সরহস্যাঃ সব্রাহ্মণাঃ সোপনিষৎকাঃ সেতিহাসাঃ সান্বাখ্যানাঃ সপুরাণাঃ সস্বরাঃ সসংস্কারাঃ সনিরুক্তাঃ সানুশাসনাঃ সানুমার্জনাঃ সবাকোবাক্যাস্তেষাং যজ্ঞম্ অভিপদ্যমানানাং ছিদ্যতে নামধেয়ং যজ্ঞ ইত্যেবাচক্ষতে।”
অনুবাদ
আথর্বণ কবন্ধের পুত্র কবন্ধী ছিলেন অনূচান মীমাংসক। তিনি নিজের অতিরিক্ত আত্মমর্যাদার কারণে অধিক মনুষ্যোপযুক্ত অর্থ উপার্জন করতে পারেননি। তাঁকে তাঁর মাতা বললেন, কুরু, পাঞ্চাল, অঙ্গ, মগধ, কাশী, কৌশল, শাল্ব, মৎস্য, শবশ, উশীনর, উত্তর দেশ সমূহে এই অন্ন ভক্ষণ করে। আমরা তোমার অতিরিক্ত মানের কারণে অনশন করছি। তুমি বাহন যোগাড় কর। তিনি যুবনাশ্বের পুত্র সার্বভৌম রাজা মান্ধাতার সোমযাগে গেলেন। সভায় প্রবেশ করে ঋত্বিক এবং যজমানদের আমন্ত্রণ করে বললেন, যেমন পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত নানা নদী সমুদ্রে প্রবেশ করে নিজেদের নাম ত্যাগ করে সমুদ্র নামে অভিহিত হয় তেমনই যজ্ঞে প্রযুক্ত বেদ, কল্প, রহস্য, ব্রাহ্মণ, উপনিষৎ, ইতিহাস, অন্বাখ্যান, পুরাণ, স্বর, সংস্কার, নিরুক্ত, অনুশাসন, অনুমার্জন, বাকোবাক্য যজ্ঞস্বরূপে পরিণত হয়ে নিজেদের নাম ত্যাগ করে যজ্ঞ নামেই পরিচিত হয়।
এই মন্ত্রটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কী সেটা অবশ্য আমরা আলোচনা করছি না। কারণ, যারা এই মন্ত্র দিয়ে নিজেদের অভীষ্ট সাধনে বদ্ধাদর তাদের কাছে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য মূল্যহীন। কেবল ‘বেদাঃ নির্মিতাঃ’ এবং ‘সব্রাহ্মণাঃ’ এই কয়েকটি শব্দই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের যুক্তি হল, যেহেতু এখানে বেদ এবং ব্রাহ্মণকে আলাদা আলাদা উল্লেখ করেছে, সুতরাং গোপথ ব্রাহ্মণের মতে বেদ ও ব্রাহ্মণ আলাদা।
এখন আমরা উপর্যুক্ত যুক্তি থেকে কয়েকটি সহজ বিষয়ের অবধারণা করছি।
১. গোপথ ব্রাহ্মণ প্রামাণিক গ্রন্থ। সুতরাং, গোপথ ব্রাহ্মণকে আমাদের মেনে চলতে হবে।
২. উক্ত বাক্যটিতে বেদের থেকে ব্রাহ্মণকে আলাদা বলা হয়েছে। একই রকম ভাবে ব্রাহ্মণের থেকে কল্প, ইতিহাস এবং পুরাণ আলাদা।
এবার এই প্রথম মান্যতাকে মাথায় রেখে আমরা গোপথ ব্রাহ্মণের কয়েকটি অংশের বিহঙ্গাবলোকন করব।
যেমন গোপথ শুরু হচ্ছে–
ওঁ ব্রহ্ম হ বা ইদম্ অগ্র আসীৎ স্বয়ম্ভ্বেকম্ এব তদৈক্ষত মহদ্ বৈ যক্ষং যদ্ একম্ এবাস্মি হন্তাহং মদ্ এব মন্মাত্রং দ্বিতীয়ং দেবং নির্মম ইতি তদ্ অভ্যশ্রাম্যদ্ অভ্যতপৎ সমতপৎ তস্য শ্রান্তস্য তপ্তস্য সন্তপ্তস্য ললাটে স্নেহো যদ্ আর্দ্রম্ অজায়ত তেনানন্দৎ তদ্ অব্রবীৎ মহদ্ বৈ যক্ষং সুবেদম্ অবিদম্ অহম্ ইতি তদ্ যদ্ অব্রবীৎ মহদ্ বৈ যক্ষং সুবেদম্ অবিদম্ অহম্ ইতি তস্মাৎ সুবেদোঽভবৎ তং বা এতং সুবেদং সন্তং স্বেদ ইত্যাচক্ষতে পরোক্ষেণ পরোক্ষপ্রিয়া ইব হি দেবা ভবন্তি প্রত্যক্ষদ্বিষঃ। (১.১.১)
অনুবাদ
ওঁ আগে এই স্বয়ম্ভূ ব্রহ্ম একাই ছিলেন। তিনি দেখলেন যে আমি মহান্ দেবতা একাই আছি। হন্ত, আমি আমারই মত দ্বিতীয় একজনকে তৈরি করি এরকম ভেবে শ্রম করলেন, তপস্যা করলেন। শ্রান্ত তপ্ত সন্তপ্ত তাঁর ললাটে যে আর্দ্র স্নেহ উৎপন্ন হল তাতে তিনি আনন্দিত হলেন। বললেন, আমি মহান্ দেবতা। আমি সুবেদকে জেনেছি। এই যে তিনি বললেন, আমি সুবেদকে জেনেছি তার ফলে তার থেকে সুবেদ জন্মাল। সেই সুবেদকেই পরোক্ষে স্বেদ বলে থাকেন দেবতারা। দেবতারা হচ্ছেন পরোক্ষপ্রিয় এবং প্রত্যক্ষদ্বেষী।
মন্ত্র
স ভূয়োঽশ্রাম্যদ্ ভূয়োঽতপ্যদ্ ভূয় আত্মানং সমতপৎ তস্য শ্রান্তস্য তপ্তস্য সন্তপ্তস্য সর্বেভ্যো রোমগর্তেভ্যঃ পৃথক্ স্বেদধারাঃ প্রাস্যন্দন্ত তাভিরনন্দৎ… পুন্ নাম নরকম্ অনেকশততারং তস্মাৎ ত্রাতীতি পুত্রস্তৎ পুত্রস্য পুত্রত্বম্… (১.১.২)
অনুবাদ
তিনি পুনরায় শ্রম করলেন, পুনরায় তপস্যা করলেন। নিজেকে পুনরায় সন্তাপিত করলেন। তখন শ্রান্ত, তপ্ত, সন্তপ্ত তাঁর সমস্ত রোমগর্ত থেকে পৃথক্ স্বেদধারা নির্গলিত হল। তার দ্বারা তিনি আনন্দিত হলেন।… পুং নামক নরক বহু প্রকার যাতনাময় নরক রয়েছে সেই নরক থেকে ত্রাণ করে বলে পুত্র। এই হল পুত্রের পুত্রত্ব।
মন্ত্র
স্বাং ছায়াম্ অপশ্যৎ তাম্ অস্যেক্ষমাণস্য স্বয়ং রেতোঽস্কন্দৎ… (১.১.৩)
অনুবাদ
নিজের ছায়াকে দেখলেন। তাকে দেখে আপন হতেই তার বীর্য স্খলিত হল।…
মন্ত্র
স দিশোঽন্বৈক্ষত প্রাচীং দক্ষিণাং প্রতীচীম্ উদীচীং ধ্রুবাম্ ঊর্ধ্বাম্ ইতি তাস্তত্রৈবাভ্যশ্রাম্যদ্ অভ্যতপৎ সমতপৎ তাভ্যঃ শ্রান্তাভ্যস্তপ্তাভ্যঃ সন্তপ্তাভ্যঃ পঞ্চ বেদান্ নিরমিমীত সর্পবেদং পিশাচবেদম্ অসুরবেদম্ ইতিহাসবেদং পুরাণবেদম্ ইতি (১.১.১০)
অনুবাদ
তিনি পূর্ব দক্ষিণ পশ্চিম উত্তর এবং ধ্রুব অর্থাৎ ঊর্ধ্ব দিকগুলিকে দেখলেন। সেই দিকগুলি শ্রম করল, তপ করল, সন্তাপ করল। সেই শ্রান্ত তপ্ত সন্তপ্ত দিকগুলি হতে পাঁচটি বেদ নির্মাণ করলেন। সর্পবেদ, পিশাচবেদ, অসুরবেদ, ইতিহাসবেদ এবং পুরাণবেদ।
এখন এই অংশগুলি থেকে আমরা যা বুঝতে পারছি সেটি হল গোপথের মতে ব্রহ্ম নামে খ্যাত সেই পরমেশ্বর শ্রান্ত হন, তাঁর কপাল থেকে ঘাম গড়ায়, প্রতি রোমকূপ থেকে ঘাম গড়ায়, আবার বীর্য স্খলন হয়। পঞ্চ বেদান্ – পাঁচখানি বেদের কথা বলছে!!! তারা আবার কারা? সর্পবেদ, পিশাচবেদ, অসুরবেদ, ইতিহাসবেদ, পুরাণবেদ। সর্বনাশ। পিশাচ, অসুর এসব আবার কী? আবার বলছে ইতিহাসও বেদ, পুরাণও বেদ? অর্থাৎ, গোপথের বচন দ্বারা ব্রাহ্মণ বেদভিন্ন বলে সিদ্ধ হচ্ছে সেই একই গোপথের বচন দ্বারা ইতিহাস এবং পুরাণও বেদ বলে স্বীকৃত হচ্ছে। পরমেশ্বরের শরীর (শরীর না থাকলে তো আর কপাল, রোমকূপ, ঘাম, বীর্যস্খলনাদি হয় না), নরক ইত্যাদিও স্বীকৃত হচ্ছে। আমরা গোপথের বচন থেকে জানলাম যে, ইতিহাস এবং পুরাণও বেদ।
সুতরাং, গোপথ ব্রাহ্মণের এই বচনগুলিকে তাদের আক্ষরিক অর্থে স্বীকার করলে অনেক সমস্যা তৈরি হবে। এই কথাগুলির অনেকটাই দয়ানন্দজীর মতের বিরোধী। অথচ দয়ানন্দজী কিন্তু গোপথ ব্রাহ্মণকে উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রূপেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। সুতরাং, এই সমস্ত মন্ত্র অর্থাৎ ব্রাহ্মণবাক্য আসলে গূঢ়ার্থপ্রতিপাদক। এবার আসা যাক প্রস্তুত মন্ত্রটি নিয়ে। উক্ত বাক্যটিতে বেদের থেকে ব্রাহ্মণকে আলাদা বলা হয়েছে। একই রকম ভাবে ব্রাহ্মণের থেকে কল্প, ইতিহাস এবং পুরাণ আলাদা বলেই প্রতিপন্ন হবে। কারণ, মন্ত্রটিতে বেদ ও ব্রাহ্মণ ছাড়াও কল্প, ইতিহাস এবং পুরাণের উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং যে যুক্তিতে ব্রাহ্মণকে বেদের থেকে আলাদা বলা হল, ঠিক সেই যুক্তিতে ব্রাহ্মণকে কল্প, ইতিহাস এবং পুরাণও ব্রাহ্মণের থেকে আলাদা।
কিন্তু, দয়ানন্দজী স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন যে, কল্প, ইতিহাস, পুরাণ এগুলিই আসলে ব্রাহ্মণ। শ্রীমৎ স্বামী দয়ানন্দজীর অমর কৃতি সত্যার্থপ্রকাশের তৃতীয় সমুল্লাসে গ্রন্থপ্রামাণ্যাপ্রামাণ্যবিষয়ক আলোচনায় ইতিহাস এবং পুরাণের স্বরূপ বলতে গিয়ে দয়ানন্দজী বলেছেন, “‘ব্রাহ্মণানীতিহাসান্ পুরাণানি কল্পান্ গাথা নারাশংসীরিতি’ (আশ্বলায়ন ৩/৩/১-২, তৈত্তিরীয় আরণ্যক ২/৯) এই গৃহ্যসূত্র বচন অনুসারে এবং তৈত্তিরীয় আরণ্যকের বচনাদি অনুসারে যে সমস্ত ঐতরেয়, শতপথ প্রভৃতি ব্রাহ্মণ সেগুলিরই ইতিহাস, পুরাণ, কল্প, গাথা এবং নারশংসী এই পাঁচটি নাম।”
তাহলে এই বাক্যটি দয়ানন্দজীর মতেরও বিরোধী হয়ে দাঁড়াল। তাহলে কি এই বাক্যটিকে প্রামাণিক বলে মানা চলবে? এই বাক্যটি দয়ানন্দজীর মতেরও বিরোধী হয়ে দাঁড়াল। তাহলে কি এই বাক্যটিকে প্রামাণিক বলে মানা চলবে?
পাঠকরা এই বিষয়টিকে আরও একটু গভীর ভাবে বুঝে নিন।
১. বেদ ও ব্রাহ্মণ এক নয়। (সাধনীয় বস্তু)
২. কারণ, গোপথ ব্রাহ্মণে বেদ শব্দটির উচ্চারণের পরে আলাদা করে ব্রাহ্মণ শব্দের উচ্চারণ হয়েছে। (অনুমানের হেতু)
৩. যদি ব্রাহ্মণ বেদই হত তাহলে বেদ এবং ব্রাহ্মণ পৃথক্ উচ্চারিত হত না। (তর্ক)
৪. ক যদি খ-এর থেকে আলাদা না হয় তবে, ক এবং খ-কে আলাদা আলাদা ভাবে উচ্চারণ করা হয় না।
৫. অতএব, ব্রাহ্মণ বেদ নয়।
এই অনুমানটি আপাতদৃষ্টিতে রমণীয় হলেও বাস্তবিক এই অনুমানটি ব্যভিচারাদি নানা দোষে দুষ্ট। শ্রীমৎ স্বামী দয়ানন্দজীর মতে, ব্রাহ্মণ শব্দের সমার্থক শব্দ হল পুরাণ, ইতিহাস, কল্প, গাথা এবং নারাশংসী (দ্র. ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা, সত্যার্থ প্রকাশ)। সুতরাং, ব্রাহ্মণ শব্দের দ্বারা পুরাণ, ইতিহাস, কল্পকে বোঝানো উচিত। সুতরাং, প্রকৃত বাক্যটিতে ব্রাহ্মণ শব্দের উচ্চারণের পরে কল্প, পুরাণ ও ইতিহাসের উচ্চারণ নিরর্থক। অতএব, বেদ শব্দ থেকে পৃথক ব্রাহ্মণ শব্দের উচ্চারণের কারণে যদি ব্রাহ্মণকে বেদবাহ্য বলে ধরে নিতে হয়, তবে, একই যুক্তিতে ব্রাহ্মণ শব্দ থেকে পৃথক ভাবে কল্প, ইতিহাস, পুরাণ শব্দের উচ্চারণের কারণে কল্প, ইতিহাস ও পুরাণকেও ব্রাহ্মণের থেকে পৃথক বলে ধরে নিতে হবে। কিন্তু সেটা দয়ানন্দজীর অভিপ্রেত নয়।
সেজন্য উক্ত তর্কের আধারে ব্রাহ্মণকে বেদের অতিরিক্ত ধরার সম্ভাবনা নেই। তাহলে এখানে বেদ শব্দের উচ্চারণের পরে আলাদা করে ব্রাহ্মণ বলার তাৎপর্য কী? গোপথের বিভিন্ন অংশের পরিশীলনে জানা যায় যে, বেদ শব্দটি এখানে কেবলমাত্র সংহিতা ভাগকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়নি। যথা সর্পবেদাদি শব্দে বেদ শব্দের অর্থ কিছু নির্দিষ্ট বিদ্যা বা শাখাবিশেষের জ্ঞান। অর্থাৎ, বেদ শব্দটিকে নানা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তেমনই এই স্থানে বেদ শব্দটির দ্বারা কেবল যজ্ঞে উচ্চারণীয় সস্বর মন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। পুরো প্রকরণটির অর্থ অনুধাবন করলে এই অর্থটিই অধিকতর গ্রহণীয় বলে মনে হয়।
অষ্টাধ্যায়ীতে ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষেধ– পরিহার
ভগবান্ পাণিনি কর্তৃক প্রণীত একটি সূত্র ‘পুরাণপ্রোক্তেষু ব্রাহ্মণকল্পেষু’ (অষ্টাধ্যায়ী ৪/৩/১০৫)। সূত্রটি তদ্ধিত প্রত্যয় বিধায়ক সূত্র। যে পুরাতন মুনি কর্তৃক ব্রাহ্মণ ও কল্প প্রোক্ত হয়েছে সেই তৃতীয়ান্ত শব্দের উত্তর প্রোক্ত-অর্থে ণিনি-প্রত্যয় হয়। উদাহরণ– মুনি ভল্লু কর্তৃক প্রোক্ত ব্রাহ্মণ ভাল্লবী (প্রাতিপদিক– ভাল্লবিন্)। মুনি শাট্যায়ন কর্তৃক প্রোক্ত ব্রাহ্মণ শাট্যায়নী (প্রাতিপদিক– শাট্যায়নিন্)। মুনি পিঙ্গ কর্তৃক প্রোক্ত কল্প পৈঙ্গী (প্রাতিপদিক– পৈঙ্গিন্)।
সূত্রটি কোন ভাবেই সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষেধ করছে না। সুতরাং, এখান থেকেও অনুমানের মাধ্যমেই ব্রাহ্মণের বেদবাহ্যত্ব সিদ্ধ করতে হবে। অনুমানটি নিম্নরূপ–
১. পাণিনির মতে ব্রাহ্মণ বেদ নয়। (সাধ্য বিষয়)
২. কারণ ব্রাহ্মণ মুনির দ্বারা উক্ত। পাণিনি ব্রাহ্মণকে পুরাতন মুনির দ্বারা উক্ত বলেছেন। (অনুমানের হেতু)
৩. যদি ব্রাহ্মণ বেদ হয় তবে তা কোন মনুষ্য দ্বারা উক্ত হতে পারে না। (তর্ক)
৪. কিন্তু ব্রাহ্মণ মুনি কর্তৃক উক্ত।
৫. সুতরাং ব্রাহ্মণ বেদ নয়।
আপাত দৃষ্টিতে এই অনুমান দ্বারা মনে হয় যে, ব্রাহ্মণকে বেদ বলা চলে না। কিন্তু অল্পশ্রুত ব্যক্তিরা পাণিনির যথার্থ হৃদয় অবগত হতে অক্ষম হয়েছেন। প্রকরণাদি থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে কেবলমাত্র এই সূত্র পড়ে এবং পাণিনির অন্যান্য বহু সূত্রকে অবজ্ঞা করে, কেবলমাত্র এই সূত্রের আধারে ব্রাহ্মণের বেদত্ব নিষেধ করলে তা বৈদিক ব্যাকরণের অন্তিম প্রবক্তা পাণিনিকে পীড়া দেওয়ার নামান্তর হয়। প্রসঙ্গতঃ আমরা পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীর আরও কয়েকটি সূত্র অনুসন্ধান করব।
১. তৃতীয়া চ হোশ্ছন্দসি (২/৩/৩)– বৈদিক প্রয়োগে হু ধাতুর কর্মবাচক শব্দে বিকল্পে তৃতীয়া বিভক্তি হবে। উদাহরণ– যবাগ্বাঽগ্নিহোত্রং (যবাগ্বা অগ্নিহোত্রং) জুহোতি। যবাগূম্ অগ্নিহোত্রং জুহোতি।
উদাহরণ বাক্যের অর্থ হল “(যাগকর্তা) অগ্নিহোত্র যাগে যবাগূ আহুতি দেন/দিচ্ছেন”। সাধারণ ভাবে কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি হয়। কিন্তু এই সূত্রে একটি বিশেষ নিয়ম করা হল। আহুতি ক্রিয়ার কর্মবাচক শব্দের উত্তর বিকল্পে তৃতীয়াও হবে বৈদিক প্রয়োগে। লৌকিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল “যবাগূম্ অগ্নিহোত্রং জুহোতি” এই একটি প্রয়োগই হবে। এখানে যবাগূ হল আহুতি ক্রিয়ার কর্ম। সূত্রে উক্ত ‘ছন্দসি’ পদটির অর্থ হল ‘বেদে’। সেজন্যই এই সূত্রের উদাহরণ বাক্য নিশ্চিত ভাবেই বৈদিক বাক্য হতে হবে। অন্যথা আহুতির কর্মবাচক শব্দে তৃতীয়া করা সম্ভব নয়। পাণিনীয় সূত্রটির উদাহরণ স্বরূপ যে উদাহরণটি উপস্থাপিত হল সেটি পাণিনীয় ব্যাকরণের প্রামাণিক আচার্য মহাভাষ্যকার মুনি পতঞ্জলি কর্তৃক উপস্থাপিত। পরবর্তীকালে কাশিকাকার সহ সমস্ত ব্যাখ্যাকারই এই উদাহরণটিই উপস্থাপন করেছেন।
এখন এই সূত্র এবং তার উদাহরণটিকে একটু বিশ্লেষণ একটা বিষয় উপলব্ধি করা যায়। সেটি হল পাণিনি বা পতঞ্জলি ব্রাহ্মণকে বেদ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্যথা ‘যবাগ্বাঽগ্নিহোত্রং (যবাগ্বা অগ্নিহোত্রং) জুহোতি’ এরকম একটি বাক্য এই সূত্রের উদাহরণ হতে পারে না। কারণ, উদাহরণ স্বরূপ উপস্থাপিত বাক্যটি কোন সংহিতাতে পাওয়া যায় না। অথচ, তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের দ্বিতীয় অষ্টকের প্রথম প্রপাঠকে পঞ্চম অনুবাকে (অগ্নিহোত্র প্রকরণে) ৩৯ মন্ত্রে রয়েছে, ‘যবাগ্বা গ্রামকামস্যৌষধা বৈ মনুষ্যাঃ’– অর্থাৎ যিনি গ্রাম লাভ করতে চান তিনি অগ্নিহোত্রে যবাগূ আহুতি দেবেন। সুতরাং, এই ব্রাহ্মণ বচনকে উক্ত সূত্রের উদাহরণ রূপে উপস্থাপিত করে মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি ব্রাহ্মণকে বেদ রূপে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
দ্বিতীয়তঃ, পয়সা জুহুয়াৎ (কৌষীতকীব্রাহ্মণ ২/১, জৈমিনীয়ব্রাহ্মণ ১/৩৮), যদ্ এব তত্র স্থাল্যাং পরিশিষ্টং স্যাৎ তেন জুহুয়াৎ (জৈমিনীয়ব্রাহ্মণ ১/৫৩), আজ্যেন জুহোতি (শতপথব্রাহ্মণ ৭/৪/১/৩৪), আজ্যেনান্ততো জুহোতি (তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণ ৩/৮/১৫/২) প্রভৃতি অজস্র ব্রাহ্মণ বাক্যে এই সূত্রটির প্রয়োগ করে আহুতির কর্মে তৃতীয়া করা হয়েছে। যেহেতু সূত্রটি কেবল বৈদিক প্রয়োগেই প্রয়োজ্য, সেজন্য ব্রাহ্মণ বাক্যে এই সূত্রের প্রয়োগের দ্বারা ব্রাহ্মণের বেদত্ব সূচিত হয়। পতঞ্জলির মত ব্রাহ্মণগুলি বেদই।
২. ছন্দসি ঘস্ (৫/৬/১০৬)– বৈদিক প্রয়োগে ঋতু-শব্দের উত্তর ঘস্ প্রত্যয় হয়। উদাহরণ– অয়ং তে যোনির্ঋত্বিয়ঃ।
এই সূত্র অনুসারে বৈদিক প্রয়োগে ঋত্বিয় শব্দের প্রয়োগ হবে, লৌকিক প্রয়োগে আর্তব শব্দের প্রয়োগ হবে। যে উদাহরণটি কাশিকায় উদ্ধৃত সেটি তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণের (২/৫/৮/৮) বচন। সুতরাং কাশিকাকার ব্রাহ্মণকে বেদ বলেই মানেন। এই উদাহরণ ছাড়াও শতপথব্রাহ্মণে (৬/৪/৪/১৭), তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণে (৩/৭/৯/৫, ৬) প্রভৃতি স্থানে ঋত্বিয়ঃ শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। ব্রাহ্মণ যদি বেদ না হত তবে এই প্রয়োগ হত না।
৩. হেমন্তশিশিরাবহোরাত্রে চচ্ছন্দসি (২/৪/২৮)– বৈদিক প্রয়োগে হেমন্তশিশিরৌ, অহোরাত্রে এমন প্রয়োগ হবে। লৌকিক প্রয়োগে অহোরাত্রৌ হওয়া উচিত। অথচ, শতপথব্রাহ্মণে বহুবার অহোরাত্রে এমন প্রয়োগ দেখা যায়।
এরকম বহু সূত্রের উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে। পতঞ্জলি তাঁর মহাভাষ্যে বৈদিক প্রকরণের সূত্রে অজস্র ব্রাহ্মণ বাক্যকে উদাহরণ রূপে উপস্থাপিত করেছেন।
‘ছন্দোব্রাহ্মণানি চ তদ্বিষয়াণি’ (৪/২/৬৬) সূত্রের ব্যাখ্যায় কাশিকাকার একটি শঙ্কা উত্থাপন করেছেন। সেটি হল ‘ব্রাহ্মণগ্রহণং কিং, যাবতা ছন্দ এব তৎ’? (ব্রাহ্মণশব্দের উচ্চারণ কেন? যেহেতু ব্রাহ্মণও ছন্দই)। উত্তরে তিনি বলছেন, ‘ব্রাহ্মণবিশেষপ্রতিপত্ত্যর্থম্’ (বিশেষ কিছু ব্রাহ্মণকে বোঝানোর জন্য)।
কাশিকার পদমঞ্জরী ব্যাখ্যার রচয়িতা হরদত্ত অষ্টাধ্যায়ী ২/৩/৬০, ২/৪/৮০ প্রভৃতি সূত্রের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট শব্দে বলেছেন, ‘মন্ত্রাতিরিক্তো বেদভাগো ব্রাহ্মণম্’।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি, কাশিকাকার, পদমঞ্জরীকার হরদত্ত প্রমুখ ব্যাকরণশাস্ত্রের মূর্ধন্য প্রামাণিক আচার্যরা ব্রাহ্মণকে বেদই মেনেছেন।
তাঁদের বচনকে অগ্রাহ্য করে অল্পশ্রুত, অর্বাচীন মহাপণ্ডিতদের মতকে প্রামাণিক মনে করার মত বালখিল্য কেউ স্বেচ্ছায় করতেই পারেন। কিন্তু আমরা মুক্ত দৃষ্টিসম্পন্ন বিচারক। আমাদের নিকট মহভাষ্যকার পতঞ্জলি প্রমুখের মতই সমধিক গুরুত্বপূর্ণ।
তথাপি যাঁদের মনে উক্ত সূত্র এবং তৎসংক্রান্ত আলোচনা থেকে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে তাদের সন্দেহের নিরসনের জন্য কিছু কথা বলা প্রয়োজন। কেবল পরমতের খণ্ডনই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা পরমত খণ্ডনবাদী বৈতণ্ডিক নই, তত্ত্ববুভুৎসু বা জিজ্ঞাসু। সেজন্য সন্দেহের নিরসন করা প্রয়োজন।
সন্দেহ এইরূপ– পাণিনি ব্রাহ্মণকে পুরাণপ্রোক্ত বললেন। ছন্দোব্রাহ্মণানি চ তদ্বিষয়াণি (৪/২/৬৬) সূত্রে ছন্দ এবং ব্রাহ্মণ আলাদা বলা হল। তার ব্যাখ্যায় বিশেষ কিছু মুনির দ্বারা উক্ত ব্রাহ্মণকে বোঝানোর জন্য ব্রাহ্মণ শব্দের উচ্চারণ হয়েছে এরকম বলা হল। অথচ, ব্রাহ্মণ বেদ। সুতরাং এটি অপৌরুষেয় বা ঈশ্বরপ্রোক্ত। তাহলে পাণিনির সূত্রের সঙ্গে ব্রাহ্মণের বেদত্বের বিরোধ ঘটছে। এমতাবস্থায় পাণিনির মতের সমন্বয় কীভাবে হবে?
মনে রাখতে হবে বেদ ঈশ্বরপ্রোক্ত বা অপৌরুষেয় হলেও তা আমাদের নিকট পৌঁছায় কোন ঋষি কর্তৃক। যে ঋষি যে মন্ত্রকে দর্শন করেন তিনিই তাঁর শিষ্য বা উত্তরপুরুষকে সেই মন্ত্র উপদেশ করেন। যেমন নিরুক্তকার যাস্ক বলেছেন, “সাক্ষাৎকৃতধর্মাণ ঋষয়ো বভূবুস্তেঽবরেভ্যোঽসাক্ষাৎকৃতধর্মভ্য উপদেশেন মন্ত্রান্ সম্প্রাদুরুপদেশায় গ্লায়ন্তোঽবরে বিল্মগ্রহণায়েমং গ্রন্থং সমাম্নাসিষুর্বেদং চ বেদাঙ্গানি চ…” (নিরুক্ত ১.২০) (ঋষিরা ধর্মকে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁরা উত্তরকালিক অসাক্ষাৎকৃতধর্মা ব্যক্তিদেরকে উপদেশপূর্বক মন্ত্র দান করেছেন। তাদেরও উত্তরবর্তীরা উপদেশ গ্রহণে অসমর্থ হওয়ায় বেদকে নানা শাখাদিতে ভিন্ন ভিন্ন করে বেদ ও বেদাঙ্গ রূপে দান করেছেন।)
যেমন সংহিতা ভাগ ঋষি কর্তৃক দৃষ্ট হয়ে উপদিষ্ট হয়। তেমনই ব্রাহ্মণ। যে ঋষি প্রথম যে মন্ত্র বা ব্রাহ্মণের উপদেশ করেন সেই মন্ত্র বা ব্রাহ্মণকে সেই ঋষি কর্তৃক প্রোক্ত বলা হয়। যেমন একই ঋগ্বেদের শাকল, বাষ্কল ও শাঙ্খায়ন নামক সংহিতা বর্তমান। তেমন সামবেদের কৌথুম, রাণায়নীয় ও জৈমিনীয় নামক তিনটি সংহিতা বিদ্যমান। যজুর্বেদে কঠসংহিতা, মৈত্রায়ণীসংহিতা, বাজসনেয়ী সংহিতা, তৈত্তিরীয় সংহিতা প্রভৃতি অনেকগুলি সংহিতা পাওয়া যায়। অথর্ববেদেরও পৈপ্পলাদ সংহিতা আদি বিভিন্ন নামে ভিন্ন ভিন্ন সংহিতা বর্তমান। বেদের এই শাখাভেদ অত্যন্ত প্রাচীন। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি, শঙ্করাচার্য, শবরস্বামী প্রমুখ সমস্ত আচার্যরাই নিজ নিজ গ্রন্থে এই শাখাভেদের উল্লেখ করেছেন। এই শাখাগুলি একেকজন পুরাণ (পুরাতন) মুনির নামে। যিনি যে শাখাটিকে উপদেশ করেছেন তাঁর নামে সেই শাখার নাম। একই রকম ভাবে যে মুনি যে ব্রাহ্মণ উপদেশ করেছেন সেই মুনির নামে সেই ব্রাহ্মণের নাম। যেমন মহীদাস নামক ঋষি ইতরার পুত্র। ইতরার পুত্র বলে তাঁর আরেক নাম ঐতরেয়। তিনি যে ব্রাহ্মণ প্রথম দর্শন করে উপদেশ করেন সেই ব্রাহ্মণ ঐতরেয় নামে পরিচিত।
ব্রাহ্মণগুলি দুই ধরণের হতে পারে– পুরাণপ্রোক্ত এবং অবরপ্রোক্ত (দ্র. পুরাণপ্রোক্তেষু ইত্যাদি সূত্রের ন্যাস ও পদমঞ্জরী ব্যাখ্যা)। ভল্লু, ঐতরেয়, শাট্যায়ন প্রমুখ কিছু অতি প্রাচীন মুনি রয়েছেন। তাঁদের দ্বারা উপদিষ্ট ব্রাহ্মণগুলি পুরাণপ্রোক্ত। অন্যদিকে যাজ্ঞবল্ক্যাদি আধুনিকতর ঋষি কর্তৃক প্রোক্ত ব্রাহ্মণগুলিকে অবরপ্রোক্ত বলা হয়। পাণিনীয় সূত্রে মুনি কর্তৃক প্রোক্ত ব্রাহ্মণ বলতে মুনি কর্তৃক উপদিষ্ট বোঝানো হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জৈমিনীয় পূর্বমীমাংসা সূত্রের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পাদের ৩০ তম সূত্র “আখ্যা প্রবচনাৎ” এবং তার ভাষ্যও প্রমাণ। সেখানে শাকল, কঠ ইত্যাদি সংহিতার নামের ব্যাখ্যা সম্বন্ধে বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে।
সংহিতা ও ব্রাহ্মণের উপদেশের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য বর্তমান। সেটি হল, সংহিতা ভাগের উপদেশ হয় সস্বর (উদাত্তাদি স্বর সহিত) এবং বিকৃতিপাঠের সহিত। প্রসঙ্গতঃ, সংহিতার মূল পাঠ ছাড়াও পদপাঠ, ক্রমপাঠ, জটাপাঠ, মালাপাঠ, লেখাপাঠ, শিখাপাঠ, ধ্বজপাঠ, দণ্ডপাঠ, রথপাঠ এবং ঘনপাঠ– এই বিভিন্ন ধরণের বিকৃতিপাঠ হয়। ব্রাহ্মণভাগের উপদেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বররহিত।
পুরাকল্প, পরকৃতি
অনেকে মনে করেন যে, ব্রাহ্মণ গ্রন্থে পুরাকল্প ও পরকৃতির উপস্থিতিই ব্রাহ্মণের বেদত্বের বাধক। কারণ, সৃষ্টির অপ্রকট অবস্থাতেও বিদ্যমান এবং সৃষ্টির আদিতে সৃষ্টিকর্তার সম্মুখে উপস্থিত বেদে পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা, ব্যক্তির বর্ণনা থাকা সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে আমরা কয়েকটি মন্ত্রের আলোচনা করি।
ব্রীহয়শ্চ মে যবাশ্চ মে মাষাশ্চ মে তিলাশ্চ মে মুদ্গাশ্চ মে খল্বাশ্চ মে প্রিয়ঙ্গবশ্চ মেঽণবশ্চ মে শ্যামাকাশ্চ মে নীবারাশ্চ মে গোধূমাশ্চ মে মসূরাশ্চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্॥(যজুর্বেদ ১৮/১২)
দয়ানন্দভাষ্য– (ব্রীহয়ঃ) তণ্ডুলাঃ (চ) ষষ্টিকাঃ (মে) (যবাঃ) (চ) আঢক্যঃ (মে) (মাষাঃ) (চ) কলায়াঃ (মে) (তিলাঃ) (চ) নারিকেলাঃ (মে) (মুদ্গাঃ) (চ) তত্সংস্কারাঃ (মে) (খল্বাঃ) চণকাঃ (চ) তত্সাধনম্ (মে) (প্রিয়ঙ্গবঃ) ধান্যবিশেষাঃ (চ) অন্যানি ক্ষুদ্রান্নানি (মে) (অণবঃ) সূক্ষ্মতণ্ডুলাঃ (চ) তৎপাকঃ (মে) (শ্যামাকাঃ) (চ) (মে) (নীবারাঃ) বিনা বপনেনোৎপন্নাঃ (চ) এতৎসংস্করণম্ (মে) (গোধূমাঃ) (চ) এতৎসংস্করণম্ (মে) (মসূরাঃ) (চ) এতৎসম্বন্ধি (মে) (যজ্ঞেন) সর্বান্নপ্রদেন পরমাত্মনা (কল্পন্তাম্)॥১২॥
সরলার্থ– চাল, যব, কলায়, তিল, নারিকেল, মুগ, ছোলা, প্রিয়ঙ্গু সহ অন্যান্য ক্ষুদ্র বীজ, শ্যামাক, নীবার, গম প্রভৃতি সংগ্রহ করে অগ্নিতে হবন করবে এবং অন্যদের খাওয়াবে।
অশ্মা চ মে মৃত্তিকা চ মে গিরয়শ্চ মে পর্বতাশ্চ মে সিকতাশ্চ মে বনস্পতয়শ্চ মে হিরণ্যঞ্চ মে যশ্চ মে শ্যামঞ্চ মে লোহঞ্চ মে সীসঞ্চ মে ত্রপু চ মে যজ্ঞেন কল্পন্তাম্॥ (যজুর্বেদ ১৮/১৩)
দয়ানন্দভাষ্য– (অশ্মা) পাষাণঃ (চ) হীরকাদীনি রত্নানি (মে) (মৃত্তিকা) প্রশংসিতা মৃৎ (চ) সাধারণা মৃৎ (মে) (গিরয়ঃ) মেঘাঃ (চ) অন্নাদি (মে) (পর্বতাঃ) হ্রস্বা মহান্তঃ শৈলাঃ (চ) সর্বধনম্ (মে) (সিকতাঃ) (চ) তত্রস্থাঃ পদার্থাঃ সূক্ষ্মা বালুকাঃ (মে) (বনস্পতয়ঃ) বটাদয়ঃ (চ) আম্রাদয়ো বৃক্ষাঃ (মে) (হিরণ্যম্) (চ) রজতাদি (মে) (অয়ঃ) (চ) শস্ত্রাণি (মে) (শ্যামম্) শ্যামমণিঃ (চ) শুক্ত্যাদি (মে) (লোহম্) সুবর্ণম্। লোহমিতি সুবর্ণনামসু পঠিতম্॥ (নিঘং॰১.২) (চ) কান্তিসারাদিঃ (মে) (সীসম্) (চ) জতু (মে) (ত্রপু) (চ) রঙ্গম্ (মে) (যজ্ঞেন) সঙ্গতিকরণযোগ্যেন (কল্পন্তাম্)॥১৩॥
সরলার্থ– পাষাণ, হীরে প্রভৃতি রত্ন, প্রশস্য মৃত্তিকা (?) সাধারণ মৃত্তিকা, মেঘ, অন্নাদি, ছোট ও বড় পাহাড়, সূক্ষ্ম বালি, বট আম প্রভৃতি বৃক্ষ, রূপা প্রভৃতি, শস্ত্র, শ্যামমণি, ঝিনুক আদি, সোনা, কান্তিসার, সীসা, লাক্ষা, রাঙ প্রভৃতি সম্পাদন করে উপযোগ করবে।
উক্ত মন্ত্র দুইটির ভাষ্য পর্যবেক্ষণ করলে একটা সংশয় উৎপন্ন হয়। সৃষ্টির পূর্বে প্রকটিত নিত্য বেদ গ্রন্থে চাল, যব প্রভৃতি শস্যের বর্ণনা কেমন করে এল? প্রথমে তো সৃষ্টির বিকাশ ঘটে, তার পরেই এই সকল উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। একই রকম ভাবে হীরা প্রভৃতি রত্ন এবং সোনা প্রভৃতি ধাতু সৃষ্টির বিকাশের পরেই নিশ্চয় নির্মিত হয়। সীসা, রাং প্রভৃতি সঙ্কর ধাতু তো মনুষ্যের সৃষ্টি। দুটি ধাতু মিশিয়ে তাদের নির্মাণ করা হয়। এগুলি প্রাকৃতিক তো নয়। এমতাবস্থায় বেদে এই সমস্ত বস্তুর বর্ণনার দ্বারা কী সিদ্ধ হয়?
১. বেদ সৃষ্টি নির্মাণের পরে রচিত।
২. এই মন্ত্রগুলি অপ্রামাণিক।
দুটির কোনটিই স্বীকার করা যাবে না। কারণ দুটি বিকল্পই দয়ানন্দজীর মতের বিরুদ্ধ। মন্ত্রগুলি সংহিতা ভাগের মন্ত্র। যদি মন্ত্রগুলি অপ্রামাণিক হত তবে দয়ানন্দজী তাদের ভাষ্য করতেন না।
সুতরাং, দয়ানন্দজীর মতকে মান্যতা দিয়ে বলতে হয় যে, পরমেশ্বর এই সমস্ত সৃষ্টির কথা আগে থেকে জেনেই সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ, এদের সৃষ্টির পূর্বেই এদের বর্ণনা বেদে দেওয়া হয়েছে। এর পরে যজুর্বেদের আরেকটি মন্ত্র দেখা যেতে পারে।
নমঃ শ্বভ্যঃ শ্বপতিভ্যশ্চ বো নমো নমো ভবায় চ রুদ্রায় চ নমঃ শর্বায় চ পশুপতয়ে চ নমো নীলগ্রীবায় চ শিতিকণ্ঠায় চ নমঃ কপর্দিনে॥ (যজুর্বেদ ১৬/২৮)
দয়ানন্দভাষ্য– (নমঃ) অন্নম্ (শ্বভ্যঃ) কুক্কুরেভ্যঃ (শ্বপতিভ্যঃ) শুনাং পালকেভ্যঃ (চ) (বঃ) (নমঃ) অন্নং সত্করণং চ (নমঃ) সত্করণম্ (ভবায়) যঃ শুভগুণাদিষু ভবতি তস্মৈ (চ) (রুদ্রায়) দুষ্টানাং রোদকায় (চ) (নমঃ) অন্নাদিকম্ (শর্বায়) হিংসকায় (চ) (পশুপতয়ে) গবাদিপশুপালকায় (চ) (নমঃ) অন্নম্ (নীলগ্রীবায়) নীলঃ শোভনো বর্ণো গ্রীবায়াং যস্য তস্মৈ (চ) (শিতিকণ্ঠায়) শিতিস্তীক্ষ্ণীভূতঃ কৃষ্ণো বা কণ্ঠো যস্য তস্মৈ (চ)॥২৮॥
সরলার্থ– কুকুর, কুকুরপালক প্রভৃতিদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও সৎকার, শুভগুণের অধিষ্ঠাতা দুষ্টদের দুঃখদায়কের উদ্দেশ্যেও অন্ন, হিংস্রদের এবং গবাদিপশুপালকদের অন্ন, যাদের গলায় সুন্দর রং বা কালো রং আছে, যাদের গলা তীক্ষ্ণ তাদেরকে অন্নাদি দান করতে হবে এবং সৎকার করতে হবে।
এই মন্ত্রের অর্থ অনুধাবন করলেও দেখা যাচ্ছে যে, কুকুর প্রভৃতি প্রাণীদের বর্ণনা, গবাদি পশুদের বর্ণনা এবং সর্বোপরি মানুষ যে এই সমস্ত পশুদের পালন করবে সেই বর্ণনা বেদে পাওয়া যাচ্ছে।
ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলের ৫৩ তম সূক্তের ১৪ মন্ত্রটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ।
কিং তে কৃণ্বন্তি কীকটেষু গাবো
নাশিরং দুহ্রে ন তপন্তি ঘর্মম্।
আ নো ভর প্রমগন্দস্য বেদো
নৈচাশাখং ভগবন্ রন্ধ্রয়া নঃ॥
উক্ত মন্ত্রে কীকট শব্দের অর্থ– অনার্যদের দেশ বা জনপদ। অথবা যজ্ঞাদির ফল নেই এরকম মনে করা নাস্তিদের দেশ বা জনপদ। প্রমগন্দ শব্দের অর্থ– বংশানুক্রমিক সুদ ব্যবসায়ী। নৈচাশাখ শব্দের অর্থ– পতিত।
মন্ত্রটির নিরুক্তানুসারী ভাবার্থ এরকম–
হে ইন্দ্র, কীকটে গরুরূপী তোমার কী কাজ? কারণ তারা দুগ্ধ দোহন করে না। যজ্ঞের পাত্রকে অগ্নিতে তাপিত করে না। সুতরাং, তাদের গাভীগুলি আমাদেরকেই দান কর। তেমনই যারা সুদখোর এবং পতিত তাদেরও ধন আমাদেরকে দান কর। কারণ, তাদের ধন যজ্ঞকর্মে উপযোগ হয় না। আমরা সেই সম্পদ যজ্ঞকর্মে লাগাব।
এই মন্ত্রে শ্রুতি অনার্য, নাস্তিক, সুদব্যবসায়ী, পতিত প্রমুখদের সম্বন্ধে বর্ণনা দিচ্ছেন। তাদের আচরণাদির নিখুঁত বিবরণ দিচ্ছেন। সুতরাং, এটি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা ঘটনা না হলেও একপ্রকার ইতিহাস। যে ইতিহাসে সমাজের বৃহত্তর ব্যবহারের বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থাৎ, সর্বজ্ঞ পরমেশ্বর সৃষ্টির পূর্বেই সৃষ্টিতে ঘটমান বহু বস্তুর বর্ণনা বেদে করছেন। সেক্ষেত্রে তিনি কেন সৃষ্টির ব্যবস্থাপনকারী প্রধান ঋষিদের এবং রাজা প্রভৃতিদের বর্ণনা করতে পারবেন না?
বলা হয়ে থাকে যে, ব্রাহ্মণে যেহেতু পুরাকল্প ও পরকৃতির বর্ণনা রয়েছে সেজন্য সেগুলি বেদপদবাচ্য নয়। সেই যুক্তিতে এই মন্ত্রগুলিকে কেন বেদবাহ্য বলা যাবে না?
আমাদের বক্তব্য এই নয় যে, যেখানেই ইতিহাসের বর্ণনা রয়েছে সেগুলিই বেদ। আমরা তেমন মূর্খোচিত অতি সরলীকরণ করছি না। আমাদের বক্তব্য হল, শুধুমাত্র পুরাকল্প ও পরকৃতি রয়েছে বলেই ব্রাহ্মণকে বেদবাহ্য বলা চলে না। আমাদের মতে সংহিতাতে এবং ব্রাহ্মণে এই ধরণের বক্তব্যগুলি পূর্ব পূর্ব কল্পের সৃষ্টি অনুসারেই নিবদ্ধ। অর্থাৎ, বেদের প্রবাহনিত্যতার সমান সৃষ্টিরও প্রবাহনিত্যতা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে পূর্বমীমাংসার “ঔৎপত্তিকস্তু শব্দস্যার্থেন সম্বন্ধস্তস্য জ্ঞানম্ উপদেশোঽব্যতিরেকশ্চার্থেঽনুলব্ধে তৎ প্রমাণং বাদরায়ণস্যানপেক্ষত্বাৎ” (১.১.৫) সূত্র এবং তার ভাষ্যও দেখতে পারেন উৎসুক পাঠকগণ।
সুতরাং, প্রতিকল্পে ঘটমান বিশিষ্ট কিছু ঘটনা, বস্তুর বর্ণনা বেদে থাকাই স্বাভাবিক। সেজন্য পুরাকল্প ও পরকৃতির কারণে ব্রাহ্মণের বেদবাহ্যতা সিদ্ধ হতে পারে না।
ব্রাহ্মণের বেদবাহ্যতার বিষয়ে কিছু মিথ্যাচার
কিছু মিথ্যাচারী এবং অর্ধসত্য প্রচারকারী এমন বলে থাকেন যে, পাণিনিকৃত “চতুর্থ্যর্থে বহুলং ছন্দসি” (অষ্টাধ্যায়ী ২/৩/৬২) সূত্রে ছন্দস্ শব্দের দ্বারা কেবল সংহিতাকেই বোঝানো হয়েছে, ব্রাহ্মণকে নয়। বাস্তবে, পাণিনিকৃত উক্ত সূত্রের ভাষ্যে মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি থেকে শুরু করে কাশিকা প্রভৃতি কোন ব্যাখ্যাতেই ছন্দস্ শব্দের দ্বারা কেবল সংহিতাকে বোঝানো হবে এটা বলা হয়নি। ছন্দস্ শব্দের দ্বারা ব্রাহ্মণকে বোঝানো হবে না এটা সর্বপ্রথম দয়ানন্দ সরস্বতী নিজের অষ্টাধ্যায়ীর বৃত্তিতে উল্লেখ করেন। যদিও তিনি তাঁর এই মতের সপক্ষে কোন প্রাচীন ব্যাখ্যাকারের সমর্থন কিংবা যুক্তি প্রদর্শন করেননি। পাণিনি নিজে কোথাও ব্রাহ্মণকে বেদবাহ্য বলেননি। উক্ত সূত্রেও ছন্দস্ শব্দেরই উচ্চারণ করা হয়েছে– ছন্দস্ শব্দটি ব্রাহ্মণ গ্রন্থকে বোঝানো হবে না সেটা বলা নেই। পাণিনি কৃত সূত্রের অর্থ নিরূপণে প্রকৃষ্টতম এবং একমাত্র প্রমাণ মহর্ষি পতঞ্জলি কৃত মহাভাষ্য। সেখানেও ছন্দস্ শব্দের দ্বারা ব্রাহ্মণকে গ্রহণ করা হবে না এমন কথা বলা নেই। সুতরাং, অষ্টাধ্যায়ীর এই সূত্রের দ্বারা ব্রাহ্মণের বেদবাহ্যতা প্রমাণিত হয় না। এটি একটি মিথ্যাচার।
কেউ কেউ বলে থাকেন যে, পতঞ্জলিকৃত মহাভাষ্যে পঞ্চম অধ্যায়ের প্রথম পাদের প্রথম সূত্রে ব্রাহ্মণকে মহর্ষিদের দ্বারা প্রোক্ত বেদব্যাখ্যাই হল ব্রাহ্মণ। বাস্তবে পতঞ্জলিকৃত মহাভাষ্যে অধ্যায়কে আহ্নিক বলা হয়। সেখানে অধ্যায়ের অন্তর্গত পাদব্যবস্থা নেই। সুতরাং, এখানে সম্ভবতঃ অষ্টাধ্যায়ীর পঞ্চম অধ্যায়ের প্রথম পাদের প্রথম সূত্রের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উক্ত সূত্রের মহাভাষ্যে এরকম কোন প্রসঙ্গ পাওয়া যায় না।
কেউ কেউ বলেন, ন্যায়ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন “তদপ্রামাণ্যম্ অনৃত-বিহিতব্যাঘাত-পুনরুক্তদোষেভ্যঃ” (ন্যায়সূত্র ২/১/৫৭) সূত্রের ভাষ্যে ব্রাহ্মণকে অনৃত, বিহিতব্যাঘাত এবং পুনরুক্ত দোষে দুষ্ট বলে বেদবাহ্য বলা হয়েছে। কিছু অর্বাচীন এই সূত্রের অর্থ না বুঝে এরকম অর্থ করে থাকেন, “প্রামাণ্য মন্ত্রবেদের শেষে ব্যাখ্যানরূপ ব্রাহ্মণগ্রন্থ পুনরায় লেখা হয়েছে।” অত্যন্ত হাস্যকর এই ধরণের অর্থ এই অর্বাচীনের অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই প্রমাণ করে না।
এই সূত্রটি আসলে বেদের অপ্রামাণ্যবাদী নাস্তিকদের মতের প্রতিপাদন। নাস্তিকদের মতে বেদে অসত্য, বিহিতব্যাঘাত এবং পুনরুক্তি দোষ থাকার কারণে বেদের অপ্রামাণিকতা সিদ্ধ হয়। ন্যায়ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন এই সূত্রটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রাহ্মণের কিছু বচনের মধ্যে আপাতভাবে অসত্য বচনের উদাহরণ দিয়েছেন। বিহিতব্যাঘাত হল, যেটির বিধান করা হয়েছে সেটিকেই আবার নিষেধ করা হয়েছে। পুনরুক্তি হল একই কথা বারবার বলা।
সম্ভবতঃ, এই সমস্ত উদাহরণ গুলি ব্রাহ্মণ থেকে গৃহীত বলে এই অর্বাচীন নির্বোধগণ মনে করেছে যে, বাৎস্যায়ন ব্রাহ্মণকে অপ্রামাণিক মনে করেন। বাস্তবে, এই সূত্রের পূর্ব প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যায় যে, এখানে বেদের অপ্রামাণ্যের শঙ্কা উত্থাপিত হয়েছে। এবং এই সূত্রের ভাষ্যে ব্রাহ্মণবাক্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে ন্যায়ভাষ্যকার ব্রাহ্মণকে বেদ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন।
সর্বোপরি এই সূত্রের পরবর্তী তিনটি সূত্রে– “ন কর্মকর্তৃসাধনবৈগুণ্যাৎ” (ন্যায়সূত্র ২/১/৫৮), “অভ্যুপেত্য কালভেদে দোষবচনাৎ” (ন্যায়সূত্র ২/১/৫৯), “অনুবাদোপপত্তেশ্চ” (ন্যায়সূত্র ২/১/৬০)– উপর্যুক্ত তিনটি দোষের খণ্ডন করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এছাড়াও “পাত্রচয়ান্তানুপপত্তেশ্চ ফলাভাবঃ” (ন্যায়সূত্র ৪/১/৬১) সূত্রে ব্রাহ্মণের বেদত্ব স্বীকার প্রসঙ্গ আগেই উল্লিখিত হয়েছে।
ব্রাহ্মণ প্রসঙ্গে দয়ানন্দ সরস্বতী
পূর্বে একাধিক প্রমাণের সাহায্যে সিদ্ধ করা হয়েছে যে, বেদের বিষয় যজ্ঞ। অপৌরুষেয় বা ঈশ্বর কর্তৃক উপদিষ্ট বেদমন্ত্রের প্রয়োগ যজ্ঞে করা হয়। কিন্তু সংহিতার কোন মন্ত্র কোন যজ্ঞে কোন ক্রিয়াতে পাঠ করতে হবে, তার নির্দেশও অপৌরুষেয় বা ঈশ্বরোপদিষ্ট হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অন্যথা সম্পূর্ণ যজ্ঞ প্রক্রিয়াই অপ্রামাণিক বলে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। সেজন্য অহৈতুক করুণাময় পরমেশ্বরই সংহিতার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রয়োগ ব্যাখ্যানপরক ব্রাহ্মণও উপদেশ করেছেন এটাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়। এই কথাটি কিন্তু দয়ানন্দ সরস্বতীও স্বীকার করেছেন। সত্যার্থ প্রকাশের সপ্তম সমুল্লাসে তিনি পরিষ্কার বলেছেন যে, ধর্মাত্মা যোগী মহর্ষিরা যখন সেই অর্থ (সংহিতা ভাগের অর্থ) জানার কামনায় ধ্যানাবস্থায় পরমেশ্বরের স্বরূপ চিন্তা করে সমাধিস্থ হয়েছেন তখন পরমাত্মা তাঁদেরকে সেই সমস্ত মন্ত্রের অর্থ জানিয়েছেন। এই অর্থই হল ব্রাহ্মণ ভাগ।
সত্যার্থ প্রকাশের প্রথম সংস্করণের দশম সমুল্লাসে দয়ানন্দ সরস্বতী ব্রাহ্মণকে শ্রুতি বলে নির্দেশ করেছিলেন।
অর্থাৎ, তুষ্যতুদুর্জন ন্যায় (কোন প্রমাণ না মানা দুর্জনের সঙ্গে তর্কের হাত থেকে বাঁচতে সেই দুর্জনকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে অসত্যকে স্বীকার করে নেওয়াকে বলা হয় তুষ্যতুদুর্জন ন্যায়) আশ্রয় করে ব্রাহ্মণকে অপৌরুষেয় বা বেদবাহ্য বলে মানলেও দয়ানন্দের মতেও তার অপ্রামাণিকতা কোনক্রমেই সিদ্ধ হয় না। বরং ব্রাহ্মণ যে বেদজ্ঞ মহর্ষিদের সমাধিতে প্রাপ্ত পরমেশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত উপদেশ এটি দয়ানন্দ সরস্বতী কর্তৃক মহান কণ্ঠরবে স্বীকৃত। অতএব, ব্রাহ্মণ বেদ হোক বা না হোক তার প্রামাণিকতা এবং স্বীকার্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না।
প্রণিধানযোগ্য বিষয় হল, দয়ানন্দ সরস্বতী সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থ শুরু করেছেন তৈত্তিরীয় আরণ্যকের মন্ত্র দিয়ে। বলা বাহুল্য, তৈত্তিরীয় আরণ্যক তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণেরই অংশ। তাছাড়াও সত্যার্থ প্রকাশে নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য দয়ানন্দ সরস্বতী গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে বিভিন্ন উপনিষদ থেকে উদ্ধৃতিও দিয়েছেন। সুতরাং, ব্রাহ্মণ এবং তারই অবান্তর বিভাগ আরণ্যক এবং উপনিষদকে কোন ভাবেই অপ্রামাণিক বলা চলে না। সর্বোপরি, দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে যে গ্রন্থের কিছু অংশ দোষদুষ্ট সেই গ্রন্থকে বিষমিশ্রিত অন্নের সমান ত্যাগ করা উচিত। যদি ব্রাহ্মণ গ্রন্থের অংশবিশেষও অপ্রামাণিক হয় তবে দয়ানন্দ সরস্বতীর মতানুসারেই ব্রাহ্মণ গ্রন্থকে অনাদর করা উচিত। কিন্তু দয়ানন্দ সরস্বতী নিজের সত্যার্থ প্রকাশে অসংখ্য বার ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদের উদ্ধৃতি দিয়ে এই গ্রন্থগুলিকে প্রামাণিক বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর কোন অংশকেই অপ্রামাণিক বলার অর্থ দয়ানন্দ সরস্বতীর মতকেই অগ্রাহ্য করা। অন্যথা দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রামাণিকতা সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ে।
সুতরাং, যে সমস্ত দুর্বিদগ্ধ ভ্রান্ত উদ্ধৃতি ও লোকঠকানো সন্দর্ভ উল্লেখ করে ব্রাহ্মণকে বেদভিন্ন বা অপ্রামাণিক বলে প্রতিপাদন করতে চাইছে তাদের মত নিছকই উন্মত্তপ্রলাপ ব্যতীত কিছুই নয়।
,