Skip to main content
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার · ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
আসন্ন অনুষ্ঠান 31 Oct 2026
Exploring the Place of Devotion: Siting and Experiencing Divinity in Bengal-Vaishnavism
Sukanya Sarbadhikary
লেখা পাঠান

ফাঁদকাটা গাঁয়ের ফাঁদকাটা গল্প

‘ফাঁদকাটা গাঁয়ের ফাঁদকাটা গল্প’ গল্পে রাজীব দত্ত রূপকথার আশ্রয়ে তুলে ধরেছেন ক্ষমতা, লোভ, প্রযুক্তির মোহ এবং লোকায়ত সংস্কৃতির বিলুপ্তির এক আশ্চর্য আখ্যান। গল্পখেকো রানির নির্দেশে চ্যাটানিনো নামের এক যন্ত্র মানুষের মনোযোগ ও কল্পনাকে গ্রাস করে, আর বণিক, পুরোহিত ও মন্ত্রীর সম্মিলিত চক্রান্তে হারিয়ে যেতে থাকে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা গল্প, গান ও স্মৃতি। একসময়ের রূপকথার গ্রাম ক্রমশ হারায় তার প্রকৃতি, প্রাণ ও জাদু। এই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে গলু ডাকাত নয় বছর ধরে বুকে আগলে রাখে ফাঁদকাটা গাঁয়ের একটি মাত্র গল্প—যে গল্প মানুষের জীবন, মাটি, ঘাম ও ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রানির সঙ্গে তার চূড়ান্ত মুখোমুখি সংঘর্ষে মুক্তি পায় বন্দি গল্পেরা; তারা পাখি, আলো ও বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশে দেশে। বাংলা লোককথার কল্পজগৎ, লিরিকধর্মী ভাষা ও রাজনৈতিক রূপকের মধ্য দিয়ে গল্পটি মৌখিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং মানুষের কল্পনাশক্তির চিরন্তন শক্তিকে উদ্‌যাপন করে।
ফাঁদকাটা গাঁয়ের ফাঁদকাটা গল্প
AIচিত্রটি প্রতীকী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় নির্মিত

১

এক দেশে এক রানি ছিল। তবে দেশটার যে কী নাম তা জানি না। দেশটা ছিল আর সে দেশে এক রানি ছিল। সে ছিল যেমন সুন্দরী, তেমন সুন্দর ছিল তার মিষ্টি গলা। সব থেকে মায়ার ছিল তার চোখ দুটো। যেই তাকাত তার পটলচেরা নীল নীল চোখে সেই অবাক হয়ে থমকে যেত। আর যেই থমকে যেত অমনি সে হয়ে যেত রানির গোলাম।

রানি যা বলত, তারা তাই করত। রানি বসতে বললে বসত, খেতে বললে খেত, সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে, ইয়া ইয়া ঢেউ, ইয়া ইয়া তুফানকে অমান্যি করে তারা রানির জন্য বাণিজ্য করতে যেত। এমনকি রানি যুদ্ধ করতে বললে তারা যুদ্ধ করত। কার সাথে যুদ্ধ করছে, কেন করছে তারা তা শুনতই না। তারা সবাই সবাই রানিকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসত।

যে মানুষ গল্প বাঁচিয়ে রাখে, তাকে কোনো গুমঘর বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না।

কিন্তু রানির মন। সে রানি বলে কথা। সে তো আর যাকে তাকে ভালোবাসতে পারে না। তাই সে ভালোবাসল কল মেশিনের এক মস্ত বণিককে। আর ভালোবাসল এক মন্ত্রীকে আর এক পুরোহিতকে।

কল মেশিনের বণিক তার মেশিনে নানান রকম যন্ত্র বানায় আর মন্ত্রী, যেমন তার বুদ্ধি, তেমন শক্তি। সে রানির হয়ে প্রজাদের দেখাশোনা করে আর যুদ্ধ করে। আর পুরোহিত প্রজাদের শোনায় ভগবানের কথা। কী করতে হবে, কেন করতে হবে আর কী করতে হবে না সে শেখায় সেইসব মন্ত্র।

কিন্তু এমনি করে রানির দিন ঠিকঠাক চলছিল না। তার মনে হল তার যেন কী নেই। কী নেই কী নেই করে তার ভীষণ খিদে পেত। কিন্তু যা খায় তাতে তার পেট ভরে না। পেট ভরলেও তার মন ভরে না।

সে ভাবে সে এত বড় রানি কিন্তু তার গল্প কই! সব গল্প তো অন্যদের। সেখানে তো সে নেই।

আসলে রানির প্রাসাদে গল্প বলার কেউ ছিল না। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, রানি একলা শুয়ে থাকত তার সোনার পালঙ্কে, চারদিকে থাকত আয়না, আর আয়নায় থাকত শুধু তার নিজের মুখ।

কোনো ঠাকুমা তাকে গল্প শোনায়নি ছোটোবেলায়, কোনো মা তাকে কোলে নিয়ে বলেনি রাক্ষসের গল্প কি রাজপুত্রের গল্প। রানি জন্মেছিল রানি হয়েই, একেবারে পুরো, একেবারে সম্পূর্ণ, আর সেই সম্পূর্ণতাই ছিল তার সব থেকে বড় শূন্যতা। যার কোনো ছোটোবেলা নেই, তার কোনো গল্পও নেই।

তাই সে যত রাজ্যের প্রজাদের ভালোবাসা পেয়েও, যত মন্ত্র-তন্ত্র পুরোহিতের মুখে শুনেও, যত যুদ্ধজয়ের বাহাদুরি মন্ত্রীর মুখে শুনেও, তার সেই একলা ফাঁকা জায়গাটা ভরত না। সেই ফাঁকা জায়গা থেকেই তার জন্ম হল আরেক খিদের, এক অন্যরকম খিদের।

তাই সে মনের জ্বালায়, খিদের জ্বালায় একদিন রাক্ষুসী হয়ে গেল। সে রাক্ষুসী হল হল তবে যেমন তেমন রাক্ষুসী হল না, সে হয়ে গেল গল্প খেকো রাক্ষুসী। যেখানে যা গল্প পায় তাই সে গিলে খায়। যত গল্প গিলে খায় তত তার গল্প খিদে বেড়ে যায়।

কিন্তু মুশকিল হল সে যে গল্প গিলে খায় সেই গল্প আর কোথাও পাওয়া যায় না। দু-একটা গল্প যদিও বা পাওয়া যায়, তা আবার রানির ইচ্ছামতো করে বলা গল্প। ভাঙাচোরা, তেড়াবেঁকা, কুঁটেমার্কা কাগজের ফুল আর প্লাস্টিকে মোড়া সে গল্প। সেই গল্পে না আছে মাটির গন্ধ, না আছে ফুলের গন্ধ, না আছে মায়ের গন্ধ। তাই সেই গল্প হারিয়ে যায় চিরদিনের জন্য।


২

এদিকে নতুন গল্প না পেলে রানির চলে না। আর তাই সে এক নতুন ফন্দি আঁটল। সে তার বণিক প্রেমিককে বলল, এমন একটা যন্ত্র বানাও যে যন্ত্র হাতে পেলে সবাই সেই যন্ত্র নিয়ে খেলা করবে। ছেলে, বুড়ো, বাপ, মা, দাদু, দিদা, খুড়ো, খুড়ি, নানা, নানি, চাচা, চাচি, পিসি, মাসি, ফুপু, বুয়া, সক্কলে। এমনকি তারা যন্ত্র হাতে নিয়ে খাবে, যন্ত্র হাতে নিয়েই ঘুমাবে।

প্রেমিক রানির আবদার বলে কথা। তাই বণিক বড় বড় বিজ্ঞানীদের দিয়ে এক চেটো মাপের একটা যন্ত্র বানাল। সেই যন্ত্র দেখে রানি তো খুব খুশি। সে যেমনটি চায়, এই যন্ত্রটি ঠিক তেমন। রানি আদর করে যন্ত্রটার নাম রাখল চ্যাটানিনো। খুশি হয়ে রানি বণিকের গালে একটা চুমু খেল। আর রানির চুমু পেয়ে বণিকও খুশি হল।

এবার রানি বণিককে বলল, যাও দূর দূর দেশে। সেখানে গিয়ে এই চ্যাটানিনো আমার হয়ে দিয়ে এসো সবার হাতে। বণিক তাই করল।

এবার রানি পুরোহিত প্রেমিককে বলল, যাও তুমি বণিকের পিছু পিছু। বণিক যখন যন্ত্রটা তুলে দেবে লোকের হাতে, তাদের কাছে থাকা গল্পগুলো তুমি নিয়ে নেবে আমার জন্য। পুরোহিত তাই করল।

এবার মন্ত্রী প্রেমিককে রানি বলল, যেই পুরোহিত গল্প নিয়ে আমাকে দেবে অমনি তুমি চ্যাটানিনোর পয়সা চাইবে লোকের কাছে। ওরা পয়সা না দিতে চাইলে ওদের দখল নেবে। দখল নেবে দেশটারও। আর যার দখল নিতে পারবে না তাকে ধরে নিয়ে আসবে আমার কাছে। তোমাকে ছেড়ে আমি ভালোবাসব ওই লোকটাকে। আর ওকে বানাব আমার দেশের মন্ত্রী। এই কথা শুনে মন্ত্রী প্রেমিক ছোটে পুরোহিতের পিছু পিছু।

আর এইভাবে বণিক একটার পর একটা দেশে যায় আর চ্যাটানিনো তুলে দেয় সে দেশের লোকের হাতে। যন্ত্র পেয়ে দেশের লোকেরা সেটা নিয়ে খেলতে থাকে। আর তারপর পুরোহিত যায় তাদের কাছে, আর তাদের কাছে থাকা যত রাজ্যের গল্প একটা মস্ত ব্যাগে ভরে নিয়ে আসে রানির কাছে। সে গল্প রানি খায়। আর রানির গল্প খাওয়া শেষ হলে মন্ত্রী গিয়ে সেই দেশটার দখল নেয়।

ওদিকে যন্ত্র পাওয়া লোকেরা যন্ত্রের নেশায় বণিকের হয়ে যন্ত্র বানায়। তাতে কিছু পয়সা পায়। আর সেই পয়সা দিয়ে ছেলেপুলেদের, বুড়োবুড়িদের আর নিজেদেরকেও একটা করে নতুন চ্যাটানিনো কিনে দেয় বছর বছর। এইভাবে গল্প খেকো রানির গল্প দিব্বি চলতে থাকে দেশে দেশে। এতে রানিও খুশি, বণিকও খুশি, পুরোহিতও খুশি আর মন্ত্রীও খুশি।


কিন্তু খুশি তো আর চিরকাল এক থাকে না। চলতে চলতে যেমন সব পথ এক থাকে না। কোথাও থাকে ছোটো ছোটো খানাখন্দ তো কোথাও থাকে ইয়া ইয়া বাঁক। একদিকে ইয়া ইয়া পাহাড় তো আর একদিকে ইয়া ইয়া খাদ। কোথাও রাস্তা নেমে গেছে সাঁই করে, তো কোথাও রাস্তা উঠে গেছে হুস করে। একটু অসাবধান হলেই ফুড়ুস্‌। গুড়ুম বাউল দাস!

তেমনই গল্প খেকো রানির গল্প চলতে চলতে যখন এসে দাঁড়াল আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়ের কোলে উল্টো আকাশ সোজা মাটির ফাঁদকাটা গাঁয়ে, বণিক তো সে গাঁ দেখেই তাজ্জব।

এমন সুন্দর গাঁ সে কোত্থাও দেখেনি। লোকেরা কাজ করে আর কাজ করা লোকেদের গা থেকে যে ঘাম ঝরে সেই ঘাম সোজা উড়ে যায় পাখি হয়ে। আর সেই পাখি মুখে করে বয়ে নিয়ে আসে নানান গান আর গল্প।

সেই গান পাখির কাছে শুনে মেয়েরা নাচতে নাচতে যখন মাঠে ফসলের বীজ পোঁতে সেই ফসলের বীজ সোনার ফসলের জন্ম দেয়। আর সেই গল্প পাখির কাছে শুনে বুড়োরা, বুড়িরা তারা-ফোটা রাতে চাঁদ আর মেঘেরা যখন লুকোচুরি করে তখন আম পাড়া জাম পাড়ার মতো একটি একটি গল্প পেড়ে শোনায় ছেলেপুলেদের।

আর ছেলেপুলেরা সেই গল্প শুনে বাতাসের কোলে দোল খেতে খেতে নদীর জলে ঘুমিয়ে পড়ে। আর সেই নদীর জল তখন হয়ে যায় ক্ষীরের নদী। আর নদীকে ক্ষীর হতে দেখে পুকুরও হয়ে যায় দুধের পুকুর।

এই দুধের পুকুর, ক্ষীরের নদী, সোনার ফসল আর গাছপালা পাখপাখালিতে ভরা এই ফাঁদকাটা গ্রাম লোকের মুখে মুখে রূপকথার গ্রাম হয়ে যায়। আর বণিক তাকে বলে সোনার পাখির গাঁ।

তো এই সোনার পাখির গাঁয়ের খবর রানির কাছে যায়। রানি বণিককে বলে, আরও বণিককে নিয়ে গিয়ে আরও আরও চ্যাটানিনো বানিয়ে দাও ওই গাঁয়ের মানুষের হাতে। আর পুরোহিতকে বলে, আরও আরও পুরোহিতকে নিয়ে গিয়ে নিয়ে এসো সোনার গাঁয়ের রূপকথার গল্প।

তাই শুনে বণিক যেখান থেকে পারে বণিক আর পুরোহিত যেখান থেকে পারে পুরোহিত নিয়ে যায় সেই দেশে। আর মন্ত্রীকে বলে সৈন্য নিয়ে তৈরি থাকতে। মন্ত্রীও গোলাবারুদ নিয়ে, ঢাল-তরোয়াল নিয়ে, লালটুম নীলটুম সেনাসামন্ত নিয়ে সেই গাঁয়ের থেকে একটু দূরে ছোটো ঝোপে লুকিয়ে থাকে।

৩

এদিকে বণিক নানান যন্ত্র তৈরি করে সেই সোনার গাঁয়ের লোকেদের দেয়। সেই না-দেখা নতুন যন্ত্র নিয়ে সোনার গাঁয়ের সবাই মেতে ওঠে। আর যেই না ওরা মেতে ওঠে, পুরোহিত ওদের সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে ওই দেশের রূপকথার গল্পগুলো পুরতে থাকে ঝোলার ভেতর।

এদিকে হয়েছে কী, পুরোহিতের সাথে আরও যেসব পুরোহিতরা এসেছিল তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিল খুব ভালো। তারা বুঝেছিল রানির আসল মতলব আর লাগ ভেলকি হয়েছে কী, ওদের হাতেই জমা পড়ে ফাঁদকাটা গাঁয়ের সেই ফাঁদকাটা গল্পটা।

আবার এমন সময় ওই গাঁয়ের একটি ছেলে ক্ষীরের নদীতে ভাসতে ভাসতে, পাখির পিঠে চেপে বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে দেখে ফেলে ওই ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা লালটুম নীলটুম সৈন্যদের। আর ভয়ে ছুটতে ছুটতে ভিরমি খেতে খেতে এসে গিয়ে পড়ে সেই ভালো পুরোহিতদের কাছে।

ভালো পুরোহিতরা ওই ছেলেটির হাতে ওই গল্পটা দিয়ে বলে, ওই দূরে আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়ের কোণে, যেখানে রানির কেউ ওকে দেখতে পাবে না, দেখতে পেলেও খুঁজে পাবে না, খুঁজে পেলেও ছুঁতে পারবে না, সেই ঘোমটা টানা নোলক পরা গুহায় পালিয়ে যেতে। এই কথা বলে ওই পুরোহিতরা হারিয়ে যায়। আর অবাক ছেলেটিও পালিয়ে যায় সেখানে।

যত সেদিকে যায় দূরে বহু দূরে ছোটো মুসুরির দানার মতো হয়ে যায় তার গ্রাম। আর সোনার গাঁয়ের গল্প হয়ে ওঠে অন্য আর পাঁচটা গাঁয়ের গল্পের মতোই।

ছেলেরা, ছোকরারা সবাই সবাই মেতে ওঠে ওই চ্যাটানিনো খেলনা হাতে নিয়ে। আর যেই না মেতে ওঠা ওরা কাজ করলেও আর ঘাম ঝরে না ওদের গা থেকে। ঘাম ঝরলেও সেই ঘাম আর পাখি হয় না। না-পাখির সোনার গাঁয়ে তাই আর মাটির গান থাকে না। মাটির গান থাকে না বলে চাষিরা চাষ করলেও সেই ফসল আর সোনার হয় না।

ওদিকে রূপকথার গল্পরাও হারিয়ে গেছে গল্প খেকো রানির পেটে। তাই ছেলেপুলেরা চ্যাটানিনো ঘেঁটে ঘেঁটে গোবরের ঢেলার মতো ঘুমিয়ে পড়ে তুঁষের বিছানায়। তাই হাওয়া আর ওদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় না নদীর কূলে। আর নদীও তাই আর ক্ষীরের নদী হয় না। পুকুরও হয় না দুধের পুকুর।

আস্তে আস্তে বণিকের দেখা সেই সোনার গাঁ সোনাহারা গাঁ হয়ে যায়। আর আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়ের আলতা রক্তআলতা হয়ে মাঝেমধ্যেই কাঁদতে থাকে আর শাঁখের চুড়ি শাঁখের করাত হয়ে কাটতে থাকে দিন, কাটতে থাকে রাত। ওদিকে সোজা মাটি উল্টে যায় আর উল্টো আকাশ ধোঁয়ায় আর ধুলোতে কখনো সোজা হয়ে কখনো কুঁজো হয়ে কাশতে থাকে বুড়োবুড়িদের মতো।

যদিও গাঁয়ের বুড়োবুড়িরা এটা ভালোভাবে নেয় না। তাদের বাপ-ঠাকুরদাদের এই গাঁ এমন হল এটা তারা কিছুতেই মানতে পারে না। তারা এর বিহিত চায়।

তারা ছেলেছোকরাদের বলে এ কথা। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ওরা চ্যাটানিনো নিয়ে খেলা করে, খেলা করেই যায়। হাল বেগতিক দেখে গাঁয়ের বুড়োরা হাল ছেড়ে দেয়।

হাল ছাড়ে না নানুখুড়ো। এককালে সে কত রূপকথার গল্প শুনেছে পাখির কাছে। মাছের গল্প, গাছের গল্প, হাওয়ার গল্প, ফসলের গল্প, নোলকের গল্প আর ফাঁদকাটার গল্প। কিন্তু কোনো গল্পই তো তার আর মনে নেই। সব খেয়ে নিয়েছে ওই গল্প খেকো রানি।

শুধু একটা টুকরো, একটা ভাঙা কাঁচের মতো টুকরো, মাঝে মাঝে চকচক করে ওঠে তার মাথায়। ছোট্ট গলু তার কোলে বসে আছে, আর সে বলছে, নদীর কোন এক মাছের কথা, যে মাছ কথা বলতে পারত, আর যে মাছটা রাজার মেয়েকে বাঁচিয়েছিল ডুবে যাওয়া থেকে। কিন্তু মাছটার নাম কী ছিল, রাজার মেয়েটা শেষে কী হল, সেসব আর মনে পড়ে না নানুখুড়োর।

শুধু গলুর সেই ছোট্ট মুখটা মনে পড়ে, যে মুখ হাঁ করে গিলত প্রতিটা কথা, ঠিক যেমন করে একদিন গল্প খেকো রানি গিলে খেয়েছিল তাদের সব গল্প।

এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে তার মাথায় নোলক শব্দটি ঘুরপাক খায়। মনে পড়ে পুরনো দিনের কথা। মনে পড়ে তার সংসারের কথা। আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়ে নোলক পরিয়ে বউটাকে ঘরে এনেছিল সে।

আর তার ছেলেটা! সে তো সেই কবে হারিয়ে গেছে। যখন পুরোহিতরা, লালটুম নীলটুম সেনারা এল দেশে। লোকে বলে তার পোলাটা ডাকাত হয়ে গেছে। গলু ডাকাত। সেনারা নাকি তাকে খুঁজছে। পেলেই ধরে নিয়ে যাবে গল্প খেকো রানির কাছে।

ন বছর আগে যে ছেলেটা ঘোমটা টানা নোলক পরা গুহায় পালিয়ে গিয়েছিল বুকে করে সেই ফাঁদকাটা গল্পটা নিয়ে, সেই ছেলেটাই গলু। গুহার ভেতর অন্ধকার, বাইরে সেনাদের খোঁজাখুঁজি, আর মাঝখানে একটা কিশোর ছেলে, তার বুকের সাথে চেপে ধরে রাখা একটামাত্র গল্প। প্রথম প্রথম সে ভয়ে কাঁপত। তারপর আস্তে আস্তে গুহাই হয়ে উঠল তার ঘর, পাহাড়ই হয়ে উঠল তার মা। জোনাকিরা তাকে পথ চিনিয়ে দিত রাতের বেলা, বুনো ফলমূল হয়ে উঠল তার অন্ন। গুহার দেয়ালের ফাটলে একদিন সে পেয়েছিল দুটো শুকনো কাঠি, আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়েরই কাঠি, আর কোমরের ভাঁজে গুঁজে রেখেছিল যত্ন করে।

আর সেই একটামাত্র গল্প, ফাঁদকাটা গল্পটা, সে বলত নিজেকেই, রোজ রাতে, যাতে সেটা হারিয়ে না যায়, যাতে সেটা তার মনের ভেতর থেকে গল্প খেকো রানিও কেড়ে নিতে না পারে। যা নেই তার জন্যই সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় মানুষের, কিন্তু যা আগলে রাখা যায় সেটাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি শক্তি দেয়, এই সত্যিটা গলু শিখল ওই অন্ধকার গুহায়, একলা।

আস্তে আস্তে সে নেমে আসত রাতের আঁধারে গুহা থেকে, রানির লোকদের কাছ থেকে চুরি করত অন্য গাঁয়ের ছিনিয়ে নেওয়া গল্পের ছিটেফোঁটা, আর সেসব বিলিয়ে দিত পথে পথে, যেখানে যেখানে মানুষ তখনও একটু গল্প শোনার তেষ্টা রাখে। শুধু নিজের গল্পটা, ফাঁদকাটা গল্পটা, সে কাউকে দেয়নি কোনোদিন। সেটা সে রেখে দিয়েছিল বুকের ভেতর, ন বছর ধরে, ঠিক সেই দিনটার অপেক্ষায় যেদিন সেটা শেষবারের মতো কাজে লাগবে।

এভাবেই সে হয়ে উঠল রানির সবচেয়ে বড় শত্রু, আর গাঁয়ে গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়া একটা নাম, গলু ডাকাত।

ভাবতে ভাবতে উচাটন হয় নানুখুড়োর মন। আর একটা পাখি কখন যেন ঠুকরে চলে যায় তার মাথায়। পাখি! নানুখুড়ো চমকে দেখে তার ঢেরাকাটা কুঁচকা চামড়ায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। আর আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়টা যেন সেই ঘাম দেখে দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে তাকে।

নানুখুড়ো বুঝে যায় বাকিটা। আর হাঁটতে থাকে পাহাড়ের দিকে।


৪

আঁধার রাত। এমন রাতকে লোকে বলে ঘুটঘুটে। নানুখুড়ো তবু হাঁটতে থাকে। পায়ের তলায় সর্‌ সর্‌, মর্‌ মর্‌। হিস্‌ হিস্‌, মিশ্‌ মিশ্‌। নানুখুড়ো ভয় পায় না। আর ভয় পায় না বলে জোনাকিরা আসে। পথ দেখায়। রাতের লতারা সরে যায় নানুর পথ থেকে।

এভাবে ন রাত ন দিন, ন প্রহর, ন পল হেঁটে নানুখুড়ো যেখানে পৌঁছে থমকায় সেটা ঘোমটা টানা নোলক পরা গুহা। কে তাকে এখানে নিয়ে এল সে বুঝতে পারে না, কিন্তু বুঝতে পারে একটা হাত তার কাঁধে।

ঘুরে চেয়ে দেখে একটা ডাকাতের মতো ছেলে। রক্তমাখা জামা তার। প্রথমে ভয় পায়। ভয় পেয়ে চোখ বোজে সে। তারপর আবার চোখ খোলে। দেখে তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার মতো একটা মুখ। সে গলু বলে ডাকে। আর গলুর চোখে তখন জল। নানুর চোখেও জল, আর গায়ে ঘাম।

এমন সময় লালটুম নীলটুম সেনারা তাদেরকে ঘিরে ধরে ফেলে। গলু ডাকাত বিনা যুদ্ধে ধরা দেয়। আর বাবার চোখের জল আর মাথার ঘাম বুকে নিয়ে চলে যায় সেনাদের সাথে।

রানির কাছে সেই খবর যায় আলোর বেগে। গল্প খেকো রানিও যেন কতদিন অপেক্ষা করছিল এই দিনটির জন্য। তাই সে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আর যত ব্যাকুল হয় তত আকাশের দিকে মুখ হাঁ করে। তার হাঁ দেখে চাঁদ-সুয্যি ভয় পায়। যত ভয় পায়, তত নিজেদের মুখ ঢাকে মেঘের কাপড়ে।

ওদিকে গলু ডাকাতও কি অপেক্ষা করেনি এই দিনটির জন্য? সে মুচকি মুচকি হাসে, আর যখন হাসে চাঁদ-সুয্যি তখন মেঘের কাপড় সরিয়ে একটু একটু তাকায়। কিন্তু কী হচ্ছে এসব বুঝতে পারে না কেউ। শুধু বোঝে গলু ডাকাত।

ওদিকে রানির প্রাসাদে রানির আদেশে রানির প্রেমিক মন্ত্রীকে বন্দি করা হয়, আর গলু ডাকাতকে স্নান করিয়ে পরানো হয় মন্ত্রীর পোশাক। তারপর চাঁদ যখন গোল টিপের মতো হয়, রানি ডেকে পাঠায় গলু ডাকাতকে।

রানি গলু ডাকাতকে দেখে হাসতে থাকে। এমন হাসি, যেন বহুদিনের উপোসের পরে বাদাবনের বাঘিনী তার হাতের নাগালে হরিণকে পেয়েছে। যেন ভুবন কাঁপিয়ে দক্ষিণ রায়ের মতো সেই হাসি হুংকার হয়ে লোনা বাতাসকে কাঁপিয়ে চলে যেতে চাইছে সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে পেরিয়ে চাঁদ আর তারার দেশে।

আর গলু ডাকাত? সে?

ওর কানে সেসব হাসি, হুংকার, ভয় কিছুই ঢোকে না। সে যেন থির বিজুরি মেঘের বুকে। জমাট। ঘন। নিবিড়। সেখানেও যে কিছু বজ্র আছে, কঠিন ও কঠোর জলের ধ্যান পুষ্প আছে, গল্প খেকো রানি তা বুঝতে পারে না।

বুঝতে পারে না বলে গলু ডাকাতের কাদামাখা ধ্যাবড়া ফাটা পায়ে এগিয়ে আসার অলৌকিক ছন্দে ঘোর লেগে যায় রানির চোখেই।

গলু এগোয়। যত এগোয়, রানির জগৎ তত টলতে থাকে। তত প্রাসাদের আয়নাগুলো কাঁপতে থাকে। আর এক-একটা আয়নায় ফুটতে থাকে এক-একটা দৃশ্যের পৃথিবী। কোনোটাতে পাহাড়। কোনোটায় নদী, তো কোনোটাতে ঘামের পাখি। আর সব থেকে বড় আয়নাতে নানুখুড়োর কপালের হিমাদ্রি ভাঁজ।

রানি বিমোহিত, আপ্লুত হয়ে বলে—

— এসো, আরও কাছে এসো গলু।

গলু এগিয়ে যায়।

— আরও।

গলু আরও কাছে যায়।

এমন কাছে যে দুজনের নিঃশ্বাসে দুজনের চুল নড়ে ওঠে।

রানি তার পটলচেরা নীল চোখ দুটো মেলে ধরে বলে—

— আমার চোখের দিকে তাকাও। তাকাও।

নিশির মতো সে ডাকে, সারা পৃথিবী যেন সাড়া দিতে চায়। নিশির মতো সে ডাকে, সারা পৃথিবী যেন ডুবে মরে শান্তি পেতে চায়। গলু ডাকাত কিন্তু জানে, যে একবার তাকায়, সে আর নিজের কথা মনে রাখতে পারে না। সাত সমুদ্দুর তেরো নদী, আপন গাঁ, আপনজন, সব ভুলে যায়। তারপর শুধু মনে থাকে রানি।

গলু ডাকাতের মনে পড়ে ন বছর ন মাস ন দিন ধরে সে একটাই গল্প বুকের ভেতর আগলে রেখেছে। সে গল্প মানুষের বুকের ধুকপুকানির গল্প। সে গল্প ফাঁদকাটা গাঁয়ের ফাঁদকাটা গল্প।

তাকে কোনো নিশিডাক ভোলাতে পারে না।

তাই সে তাকায় না। উল্টে একটা উল্টো কাজ করে।

সে শুধু মুচকি হাসে আর নানুখুড়োর একফোঁটা ঘামের একটা কণা ভাসিয়ে দেয় বাতাসে। সেই ঘামের কণা আলো পড়ে চকচক করে। যেন পারা-দেওয়া আয়না। সেই আয়নাতে রানির মুখ ভাসে গলুর চোখে, আর গলুর মুখ ভাসে রানির চোখে। এ যেন এক অলৌকিক শুভদৃষ্টি। আর সেই শুভদৃষ্টি জুড়ে কপট হাসির পাকশালা।

এসব চাঁদ বুঝতে পারে না। সে সেই মায়াবী হাসির যুগলবন্দি দেখে মেঘের আড়াল থেকে একটু উঁকি দেয়। যেন সেও হয়ে গেছে কোমলমতি কিশোরী।

এদিকে রানি আবার বলে... কী বলে কেউ বুঝতে পারে না, যেন জগৎ থমকে গেছে, বাতাস কথাগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছে গুমঘরের দিকে।

আর গলু ডাকাত? সে তখন বিড়বিড় করে বলে চলে—

টানাকাঠি

মানাকাঠি

ঝিরে ঝুম,

মায়ার মায়া

হ রে গুম।

এই বলে কোমরের ভাঁজ থেকে বের করে আনে আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড়ের সেই দুটো শুকনো কাঠি।

একবার ঘষে।

দুবার ঘষে।

তিনবার ঘষতেই...

টিক্!

একটা ফুলকি।

তারপর দুটো।

তারপর দশটা।

তারপর হাজার হাজার।


মুহূর্তে সারা প্রাসাদ ভরে যায় জোনাকির আলোয়। জোনাকি উড়তে উড়তে ফুল হয়। ফুল উড়তে উড়তে পালক হয়। পালক উড়তে উড়তে গল্পের পাতায় বদলে যায়। সেই পাতাগুলো আবার পাখির মতো ডানা মেলে আকাশে ঘুরতে থাকে।

রানি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

সে জীবনে অনেক গল্প গিলেছে, কিন্তু গল্পের জন্ম কোনোদিন দেখেনি।

গলু ডাকাত তখন বুকের ভেতর থেকে আস্তে আস্তে বের করে আনে সেই ফাঁদকাটা গল্প।

ন বছর ন মাস ন দিন ধরে বুকে আগলে রাখা গল্প।

বাবার ঘামের গন্ধে ভেজা গল্প।

মায়ের আঁচলের শান্তিমাখা গল্প।

পাহাড়ের নীরবতায় বড় হওয়া গল্প।

সে গল্পকে দুহাতে তুলে ধরে গলু।

তারপর খুব আস্তে বলে—

গল্প নেবে রানি?

ফাঁদকাটা গাঁয়ের গল্প?

রানির চোখ তখন আর চোখ নেই।

সে হয়ে যায় লোভের হাত।

রানির দুই হাত তখন আর হাত নেই।

সে হয়ে যায় লোভের চোখ।

রানি প্রথমে গলু ডাকাতের কথা শুনে পাঁচ পা পিছিয়ে যায়। তারপর এক পা এগোয়।

আরও এক পা।

আরও।

গলুও পিছোতে পিছোতে ছাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়ায়। আর পিছোয় না।

সে ওই দুটো কাঠিকে আবার ঘষতে ঘষতে শুধু ছড়া কাটে—

আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি

ঢেরা কাটা--কাটি রে---

লকলকিয়ে উঠরে টুটি

আলো দিয়ে কাটি রে---

গলু বিড়বিড় করে আবার বলে—

আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি

লোভের হাতে লাগ

আকাশ পানে ছুটুক সেও

অস্ত্র ভুলে যাগ।

এদিকে রানির লোভের হাত আর হাতের লোভ সব একাকার হয়ে যায়। তারা হাঁ করতে চায়। আর তারা হাঁ করতে চায় বলে রানিও হাঁ করে।

আরও হাঁ।

আরও।

আরও হাঁ।

এত বড় হাঁ, যেন আকাশটাকেই গিলে খাবে।

গল্পটা তখন গলুর হাত থেকে ছুটে উঠে যায়।

পাখি হয়ে।

আলো হয়ে।

জোনাকি হয়ে।

চাঁদের কপালে গিয়ে বসে।

রানি হাত বাড়ায়। আর হাত লম্বা হতে থাকে।

রানি মুখ বাড়ায়। আর রানির গলা লম্বা হতে থাকে।

হাত লম্বা হয়। গলা লম্বা হয়।

লম্বা।

আরও লম্বা।

সরু।

আরও সরু।

যেন বাঁশের কঞ্চি বাতাসে দুলছে।

যেন কচি লাউলতা লকলকিয়ে উঠছে।

যেন লোভের ছায়া, বিকেলের মতো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

গল্পটা এবার চাঁদকে ছাড়িয়ে আরও ওপরে ওঠে।

যত ওপরে রানির গলা, রানির হাতও তত ওপরে ওঠে।

তারপর...

চাঁদ চুপচাপ।

মেঘ চুপচাপ।

পাহাড় চুপচাপ।

আর রানির মুখ আশমান পানে। রানির হাত আশমান পানে।

এতটা ওপরে যে পৃথিবীতে ফিরতে গেলে লেগে যাবে কিছুটা সময়।

আর গলু এই ক্ষণটার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। তাই কালক্ষেপ না করে ঠিক সেই মুহূর্তেই সে রানির কোমর থেকে আলোর তরোয়ালটি টেনে নেয়।

...আর যেই না আলোর তরোয়াল ঝলসে উঠল, আর শোনা গেল একটিই আওয়াজ:

খচাৎ!

যেন রাতের ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে টানা একটা সাদা দাগ!

প্রথমে কেউ কিছুই বুঝল না।

রানি নিজেও না।

সে তখনও হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন এখনও গিলে খাবে সেই ফাঁদকাটা গল্প।

তারপর...

টুপ্।

একফোঁটা।

দুফোঁটা।

তারপর ফিনকি।

কিন্তু সে রক্ত একা এল না।

রক্তের সঙ্গে বেরিয়ে এল একটা গল্প।

তার পিছু পিছু আর একটা।

আর একটা।

তারপর আর গোনাই গেল না।

যেন কত যুগ ধরে বন্দি হয়ে থাকা পাখির ঝাঁক একসঙ্গে খাঁচা ভেঙে উড়ে গেল।

কোনো গল্পের গায়ে ছিল মাটির গন্ধ।

কোনোটার গায়ে ধানের গন্ধ।

কোনোটার গায়ে মায়ের কোলের গন্ধ।

তো কোনোটার গায়ে নদীর জল, পাহাড়ি বাতাসের গন্ধ।

কোনোটা উড়তে উড়তে চাঁদের কপালে বসে তারা হয়ে জ্বলল।

কোনোটা বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে নেমে গেল মাটির তলায় বীজ হয়ে।

কোনোটা ঘামের পাখির পিঠে চেপে উড়ে গেল বহু দূর দেশে।

সাত সমুদ্দুর।

তেরো নদী।

তারও পরে।

কোথাও গিয়ে রাজপুত্রের নাম বদলে গেল।

কোথাও রাক্ষস হয়ে গেল বাঘ।

কোথাও বুড়ি হয়ে গেল ঠাকুমা।

তো কোথাও ঠাকুমা হয়ে গেল নানি।

কোথাও ক্ষীরের নদী সমুদ্র হল। তো কোথাও আলতা নুড়ি শাঁখের চুড়ি পাহাড় বরফে ঢাকা পাহাড় হয়ে দাঁড়াল।

গল্পেরা কিছুই মনে রাখল না নিজের নাম, ধাম, ঠিকানা।

শুধু মনে রাখল নিজের প্রাণটুকু।

তাই আজও লোকে বলে, গল্পের যেমন পা নেই, তেমনি তার পথেরও শেষ নেই। এক দেশের গল্প হাঁটতে হাঁটতে আর-এক দেশের হয়ে যায়। আবার সেই দেশের গল্প নদী পেরিয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে, মানুষের মুখে মুখে বদলে যায় আর-এক রূপে। নাম বদলায়, ভাষা বদলায়, পোশাক বদলায়, কিন্তু বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা আর বদলায় না।

তেমনই বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা ফিরে আসে ফাঁদকাটা গাঁয়েও।

বুড়োবুড়িদের মনে ফিরে আসে।

কচিকাচাদের স্বপ্নে ফিরে আসে।

ফিরে আসে সাদা সাদা, নীল নীল, লাল লাল, সবুজ সবুজ সেইসব গল্প, সেইসব অবাক কথারা।

রুপালি মাছেদের সাথে হাসতে হাসতে ফিরে আসে। সোনালি পাখিদের সাথে শিস দিতে দিতে ফিরে আসে। আলোর সাথে, হাওয়ার সাথে বিলুইয়ের মতো খুনসুটি করতে করতে ফিরে আসে।

শুধু আর ফিরে আসে না গলু ডাকাত আর নানুখুড়ো।

কেউ বলল, রানির বেঁচে থাকা বণিকেরা আর পুরোহিতেরা তাদের এমন এক গুমঘরে বন্দি করেছে, যার দরজা আছে, কিন্তু পথ নেই।

কেউ বলল, না, তারা বন্দি হয়নি।

যে মানুষ গল্প বাঁচিয়ে রাখে, তাকে কোনো গুমঘর বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না।

সে একদিন না একদিন বাতাস হয়ে বেরিয়েই পড়ে।

আবার কেউ কেউ তারা-ফোটা রাতে আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল—

ওই যে পাশাপাশি দুটো তারা। ওই দুটোই নানুখুড়ো আর গলু ডাকাত।

ফাঁদকাটা গাঁয়ের কোনো ছেলে যখন চ্যাটানিনোটা পাশে রেখে বুড়োর মুখে গল্প শুনতে বসে, তখন ওই দুটো তারা একটু একটু জ্বলে ওঠে। জ্বলতে জ্বলতে মিটিমিটি হাসে।

লোকে তখনও বলে, দেখ দেখ গলু ডাকাত আর নানুখুড়ো কেমন গল্প শুনছে, পৃথিবীর গল্প...

Rajib Dutta R
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Rajib Dutta

জন্ম: ১৯৮১, পশ্চিমবঙ্গ। প্রকাশিত কবিতা বই : একতারা নদী, পাখিপুরাণের গান, না-চলা পথ। পেশায় প্রাথমিক শিক্ষক। লিটল ম্যাগাজিন কর্মী, শিক্ষক ও কর্মচারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত একজন সক্রিয় কর্মী।

স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি CC BY-NC-ND 4.0 লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব; তা Poorvam-এর নীতি বা অবস্থান প্রতিফলিত করে না।

Rajib Dutta-এর আরও লেখা