Skip to main content
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার · ১ অক্টোবর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
আসন্ন অনুষ্ঠান 11 Oct 2026
Exploring The Dharma of Justice in the Sanskrit Epics
Prof Ruth Vanita
লেখা পাঠান

দুর্গাপূজা– অন্তর্লীন ভাবনা

বর্তমানে সর্বাপেক্ষা প্রচলিত কল্পারম্ভ হল ষষ্ঠ্যাদিকল্পারম্ভ। শারদীয়া দুর্গাপূজার বিধি বিধান বিশিষ্ট। ষষ্ঠীতিথির সন্ধ্যাবেলাতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস হয়। দেবী বিল্বশাখাবাসিনী অর্থাৎ, বেলগাছের ডালে তাঁর অধিষ্ঠান। নিয়ম অনুযায়ী যারা দুর্গাপূজা করবেন তাদের দুর্গাপূজার জন্য নির্দিষ্ট একটি বেলগাছ রাখা কর্তব্য। সেই বৃক্ষের মূল পরিষ্কার করে গোবর ইত্যাদি লিপ্ত করে সেখানে বোধনের ঘট স্থাপন করা হয়। তার পরে এই বেলগাছের পূজা করা হয়।
দুর্গাপূজা– অন্তর্লীন ভাবনা

ভারতীয় আইনে অত্যন্ত পরিচিত নাম জীমূতবাহন। হিন্দু সমাজে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনের ভিত্তিভূমি এখনও জীমূতবাহন বিরচিত দায়ভাগঃ নামক বহুল পরিচিত গ্রন্থ। এই জীমূতবাহন প্রায় এক সহস্রাব্দ পূর্বে বাংলারই সাঁইথিয়ার নিকট পারিভদ্র গ্রামে জন্মেছিলেন বলে বিশেষজ্ঞদের মত। এই জীমূতবাহন আরও একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। গ্রন্থটির নাম কালবিবেকঃ। এই গ্রন্থটিতে এই অঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন উৎসবের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই কালবিবেকঃ গ্রন্থটিতে বাংলার নানা উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। সেখানে দুর্গাপূজার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি নবম্যাদিকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা প্রায় সকলেই কল্পারম্ভ কথাটি শুনেছি। শরৎকালিক এই দুর্গাপূজায় দেবীর বোধন করতে হয়। সহজ কথায় এই বোধনকেই কল্পারম্ভ বলা হয়। জীমূতবাহনের সময়ে একটিই কল্পারম্ভের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেটি হল নবম্যাদিকল্পারম্ভ। এই মতে কল্পারম্ভ হয় ভাদ্র অমাবস্যার পূর্ববর্তী কৃষ্ণা নবমী তিথিতে। এবং প্রায় ২৫ দিন ব্যাপী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এখনও বাংলার অত্যন্ত প্রাচীন পূজাগুলি নবম্যাদিকল্পারম্ভই দেখা যায়।

তবে বর্তমানে সর্বাপেক্ষা প্রচলিত কল্পারম্ভ হল ষষ্ঠ্যাদিকল্পারম্ভ। শারদীয়া দুর্গাপূজার বিধি বিধান বিশিষ্ট। ষষ্ঠীতিথির সন্ধ্যাবেলাতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস হয়। দেবী বিল্বশাখাবাসিনী অর্থাৎ, বেলগাছের ডালে তাঁর অধিষ্ঠান। নিয়ম অনুযায়ী যারা দুর্গাপূজা করবেন তাদের দুর্গাপূজার জন্য নির্দিষ্ট একটি বেলগাছ রাখা কর্তব্য। সেই বৃক্ষের মূল পরিষ্কার করে গোবর ইত্যাদি লিপ্ত করে সেখানে বোধনের ঘট স্থাপন করা হয়। তার পরে এই বেলগাছের পূজা করা হয়। পূজার পরে সেই বেল গাছের ঈশান কোণের এমন একটি ডালকে চিহ্নিত করা হয় যে ডালে দুটি বেল রয়েছে। সেই ডালটিকেই দুর্গারূপে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং ডালের গোড়ার দিকে একটি জায়গায় সিঁদুর লেপে আসা হয়। এই বোধন পূজার কয়েকটি মন্ত্রে আমরা নজর দিতে পারি।

এখানে প্রথমেই বেলগাছটির পূজা করা হয়– “ওঁ বিল্ববৃক্ষায় নমঃ”। এর পরে যে মন্ত্রটি পাঠ করা হয় সেটি বর্তমানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ —

দেবীর পূজার সূচনাই হয় শ্রীরামচন্দ্রকে স্মরণ করে। সুতরাং, যারা রামের সঙ্গে বাঙ্গালীর যোগ সম্বন্ধে সন্দিহান এবং বলেন যে, দুর্গা বা কালীই বাঙ্গালীর দেবতা, তাদের এই মন্ত্রটি একটু মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক শ্রী শ্রী দুর্গাদেবীর শরৎকালিক পূজার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ৩০তম অধ্যায়ে। সেখানে ষষ্ঠী থেকে দেবীর পূজার উল্লেখ করা হয়েছে। দেবর্ষি নারদ সেই পূজার বিধি বিধান উপদেশ করেছিলেন।

ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে ব্রহ্মণা বোধো দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা।
অহম্ অপ্যাশ্বিনে তদ্বদ্ বোধয়ামি সুরেশ্বরি।
ধর্মার্থকামমোক্ষায় বরদা ভব শোভনে।
শক্রেণ চ সম্বোধ্য প্রাপ্তং রাজ্যং সুরালয়ে।
তস্মাদ্ অহং ত্বাং প্রতিবোধয়ামি
বিভূতিরাজ্যপ্রতিপত্তিহেতোঃ।
যথৈব রামেণ হতো দশাস্যস্
তথৈব শত্রূন্ বিনিপাতয়ামি।
দেবি চণ্ডাত্মিকে চণ্ডি চণ্ডবিগ্রহকারিণি।
বিল্বশাখাং সমাশ্রিত্য তিষ্ঠ দেবি যথাসুখম্।


অর্থাৎ– হে দেবি রাবণের বধেের জন্য এবং রামচন্দ্রের অনুগ্রহের জন্য অকালে ব্রহ্মা পূর্বে তোমাকে জাগিয়েছিলেন। আমিও তেমনই আশ্বিন মাসে তোমাকে জাগাচ্ছি। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ প্রদান করার জন্য তুমি প্রস্তুত হও। ইন্দ্রও তোমার আহ্বান করে দেবতাদের রাজা হয়েছিলেন। সেজন্য আমিও বিভূতি এবং রাজ্য প্রাপ্তির জন্য তোমাকে জাগাচ্ছি। যেমন রাম রাবণকে বধ করেছিলেন তেমনই আমি শত্রুদের ধ্বংস করি। হে বিকটরূপধারিণী দেবী চণ্ডী, এই বেলের ডালকে আশ্রয় করে সুখে অধিষ্ঠান কর।

প্রণিধানযোগ্য হল, দেবীর পূজার সূচনাই হয় শ্রীরামচন্দ্রকে স্মরণ করে। সুতরাং, যারা রামের সঙ্গে বাঙ্গালীর যোগ সম্বন্ধে সন্দিহান এবং বলেন যে, দুর্গা বা কালীই বাঙ্গালীর দেবতা, তাদের এই মন্ত্রটি একটু মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক শ্রী শ্রী দুর্গাদেবীর শরৎকালিক পূজার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ৩০তম অধ্যায়ে। সেখানে ষষ্ঠী থেকে দেবীর পূজার উল্লেখ করা হয়েছে। দেবর্ষি নারদ সেই পূজার বিধি বিধান উপদেশ করেছিলেন।

এর পরে সপ্তমীর প্রাতঃকালে পুনরায় সেই বেল গাছের নিকট গিয়ে অত্যন্ত ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে আগের দিনে চিহ্নিত শাখাটির যেখানে সিঁদুর লেপন করা হয়েছিল সেখান থেকে কেটে নেওয়া হয়। এই সময় যে মন্ত্রটি পাঠ করা হয় সেটি হল–

ওঁ বিল্ববৃক্ষ মহাভাগ সদা ত্বং শঙ্করপ্রিয়।

গৃহীত্বা তব শাখাং চ দুর্গাপূজাং করোম্যহম্।

শাখাচ্ছেদোদ্ভবং দুঃখং ন চ কার্যং ত্বয়া প্রভো।

দেবৈর্গৃহীত্বা তে শাখাং পূজ্যা দুর্গেতি বিশ্রুতিঃ।

অর্থাৎ– হে মহাভাগ বেল গাছ, তুমি শঙ্করের প্রিয়। তোমার শাখা গ্রহণ করে আমি দুর্গাপূজা করব। তুমি শাখা ছেদের জন্য দুঃখ কর না। দেবতারাও বেলের ডাল নিয়ে দুর্গাপূজা করেন বলেই প্রসিদ্ধি রয়েছে।

এর পরে বিল্বশাখারূপিণী দুর্গাকে নবপত্রিকার সঙ্গে শ্বেত অপরাজিতা লতা এবং হলুদে চোবানো সুতো দিয়ে বেঁধে তাকে স্থাপন করা হয়। নবপত্রিকা হল নয় প্রকার গাছ– ব্রহ্মাণীর প্রতীক কলা, কালিকার প্রতীক কচু, দুর্গার প্রতীক হলুদ, কৌমারী বা কার্তিকীর প্রতীক জয়ন্তী, শিবা-র প্রতীক বেল, রক্তদন্তিকার প্রতীক ডালিম, শোকরহিতার প্রতীক অশোক, চামুণ্ডার প্রতীক মান, লক্ষ্মীর প্রতীক ধান। বর্তমানে লোকে এই নবপত্রিকাকে কলাবউ বলে সম্বোধন করেন। এই নবপত্রিকাকে গণেশ মূর্তির ডানদিকে স্থাপন করতে হয়। বর্তমানে সমাজে ধারণা প্রচলিত হয়ে গিয়েছে যে, নবপত্রিকা হল শ্রীগণেশের পত্নী। এমনকি অতি বিজ্ঞ আর্ট ফিল্ম মেকার বুদ্ধিজীবীরাও নিজেদের চলচ্চিত্রে এমন একটি হাস্যকর অশাস্ত্রীয় নিরাধার কথা নির্দ্বিধায় অভিনেতাদের মুখে বসিয়ে দেন।

যাই হোক, এই ধারণা একেবারেই নিরাধার। শরৎকালিক দুর্গাপূজা আসলে প্রকৃতিরূপিণী দেবীর পূজা। এই নবপত্রিকা পূজা থেকে আরও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। শিবা এক। তিনি বিভিন্ন সময়ে অশুভ শক্তির সংহার কল্পে নানা রূপ ধারণ করেছেন। আসলে তাঁরা সকলেই এক শিবা-র নানা রূপের বিকাশ। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে পাওয়া যায় যে, শুম্ভ ও নিশুম্ভের অসুর সেনার সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে দেবী নানাবিধ রূপে নিজেকে বিকশিত করেছেন। দশম অধ্যায়ে শুম্ভ দেবীকে বলেছিল– দুর্গা, তুমি অন্যদের বলে বলীয়ান হয়ে যুদ্ধ করছ, একা যুদ্ধ করে দেখাও দেখি! উত্তরে দেবীর শরীরে সমস্ত শক্তি বিলীন হয়ে যায় এবং দেবী বলেন যে, জগতে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কিছু নেই।

এটি হল হিন্দু সংস্কৃতির সমস্ত ভাবনার ভিত্তিস্বরূপ ভাবনা– বিবিধতার মাঝে একতা এবং সেই একতার অন্বেষণ ও উপলব্ধি। নবপত্রিকা পূজায় এই ভাবনাটি পরিপুষ্ট হয়।

এর পরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল মহাস্নান। নবপত্রিকাকে পূজামণ্ডপে প্রবেশ করিয়ে তাকে একটি দাঁতন দেওয়া হয়। কারণ, দেবী ঘুম থেকে উঠেছেন। এর পরে তাঁর স্নান হয়। সেই স্নান নয় প্রকার জল দিয়ে করানো হয়। তার মধ্যে কুয়োর জল, শিশিরের জল, সমুদ্রের জল, প্রভৃতি রয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনের এটি আরেকটি নিদর্শন। এর পরে মহাস্নান হয়। মহাস্নানে একটি সহস্রধারা দিয়ে দেবীকে স্নান করানো হয়। সহস্রধারা হল একটি ধাতব পাত্র যার তলাটিতে সহস্র (অর্থাৎ অনেক) ছিদ্র থাকে। সেই পাত্র দিয়ে বৃষ্টির ধারার মত জল পড়ে। সহস্রধারায় স্নান করানোর সময়ে যে মন্ত্র পাঠ করা হয় তার মধ্যে একটি হল–

সিন্ধুভৈরবশোণাদ্যা যে হ্রদা ভুবি সংস্থিতাঃ।

সর্বে সুমনসো ভূত্বা ভৃঙ্গারৈঃ স্নপয়ন্তু তে।

কুরুক্ষেত্রং প্রয়াগশ্চাক্ষয়ো বটসংজ্ঞকঃ।

সর্বে সুমনসো ভূত্বা ভৃঙ্গারৈঃ স্নপয়ন্তু তে।

অর্থাৎ– সিন্দু, ভৈরব, শোণ প্রভৃতি যত হ্রদ জগতে রয়েছে সকলে তোমাকে ভৃঙ্গার দিয়ে স্নান করাক। কুরুক্ষেত্র, প্রয়াগ, অক্ষয় বট প্রভৃতি সকলে ভৃঙ্গার দিয়ে তোমাকে স্নান করাক।

ভারতবর্ষের একতার মূল সূত্র ভারতের সংস্কৃতি। ভারতীয় সংস্কৃতির পীঠস্থান হল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত নদ, নদী, তীর্থস্থানগুলি। এই মন্ত্রে সেই সাংস্কৃতিক একতার কথাই এই মন্ত্রে ধ্বনিত হয়।

এই ধারণাটি আরও দৃঢ়তর হবে মহাস্নানের অগ্রিম প্রক্রিয়াতে। সেখানে পঞ্চগব্য, পঞ্চামৃত প্রভৃতি প্রসিদ্ধ দ্রব্য দিয়ে স্নান করানো ছাড়াও যে সমস্ত জলের উ্ল্লেখ পাওয়া যায় তার অন্যতম হল পঞ্চকষায় মিশ্রিত জল (রোগ প্রতিরোধ শক্তি বর্ধনের উপযোগী পাঁচটি আয়ুর্বেদোক্ত দ্রব্য হল পঞ্চকষায়), নারিকেল জল, সর্বৌষধি ও মহৌষধির জল (এগুলিও স্বাস্থ্যবর্ধক বিভিন্ন ভেষজ), শিশিরের জল, বৃষ্টির জল। এর তাৎপর্য স্পষ্ট। এই প্রক্রিয়াতে জীবনের সর্বাঙ্গীণ রূপটি ফুটে ওঠে। এর পরে বারো রকম মাটি দিয়ে দেবীর অভিষেচনের কথা বলা আছে। সেই বারো রকমের মাটির মধ্যে রয়েছে– গজদন্তমৃত্তিকা (হাতি দাঁত দিয়ে যে মাটি খুঁড়েছে সেই মাটি), বরাহদন্তমৃত্তিকা (বন্য শূকর দাঁত দিয়ে যে মাটি খুঁড়েছে), বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা (যদিও বর্তমানে প্রচলিত ধারণায় বেশ্যাদের যথার্থ রূপটি আমরা অনুধাবন করতে পারব না। এটি প্রসঙ্গান্তরে আলোচনা করা যেতে পারে), বৃষশৃঙ্গমৃত্তিকা (ষাঁড় শিং দিয়ে যে মাটি খুঁড়েছে), বল্মীকমৃত্তিকা (উইঢিপির মাটি), নদীমৃত্তিকা (নদীর খাতের মাটি), নদীর দুই কুলের মাটি, সাগরের মাটি, চৌরাস্তার মাটি, গঙ্গার মাটি, গোয়ালের মাটি, গোরোচনা। এর পরে স্নান করানো হয় অষ্টকলশের জলে। আটটি কলশে গঙ্গাজল, বৃষ্টির জল, সরস্বতী নদীর জল, সমুদ্রজল, পদ্মরেণুমিশ্রিত জল, ঝরনার জল, সর্বতীর্থের জল, চন্দনমিশ্রিত জল রেখে সেই জল দিয়ে দেবীর স্নান করানো হয়।

এখানে সম্পূর্ণ সমাজ এবং প্রকৃতিকে একসূত্রে গাঁথার প্রক্রিয়াটি কী অদ্ভুত! এই বিষয়ে অধিক বলা নিষ্প্রয়োজন।

দুর্গাপূজার অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল অস্ত্রপূজা। দেবীর প্রত্যেক অস্ত্রের পৃথক পৃথক মন্ত্রে পূজার বিধান করা হয়েছে। এই অস্ত্রগুলি হল– ত্রিশূল, খড্গ, চক্র, তীক্ষ্ণবাণ (ধারাল তীর), শক্তি (কার্তিকের অস্ত্র, এক প্রকার ছোট বল্লম), পূর্ণচাপ (ধনুক), পাশ (দড়ি), অঙ্কুশ (হাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার যে অস্ত্র), ঘণ্টা, পরশু (কুঠার)।

এর পরে অষ্টমী ও নবমী তিথিতেও দেবীর অনুরূপ পূজার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে সন্ধিপূজায় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। চামুণ্ডা শত্রুনাশিনী এবং বীভৎস আচরণকারী রাক্ষসী শক্তির নাশিকা।

এর পরে দশমীর বিসর্জনকৃত্যের পরে আরেকটি পূজার বিধান রয়েছে। সেটি হল অপরাজিতা পূজা। অপরাজিতা পূজা হয় শত্রুনাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। পূজাতে সর্বতোভদ্রমণ্ডল আঁকা হয়। এটি একটি অদ্ভুত জ্যামিতীয় নির্মাণ। অর্থাৎ, শিল্পকলা ও বিদ্যাচর্চাও এখানে বাদ নেই।

অর্থাৎ, সম্পূর্ণ দেবীর পূজার প্রক্রিয়াটিকে দেখলে দেখা যাবে যে অপূর্ব প্রক্রিয়ায় তিন দিন ব্যাপী পূজা। নবপত্রিকা, ১০৮ কলশ জলে দেবীর অভিষেক, সর্বতোভদ্র মণ্ডল, চণ্ডীপাঠ। সময়ও অদ্ভুত। বর্ষার শেষ। শস্যশ্যামলা ধরিত্রী। কিশলয়ের শ্যামলিমা আর নির্জলা মেঘের ধবলিমা– যেন দেবী আসবেন বলে প্রকৃতিতে নতুন রং করা হয়েছে। নদী, খাল, বিল, পুষ্করিণী ভরন্ত – সর্বত্র সমৃদ্ধির চিত্র। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে দেবগণের শয়নকাল। তাই দেবীকে বোধন করে – জাগিয়ে তার পূজা করা হয়। সব মিলিয়ে সমস্তটাই অদ্ভুত।

এর সঙ্গে রয়েছে দেবীর অদ্ভুত মূর্তি। সিংহবাহিনী দশভুজা দুর্গা। চরণতলে ছিন্নমুণ্ড মহিষ ও তার থেকে নির্গত মৃতপ্রায় মহিষাসুর। দেবীর ডান দিকে গণেশ ও লক্ষ্মী। বামে সরস্বতী ও কার্তিকেয়। সকলে সশস্ত্র, সবাহন। একই সঙ্গে পেঁচা আর ইঁদুর, একই সঙ্গে সাপ আর ময়ূর। নবপত্রিকা – কচু থেকে শুরু করে ধান, জয়ন্তী, অশোক।

একই সঙ্গে সমৃদ্ধি ও কার্যসিদ্ধি (গণেশ), ঐশ্বর্য (লক্ষ্মী), বিদ্যা (সরস্বতী), বীর্য (কার্তিকেয়)।

ইঁদুর – শস্য সমৃদ্ধি না হলে কি ইঁদুর থাকে?

পেঁচা – শস্য ধ্বংসকারী কীট প্রভৃতির নাশক। রাত্রিতে দেখার অদ্ভুত সামর্থ্য, কাকের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অবিরত সংগ্রাম– সর্বদা বিপরীত পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মনোভাব। বাণিজ্যিক সাফল্যের মন্ত্র।

হংস – নীর ক্ষীর বিবেক – দুধকে জল থেকে আলাদা করার কৌশল। বিদ্যার সার্থকতা।

ময়ূর – অতুলনীয় সৌন্দর্যের সঙ্গে বিষ হজম করার অসাধারণ ক্ষমতা।

তামসিকতার মূর্ত বিগ্রহ মহিষ রাজসিক সিংহের নখরাঘাতে রক্তাক্ত। সাত্ত্বিকতার মূর্তিটিতে মাতৃত্বের অপরূপ লালিমার সঙ্গে অজেয় শক্তি। ভয়ানক বনরাজ সিংহ সৌম্য মাতৃ মূর্তির চরণে শান্ত। তার পরাক্রমে ষড়রিপু, অত্যাচার, অন্যায়, ভোগসর্বস্বতা, ইন্দ্রিয়লোলুপতার প্রতীক অসুর নষ্টপ্রায়। শুধু তাই নয়, সে পূজা পায়। পূজা তার নয় – তার অসাধারণ সহনশক্তি যাকে আশ্রয় করে সে ঘোরতর তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে।

দেবী মাতৃত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুষ্টের দলনে শস্ত্র ধারণ করেছে। কিন্তু তার মাতৃত্ব অক্ষুণ্ণ। অসুর তাঁর রোষের শিকার নয়। অসুর তাঁর কৃপার পাত্র – অসুরত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সে পূজার্হ হয়ে ওঠে।

দেবী কুশল সংগঠক, প্রশাসক। তাঁর উপস্থিতি সকলকে অভয় দেয়। সাপ ও ময়ূর, পেঁচা ও ইঁদুর নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়েই নির্ভয়ে একত্রিত সমাজের মঙ্গলে।

দেবী সকলের তেজের মূর্তি – সৎ শক্তির সংগঠনের প্রতীক। বিদ্যা, ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি, বীরত্বের সহাবস্থান – তিনি মধ্যমণি বলে। তাঁর বার্তা – সংগঠিত সজ্জন শক্তিশালী সমাজের মূল। শক্তিশালী সমাজে বিদ্যা, ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি, বীরত্বের বিকাশ। সেই সমাজে সকলের মঙ্গল, সকলে সেখানে নির্ভয়।

দেবীপূজার প্রথম দিন থেকে প্রকৃতির আরাধনা। বেলগাছ, নবপত্রিকা, নানা ধরণের মৃত্তিকা, নানা ধরণের জলের সমাহার। সমাজের সর্বস্তরের সর্বস্পর্শী প্রক্রিয়া। সেই সঙ্গে রয়েছে সমগ্র দেশের সমস্ত অংশ থেকে জল ও মাটির সংগ্রহের বার্তা– রাষ্ট্রীয় একতার বার্তা। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শত্রুনাশ। বোধনের মন্ত্র থেকে শুরু করে সন্ধিপূজা, অপরাজিতা পূজা– সর্বত্র শত্রুনাশের কামনা এবং বিজয় প্রার্থনা। অর্থাৎ, সমাজের হৃদয়ে বিজিগীষু মনোবৃত্তি (জয়ী হওয়ার মানসিকতা) জাগানোর অন্তর্লীন প্রয়াস এবং প্রক্রিয়া। পরাজয়ের গ্লানি ও হতাশার ক্লেদ মুক্ত হয়ে জয়ী হওয়ার প্রবল ইচ্ছা সমাজের মধ্যে জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই অস্ত্রপূজা এবং অপরাজিতা পূজার ব্যবস্থা।

বর্তমানে দুর্গাপূজায় আড়ম্বর, থিম, ম্যাডক্স স্কোয়ার আর মিলেনিয়াম পার্কের আড্ডার মাঝে পূজাই গৌণ হয়ে পড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি চেতনা, রাষ্ট্রবোধ, বিজিগীষু মনোবৃত্তি। পূজার পবিত্রতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক। সমাজ চেতনা ও প্রকৃতি চেতনায় জারিত হোক দুর্গাপূজা।

Rakesh Das R
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Rakesh Das

Associate Professor • Ramakrishna Mission Vivekananda Educational and Research Institute

ড. রাকেশ দাস সংস্কৃত ও দর্শনের বিশিষ্ট অধ্যাপক, গবেষক ও লেখক। তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সংস্কৃত ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র সংস্কৃত ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, বেদান্ত, সংস্কৃত সাহিত্য ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা। তিনি একাধিক গ্রন্থের সম্পাদক, অনুবাদক ও রচয়িতা এবং দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গবেষণামূলক বক্তৃতা ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন।

সংযোগ:
স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি CC BY-NC-ND 4.0 লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব; তা Poorvam-এর নীতি বা অবস্থান প্রতিফলিত করে না।

Rakesh Das-এর আরও লেখা

আপনার লেখা পাঠান

গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।