সদ্য (২৭.০৯.২০২৬) ব্রহ্মপদে লীন হলেন মাদ্রাজ সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ এবং অদ্বৈত বেদান্তের প্রকাণ্ড পণ্ডিত, রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্রহ্মশ্রী মহামহোপাধ্যায় আর কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রী, রেখে গেলেন এক বিশাল বিদ্যাবংশ। তাঁর অল্পসময়ের ছাত্র হিসেবে আমার এই বিনীত স্মৃতিচারণ।
আমি তখন বেলুড়ে বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশনের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। স্পেশাল পেপার হিসেবে অদ্বৈত বেদান্ত নির্বাচন করেছি। মাননীয় উপাচার্য স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দজী দেশ-বিদেশের বিখ্যাত পণ্ডিতদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাঁরা এসে বিভিন্ন সময় আমাদের ক্লাস নিতেন এবং অনুপ্রাণিত করতেন। বেম্পটি কুটুম্ব শাস্ত্রী, হরেকৃষ্ণ শতপথী, লক্ষ্মী তাতাচার, রামচন্দ্র ভট্ট, শ্রীনিবাস বরখেডি, এ. ভি. নাগসম্পিগে, বশিষ্ঠ ত্রিপাঠী, রাজারাম শুক্ল, আর কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রী, তাঁর সুযোগ্য পুত্র কে. রামসুব্রহ্মণ্যম্, বিশ্বনাথ ধিতাল প্রমুখ দিকপালেরা একাধিকবার এসেছেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং আমরা তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তাঁদের ক্লাস করেছি এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নানা বিষয় জেনেছি।
এরকমই একবার সম্ভবত ২০১০ সালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন মহামহোপাধ্যায় আর কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রী মহাশয়। তখন তিনি রিটায়ার করেছেন। আমরা মেধাভবনের তিনতলায় থাকতাম, আমাদের রুমের ঠিক বিপরীত রুমেই গেস্টরা থাকতেন, পরে এগুলি স্যারেদের রুম হয়ে যায়। আর কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রী আমাদের মেধাভবনেই ছিলেন, ফলে ক্লাসের বাইরেও দেখা হত এবং উনি সবার সঙ্গে অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে কথা বলতেন। সদা হাস্যময় মুখ, চনমনে ফুরফুরে মেজাজ এবং অকৃত্রিম বিনয় ওনাকে আকর্ষণীয় করে তুলত। ওনার পাণ্ডিত্যের আলোক চোখদুটি থেকে যেন বিচ্ছুরিত হত। ওনার ক্লাসগুলি ছিল বিচিত্র, কঠিন থেকে কঠিনতম বেদান্তের তত্ত্বগুলিকে সহজ করে মজার ছলে বুঝিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল তাঁর। দু-তিন ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পড়িয়ে চলে গেলেন, কোনো ক্লান্তি নেই চোখেমুখে। আর আমরাও বুঝতে পারতাম না যে এতক্ষণ আলোচনা হল বলে। পড়ার মাঝে মাঝে বেশ হাসাতেন সকলকে, নিজেও মিটিমিটি হাসতেন। আমাদের বেশ দাদু দাদু লাগত। মনে হত যেন গল্প শুনতে বসেছি, আমরা হাঁ করে শুনতাম, অদ্ভুত আকর্ষণী ক্ষমতা ছিল তাঁর।
তারপর একবার স্যারের স্ত্রী, আমরা 'মাতা' (মা) বলে ডাকতাম, এলেন। আমাদের সুজির হালুয়া ইত্যাদি দক্ষিণ ভারতীয় খাবার খাওয়ালেন। একদিকে স্যারের পাণ্ডিত্য আর অন্যদিকে মায়ের স্নেহ—আমরা সকলেই যেন অজান্তে স্যারের বৃহত্তর পরিবারের অংশ হয়ে গেলাম। তারপর সেই বছরই ওনাদের সুযোগ্য পুত্র IIT মুম্বইতে কর্মরত অধ্যাপক কে. রামসুব্রহ্মণ্যম্ এলেন এবং ওনার মধ্যে আবার স্যারের এবং মায়ের সম্মিলিত রূপ দেখতে পেলাম। সেই স্মিত হাসি, সেই প্রকাণ্ড পাণ্ডিত্য, সেই বিনয় এবং ছাত্রবৎসল্য। আমরা একাধিকবার সুব্রহ্মণ্যস্যারের তৈরি মিষ্টি খেয়েছি এবং মাঝেমাঝে উনি নিয়েও আসতেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই পুরো পরিবারের প্রতি আমাদের ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল।
গ্র্যাজুয়েশনের পর এম.এ. ক্লাস শুরু হওয়ার আগে এক মাস ছুটি থাকত। আমি একটু বেশিই উৎসাহী ছিলাম। স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দজীকে বললাম যে—মহারাজ, আমি এই ছুটিতে বাড়ি না গিয়ে চেন্নাইতে কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রীজির কাছে পড়তে যেতে চাইছি, আপনি যদি কোনো ব্যবস্থা করে দেন, ভালো হয়। পড়াশোনার ব্যাপারে মহারাজ আমাদের থেকেও বেশি উৎসাহী ছিলেন। বললেন, তোমরা সংস্কৃত বিভাগে কতজন আছো। আমি বললাম, তা মহারাজ, জনা চোদ্দো তো হবেই। উনি প্রকাশ মহারাজকে ফোন করে বললেন যে, প্রকাশ, তুমি সংস্কৃত বিভাগের ছেলেদের নিয়ে পনেরো দিন চেন্নাই ঘুরে এসো, ছেলেরা একটু পড়াশোনা করতে চাইছে। প্রভাকর মহারাজ (স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দজী) সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন। সমস্ত ব্যয়ভার তিনিই বহন করেছিলেন।
মাইলাপুরে রামকৃষ্ণ মিশনে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল এবং সকলে দল বেঁধে কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রীজির বাড়িতে গিয়ে পড়তাম। প্রায়দিনই মা (স্যারের স্ত্রী) কিছু না কিছু খাবার রাখতেন আমাদের জন্য। স্যারের বাড়িটিও ছিল একেবারে সিনেমায় দেখা দক্ষিণ ভারতীয় বাড়ির মত, অনাড়ম্বর কিন্তু সুন্দর। পঞ্চদশী এবং ব্রহ্মসূত্রের চতুঃসূত্রী পড়তাম আমরা। স্যার বেশ রসিয়ে রসিয়ে পড়াতেন, মাঝেমাঝেই প্রকাশ মহারাজ অপ্রস্তুত হতেন। আমরা বেশ জমিয়ে পড়াশোনা করছিলাম।
তারপর স্যারকে হঠাৎ চেন্নাই থেকে বেশ দূরে থেনি বলে একটি জায়গায় দক্ষিণামূর্তি মঠে বিশেষ কাজে যেতে হল। স্যার বললেন, তোমরাও চলো, আমি ব্যবস্থা করছি। থেনি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পাদদেশে একদম ছবির মতো অসম্ভব সুন্দর একটি গ্রাম। আমরা বিকেলে বেরিয়ে চারপাশ ঘুরতাম। ট্রেনে করে আমরা গেলাম, স্যার সম্ভবত আগের দিন চলে গেছিলেন। থেনিতে দক্ষিণামূর্তি মঠে আমরা আবার স্যারের কাছে পড়তে লাগলাম সকাল-বিকেল। এখানে পীতাম্বরদার শরীর অসুস্থ হয়, সম্ভবত হাসপাতালেও নিয়ে যেতে হয়েছিল। মঠের থেকেই সমস্ত ব্যবস্থা হয়েছিল। তারপর যখন আমরা থেনি থেকে চেন্নাই ফিরছি তখনও পীতাম্বরদা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি।
ফেরার সময় ট্রেনে স্যারের সিট ছাড়া প্রায় কারোরই কনফার্ম টিকিট ছিল না, আরএসি ছিল। সকলে বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিকে-ওদিকে ছিল। আমি পীতাম্বরদা এবং আর দু-তিনজন স্যারের সঙ্গে ছিলাম। দুপুরবেলায় স্যারের ঘুমানোর প্রয়োজন হলে, স্যার পীতাম্বরদাকে ওনার সিটে শুয়ে যেতে বললেন। তারপর যেটা করলেন আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। যেখানে পা রাখা হয়, দুটো সিটের মাঝের জায়গায়, সেখানে একটা গামছা পেতে শুয়ে পড়লেন। পীতাম্বরদা অস্বস্তিতে, আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ওরকম মাপের একজন পণ্ডিত, বয়োজ্যেষ্ঠ, ট্রেনে কীভাবে অবলীলায় নীচে একটা গামছা পেতে শুয়ে গেলেন! এই সারল্য এবং এই অহংহীনতা ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া সম্ভব নয়। তারপর আবার মাইলাপুর এসে কয়েকদিন পড়াশোনা চলল। তারপর আমরা বেলুড় ফিরে এলাম।
এরপর উনি একাধিকবার বেলুড় এসেছেন। বিভিন্ন সময় সেমিনারে, ওয়ার্কশপে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। পূজনীয় মণিদ্রাবিড় শাস্ত্রীজির কাছে যখন আমি পিএইচডির কাজ শুরু করি (যদিও চাকরি পাওয়ার জন্য মাঝে ছেড়ে দিতে হয়েছিল), তখন মাইলাপুর গেলে ওঁনার সঙ্গে দেখা করতাম। ওঁনার স্নেহ ভোলার নয়। বেদান্তকে কীভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হয় এবং ছাত্রদের কাছে কীভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়—তা ওঁনার ক্লাস যারা করেছেন, তারা জানেন। উনি শৃঙ্গেরীর আস্থানপণ্ডিত ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, তিরুপতি থেকে মহামহোপাধ্যায় উপাধি পেয়েছেন। এছাড়াও ওনার অর্জনের তালিকায় রয়েছে একাধিক উপাধি ও পুরস্কার। অদ্বৈত বেদান্তের একজন প্রামাণ্যভূত আচার্য ছিলেন মহামহোপাধ্যায় আর কৃষ্ণমূর্তি শাস্ত্রী। অদ্বৈত বেদান্তের বহু নামকরা পণ্ডিতদের তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে রেখে গেছেন তিনি। ওঁনার মৃত্যু আমাদের শোকাহত করে। ওঁনার অবদান অবিস্মরণীয়। ওঁনার চরণে আমার কোটি কোটি প্রণাম। উনি নিশ্চয়ই ব্রহ্মে লীন হয়েছেন, অনন্ত আনন্দে একীভূত হয়েছেন। ঈশ্বর যেন তাঁর পরিবারকে এই শোক অতিক্রম করার শক্তি দেন।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।