“আমাদের দেশের খবর জার্মানরা অনেক বেশি রাখেন আমাদের থেকে”, বলেছিলেন আশি ছুঁইছুঁই এক বৃদ্ধ। তিনি আরও বলেছিলেন, “ভাগ্যিস তাঁরা ছিল! নাহলে হিন্দুদের বেদ-বেদান্তের বাণী কীভাবে সাতসাগর আর তেরোনদী পেরোতে পারত বল?” সেই বৃদ্ধের কথা পুরোটা ফেলে দিতে পারিনি। সত্যিই তো প্রাচ্যবিদ্যার যেটুকু চর্চা আমরা করে থাকি বা ইংরাজি অনুবাদের মধ্য দিয়ে যখনই বেদ, পুরাণ বা উপনিষদের পাঠ আমাদের নিতে হয়, তখনই শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করতে হয় জার্মান প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদগণদেরকে।
ভারতের সাথে পাশ্চাত্য দেশগুলির সম্পর্ক ইংরেজ শাসনের বহু পূর্ববর্তী সময় থেকেই বিদ্যমান ছিল। আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরে রেশম, চা, ভারতীয় মশলার সাথে সাথে ভারতীয় চিন্তার কিছু ফসল ছড়িয়ে গিয়েছিল পাশ্চাত্যভূমিতে। কিন্তু যখন কোম্পানি সদলবলে হাজির হল, ভারতের মত ‘বর্বর’ দেশকে সুশিক্ষিত করবার জন্য ঠিক তখনই ইউরোপীয় বিদ্বানসমাজ ভারতবর্ষের সভ্যতার কিছু দিক আবিষ্কার করেছিলেন। আমার মতে, এই আবিষ্কারের দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে। ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষে সুষ্ঠভাবে ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন এবং ভারতের মত বহুভাষাভাষী ও বহুধর্মমত সমন্বিত দেশে ব্যবসা করতে গেলে ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতির কিছু পাঠ নেওয়া ছিল আবশ্যক। খানিকটা অর্থনৈতিক স্বার্থেই ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষকে জানতে আগ্রহী হন। অপর কারণটি হল, পাশ্চাত্যের নবজাগরণ। ইউরোপীয় পন্ডিতরা মনে করেন ভারতবর্ষকে সুশিক্ষিত করতে হবে। তাই পাশ্চাত্য জ্ঞান চর্চাকে হাতিয়ার করেই ইউরোপীয় পণ্ডিতরা ইট, গাছ, পাথর বা মাকড়সা (ঊর্ণনাভ) ভগবানে বিশ্বাসী ভারতীয়দের সুশিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। প্রধানত দুটি দেশ এই নব্যভারত নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল, জার্মানী ও ইংল্যান্ড। কোম্পানির রাজত্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ইউরোপীয় বণিক সমাজের অবাধ অর্থনৈতিক শোষণ এবং জার্মান পণ্ডিতদের প্রাচ্য বিদ্যার চর্চার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ভারতের ইউরোপীয়করণের প্রচেষ্টা। ইউরোপীয় বণিকদের অর্থনৈতিক শোষণের ফলে ভারতবর্ষে একটি ভয়াবহ আর্থসামাজিক পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। কিন্তু জার্মান পন্ডিতদের প্রাচ্যবিদ্যা চর্চা ইউরোপীয় বণিকদের অর্থনৈতিক শোষণের মত ক্ষতিকারক ছিল না। কিন্তু সেখানে ভারতবিদ্বেষ ছিল স্পষ্ট। পন্ডিতরা মনে করে ছিলেন কচ্ছপের উপর হাতি, হাতির উপর পাহাড়, পাহাড়ের উপর পৃথিবী বা সাপের মাথায় সহস্র ভূমণ্ডলের অবস্থান এইসব আজগুবি তত্ত্ব ও তথ্যকে যাঁরা স্বীকার করেন, তাঁদের সভ্য করার প্রয়োজনীয়তা আছে। এছাড়া তাঁদের প্রমাণ করতে হত ভারতীয়রা কতটা যুগের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখেই শুরু হয় প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার। কিন্তু এটা বললে একটি যথেচ্ছ সামান্যীকরণ করা হবে। একদল প্রাচ্যবিদ্ ছিলেন যাঁরা ভারতের প্রতি কোন বিপ্রতীপ মনোভাব রাখতেন না। তাঁরা মূলতঃ সংস্কৃত ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং সংস্কৃত পদ্যসাহিত্যে রীতিকে ভালবেসে প্রাচ্যবিদ্যায় উৎসুক হন। তাহলে আমরা ভারতপ্রেম ও ভারতদ্বেষের নিরিখে প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদগণদের দুটি দলে বিভক্ত করতে পারি। প্রথম দলে ছিলেন, ম্যাক্স মূলার (যিনি ভারতবাসীর এত আপন হয়েছিলেন যে, প্রাচ্যবিদ্যা চর্চা করতে করতেই তাঁর নামের মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটে অর্থাৎ মোক্ষমূলার নামেই সুপরিচিত হন), হুমবোল্ড, শ্লেগেল, কান্ট প্রভৃতি ভারতপ্রেমিকরা, অপরদিকে ছিলেন হেগেল, শ্লায়ারমেকার, শেলিং প্রভৃতির মত ভারতদ্বেষীরা।
আমার এই প্রবন্ধে আমি ভারতদ্বেষী হেগেলের গীতা তথা ভারত চিন্তনের সবিচার ব্যাখ্যা করব।
ভারতীয় জনজীবনের সাথে শ্রীমদ্ভগবদগীতা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কেবল মাত্র ধর্মগ্রন্থ হিসাবে গীতা ভারতীয় জনসমাজে স্থান পাইনি। গীতার দার্শনিক অভিমুখ ও কাব্যিক লালিত্যও অপরিসীম। গান্ধীজী থেকে ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বা অরবিন্দ ঘোষ থেকে মহামান্য তিলক প্রায় প্রত্যেক ভারতীয় বুদ্ধিজীবিই গীতাকে নিজ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করার প্রচেষ্টা করেছেন।
গীতার বক্তা হলেন শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রোতা হলেন অর্জুন । অর্জুন যুদ্ধ ভয়ে ভীত হয়ে রণত্যাগে ব্রতী হলেন ঠিক তখনই অর্জুনকে স্বধর্মে প্রবৃত্ত করার জন্য কৃষ্ণ গীতার অবতারণা করেন। মহাভারতের ভীষ্মপর্বে স্বয়ং বেদব্যাস গীতা শাস্ত্রকে গ্রন্থাবদ্ধ করেছিলেন, এই রকমই পৌরাণিক আখ্যান আমরা পেয়ে থাকি। গীতার পৌরাণিক আখ্যান যাই থাকুক না কেন ভারতপ্রেমী পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদ্গণ গীতাকে একটি উন্নতমানের সাহিত্যিক নিদর্শন হিসাবেই প্রথম থেকে গ্রহণ করেন। তাঁদের গীতার পৌরাণিক উৎস অন্বেষণের প্রতি খুব একটা উৎসাহ ছিল না। বিশেষত সংস্কৃত ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন হিসাবেই তাঁরা গীতা গ্রন্থটি কে গ্রহণ করেছিলেন।
এবার আসি প্রধান প্রসঙ্গে। হেগেলের গীতাচর্চার মূলে ছিল হুমবোল্ডের একটি বিশেষ প্রভাব। হুমবোল্ড ছিলেন সংস্কৃতানুরাগী। তিনি মনে করতেন সংস্কৃত ভাষা প্রায় সবকটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার জননী। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি হুমবোল্ডের একটি বিশেষ আকর্ষণের সূচনা ঘটে সংস্কৃত ভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি গীতার মত সুবিদিত গ্রন্থকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। এরই মধ্যে গীতার উপর হুমবোল্ড একটি ব্যাখ্যা লিখে ফেলেন, এবং এই ব্যাখ্যার উপর হেগেল লিখে ফেলেন দুটি প্রবন্ধ[1]। এখান থেকেই হেগেলের গীতাপাঠ শুরু। হেগেলের প্রবন্ধদুটি পড়লেই বোঝা যায় তিনি গীতাকে হুমবোল্ডের মত খুব সদর্থক দৃষ্টিতে নেননি। হেগেল গীতার সমালোচনা তো করেইছেন, তার সাথে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিদ্বেষ প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশও করেছেন। হেগেলের চোখে ভারতের সভ্যতার উৎকর্ষতা কোনদিনই ধরা পড়েনি। হেগেলের অনুগামীরা এবং পরবর্তী যুগের হাইডেগার ও হুসার্লের মত দার্শনিকরাও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের বিদ্বেষই প্রকাশ করেছেন। হেগেল ও হেগেলানুগামীরা মনে করতেন ভারতের নিজস্ব ‘দর্শন ও বিজ্ঞান’ কিছুই ছিল না। কারণ দর্শন ও বিজ্ঞানের বিকাশ কেবলমাত্র ইউরোপীয় সমাজবিবর্তনের বিশেষ একস্তরে সংগঠিত হয়েছিল, এই ছিল তাঁদের স্পষ্ট অভিমত।
হুমবোল্ড হেগেলের দার্শনিক ভাবেরও বিরোধী ছিলেন। ভাষাতাত্ত্বিক হবার জন্য তিনি মনে করতেন পরম চৈতন্যের অভিব্যক্তি কেবল ভাষাতাত্ত্বিকভাবেই সম্ভব। চেতনার এই ভাষিক বিকাশ হেগেলের মতে গ্রহণযোগ্য ছিল না। হুমবোল্ডের মতে সংস্কৃত ছিল অন্যতম প্রাচীন, ঐশ্বরিক ভাষা যার মধ্য দিয়েই পরম চৈতন্যের প্রকাশ ঘটা সম্ভব। (হুমবোল্ডের মতের সাথে প্রাচীন ভারতের অনেক ভাষাচিন্তকদের মতের সাদৃশ্য থাকতে পারে, এইসব ভাষাতাত্ত্বিকরা ভাষাকে কেবল যাপনের অঙ্গ হিসাবে না দেখে ঐশ্বরিক বস্তু হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন)
সংস্কৃতভাষার ঐশ্বরিকত্ব প্রতিস্থাপনের সাথে সাথে হুমবোল্ডের হিন্দুধর্ম জনজীবন নিয়েও নিজের গভীর অনুরাগ প্রকাশ করেছিলেন। তাই শ্লেগেলকৃত গীতার লাতিন অনুবাদ পড়ে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁর সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেন।
হুমবোল্ডের মতে গীতা প্রথমশ্রেণীর দার্শনিক গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম। তিনি মনে করতেন যাঁরা কেবল গীতার অনুবাদ পড়েন তাঁরা বিশেষভাবে মূলগ্রন্থপাঠের সুখ থেকে বঞ্চিত হন। তাই গীতার অনুবাদ হুমবোল্ডের কাছে ছিল একটি রঙবিহীন ছবি মাত্র। হুমবোল্ড আরও মনে করেছিলেন গীতা দার্শনিকভাবেই কেবল সমৃদ্ধ নয়, এর কাব্যিক সৌন্দর্যও অতুলনীয়। তাই তিনি জার্মান পন্ডিতদের বারংবার সাবধান করেছিলেন গীতাকে কোন নির্দিষ্ট দার্শনিক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত না করতে। একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ অবলম্বন করে, যদি গীতার তত্ত্বকে মূল্যায়ন করা যায় তাহলে তা বৌদ্ধিকভাবে হিতকর হবে, এই ছিল হুমবোল্ডের গীতা অনুধ্যান।
গীতার একটি নিজস্ব দার্শনিক মর্ম আছে, কোন পৌরাণিক বা লোকায়ত অতিকথনের সাথে সেটিকে গুলিয়ে ফেলা উচিত হবে না। ঐতিহাসিকতার প্রেক্ষাপটে যদি কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ বিচার করতে যাই, তাহলে আমাদের পদে পদে সমস্যা হতে পারে। কেবলমাত্র দার্শনিক বিচারের মধ্য দিয়েই গীতার মূল্য বোঝা সম্ভব। কিন্তু হেগেল এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন না। হুমবোল্ড বলেছিলেন গীতাকে অন্য কোনো ধরণের অতিকথনের সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। কিন্তু, হেগেল এই সতর্ক বাণী উপেক্ষা করেই তাঁর প্রবন্ধ দুটি লেখেন।
নবজাগরণের সময় ইউরোপীয় দর্শন চর্চার অগ্রগতিতে কান্ট ও হেগেলের অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য। তাঁরা দুজনেই যুক্তি নির্ভর বিচারের মধ্য দিয়েই দর্শনের ক্রমবিকাশের পথ কে সুবিন্যস্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কান্ট ও হেগেলের যুক্তি নির্ভরতার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। তাঁরা দুজনেই মানতেন পরমসত্তার বিকাশ বা অভিব্যক্তি যৌক্তিকতার মধ্যে দিয়েই হবে। কিন্তু হেগেলীয় যুক্তির ধারণা কান্টীয় যুক্তির ধারণা থেকে ছিল সম্পূর্ণভাবে পৃথক।
কান্ট মনে করতেন যে যৌক্তিকতার কোনো দ্বান্দিক প্রকাশ থাকতে পারে না৷ অপরিবর্তনীয়তা ও সার্বিকতাই হল যুক্তির প্রধান কাঠামো৷ অপরদিকে হেগেল ছিলেন দ্বান্দ্বিকতার জনক। তিনি যুক্তির অভিব্যক্তিকে দ্বন্দের মধ্যে দিয়েই দেখতে পছন্দ করেছিলেন।
হুমবোল্ড ছিলেন কান্টপন্থী। তিনি দ্বান্দ্বিকপদ্ধতি তে কোনো কিছুর মূল্যায়ণ কে মেনে নিতে পারেন নি। কান্টের মতোই তিনি সার্বিক বা বিশ্বজনীন একটি তাত্ত্বিক পদ্ধতির নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন গীতার মতো কোনো শাস্ত্র কে অনুধাবন করবার জন্য । পরিবর্তনশীল কোনো পদ্ধতিই বিচারের হাতিয়ার হতে পারেনা, তা তিনি বুঝেছিলেন কাণ্টের অনুপ্রেরণাতেই।
কান্টের মতো হুমবোল্ডও ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতাকে উচ্চাসনে বসিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোনো স্বার্থকে চরিতার্থ করার মধ্যদিয়েই মানবজীবনের পুরুষার্থ সিদ্ধি হতে পারে, এই মনোভাবকে হুমবোল্ড বর্জন করেছিলেন। হেগেল মনে করতেন রাষ্ট্র হল ঈশ্বরের পদচিহ্ণ, ঐশ্বরিক রাষ্ট্রের রক্ষা ও দায়বদ্ধতা প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই মনুষ্য জীবনের সার্থকতা আসে। হুমবোল্ড দেখেছিলেন গীতার ব্যাখ্যাতে হেগেল এই প্রসঙ্গ গুলির অবতারণা করেছেন। কিন্তু এই অবতারণাকে তাঁর ভালো লাগেনি৷ হেগেলের যথার্থ প্রত্যুত্তর না দিলেও, তিনি জার্মান পন্ডিত সমাজকে সতর্ক করেছিলেন বারংবার। হুমবোল্ড বিশ্বাস করতেন কিছু অনুবাদ পড়ে গীতার মতো উচ্চমানের দার্শনিক গ্রন্থের বিচার করা হেগেলের উচিত হয়নি।
ফ্রিডম বা স্বাধীনতার বিচারেও হেগেল হুমবোল্ডের দ্বন্দ্ব ছিল বিদ্যমান। কান্টের অনুগামী হুমবোল্ড মনে করতেন যদি একজন মানুষ নিজের স্বভাবগত নৈতিকতার সাথে অবগত হন তাহলে তিনি নিজেকে স্বাধীন বা স্বরাট হিসাবে জানতে পারেন। গীতার অনেকাংশকের ব্যাখ্যা হুমবোল্ড এইরকম ভাবেই করবার চেষ্টা করেন। কিন্তু হেগেল মনে করতেন স্বাধীন ইচ্ছা যুক্তি নির্ভর রাষ্ট্রের কাছে যদি নিবেদিত হয়, তাহলেই স্বাধীন ইচ্ছার প্রকৃত মূল্য দেওয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে। সীমিত ক্ষুদ্র বিষয়ীগত চেতনা স্বাধীন ইচ্ছার পূর্ণ মর্যাদা দিতে পারে না। তাই একমাত্র রাষ্ট্রের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিপালন সম্ভব। রাষ্ট্র যুক্তির মূর্ত প্রকাশ, এবং এর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যই যৌক্তিক মানবের প্রধান কর্তব্য।
এতো গেল দর্শনের তাত্ত্বিক কচকচানি। কিন্তু এবার আমরা দেখব কোন কোন দার্শনিক পূর্বস্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে হেগেল গীতার বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
১) বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা
২) যোগ
৩) ব্রহ্ম বা পরমপুরুষবাদ
বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা গীতার অন্যতম একটি দার্শনিক ভিত্তি। গীতা মতে কৃষ্ণ স্বয়ং এই ব্যবস্থার প্রবর্তক। আমরা দেখতে পাই কৃষ্ণ বলছেন,
“চাতুর্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ
তস্যাকর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।‘’[2]
এর বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় কৃষ্ণ এই চারটি বর্ণের সৃষ্টি করেছেন গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুযায়ী। এবং এই ব্যবস্থার (বর্ণাশ্রম) অন্তর্ভুক্ত যারা, তাঁরা প্রত্যেকেই স্বধর্ম পালন করবেন এবং নিজেকে অকর্তা এবং ঈশ্বরকে কর্তা হিসাবে মানবেন। এবং ঠিক এইখানেই হেগেলের সমস্যা ।
হেগেল মনে করেছিলেন এই ধরণের সমাজব্যবস্থা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র বা ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিরোধী। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, হেগেল ভুল কিছু বলেননি। নিজেকে অকর্তা ভেবে যদি কর্ম করা হয় তাহলে ব্যক্তি-স্বাধীনতার উত্তরণ হয় না, বরং হানিই হয়। কিন্তু হেগেল হয়তো কর্তৃত্বের ভারতীয় ব্যাখ্যাটি বুঝতে পারেননি। এইক্ষেত্রে আমরা শরণাপন্ন হতে পারি আরেকজন বিখ্যাত চিন্তকের যিনি কিনা গীতাকে তাঁর জীবনের সর্বস্ব মানতেন, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গান্ধীজী জাতিভেদপ্রথা বা সেই অর্থে বর্ণাশ্রম ধর্মের তীব্রবিরোধী ছিলেন। কিন্তু এই শ্লোকপ্রসঙ্গে তাঁর মত ছিল ভিন্ন। তিনি এই শ্লোকের মর্মার্থ করেছিলেন, অনাসক্ত চিত্তে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনা।[3] নিজেকে অকর্তা ভাবা ও অনাসক্ত চিত্ত হবার মধ্যে কিন্তু তফাৎ আছে। অনাসক্ত চিত্তের অর্থ হল, কর্মফল বিমুখ মনোভাব, যা অনেকটা কান্টীয় নীতিশাস্ত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু অকর্তৃত্বের অর্থ হল কর্তাবুদ্ধি ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ, যা দাস্যভক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য। পরম্পরাগতভাবেও গীতার আদিভাষ্যকার ভগবতপাদ আচার্য শঙ্কর অনাসক্ত চিত্তে কর্মসম্পাদনাকেই এই শ্লোকের ভাষ্য হিসাবে স্বীকার করেন। অনাসক্ত চিত্তে কর্মসম্পাদনার মধ্য দিয়েই চিত্ত কলুষতা দূর হয় এবং মুমুক্ষুত্বের পথ সুগম হয়। হেগেলের শঙ্করাচার্যের মতের সাথে পরিচিত ছিল কি না স্পষ্টভাবে জানি না, পরিচয় না থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। ভারতবর্ষের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক বাহক যে যে গ্রন্থরাজি আছে তাদের ব্যাখ্যা মূলতঃ আদি শঙ্কর করেছিলেন। জার্মান পন্ডিতরাও শঙ্করাচার্যের অবদান সম্বন্ধে সুবিদিত ছিলেন। কিন্তু বর্ণ ধর্ম নিয়ে এহেন ধারণা হেগেল পোষণ করেছিলেন কারণ তিনি হয়তো শঙ্করের গীতাভাষ্য নিয়ে ততটা ওয়াকিবহল ছিলেন না। বর্ণাশ্রম নির্ভর ভারতীয় সমাজব্যবস্থা প্রবর্তক কোন রাষ্ট্রের মত যৌক্তিক প্রতিষ্ঠান নয় বরং একজন ব্যক্তি যিনি কিনা স্বঘোষিত ঈশ্বর, এরফলে হেগেলের স্বাভাবিক ভাবেই মনে হয় যা রাষ্ট্রদ্বারা প্রণোদিত নয়, তা কোনভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। তাই ভারতীয় বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা ত্রুটিযুক্ত। কিন্তু ভারতবর্ষে সমাজব্যবস্থার তথা রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্রমবিবর্তন পাশ্চাত্যের মত ঐতিহাসিকভাবে একরৈখিক ছিল না। রাষ্ট্র, সমাজ প্রভৃতির সাথে জড়িয়ে ছিল নানা ধরণের ধার্মিক, পৌরাণিক অতিকথন। এই অতিকথনগুলি থেকে আলাদা করে কেবল যুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভারতবর্ষের বুকে স্থাপন করা ছিল অসম্ভব। পুরাণে অনেক অনেক আখ্যান আছে যেখানে পৌরাণিক চরিত্ররা রাষ্ট্রের নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং এই পৌরাণিক আখ্যানগুলির শিকড় খুবই গভীরে। শুদ্ধযুক্তি দিয়ে যদি রাষ্ট্রগঠনের ভাবনা করা হয়, তাহলে এই পৌরাণিক অতিকথনগুলি চিরতরে লুপ্ত হবে। তাই হেগেলীয় রাষ্ট্রনির্মাণের ভাবনা ভারতবর্ষের মত দেশে কতটা উপযুক্ত, সেইনিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাবে। হয়তো হেগেল ভেবেছিলেন ইউরোপে যেমনভাবে রাষ্ট্রের বিকাশ হয়েছিল, ঠিক সেইভাবেই ভারতবর্ষে রাষ্ট্রের বিকাশ হয়েছে। কিন্তু ভারতচর্চার মধ্য দিয়ে হেগেল চরমভাবে আশাহত হন এবং সেই সঙ্গে তাঁর মনে ভারতের প্রতি একটি বিপ্রতীপ ভাবনার জন্ম নেয়। হেগেল ভারতীয় ধর্ম, দর্শন বা পৌরাণিক আখ্যান কোন কিছুর মধ্যে পার্থক্য করার কোনো প্রয়াস দেখতে পাননি। জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় অধিবিদ্যার অবাধ প্রবেশ বা পুরাণের লোককথায় রাষ্ট্রগঠনের কাহিনী দেখে বীতশ্রদ্ধ হেগেল ভেবেই বসেন ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ অপরিপক্ক। তাই হেগেলের চোখে ভারতীয় সভ্যতা ছিল অতিকথন নির্ভর, যুক্তি-বিবর্জিত রূপকথার গল্পমাত্র।
এবার আসি দ্বিতীয় আপত্তিতে। হেগেল গীতাতে বর্ণিত যোগতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে নিজের কিছু মতামত লিপিবদ্ধ করেন। গীতার প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে “যোগ” শব্দটির উপস্থিতি তাঁকে হতবাক করেছিল। হেগেলের কাছে “যোগ” ছিল ভারতীয় আস্তিক দর্শন সম্প্রদায়ের অন্তর্গত একটি সম্প্রদায়মাত্র। কিন্তু “কর্মযোগ”, “সন্ন্যাসযোগ”, “ভক্তিযোগ” প্রভৃতি অধ্যায়ের নামের সাথে সাথে “যোগ” শব্দটির ব্যবহার তাঁকে কৌতুহলী করে তুলেছিল। কিন্তু এই বিষয়টির মীমাংসা হয় যখন হেগেল “যোগ”-কে কেবলমাত্র একটি সম্প্রদায়াবদ্ধ না করে ঈশ্বরের সাথে জীবাত্মার যুক্ত হবার একটি মাধ্যম হিসাবে গণ্য করেন। হেগেল নতুন করে এবিষয়ে আর কিছু লেখেননি। কিন্তু তিনি গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকটি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, গীতাতে “যোগ” শব্দটি যথেচ্ছ প্রয়োগ হয়েছে। গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের এই শ্লোকটি এবার দেখা যাক।
“যৎসাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদ্যোগৈরপি গম্যতে।
একং সাংখ্যঞ্চ যোগঞ্চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।। “[4]
এর বঙ্গানুবাদ করলে হয় সাংখ্যগণ যে স্থান প্রাপ্ত হয়ে থাকেন, যোগিগ্ণও সেই স্থান প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। যিনি সাংখ্য ও যোগকে সমদৃষ্টিতে দর্শন করেন, তিনিই প্রকৃত দ্রষ্টা। এবার হেগেলের প্রশ্ন হল, যোগ ও সাংখ্য দুটি আলাদা দার্শনিক সম্প্রদায় হলে, একে এক করে দেখার কারণ কী? সাংখ্য ও যোগের মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও আধিবিদ্যক বিষয়ে অনেক সাদৃশ্য থাকলেও, এদের সাম্প্রদায়িক অস্ত্বিত্ব কিন্তু পৃথক। তাই এই শ্লোকে যেভাবে সাংখ্য ও যোগকে একীভূত করা হয়েছে তা হেগেলের মতে অনুচিত। হেগেল ভেবেছিলেন সাংখ্য ও যোগ যেহেতু আস্তিক দর্শনান্তর্গত এবং যেহেতু এদের অন্তিম পুরুষার্থ মোক্ষ, তাই আপাত সদৃশ অথচ অস্তিত্বগতভাবে পৃথক দার্শনিক সম্প্রদায় দুটিকে সমভাবে দেখার কথা গীতাতে বলা হয়েছে। গীতা ভাষ্যে[5] আচার্য শংকর সাংখ্য ও যোগ শব্দের ব্যাখ্যা অন্যভাবে করেছেন। আচার্যের মতে সাংখ্য শব্দটির অর্থ হল বিদ্বৎসন্ন্যাস অর্থাৎ জ্ঞানীর সংসারের প্রতি অনাসক্তি এবং যোগ শব্দের তাৎপর্য হল ফলাকাঙ্ক্ষা বর্জিত ও ঈশ্বরে সমর্পিত বেদ বিহত কর্মানুষ্ঠান। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি সাংখ্য ও যোগের যে প্রচলিতা অর্থ বিদ্যমান তার সাথে ব্যাখ্যার অর্থের দূরদূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই।
শংকর কৃত সাংখ্য ও যোগ শব্দের অর্থ হেগেলের নিকট পরিচিত ছিল না। কিন্তু একথা সত্য বহু জার্মান পন্ডিত শংকরের উপনিষদ, গীতাভাষ্য প্রভৃতির খোঁজ খবর রাখতেন। শোপেনহাওয়ার এই সমস্ত পন্ডিতদের মধ্যে ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু ব্যাখ্যা নির্ভর ভারতীয় শাস্ত্রের মর্মাথ বুঝতে আগ্রহী হেগেল কোনো ব্যাখ্যার আঙ্গিকে গীতার দার্শনিক সিদ্ধান্ত কে বোঝার চেষ্টা করলেন না, এ কথা ভেবে তাজ্জব হতে হয়। গীতার কিছু অংশের ইংরেজী অনুবাদ পড়ে এবং পারিভাষিক কিছু শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ দেখেই হেগেল খুশি ছিলেন। যদি হেগেলের তাঁর গীতা বিষয়ক পড়াশোনার পাশাপাশি গীতার প্রচলিত ভাষ্য সম্বন্ধও কিছু অবগত থাকতেন, তাহলে হয়ত আর গীতাকে অপরিপক্ক দার্শনিক সিদ্ধান্ত হিসাবে তাঁর মনে হত না।
এবার আসি তৃতীয় তথা শেষ আপত্তি তে। এই আপত্তিটি হল পরমপুরুষ বিষয়ক আপত্তি। প্রথমেই বলি এই আপত্তির মূলে আছেন গীতার প্রধান চরিত্র কৃষ্ণ। কৃষ্ণ হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো সাধারণ পৌরাণিক চরিত্র নন, তিনি পূর্ণব্রহ্মের মনুষ্যপ্রকাশ। গীতামুখে কৃষ্ণ বহুবার তাঁর সেই অবতারত্বের কথা বারবার প্রকাশ করেছেন। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন হতে পারে একজন সাধারণ মনুষ্য দেহধারী মানুষ কিভাবে স্বয়ং পরম চৈতন্য হতে পারেন।
আগেই বলেছি কৃষ্ণকে ভারতীয় জনজীবনে কেবলমাত্র কোনো পৌরাণিক চরিত্র হিসাবে দেখা হয়নি। ব্যক্তি কৃষ্ণের সাথে সাথে কৃষ্ণের একটি তাত্ত্বিক সত্তা আছে। ব্যক্তি ও তত্ত্ব এই দুইয়ের মিলনেই কৃষ্ণ চরিত্র ফুটে উঠেছে ভারতীয় মননে৷ কিন্তু হেগেল এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভাবে অনভিজ্ঞ ছিলেন।
আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, হেগেল বিমূর্ত ঐশ্বরিক তত্ত্বের সাথে ভারতীয় সমাজে প্রসিদ্ধ ঈশ্বর তত্ত্বকে এক করে ফেলেছিলেন। দেখাটা অস্বাভাবিকও কিছু না। হেগেলের চিন্তাতন্ত্রে ঈশ্বরের যে ধারণা আছে তা absolute spirit নামে আখ্যায়িত। এই absolute spirit হল পরমচৈতন্যের দ্যোতক। স্বাভাবিক ভাবেই হেগেলের ঈশ্বর নিরাকার, অসীম শাশ্বত। তাই ভারতীয় সমাজে প্রচলিত অবতারবাদের প্রতি হেগেল তাঁর বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করেন। তা ছাড়া বাইবেল প্রভৃতি শাস্ত্রে যিশুকে ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে দেখা হয়। যিশু সেই নিরাকার পরমচৈতন্যের প্রকাশ, কিন্তু স্বয়ং পরমচৈতন্য নন। কিন্তু কৃষ্ণের ক্ষেত্রে তা উলটো। কৃষ্ণ ঈশ্বরের পুত্র নন বরং স্বয়ং ঈশ্বর। তাই বাইবেলের পিতাপুত্রেরর তত্ত্ব দিয়ে যদি কৃষ্ণ তত্ত্বের বিশ্লেষণে কেউ প্রয়াসী হন, তাহলে সেটি সমুচিত হবে না। হেগেল এ বিষয়ে কোনো কিছু স্পষ্ট ভাবে লেখেন নি। কিন্তু তিনি যে খ্রীষ্টাণ তত্ত্বের পরম পিতার নিরিখেই যে absolute spirit এর ধারণাটি নির্মাণ করেন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তাইহ হয়ত এই কারণের জন্যই মনুষ্যাকৃতি বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তির ঐশ্বরিক অস্তিত্বকে হেগেল ভালো চোখে গ্রহণ করেন নি।
কৃষ্ণ চরিত্র সম্বন্ধে জ্ঞান লাভের প্রামাণিক দুটি গ্রন্থ ভারতীয় তথা হিন্দু জনজীবনে প্রচলিত, মহাভারত ও শ্রীমদ্ভাগবত। গীতা মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্ভুক্ত। মহাভারতে বর্ণিত কৃষ্ণচরিত্র ভাগবতের কৃষ্ণচরিত্রের থেকে একটু আলাদা। ভাগবতে কৃষ্ণের সামগ্রিক লীলাচিত্র পাওয়া যেখানে মহাভারতে কৃষ্ণ কেবল মাত্র পাণ্ডব সখা, একজন রাষ্ট্রনায়ক, অর্জুনের সারথি এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রধান কুশীলব। কিন্তু ভাগবত ও মহাভারতের একটি জায়গাতেই সাদৃশ্য আছে। দুই গ্রন্থই কৃষ্ণের ভগবৎ সত্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেনি৷ দুই গ্রন্থের মতেই কৃষ্ণ পরমপুরুষ। মহাভারতে কৃষ্ণের পরমপুরুষত্বের মধ্যে মানবিক উত্তরণের ধাপ আছে। ভাগবতে কৃষ্ণ ভক্তমানসবিগ্রহ। ভক্তের কল্যাণের জন্য তাঁর লীলার বিস্তার।
গীতায় বর্ণিত কৃষ্ণচরিত্রটি মহাভারতীয় কৃষ্ণচরিত্রের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কৃষ্ণ এখানে অর্জুনের সখা, গুরু এবং নিজের ভাগবতী সত্তার ঘোষণাকারী। উপনিষদের ঋষিদের মতো তিনি ব্রহ্মজ্ঞ , ব্রহ্মজ্ঞানের ধারক। এই বিশেষ চরিত্রায়ণের জন্যেই গীতাকে সব উপনিষদের সারসমূহ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। হঠাৎ করে লীলাপুরুষোত্তম কৃষ্ণ ঔপনিষদিক ঋষিদের মতো তত্ত্বজ্ঞান প্রদাতা হয়ে উঠলেন কেন? অনেকেই এই প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন ভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। অনেকে লীলার তারতম্য অনুযায়ী কৃষ্ণচরিত্রের বিশ্লেষণ করেও থাকেন। কিন্তু আমার মনে হয় কৃষ্ণচরিত্র সম্বন্ধে যদি কিছু ধারণা আমাদের সঠিক ভাবে পেতে হয় তাহলে কোনো একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে চরিত্রের মূল্যায়ন করলে চলবে। কৃষ্ণ চরিত্রের বিবর্তনের ধাপ গুলি খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি সামগ্রিক দৃষ্টি কোণ দিয়েই আমাদের চরিত্রটির মূল্যায়ন করতে হবে। রাসবিহারী কৃষ্ণ থেকে পার্থসারথি কৃষ্ণ, এই চারিত্রিক ক্রমবিকাশের যাত্রটি আমাদের খুব মনোযোগ দিয়ে বোঝা দরকার। কোনো একটি বিশেষ ঘটনার নিরিখে যদি কৃষ্ণ চরিত্রের বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে হয়ত চরিত্রটির প্রতি অবিচার হতে পারে বলে, আমার বিশ্বাস।
কৃষ্ণের চরিত্রের সামগ্রিক চিত্রায়ণটি বুঝতে গেলে কোনো একটি বিশেষ গ্রন্থকে অবলম্বন করলে হবে না। এর জন্য পুরো প্রেক্ষাপটের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। নিরাকার ব্রহ্ম কখন সাকার রূপ নেন, বা তিনি কখন রাষ্ট্রের নির্মাতা হয়ে আশ্রমধর্মের সূচনা করেন, বা কখন তিনি নিরাসক্ত কর্মফলের দাতা ও গ্রহীতা দুই হন, এই সব প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়ার জন্য হেগেলকে গীতা ব্যতীত অন্যান্য কৃষ্ণ বিষয়ক গ্রন্থ গুলি পড়তে হত। (এটা মনে করার কোনো কারণ নেই সেই সময় জার্মানিতে ভাগবত, হরিবংশ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রভৃতি সম্বন্ধে কেউই অবগত ছিলেন না।) কিন্তু হেগেল গীতার কিছু অংশের অনুবাদ পড়েই একটি নিজস্ব ন্যারেটিভ সৃষ্টি করেছিলেন এবং এর মধ্যে দিয়েই তিনি কৃষ্ণ চরিত্রের বিচার করতে চেয়েছিলেন । হেগেল কৃত সেই ন্যারেটিভ কৃষ্ণের মতো বৃহদায়তন চরিত্রের বিচার করতে কতটা কার্যকর হয়েছিল, সেই নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
হেগেলের কাছে পরমচৈতন্যের কোনো মূর্ত বিগ্রহ নেই, তা আকার আকৃতি বিহীন জন্মমৃত্যু রহিত এক শাশ্বত অসীম সত্তা। তাই হেগেলের মনুষ্যাকৃতি ঈশ্বরকে নিয়ে বিপ্রতীপ ভাবনা ছিল। এবং মনুষ্যাকৃতি ঈশ্বরের ভাবনা কতটা যুক্তি নির্ভর, তা নিয়েও হেগেল সন্দিহান ছিলেন। অসীমের মনুষ্যদেহ হলে অসীমত্বের হানি হতে পারে , হেগেল হয়ত এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষ সচেতনতা অবলম্বন করেছিলেন।
সাধারণত পরম চৈতন্য আর মনুষদেহ ধারী ঈশ্বরাবতারের মধ্যে একটি পার্থক্য বিদ্যমান। পরমচৈতন্য বা absolute spirit বিমূর্ত সত্তা, অপর ঈশ্বরের অবতার বা দৈবীপ্রতিনিধিগণ মূর্ত সত্তার অধিকারী।
ভারতীয় আস্তিক সম্প্রদায়ের অন্তর্গত উত্তর মীমাংসা দর্শনে স্বীকার করা হয়, ব্রহ্ম মায়ার শক্তি অবলম্বন করে সোপাধিক ঈশ্বরত্ব প্রাপ্ত হন। এই সোপাধিক ঈশ্বরই দুষ্টের দমন আর সাধু জনের পালনের জন্য অবতার রূপে ধরাতলে অবতরণ করেন। এই ঈশ্বর ভক্তের খুব নিকটে অবস্থান করেন, তিনি ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু । কিন্তু ব্রহ্ম ভক্তবাঞ্চাকল্পতরু নন, কেবল নির্বিকার দ্রষ্টা। হেগেল দেখেছিলেন কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার বা মনুষ্য প্রকাশ হয়ে সেই শাশ্বত পরমচৈতন্য সত্তার সাথে নিজের একত্ব প্রতিস্থাপন করেছিলেন। মনুষ্যাকৃতি সসীম ঈশাবতার কৃষ্ণ কীভাবে অসীম নিরাকার ব্রহ্মের সাথে তাদাত্ম্য হতে পারেন? হেগেলের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর ছিলনা। বরং কৃষ্ণের একসঙ্গে অসীম ও সসীমতায় বিচরণ তাঁর কাছে যৌক্তিক ভাবে অসংগতিপূর্ণ লাগে।
হেগেলের এই চিন্তনের পিছনে লুকিয়ে আছে দুটি প্রধান পূর্বশর্ত। প্রথমটি হল হেগেলের খ্রীষ্টিয় দৃষ্টিকোণে ভারতীয় ঈশ্বরতত্ত্বের অন্বেষণ এবং দ্বিতীয়টি হল বেদান্তের ব্রহ্মবাদের সাথে absolute spirit এর ধারণাগত সংমিশ্রণ৷ হেগেলের ধর্ম তত্ত্বে ঈশ্বরকে অসীম ও নিরাকার এই দুই বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় এই বিশেষণ দুটি গ্রহণের পিছনে ভারতীয় দর্শনের নিরাকার ব্রহ্মবাদের একটি প্রকট প্রভাব আছে৷ বহু জার্মান পণ্ডিতদের মতো হেগেল শংকরাচার্যের নিরাকার ব্রহ্মবাদের ধারণাকে নিজের চিন্তাপদ্ধতিতে একটি বিশেষ স্থান দেন।( অনেক হেগেলবিশেষজ্ঞরা নিরাকার ব্রহ্মের সাথে হেগেলীয় স্পিরিটের মধ্যে বহু ধারণাগত সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন)। হেগেল হয়ত ভেবেছিলেন হিন্দুদের পরমচৈতন্য বা ব্রহ্ম absolute spirit এর মতোই অসীম ও নিরাকার। তাই কৃষ্ণের মতো মনুষ্যাকৃতি পুরুষ যখন নিজেকে ব্রহ্মের অসীম সত্তার সাথে একত্ব প্রতিস্থাপন করেন, তখনই যুক্তির পূজারী হেগেলের মনে তাত্ত্বিক দোলাচলের সৃষ্টি হয়৷
হেগেলের মনে সুপ্ত বাসনা ছিল পেগান হিন্দুদের প্রাচীন পৌত্তলিক আস্থাকে বিদ্রুপ করা। তাছাড়া হেগেলের গীতা নিয়ে হিন্দু পন্ডিত, দার্শনিকদের এত মাতামাতি ভালো লাগেনি। কারণ গীতাতে নিরাকার ব্রহ্মের কথা প্রকট ভাবে উল্লেখ নেই। তাঁর আরো আশ্চর্য লেগেছিল একজন মনুষ্যাকৃতি স্বঘোষিত ঈশ্বর কিভাবে নিজেকে অসীম বলে দাবি করতে পারেন, এটি ভেবে।যীশু ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর, ‘সর্বভূতমহেশ্বর’ স্বয়ং লোকপিতা, সৃষ্টির অনাদি বিধাতা। হেগেল ভেবেছিলেন শংকরের ব্রহ্ম তাঁর absolute spirit এর সদৃশ, তাই বৈদান্তিক ব্রহ্মবাদ তাঁর কাছে লোভনীয় ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল তিনি ব্রহ্মতত্ত্বকে কি আদৌ বুঝেছিলেন নাকি কেবল কয়েকটি সাদৃশ্যের জন্য তিনি absolute spirit আর ব্রহ্মকে একভেবে বসলেন।
শংকরের কাছে ব্রহ্ম কেবল নিরাকার বা অসীম নন, তিনি বাক্যমনের অগোচর। সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের দ্রষ্টা, নির্বিকার চৈতন্য। এই ব্রহ্ম মায়ার সাথে যুক্ত হয়েই নানা লীলাবিধান করেন।
হেগেলের কাছে অদ্বৈতবাদের একটি রূপরেখা ছিল মাত্র। ব্রহ্ম বিষয়ে যে দার্শনিক বিচার বেদান্ত সম্প্রদায়ে আছে, হেগেল সেই গুলি সম্বন্ধে কোনো ভাবেই সচেতন ছিলেন না। ব্রহ্মের দুটি বিশেষ বিশেষণ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল মাত্র। তাই তিনি ব্রহ্মের নিরাকারত্ব ও অসীমতা এই বিশেষণ দুটিকে তাঁর absolute spirit এর তাত্ত্বিক নির্মাণে স্থান দেন৷ কিন্তু হেগেল ভুল করে ফেলেছিলেন অন্য জায়গাতে। তিনি absolute spirit এর যৌক্তিক উৎকর্ষতা স্বীকার করার মধ্যদিয়েই ব্রহ্মতত্ত্ব থেকে অনেক দূরে অজান্তেই চলে যান৷ পরম চৈতন্যের যৌক্তিক উৎকর্ষতা বিচারের জন্য যে দ্বান্দিক পদ্ধতির হেগেল সূচনা করেন তা কোনোভাবেই ব্রহ্মের ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারে না।
শ্রুতিমতানুযায়ী ব্রহ্মজ্ঞব্যক্তি ব্রহ্মথেকে ভিন্ন নন। ( এখানে ব্রহ্মের সাথে অভিন্নতার মানে হল নিজের স্বরাট্ অসীম চেতনার সাথে একীভূত হওয়া) ভারতীয় শাস্ত্রমতে শ্রীকৃষ্ণ অবশ্যই ব্রহ্মকে জেনেছিলেন এবং ব্রহ্মকে জানার সাথে সাথে ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন, একথা সব আস্তিক সম্প্রদায়ই স্বীকার করেন। তাছাড়া শংকারাচার্য প্রবোধসুধাকর নামে একটি প্রকরণ গ্রন্থে কৃষ্ণের অসীমতা ও নিরাকরত্ব বিষয়ে সংশয় নিরাস করেন। শংকরের মতে কৃষ্ণ নামরূপাদি বিশিষ্ট হয়ে মনুষ্যকৃতি ধারণ করে সাধারণ প্রত্যক্ষগম্য হন। কিন্তু কৃষ্ণের পরম চৈতন্য সত্তার আভাস পাওয়ার জন্য জ্ঞানচক্ষুর প্রয়োজন বা প্রকৃত জ্ঞানোন্মচনের প্রয়োজন। এককথা স্বয়ং কৃষ্ণ গীতার একাদশ অধ্যায়ে সখা অর্জুনকে বলেছেন। শংকরের মতে কৃষ্ণ নিরাকার। জলের নির্দিষ্ট কোনো আকার থাকেনা, অথচ জলকে যখন পাত্রস্থিত করা হয় তখন তা সেই আকারে আকারায়িত হয়। ঠিক সেরমই কৃষ্ণের কোনো আকার নেই সমগ্র বিশ্বই তাঁর আকার। ( এই প্রসঙ্গের উল্লেখ একাদশ অধ্যায়ে আছে)। শংকরাচার্য এই ব্যাখ্যা প্রবোধসুধাকর গ্রন্থে করলেও তাঁর রচিত গীতাভাষ্যে এই সমস্ত কিছুরই স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন৷ বেদান্তের ব্রহ্মবাদে আগ্রহী হেগেল যদি গীতার শাংকরভাষ্যকে সাথে রেখে কৃষ্ণ চরিত্র বিশ্লেষণে নামতেন তাহলে হয়ত তাঁর মনে এই রকমের দোলাচলের সৃষ্টি হতনা। ভারতীয় শাস্ত্রকারদের মতে পরব্রহ্ম যখন মনুষ্য রূপে আসেন তখন তিনি ঈশ্বরের প্রেরিত কোনো দূত হিসাবে আসেন না, আসেন তাঁর স্বীয় স্বরূপে এবং মায়ায় দ্বারা আশ্রিত হয়ে তিনি যখন দেহ ধারণ করেন তখন তাঁর অসীমসত্তার কোনো হানি হয় না , এই কথা গুলি হেগেল তাত্ত্বিক ভাবে গ্রহণ করতে চাননি অথবা বুঝতে পারেন নি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কৃষ্ণকে নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। আমি এখানে কেবল অদ্বৈতসিদ্ধান্তের নিরিখেই হেগেলের আপত্তির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। (কারণ আমার মনে হয়েছে হেগেল কোথাও গিয়ে অদ্বৈতবাদী বিচার ধারার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন) বৈষ্ণব সম্প্রদায় নিরাকার কৃষ্ণতত্ত্বের ব্যাখ্যা কে না নিয়ে লীলাপুরুষোত্তম কৃষ্ণের মনুষ্যলীলাসমূহ কে ভিত্তি করেই তাঁকে পরমসত্তা হিসাবে গ্রহণ করেছেন৷ হেগেলের মতের সাথে তা সহাবস্থান করেনা বলেই , এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করলাম না।
এইখানে বিশেষকরে একটি কথা বলতে ইচ্ছে করল। কৃষ্ণতত্ত্ব ও কৃষ্ণচরিত্রের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। ভারতীয় শাস্ত্রের মধ্যে বিশেষত পুরাণের লক্ষ্য হল গল্প বা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সর্বোচ্চ দার্শনিক আলোচনা। কৃষ্ণচরিত্র ও গীতাগ্রন্থটি এর ব্যতিক্রম না। ভারতীয় চিন্তকরা বরাবরই তত্ত্বানেষণের প্রতি নিযুক্ত, ইতিহাস তাঁদের কাছে সময়ের একটি চালচিত্র ছাড়া আর কিছুইনা। তাই তত্ত্বনির্ভর ভারতীয় সংস্কৃতির যেকোনো পৌরাণিক চরিত্রের পিছনে একটি দার্শনিক প্রেক্ষাপট থাকবে, তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু হেগেল ভারতের এই দিকগুলি সম্বন্ধে অবগত না হয়েই গীতা রামায়ণ, মহাভারত এবং ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি সম্বন্ধে কিছু লেখা লিখে ফেলেছিলেন যা সাংস্কৃতিক ও তাত্ত্বিকভাবে সুখপ্রদ ছিলনা।
হেগেলের চিন্তাতন্ত্রে রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য স্থান আছে। এব তিনি রাষ্ট্র ব্যবস্থা কে একটি যৌক্তিক সংস্থান হিসাবেই দেখেছেন। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গাতে। হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি হল ইউরোকেন্দ্রিকতা। রাষ্ট্রের যৌক্তিক বিবর্তন, বা উৎকর্ষতা এবং বিকাশ সব কিছুই সম্ভব হতে পারে যদি সেটি ইউরোপীয় সভ্যতার অংশ হয়। হেগেল তাঁর ইউরোকেন্দ্রিকতার চশমা দিয়েই ভারতীয় সমাজকে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর কাছে কৃষ্ণের বর্ণাশ্রম ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রবর্তন ছিল অযৌক্তিক।
রাষ্ট্র হল পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের পদচিহ্ন। হেগেল মনে করেছিলেন যেহেতু প্রাচ্য সংস্কৃতি যেহেতু যৌক্তিকতা বর্জিত তাই ভারতীয় সমাজে কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকতে পারেনা, এবং এর কোনো ( প্রাচ্য রাষ্ট্রের) নির্মাতাও থাকতে পারেনা। তাই কৃষ্ণের বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রচলন কেবলই কষ্টকল্পনা।
হেগেলের এই ধরণের ভাবনার কেন্দ্রে ছিল ইউরোকেন্দ্রিকতা। তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরও যদি প্রাচ্য রাষ্ট্রের প্রবর্তক হন তাহলে রাষ্ট্রের বিকাশ সম্ভব নয়। কৃষ্ণ রাষ্ট্রের গঠন করুন বা রাম, প্রাচ্য রাষ্ট্রের ধারণা হেগেলের কাছে ছিল ব্রাত্য। রাষ্ট্রের একমাত্রিক বির্বতনের তত্ত্বে বিশ্বাসী হেগেল কৃষ্ণকে রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে মানতে পারেন নি। হেগেল যদি বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার ও হিন্দু রাষ্ট্রব্যবস্থার গঠনমূলক সমালোচনা করতেন তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু হেগেলের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় সভ্যতার মহত্ব স্থাপন করা, গঠনমূলক সমালোচনা করা নয়। বহু পন্ডিত, দার্শনিকই গীতার এই বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু হেগেলের সমালোচনার প্রেক্ষাপটে ছিল ভারতদ্বেষ। হেগেলের লেখায় দার্শনিক বিচারের থেকেও বেশি ছিল ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি বিপ্রতীপ মনোভাব। বলতে কোনো বাঁধা নেই হেগেল সচেতন ভাবেই ঔপনিবেশিক চিন্তার পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন৷ এবং তাঁর দার্শনিক পদ্ধতিকে সেভাবেই গঠন করতে চেয়েছিলেন৷ ইতিহাস ও যুক্তির আশ্রয়ে লালিত হেগেলের দর্শন ইউরোপীয় সভ্যতার আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম বৌদ্ধিক হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছিল।ভারতে ঔপনিবেশিক চিন্তার অগ্রগতির সাথে বাড়তে থাকে হেগেলীয় চিন্তার প্রসারণ। উদাহরণ হিসাবে নেওয়া যেতে পারে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম। হেগেলের দর্শন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবিভাগের আবশ্যিক চর্চার বিষয় ছিল। তা ১৯১৩ সাল থেকে দর্শন বিভাগের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার শিক্ষিত ভারতবাসীকে ঔপনিবেশিক চিন্তায় পরিপুষ্ট করতে চেয়েছিলেন এবং হেগেলের দর্শন পড়ানোর মধ্যে দিয়ে তা খুব সহজ ভাবেই সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছিল। উপনিবেশবাদ রাজনৈতিক ভাবে জমি দখল করার সাথে সাথে মানুষের বুদ্ধির অধিকারও নিতে থাকে। এবং চেতনার ওপর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সহায়ক মেশিনারি হিসাবে গ্রহণ করা হয় ভাষা, দর্শন, কলা, সাহিত্যের মত বিষয়গুলিকে।
ইংরেজ সরকার দর্শন বিভাগে হেগেলকে অবশ্যপাঠ্য করার মধ্যে দিয়ে চেতনা তথা বুদ্ধির ওপরে ইউরোকেন্দ্রিকতার বিস্তার কে সূচিত করেছিলেন। যার ফলস্বরূপ একদল ভারতীয়দের স্থির বিশ্বাস হয় প্রাচ্যসভ্যতা ইতিহাসের একটি অপরিপক্ক সাক্ষী ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা ঠিক তদানীন্তন ভারতীয় সমাজ কুসংস্কারের জালে বন্দি ছিল। কিন্তু নব্য ইউরোপীয় ধারায় দীক্ষিত ভারতীয়রা কুসংস্কার বিমুক্তকরণের মধ্যে দিয়ে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে পিছিয়ে পড়া মূল্যবোধের পরিচায়ক হিসাবে আখ্যায়িত করেন। আর প্রাচ্যের কোনো সংরক্ষিত ইতিহাস নেই বলেই তাঁরা খুব সহজেই কাজটি করতে পেরেছিলেন বলে আমার বিশ্বাস।
কিন্তু কিছু বিপরীত প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয় এই সময়ে। হেগেল তথা ঔপনিবেশিক দর্শনের বিপরীতে গিয়ে কিছু দল চিন্তক নতুন ভাবে চিন্তা করতে অনুপ্রাণিত করেন ভারতবাসীকে। এ বিষয়ে ব্রজেন্দ্রনাথশীল, কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য, হীরালাল হালদার প্রমুখরা স্মরণীয়।
হেগেল তথা ঔপনিবেশিকতার বিরোধী চিন্তক হিসাবে আমার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল কে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। ব্রজেন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন হেগেলকে বোঝার জন্য দরকার দ্বান্দিক পদ্ধতির জ্ঞান। তিনি সেই পদ্ধতি আয়ত্ত করেন রীতমত। হেগেলের দ্বান্দিক পদ্ধতির বহুবিধ প্রকাশযোগ্যতা ব্রজেন্দ্রনাথ কে মুগ্ধ করে। কিন্তু তিনি পরমচৈতন্যের দ্বান্দিক অভিব্যক্তি কে মানতে পারেন নি। তা ছাড়া পরম চৈতন্যের অভিব্যক্তি কেবল ইউরোপীয় সভ্যতাতেই হয়েছিল এবং অন্যসব সভ্যতা ছিল অচ্ছুৎ, হেগেলের এই ইউরোকেন্দ্রিক দার্শনিক মতটির ঘোরতর বিরোধী ছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ। আন্তর্জাতিকতা বাদে দীক্ষিত ব্রজেন্দ্রনাথ স্থির ভাবে বিশ্বাস করতেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতা দুটিই সমানভাবে মূল্যবান।
হেগেলের ভারতচর্চার কি কোনো সুদূরপ্রসারী ফলাফল আছে? বলতে গেলে ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসী হেগেল পড়েই ইউরোপের রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা, নব্য রোমান্টিক আন্দোলন প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেন৷ এর সাথে সাথে মূলত হেগেলের চিন্তাকে সামনে রেখেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিক চিন্তাধারগুলির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনার সুত্রপাত হয়। হীরালাল হালদার থেকে রাধাকৃষ্ণণ প্রত্যেকেই এই জ্ঞানীয় প্রকল্পে অংশ নেন। আমরা ভারতবর্ষে জ্ঞান চর্চার একটি নতুন পদ্ধতি পাই। তাই আমাদের দেশে তুলনামূলক দর্শনের সূত্রপাতে হেগেলের অবদানকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। এবং এই ধারা আজও প্রকট ভাবে অথবা প্রছন্ন খরস্রোতা নদীর মতো প্রবহমান।
কিন্তু হেগেলের ভারতদ্বেষের কি কোনো প্রত্যুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ভারতীয় দার্শনিকরা? ব্রজেন্দ্রনাথ প্রভৃতিরা হেগেলের মতের ভিতরকার ত্রুটি দেখালেও ভারতদ্বেষের কোনো প্রত্যুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা নেই। হয়ত দ্বেষের প্রত্যুত্তর করা দার্শনিক স্বভাবোচিত নয় বলেই তাঁরা সে বিষয়ে বিশেষ মাথা ঘামাননি। কিন্তু কেবল দার্শনিক অনুসন্ধান করেই ক্ষান্ত হয়ে যাওয়াটা হয়ত সময়োপযোগী ছিল না। ভারতের বুকে ঘটে যাওয়া ভক্তি আন্দোলনকে যদি দার্শনিকগণ খুব যত্ন নিয়ে পর্যালোচনা করতেন তাহলে হয়ত হেগেলের ভারতদ্বেষের বিরুদ্ধে একটি ন্যারেটিভ প্রস্তুত করা যেত। কিন্তু সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যেত । তাই কেবলমাত্র হেগেলীয় দর্শনের ত্রুটিসমূহের সমালোচনা করেই তাঁরা ( ভারতীয় দার্শনিকরা) হেগেল চর্চার ইতি টানেন।
এবার নোটে গাছটি মোড়ানোর পালা। হেগেলের গীতাপাঠ এবং ভারতচর্চা আমাদের দুটি শিক্ষা দেয়। প্রথমটি দার্শনিক এবং দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক।
দার্শনিক শিক্ষাটি হল, যদি কোনো দার্শনিক বিচার বা বিশ্লেষণের রীতি বিপ্রতীপ মনোভাব থেকে উৎপন্ন হয়, তাহলে কিন্তু সেই বিচারটিকে কোনোভাবেই আর দার্শনিক বিচার হিসাবে গণ্য করা যায় না। আমরা যখন দার্শনিক কোনো আলোচনায় প্রবৃত্ত হব, আমাদের এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কোনো দার্শনিক ব্যবস্থাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সেই সমালোচনার অবশ্যই গাঠনিক মূল্য থাকবে। হেগেলের গীতাবিশ্লেষণের কেন্দ্রে ছিল প্রাচ্য সংস্কৃতির ছিদ্রান্বেষণ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, আমরা যেন হেগেলের মতো ভুল করে না বসি।
আর রাজনৈতিক শিক্ষাটি হল, আমাদের সচেতন থাকতে হবে যাতে কোনো ভাবেই আমাদের চিন্তায় উগ্ররাষ্ট্রবোধের অনুপ্রবেশ না ঘটে। হেগেলের ভারতদ্বেষের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর স্বজাতির প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি অকৃত্তিম শ্রদ্ধা। যার ফলে তিনি সহজেই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা হেগেল কে তাঁদের গুরু ঠাকুর হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। আজকের যুগে প্রকট ঔপনিবেশিকতা না থাকলেও ছদ্ম ঔপনিবেশিকতা কিন্তু খুব বেশি করে বিদ্যমান। আমাদের চিন্তায় ভাবনায়, লেখায়, পোশাকে,উৎসবে, ব্যসনে , ভাষায় পরানুকরণ, আত্মঘৃণা ও সুগভীর ছদ্ম ঔপনিবেশিক বোধ লঙ্কাকান্ড করেই চলেছে।
এর থেকে মুক্তির উপায় কী? মুক্তি তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা নিজেদের চিন্তার পক্ষপাতিত্বহীন পর্যালোচনা শুরু করব। এবং এই চিন্তার বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়েই বহুমতের সহাবস্থান সম্ভব হবে, আর এখানেই হার মানবে ছদ্ম ঔপনিবেশিকতা । এবং এই ক্ষেত্র প্রস্তুত করাটাই আমাদের অন্যতম প্রধান বৌদ্ধিক কর্তব্য। আর কর্তব্যের গাফিলতা করার মানে হল চিন্তার পরাধীনতা স্বীকার করা। চিন্তার পরাধীনতার জ্বালা রাজনৈতিক পরাধীনতার জ্বালার থেকেও তীব্র। কৃষ্ণচন্দ্র, ব্রজেন্দ্রনাথরা হয়ত এই জ্বালা টের পেয়েছিলেন, তাই তাঁরা নিজেদের মতো করেই খুব স্বল্প পরিসরেই ঔপনিবেশিকতার সমালোচনা করে গেছেন।
তাঁদের দার্শনিক উত্তরাধিকার ও আপোষহীন মনোভাব আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হোক এবং শুভ বুদ্ধিতে নিযুক্ত করুক।
হেগেল রচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক গ্রন্থ
১) The Phenomenology of Spirit (১৮০৭ সালে প্রকাশিত)
২) Elements of the Philosophy of Right (১৮২০ সালে প্রকাশিত)
৩) Lectures on the Philosophy of History (১৮৩৭ সালে প্রকাশিত)
৪) Lectures on Aesthetics (১৮৩৫ সালে প্রকাশিত)
৫) Encyclopedia of the Philosophical Sciences (1817 সালে প্রকাশিত)
- সূত্র নির্দেশ ঃ
- Hegel.G.W.F, On the episode of the Episode of the Mahabharata Known by the Name Bhagavad-Gita by Wilhelm von Humboldt, ed and trans. Herbert Herring ( New Delhi: Indian Council of Philosophical Research, 1955). ↑
- জগদীশ্বরানন্দ, শ্রীমদ্ভভগবদ গীতা (কোলকাতাঃ উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৯০) ,পৃঃ ৭২। ↑
- গান্ধীজি রচিত Gita-My Mother গ্রন্থের সপ্তাদশ অধ্যায়ে এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। ↑
- জগদীশ্বরানন্দ, শ্রীমদ্ভগবদ গীতা (কোলকাতাঃ উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৯০), পৃঃ ৮৮। ↑
- বাসুদেবানন্দ, শ্রীমদ্ভগবদ গীতা,(শাংকরভাষ্য সমেত) (কোলকাতাঃ উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৮), পৃঃ ৪০৭। ↑