Skip to main content
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার · ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আনুপূর্বী আনুপূর্বী
অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে
আসন্ন অনুষ্ঠান 11 Oct 2026
Exploring The Dharma of Justice in the Sanskrit Epics
Prof Ruth Vanita
লেখা পাঠান
অনাহতলেখ
5 মিনিট পাঠ

অনাহতলেখ

বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় –
এমন একটি বাক্যকে সত্যি বলে মানতে চেয়ে
আমি সেদিন অনন্ত সূর্যমুখীর মাঠে লুকিয়ে পড়েছিলাম।
DEBASMITA SARKAR
লেখক
আশ্বিন ১৪৩৩
অক্ষরের মাপ:
শেয়ার ও ফিড: RSS

কবিতা গুচ্ছ সূচি (৫টি কবিতার সংকলন)

কবিতা ১

বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় –
এমন একটি বাক্যকে সত্যি বলে মানতে চেয়ে
আমি সেদিন অনন্ত সূর্যমুখীর মাঠে লুকিয়ে পড়েছিলাম।
লুকিয়ে যাওয়া বুঝি সঠিক না, কারণ পৃথিবীর কাছ থেকে মানুষ কোথায় লুকোয়? তার নিজের শরীরে পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত নজরদারি। হাড়েমজ্জায় বংশানুক্রম, রক্তে অনুবাদহীন পূর্বপুরুষ, চোখের নীচে ঘুমহীন কয়েক দশক, আর মস্তিষ্কের ভিতরে যে-অন্ধ সম্পাদক সারারাত জীবন থেকে অসহনীয় অংশগুলি কেটে কেটে একটি সহনীয় আত্মজীবনী বানিয়ে রাখে - তার কাছ থেকে পালাব কোথায়?
তবু গিয়েছিলাম।
হলুদের ভিতর আরও হলুদ,
তার ভিতর কালো বীজের ঘূর্ণি,
তারও ভিতর এমন এক অন্ধকার
যার কথা ফুল কখনও সূর্যকে বলে না।
অনন্ত সূর্যমুখী আমাকে চিনত না।
এই না-চেনা আমার ভালো লেগেছিল।
তারা প্রত্যেকে
নিজের মুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে
আলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
মনে হল,
এটাই হয়তো ফুলেদের প্রাচীনতম দর্শন -
নিজের কেন্দ্রটিকে অন্ধকার রেখে
অন্য কারও দিকে মুখ ফেরানো।
আমি তাদের মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে
ক্রমশ একটি ব্যক্তি থেকে
একটি চলমান অভাব হয়ে উঠছিলাম, আমার নাম পিছনে পড়ে রইল, বয়স আরও খানিক দূরে, যে সমস্ত মানুষ আমাকে ভালোবেসে ভিন্ন সব মধু নামে ডেকেছে তারা আরও দূরে। শুধু একটি শরীর হাঁটছিল, সেও ঠিক শরীর নয় - দুই ফুসফুসের মাঝখানে বাতাসের একটি সাময়িক ব্যবস্থা। বাতাস মেদুর ছিল। আমি তাকে খাচ্ছিলাম। সত্যিই খাচ্ছিলাম তবে মুখ দিয়ে না, কাঁধের পুরোনো ক্লান্তি দিয়ে, চুলের গোড়া দিয়ে, নাভির অন্ধ গর্ত দিয়ে, পায়ের পাতার সেইসব ক্ষুদ্র রেখা দিয়ে যেখানে কোনো জ্যোতিষী আজও আমার ভবিষ্যৎ পড়তে পারেনি।
বড় করে শ্বাস নিলাম।
এত বড় যেন ভিতরের সমস্ত আসবাব সরিয়ে একটি আকাশের জায়গা করতে চাইছি
আর তখনই উপরে কিছু ঘটল।
আমাদের ভাষায়
মাথার উপরের অসীম সাদা বা অন্ধকারের জন্য
আকাশের চেয়ে সুবিধাজনক আরেকটি শব্দ নেই।
সেখানে একটি প্রোজ্জ্বল কিছু নেমে আসছিল।
বস্তু?
আলো?
পাথর?
ভবিষ্যৎ?
কোনো বিলুপ্ত দেবতার অবশিষ্ট বিরামচিহ্ন?
আমি জানি না।
জানা জরুরিও ছিল না।
মানুষ যে-মুহূর্তে কোনো আশ্চর্যকে নাম দেয় সেই মুহূর্তেই তার চারদিকে একটি ছোটো বেড়া উঠে যায়। উল্কা বললে সে আর ঈশ্বর হতে পারে না, ঈশ্বর বললে সে আর কেবল একটি পাথর হতে পারে না, ভ্রম বললে আমাদের সমস্ত অহংকার বেঁচে যায়, অলৌকিক বললে বেঁচে যায় অজ্ঞতা। তাই কোনো নাম না। শুধু দেখলাম প্রোজ্জ্বল অনামাটি আকাশ থেকে নেমে আসছে, আর তার আলোয় সূর্যমুখীর পাতার নিচে রেখাও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
হঠাৎ মনে হল,
মানুষের সমস্ত ইতিহাস যে সামনের দিকের;
পেছনে কত সাম্রাজ্য,
কত প্রেম,
কত গণহত্যা,
কত রান্নাঘরের নীরব দুপুর,
কত অজানা ঘাম, শিশুর গোপন ভয়
পাতার উল্টো পিঠে
নিজেদের ক্ষুদ্র শিরা নিয়ে বেঁচে আছে -
কেউ লিখে রাখেনি।
প্রোজ্জ্বল বস্তুটি আরও কাছে এল
এত কাছে যে আমার ছায়া কোথায় যাবে
স্থির করতে না পেরে
একবার ডানে,
একবার বাঁয়ে,
শেষে আমার পায়ের নীচে ঢুকে গেল।
চোখ বুজলাম
তথাপি অন্ধকার হল না।
দৃশ্য বদলে গেল।
❦   ~   ❦   ~   ❦
কবিতা ২

চোখের একটি আশ্চর্য স্বভাব আছে
তাকে বন্ধ করলেও
সে দৃশ্য উৎপাদন ছাড়ে না।
বরং বাইরের পৃথিবীর চাকরি ছেড়ে ভিতরের দিকে পূর্ণকালীন হয়ে যায়।
আমি সেদিন সেই ভিতরের দৃশ্যে নিজের অনুপস্থিতি দেখলাম।
তারপর দেখলাম
আমি সেই অনুপস্থিতির চেয়েও বড়,
চারদিকে বিস্তীর্ণ সাদা।
যেন সাদা নয়, তারও আগে যে অবস্থা,
যেখানে রংগুলি এখনও নিজেদের স্বতন্ত্র নাম পায়নি।
আমি সেখানে একা নই, যেহেতু একা হওয়ার জন্য একটি অপরের প্রয়োজন হয়।
সেখানে অন্য কেউ ছিল না।
একাকিত্বও ছিল না।
আমি বরং ব্যপ্ত।
এমনভাবে ব্যপ্ত
যেন আমার চামড়ার সমস্ত সীমান্ত
কোনো অজানা রাষ্ট্র
এক মুহূর্তের মধ্যে তুলে নিয়েছে।
আমি হাত তুললাম,
হাতের পরে আরও হাত।
শ্বাস নিলাম
ফুসফুসের পরে আরও শূন্যতা।
আমার বুকের মধ্যে যে হৃদয়টি এতদিন
খুব ব্যক্তিগতভাবে ধুকপুক করত
সে হঠাৎ ব্যক্তিগত অধিকার হারিয়ে
দূরের কিছু নক্ষত্রের সঙ্গে কাঁপতে লাগল।
তখন আবার তাকে দেখলাম
সেই প্রোজ্জ্বল অনামা। এখন সে পাথরের মতো। বিরাট। তার একদিক মাটির ভিতর এত গভীর প্রোথিত যেন পৃথিবীর জন্মের আগেই তার জন্য সেখানে একটি গর্ত রাখা হয়েছিল। অন্য দিক উঠে গেছে আকাশ পেরিয়ে। উঠে গেছে নাকি আকাশটাই যেন তার চারদিকে পরে তৈরি হয়েছে।
আমি তার কাছে গেলাম।
হাত রাখলাম।
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল তালুর রেখাগুলি
এক অচেনা বর্ণমালায় বদলে যাচ্ছে।
পাথরের ভিতর মৃদু বিদ্যুৎ,
অসংখ্য অনুচ্চারিত বাক্যের সমবেত স্নায়ু।
কেউ কথা বলছে না, তবু ভাষা ঘটছে।
আমি তার চারপাশে ঘুরতে শুরু করলাম।
এক পাক।
দুই।
তিন।
তারপর সংখ্যা ভেঙে গেল।
ঘূর্ণনের একটি পর্যায়ে শুরু আর শেষ আলাদা করা যায় না।
আমি সম্ভবত
একই জায়গা দিয়ে বহুবার যাচ্ছিলাম, তবু প্রতিবার জায়গাটি অন্য।
যেমন একই বই বিশ বছর বয়সে এক, চল্লিশে আরেক;
যেমন একই মৃত মানুষ
মৃত্যুর পরেই প্রথমে ক্ষত, তার পরে গন্ধ,
আর বহু পরে
হঠাৎ একটি বিকেলের আলো।
ঘুরতে ঘুরতে নিজের কিছু অংশ পাথরের গায়ে রেখে যাচ্ছিলাম।
নাম, অসফল সংলাপ, দীর্ঘ রাত্রি আর সঙ্গে এক অসমাপ্ত ক্ষমা,
যার পরে আমার বয়স হঠাৎ পাঁচ বছর বেড়ে গিয়েছিল।
তারপর দেখি
আমার বহুদিনের অপমান
পাথরের পায়ের কাছে পড়ে আছে
ছোটো, শুকনো, নিরীহ -
যে জিনিস আমার ভিতরে
এতদিন একটি মহাদেশ দখল করে ছিল
বাইরে এসে তা এক টুকরো খোসার চেয়ে বেশি কিচ্ছু না।
তখনই সন্দেহ -
আমরা কি সত্যিই আমাদের স্মৃতি বহন করি,
নাকি স্মৃতিগুলিই
আমাদের ভিতরে নিজেদের আকার বড় করে আমাদের বহন করে?
আমি উত্তর পেলাম না।
পাথরও দিল না।
ভালোই হল।
উত্তর কখনও কখনও প্রশ্নের সবচেয়ে অকাল মৃত্যু।
❦   ~   ❦   ~   ❦
কবিতা ৩

দূরে একটি ছায়া দাঁড়াল।
সে কখন এল বলতে পারব না।
শুধু হঠাৎ আবিষ্কার করি
অনুপস্থিতির জায়গায় কেউ একজন আছে।
ছায়াটি এত দীর্ঘ
যে তার শরীর কোথায় শেষ
আর আমার দিকে প্রসারিত তার অন্ধকার কোথায় শুরু বুঝতে পারছিলাম না।
আমি তাকে ডাকতে চাইলাম।
কী বলে ডাকব?
নাম না জানলে মানুষ ভয় পায়।
আমি সেদিন
নাম না জানার ভিতরেই এক আশ্চর্য অন্তরঙ্গতা পেলাম।
ডাকার আগেই সে এগিয়ে এল, অথবা এগোয়নি
আমাদের মাঝের দূরত্ব
নিজেই নিজের অস্তিত্বে লজ্জিত হয়ে ছোটো হতে শুরু করল।
ছায়াটি কাছে আসছিল একটি পরম কারণ নিয়ে।
যদিও পরম বলে কিছু আছে কিনা এই কবিতা জানে না।
কবিতা কখনও জানার সমস্ত যন্ত্রপাতি খুলে রেখে
খালি পায়ে এমন একটি ঘরে ঢোকে যেখানে প্রমাণের প্রবেশ নিষেধ।
সেই ঘরেই ছায়াটি আমার কাছে এল
আমি তার মুখ দেখতে পেলাম না, বদলে দুটি বিরাট সাদা ডানা।
তাদের পালক এত উজ্জ্বল
যেন প্রতিটি পালকের ভিতরে
একটি করে ছোটো শীতকাল বরফ হয়ে জমে।
সে আমাকে ঢেকে দিল।
আমি শিশুর মতো বসে পড়লাম।
এই শিশু আমার সমস্ত বয়সের নীচে সারাক্ষণ নিঃশব্দে ছিল
যাকে বড় হওয়া
প্রতিদিন একটু একটু করে মিথ্যে বলতে শিখিয়েছে, বলেছে - কেঁদো না, চাইবে না, নির্ভর করবে না, মুগ্ধ হয়ো না, কারও কোলে মাথা রেখো না, নিজেকে যথেষ্ট ভাবো, পৃথিবীকে বোঝো, সাবধান, সাবধান, সাবধান।
আমি ডানার ভিতর বসে প্রথমবার সমস্ত সাবধানতা খুলে রাখলাম।
আহ্লাদ হচ্ছিল।
মুক্তি, মোক্ষ, পরিত্রাণ – এই সব উচ্চতর শব্দগুলি অনেক সময় শরীরের আনন্দকে অপমান করে।
আমার আহ্লাদ হচ্ছিল, আমি কি আরামে পালকের গায়ে মুখ রাখলাম।
এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
যেন বহুদিন পরে কেউ আমাকে বোঝাতে আসেনি,
আচ্ছাদন দিয়েছে
এবং আমি জানতে পারি
করুণার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ সম্ভবত ব্যাখ্যাহীন।
ছায়ামূর্তিটি তার একটি ডানা ছড়িয়ে দিল। সেই ডানা আমাদের নতুন সাদা জগতের উপর দিয়ে বহুদূর যেতে লাগল। তার প্রান্তে আলো। আলোটি সোজা গেল না। প্রথমে একটি বাঁক। তারপর আর একটি। তারপর নিজেকেই ঘিরে একটি বৃহৎ শক্ত্যাবর্ত - কেন্দ্র থেকে পাক খেতে খেতে বাইরের দিকে প্রসারিত, আবার বাইরে যেতে যেতে কেন্দ্রকে হারায় না। একটি বিশাল আবর্তরেখা দৃশ্যের উপর দিয়ে ছড়িয়ে গেল। আমি তাকিয়ে আছি। মনে হল এ কোনো নতুন প্রতীক না। আমি একে দেখেছি শামুকের খোলে, ছায়াপথে, ঘূর্ণিঝড়ে, আঙুলের ছাপে, মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ভঙ্গিতে, সূর্যমুখীর বীজে, কানের ভিতরের সর্পিল গোলকধাঁধায়, এমনকি যে প্রশ্ন থেকে মানুষ পালাতে পালাতে শেষে আবার সেই প্রশ্নেই ফিরে আসে তার মধ্যেও।
বিশ্ব হয়তো সরলরেখায় লিখিত হয়নি।
আমরাই সুবিধার জন্য
জন্ম-কৈশোর-প্রেম-কর্ম-বার্ধক্য-মৃত্যু
এভাবে অধ্যায় বানিয়েছি।
বিশ্বের গুঢ় বাক্য সম্ভবত আবর্তে লেখা।
একটি শব্দ
নিজের কাছ থেকে যত দূরে যায়
ততই অন্য অর্থ নিয়ে আবার নিজের কাছে ফিরে আসে।
আমি যে আমি বলে
সূর্যমুখীর মাঠে ঢুকেছিলাম
সে কি সেই একই আমি যে এখন এই ডানার ভিতর বসে?
যদি না হয়,
তবে এই কবিতার প্রথম পুরুষটি এখন কার?
এবং যে পড়ছে সে কি বাইরে আছে?
নাকি পড়তে পড়তে
তারও দুই হাতের মধ্যে
ইতিমধ্যে
একটি অদৃশ্য তাপ জমতে শুরু করেছে?
❦   ~   ❦   ~   ❦
কবিতা ৪

শক্ত্যাবর্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে।
যেখানে তার রেখা ছুঁয়েছে সেখানে দৃশ্য জন্ম নিচ্ছে।
একটি ঘাস।
তার উপর শিশির।
একটি সিঁড়ি যার শেষ নেই।
একটি খালি চেয়ার।
একটি রান্নাঘরের জানালা,
একজন বৃদ্ধা মুগ ডাল বাছছেন।
একটি যুদ্ধবিমান খুব দূরে চলে যাচ্ছে।
একটি শিশু কাগজে একটি বৃত্ত এঁকে তার ভিতরে আরেকটি বৃত্ত আঁকছে।
একটি মৃত ভাষার শেষ উচ্চারণকারী মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছেন।
একটি শহরে
একই মুহূর্তে
সাতশো মানুষ ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলছে
এবং তাদের মধ্যে
কমপক্ষে তিনশো জন নিজের কথার অর্থ জানে না।
একটি মর্গে
এক মৃত নারীর নখে সামান্য লাল রং রয়ে গেছে।
একটি আদালতে সত্যকে নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
একটি কবিতায় সত্য নথি হতে অস্বীকার করছে।
সবকিছু শক্ত্যাবর্তের ভিতরে।
মহৎ আর তুচ্ছ কোনো পৃথক সারিতে নেই।
একটি ছায়াপথের পাশে
একটি হারানো চুলের ক্লিপ।
একটি প্রলয়ের পাশে চায়ের দুধ উথলে পড়ছে।
আমি হাসলাম, হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে গভীর অসম্মান
আমরাই করেছি
যখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বহীন-এ ভাগ করেছি।
❦   ~   ❦   ~   ❦
কবিতা ৫

ছায়াটি এবার দুই হাত আমার দিকে বাড়াল। তার তালুতে তাপ। আমি নিজের হাত তুললাম। দুই হাতের মাঝখানে প্রথমে কিছু নেই। তারপর সেই কিছু না থাকা ঘন হতে লাগল। আমাকে একটি বিশাল বল কল্পনা করতে বলা হল। শব্দে ঠিক না, যেন কোনো আদেশ শরীর বুঝে নিল সরাসরি। আমি গোলকটি কল্পনা করলাম। বিরাট। দুই হাতের সীমার অনেক বাইরে। তার ভিতরে ঢুকে গেল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী, সূর্যমুখীর মাঠ, আমার প্রথম ভয়, আমার প্রথম মিথ্যে, যে-দিন প্রথম মৃত্যু দেখেছিলাম, একটি প্রেমের বিছানা, শৈশবের দুপুরে কাঁঠালপাতার উপর রাখা ভাত, কয়েকটি রাজনৈতিক স্লোগান, একটি দাঙ্গার আগুন, একটি মেয়ের লুকিয়ে লেখা চিঠি, নিষিদ্ধ বই, স্বৈরশাসকদের ছবি, আমার মায়ের হাতের শিরা, যেসব মানুষের মুখ আমি ভুলতে চেয়েও ভুলিনি, আর যাদের ভুলে গেছি তাদের অজানা জনপদ। আমি তাকিয়ে দেখি আমার দুই হাতের মাঝে একটি অসম্ভব পৃথিবী ফুলে আছে। তারপর অচেনা স্বর যেন বলল চেষ্টা করে দেখো কতোটা ছোটো করা যায় এই গোলক। আমি হাত কাছে আনলাম, পৃথিবী সংকুচিত হল। আরও চেষ্টা করি, সমুদ্রগুলি ভাঁজ হয়ে গেল। তারও পর, পর্বতমালা নরম হয়ে একটি কুঁচকে যাওয়া কাপড়। তারপর, রাষ্ট্রসীমা মুছে গেল। তারপর, ধর্মগুলি তাদের বড় বড় দরজা হারাল। তারপর আমার ব্যক্তিগত দুঃখ বিশ্বের সমস্ত দুঃখের পাশে এসে নিজের মাপ দেখে চুপ করে গেল। আরও কাছে আনলাম, আরও। আমার তালু প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠছে। মাঝখানে চাপ। কোনো অদৃশ্য পদার্থ নিজেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতে দিচ্ছে না। আমি চেষ্টা করছি। বিশাল গোলক একটি ফলের মাপে। তারপর একটি পাখির ডিম। তারপর একটি চোখ। তারপর একটি বীজ। দুই হাত প্রায় কাছাকাছি। অই স্বরের নির্দেশ : শেষে যতটুকু থাকবে জেনে রেখো এই মুহূর্তে তোমার শক্তি ততটুকু। আমি আরও চাপ দিলাম। আরও। এত কাছে যে আমার দুই তালুর মাঝখানে প্রায় কোনো পৃথিবী থাকার কথা নয়। ঠিক তখন বাস্তবতার ব্যাকরণে একটি ভুল হল। বৃত্তটি বৃত্ত রইল না। তার গোলাকার প্রান্তে কোণ জন্মাল। বাঁধাই জন্মাল। পাতা, মলাট। আমার দুই হাতের মাঝখানে একটি বই ভেসে আছে।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব। এসব বক্তব্য বা মতামত Poorvam-এর নীতি, অবস্থান বা মতামতকে প্রতিফলিত করে না।
স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International (CC BY-NC-ND 4.0) লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
creative commons

আমরা তথ্যের অবাধ মুক্ত প্রবাহে বিশ্বাসী

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইনে বা প্রিন্টে পুনঃপ্রকাশ করুন।

আরও পড়ুন