জ্যৈষ্ঠ
মাসের গরম যে কী জিনিস, তা কলকাতার মানুষকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। তবে এবারের গরমটা
যেন সব হিসেব ছাড়িয়ে গেছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে না হতেই রাস্তাঘাট শুনশান হয়ে
পড়ছে। পিচের রাস্তা থেকে তাপের হলকা উঠছে, বাড়ির ছাদে পা রাখা দায়, আর জানলা খুললেও
ঘরে বাতাসের বদলে ঢুকছে গরমের ঝাপটা। ফ্যানের তলায় বসেও ঘাম থামার নাম নেই। তার ওপর
আকাশের মুখ ভার হওয়ারও কোনো লক্ষণ নেই।
বেশ
কয়েক বছর ধরেই কলকাতায় গরমের দাপট বেড়েছে। কিন্তু এবারের হাঁসফাঁস করা আবহাওয়া
যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না। দিনের পর দিন বৃষ্টির দেখা নেই। আকাশের দিকে তাকালে মনে
হয়, এক পশলা বৃষ্টির জন্য শহরটা যেন হাপিত্যেশ করে বসে আছে। বিকেলের দিকে কোথাও কোথাও
কালো মেঘ জমলেও শেষ পর্যন্ত তা হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। ফলে গরম থেকে মুক্তি তো মিলছেই
না, বরং বাতাসের আর্দ্রতায় অস্বস্তি আরও বাড়ছে।
এই গরমের হাত থেকে বাঁচতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামার অপেক্ষায় থাকি আমরা। যদিও সন্ধেবেলাতেও স্বস্তি বিশেষ মেলে না, তবু বাড়িতে বসে হাঁসফাঁস করার চেয়ে পাড়ার ক্লাবে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়া ঢের ভালো। আমাদের সেই ক্লাবের আড্ডায় অবশ্য গরম নিয়ে আলোচনা করার লোকের অভাব নেই। কে কতবার স্নান করেছে, কার বাড়ির ফ্যানের হাওয়া সবচেয়ে গরম, কিংবা বৃষ্টি কবে নামবে—এসব নিয়ে রীতিমতো তর্ক চলে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তার ওপর আজ রবিবার, তাই সেই আলোচনা বেড়েছে বই কমেনি।
সন্ধে নামার কিছুক্ষণ পরেই ক্লাবে গিয়ে দেখি, অনেকেই ইতিমধ্যে এসে হাজির। কেউ হাতপাখা নিয়ে বসে আছে, কেউ আবার কাগজের কাপে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবহাওয়া দপ্তারের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করছে। আমি বসতে না বসতেই পেছন থেকে তন্ময় বলে উঠল,
- “এভাবে আর কদিন চলবে বল
তো? বৃষ্টি না হলে তো এবার গরমেই মরে যাব!”
কথাটা
শুনে হাসি পেল। তবে উত্তর দেওয়ার আগেই চোখ পড়ল ক্লাবের দরজার দিকে। সাধনজেঠু তখন
ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকছেন। তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হলো, গরমের আলোচনা নিয়ে তাঁর বিশেষ
আগ্রহ নেই। বরং মনে হচ্ছিল, মাথার মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
সাধনজেঠু
এসে নিজের চেনা চেয়ারটায় বসলেন। তারপর খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে চুপচাপ পড়তে শুরু
করলেন।
আমরাও
যে যার মতো কথা বলতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে অনুপমের কী মনে হলো কে জানে! সে সবাইকে
ইশারায় চুপ করতে বলে সাধনজেঠুর দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর মুখে একটু শয়তানি হাসি
ফুটিয়ে বলল, “কী ব্যাপার, জেঠু? আজ মুখে কুলুপ এঁটেছ নাকি? আমাদের সঙ্গে কথা বলার
জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে না। যা আজগুবি গল্প বলার আছে, বলে ফেলো!”
এর পরেও কোনো উত্তর না আসায় অনাদি এবার বলে উঠল, “আজ তো অনুপমও গল্প—না সরি, তোমার জীবনের অভিজ্ঞতা শুনতে চাইছে। তো একটা বলেই ফেলো!” এতেও যখন কোনো উত্তর এল না, তখন আমিই শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, কী এত ভাবছ? এসে থেকে দেখছি, তোমার মুখটা ভার হয়ে আছে। অসুবিধা না থাকলে আমাদের বলতে পারো। এতক্ষণ পরে জেঠু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন, “অসুবিধা থাকবে কেন? আজ এক পুরোনো ঘটনার কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে এক কাছের বন্ধুর কথা।”
আমি আবার
জিজ্ঞাসা করলাম, কী ঘটনা?
জেঠু
উত্তর দিলেন, “না থাক। এখানে আবার কারও আমার কথা আজগুবি গল্প বলে মনে হয়। আর এই ঘটনাটা
তো…”
অনুপম
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সনাতন ওকে বলার সুযোগ না দিয়েই বলে উঠল, “দূর, ছাড়ো
তো ওর কথা! জানোই তো, ওর ওরকমই স্বভাব। তুমি বলো।”
জেঠু
একবার অনুপমের দিকে তাকিয়ে নিলেন। তারপর মাথার ওপর ঘুরতে থাকা পাখাটার দিকে কিছুক্ষণ
একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। গল্পের আশায় আমরা এবার বেশ জাঁকিয়ে বসলাম। কারণ আমরা ভালো
করেই জানতাম, সাধনজেঠু যখন এভাবে থামেন, তখন তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে উঠে আসতে
চলেছে কোনো না কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনা।
সাধনজেঠু একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করলেন, “বেশ অনেক বছর আগের কথা। আজ থেকে প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর আগের ঘটনা। তখন কাজের খুব চাপ। দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাজে কেটে যেত। একটার পর একটা কাজ, মিটিং, বাইরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে নিজের জন্য সময় বের করাই দায় হয়ে উঠেছিল। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগও ক্রমশ কমে এসেছিল। কে কোথায় আছে, কী করছে, সেসব খবরও আর নিয়মিত রাখা হয়ে উঠত না। সেই সময় একদিন সকালে ঘরে বসে জরুরি কিছু কাজ করছি। এমন সময় পিয়ন এসে আমায় একটা চিঠি দিয়ে গেল। চিঠিটা হাতে নিয়ে প্রথমে বিশেষ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু খামের ওপর প্রেরকের নামটা চোখে পড়তেই বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে নামটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
খামের
ওপর লেখা পরিচিত একটা নাম—অরিন্দম। কত বছর পর ওর চিঠি পেলাম! তাড়াতাড়ি খামটা খুলে
ভেতর থেকে হলদেটে হয়ে আসা চিঠিটা বের করলাম। কাজের তাড়ায় খামের গায়ে লেখা বাকি
কথাগুলো তখন আর ভালো করে দেখা হয়নি।
আমি
তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম।
প্রিয় সাধন,
অনেক দিন তোকে চিঠি লিখব ভাবছি, কিন্তু হয়ে উঠছিল না। জানি না, এই চিঠি পেয়ে তুই কতটা অবাক হবি। কত বছর হয়ে গেল আমাদের দেখা হয়নি, ঠিক করে কথাও হয়নি। মাঝে মাঝে পুরোনো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয়, সেই দিনগুলো যদি আর একবার ফিরে পেতাম!
যাক সে কথা। তোকে একটা খবর দেওয়ার জন্যই আজ চিঠি লিখছি। আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী ১৭ই জ্যৈষ্ঠ বিয়ে। সপরিবারে উপস্থিত থাকার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ রইল। কত দিন তোকে দেখি না, কত কথা জমে আছে! এই উপলক্ষে যদি আবার একসঙ্গে বসার সুযোগ হয়, তাহলে মন্দ কী!
বিয়ের দু-এক দিন আগে এলে আরও ভালো হয়। তাহলে একটু নিরিবিলিতে বসে পুরোনো দিনের গল্প করা যাবে। তোর সঙ্গে কত দিন যে মন খুলে আড্ডা দিইনি! এবার কিন্তু আর কোনো অজুহাত শুনব না।
বাড়ির ঠিকানা নিচে দিলাম। আশা করি, চিঠি পেয়েই উত্তর দিবি। তোর আসার অপেক্ষায় রইলাম।
ইতি,
তোর বন্ধু,
অরিন্দম।
ঠিকানা:
অরিন্দম মুখোপাধ্যায়
গ্রাম—মধুবনপুর, ডাকঘর—চাঁদিপুরঘাট, থানা—কুলতলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ।
চিঠিটা
পড়ে মনে মনে ঠিক করেছিলাম, দু-এক দিন আগেই সবাইকে নিয়ে হোক বা একা, যেভাবেই হোক বিয়েতে
যাব। অথচ তারপর কাজের চাপে এমন ডুবে গেলাম যে দিন পেরিয়ে সপ্তাহ চলে গেল, আর যাওয়ার
কথাটাই মন থেকে মুছে গেল।
হঠাৎ একদিন কাজের ফাঁকে কথাটা মনে পড়ল। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখি, পনেরো তারিখ! অর্থাৎ বিয়ের আর মাত্র দু-দিন বাকি। চিঠিতে লেখা ছিল, ১৭ই জ্যৈষ্ঠ বিয়ে। অথচ বিয়ের দু-এক দিন আগে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করব বলে যে ভেবেছিলাম, সেই সময়টুকুও আর হাতে নেই। তার ওপর তখন একা যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। তোদের জেঠিমা ছেলেকে নিয়ে তার বাপের বাড়ি গিয়েছিল। সেখানে তখন আমার এক শালীর বিয়ে, তাই বেশ কয়েক দিন আগেই তারা চলে গিয়েছিল। অরিন্দমের মেয়ের বিয়ের কথা যখন মনে পড়ল, তখন আর ওদের সঙ্গে যাওয়ার কথা বলারও সুযোগ ছিল না। কী আর করা যাবে! ঠিক করলাম, পরের দিন বাকি কাজগুলো যতটা সম্ভব গুছিয়ে নিয়ে বিয়ের দিন সকালে রওনা দেব। অন্তত বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে গিয়ে হাজির তো হতে পারব!
যেমন
ভাবা, তেমন কাজ। বিয়ের দিন বেশ সকাল সকাল তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আগের দিন কাজগুলো
যতটা সম্ভব গুছিয়ে রেখেছিলাম, তাই সেদিন আর দেরি করার কারণ ছিল না। সঙ্গে একটা ছোট
ব্যাগ নিয়ে বেরোলাম। ঠিক করেছিলাম, বিয়েবাড়িতে রাত কাটিয়ে পরদিন ফিরে আসব। অরিন্দমের
সঙ্গে দেখা হবে, অনেক দিনের জমে থাকা কথাও বলা যাবে। সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লাগছিল।
বাগবাজার
থেকে বাস ধরে শিয়ালদহ পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল বেশ খানিকটা গড়িয়ে গেল। সেখান থেকে জয়নগর-মজিলপুর
যাওয়ার ট্রেনে উঠলাম। তখনকার দিনে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় পৌঁছনো আজকের
মতো সহজ ছিল না। কোথাও ট্রেন, আবার কোথাও নদী পারাপারের জন্য লঞ্চ বা নৌকার ওপর নির্ভর
করতে হতো।
ট্রেন ছাড়ার পর জানলার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রথমে চোখে পড়ছিল শহরের চেনা দৃশ্য—ঘিঞ্জি বাড়িঘর, দোকানপাট, রেললাইনের ধারে ছোট ছোট বসতি। তারপর ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ততা পিছনে পড়ে যেতে লাগল। বাড়িঘরের ফাঁক বাড়ল, চোখে পড়তে লাগল মাঠ, পুকুর, গাছপালা আর ছোট ছোট স্টেশন। কোথাও ধানজমি, কোথাও পুকুরের জলে রোদ ঝিকমিক করছে, আবার কোথাও গাছের ছায়ায় বসে দু-একজন মানুষ গল্প করছে। ট্রেনের জানলা দিয়ে গরম হাওয়া আসছিল ঠিকই, কিন্তু বাইরের দৃশ্যটা বেশ ভালো লাগছিল। মাঝে মাঝে ছোট স্টেশনগুলোয় ট্রেন থামছিল। কেউ নামছে, কেউ উঠছে। চায়ের হাঁক, বাদামওয়ালার ডাক আর সহযাত্রীদের কথাবার্তার মধ্যে বসে আমি হারিয়ে গেলাম পুরোনো স্মৃতির জগতে।
অরিন্দমের
দাদুর সঙ্গে ওর বাবার কোনো একটা কারণে মনোমালিন্য হয়েছিল। তাই ওর বাবা স্ত্রী-সন্তানদের
নিয়ে দেশের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। সেই সময় থেকেই অরিন্দমের সঙ্গে আমার
পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যে একে অপরকে ছাড়া আমাদের দিনই কাটত
না। একই স্কুলে পড়তাম। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, ছুটির পর বাড়ি ফেরার বদলে এদিক-ওদিক
ঘুরে বেড়ানো, কখনো মাঠে খেলা, কখনো পাড়ার অলিগলি ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা—কত কী
যে করেছি, তার হিসেব নেই! তখন তো আর বুঝতাম না, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো যে
নিঃশব্দে পেরিয়ে যাচ্ছে।
সময়
তো আর কারও জন্য থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে বড় হলাম। পড়াশোনার পথও আলাদা হয়ে গেল।
আমি আর কলেজে পড়তে পারলাম না। সংসারের দায়িত্ব নিতে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম।
অরিন্দম অবশ্য কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তখন থেকেই আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ কমতে শুরু করল।
আগে যে ছেলেটার সঙ্গে সারাদিন কাটিয়েও কথা ফুরোত না, তার সঙ্গেই দেখা করার সময় বের
করা কঠিন হয়ে উঠল।
এরই
মধ্যে একদিন খবর পেলাম, অরিন্দমের দাদুর শরীর খুব খারাপ হয়েছে। সেই কারণে ওর বাবা
সবাইকে নিয়ে আবার দেশের বাড়িতে ফিরে গিয়েছেন। খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
তবে তখন কাজের জন্য আমাকে কলকাতার বাইরে থাকতে হতো। ভাবলাম, একবার কলকাতায় ফিরলে ওর
সঙ্গে যোগাযোগ করব। কিন্তু সেই একবার আর ঠিক হয়ে উঠল না।
এরপর
অবশ্য একবার ওর সঙ্গে ওর দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে এক অন্য জগৎ! বিশাল পুরোনো বাড়ি,
বড় বড় ঘর, চারদিকে কত জমিজমা! নিজেদের ধানজমি থেকে গোলাভর্তি ধান আসত। বাড়ির উঠোন
পেরিয়ে গেলেই বিস্তীর্ণ মাঠ, দূরে গাছের সারি আর গ্রামের সেই চেনা শান্ত পরিবেশ।
তারপর
আবার যে যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কাজ, সংসার, দায়িত্ব—সবকিছুর ভিড়ে দিন পেরিয়ে
মাস, মাস পেরিয়ে বছর চলে গেল। যোগাযোগটা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার
কী জানিস, ওর সঙ্গে বন্ধুত্বটা কোনো দিন মুছে যায়নি। কতবার ভেবেছি, একদিন যাব ওর কাছে।
কিন্তু সেই একদিন আর আসেনি।
আমাদের
শেষ দেখা হয়েছিল বহু বছর আগে। আর আজ এত বছর পর সেই বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হবে, আবার
পাশাপাশি বসে কথা বলব। হয়তো আগের মতো সারাদিন ঘুরে বেড়ানো হবে না, কিন্তু অন্তত একবার
ওর মুখোমুখি বসে বলতে পারব—দেখ, এত বছর পেরিয়ে গেলেও তোকে ভুলিনি।
ভাবনায়
বাধা পড়ল সহযাত্রীদের গুঞ্জনে। তাদের কথা শুনে খেয়াল করলাম, ট্রেনটা একটা স্টেশনে
এসে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম, সামনের লাইনে কোনো সমস্যা হয়েছে। ঠিক
কতক্ষণ লাগবে, কেউ বলতে পারল না। অগত্যা জানলার পাশে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায়
রইল না।
শেষ
পর্যন্ত ট্রেন চলতে শুরু করল বটে, কিন্তু ততক্ষণে বেশ অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে।
জয়নগর-মজিলপুর স্টেশনে পৌঁছে যখন নামলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। স্টেশনের বাইরে
এসে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সাইকেলভ্যান ধরলাম। মনে মনে হিসেব করলাম, আর
দেরি না হলে সন্ধের আগেই অরিন্দমের বাড়ি পৌঁছে যাব।
কিন্তু
তখনও বুঝিনি, আসল দেরিটা বাকি রয়েছে।
স্টেশন
ছাড়ার পর প্রথম দিকে রাস্তা মোটামুটি ভালোই ছিল। দুপাশে ছোট ছোট বাজার, দোকানপাট,
বসতি আর গাছপালা দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছিলাম। কোথাও রাস্তার ধারে পুকুর, কোথাও বিস্তীর্ণ
ধানজমি। দুপুরের রোদ তখনও বেশ চড়া। গরমে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। মাঝে
মাঝে দু-একটা সাইকেল বা ভ্যান ছাড়া লোকজনের দেখাই মিলছিল না।
কিছুটা
যাওয়ার পর হঠাৎ গাড়িটা থেমে গেল। চালক নেমে সামনের চাকা পরীক্ষা করতে লাগল। বুঝলাম,
টায়ারে কোনো সমস্যা হয়েছে। আশপাশে মেরামতির দোকানও নেই। চালক অনেক চেষ্টা করে শেষ
পর্যন্ত গাড়িটা কোনো রকমে চালানোর ব্যবস্থা করল। কিন্তু ততক্ষণে আরও প্রায় এক ঘণ্টা
চলে গেছে।
আবার
রওনা হলাম। এবার যত এগোতে লাগলাম, রাস্তা তত সরু হতে লাগল। কোথাও পিচ উঠে গিয়ে বড়
বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার রাস্তার ওপর ইটের টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে। ভ্যানটা
খুব ধীরে চলছিল। শেষ পর্যন্ত একটা ঘাটের কাছে এসে নামতে হলো। সেখান থেকে নদী পার হতে
হবে নৌকা বা ভটভটিতে, তারপর ওপারে গিয়ে ধরতে হবে অন্য কোনো যান।
ঘাটে
পৌঁছে দেখি, নৌকা এইমাত্র ছেড়ে গেছে। পরের নৌকা কখন আসবে, তা কেউ ঠিক করে বলতে পারল
না। ঘাটের পাশে একটা ছোট চায়ের দোকান ছিল। সেখানে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
প্রায়
চল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর নৌকা এল। কোনো রকমে নদী পার হয়ে ওপারে পৌঁছে আবার একটা রিকশা
ধরলাম।
এভাবে
বারবার যান বদলাতে আর অপেক্ষা করতে করতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে এসেছে, খেয়ালই
করিনি। চারপাশের দৃশ্যও ততক্ষণে বদলে গেছে। দুপুরের রোদে যে মাঠঘাট ঝলমল করছিল, সেখানে
এখন গাছের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। গ্রামের রাস্তার দুপাশে এক-একটা বাড়িতে আলো
জ্বলতে শুরু করেছে। কোথাও রান্নার ধোঁয়া উঠছে, কোথাও উঠোনে বসে লোকজন গল্প করছে।
শেষবার
যখন ঘড়ি দেখলাম, তখন প্রায় সন্ধে সাড়ে সাতটা। অরিন্দমের বাড়ি পৌঁছতে তখনও কিছুটা
পথ বাকি। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে যাওয়ার কথা দিয়েও শেষ
পর্যন্ত বিয়ের দিন রাত করে হাজির হচ্ছি! অবশ্য আমার হাতে তখন আর কিছু করারও ছিল না।
অবশেষে
রাত আটটা নাগাদ রিকশা থেকে নামলাম। অরিন্দমের পাড়ার নামটা আমার মনে ছিল—মুখুজ্জেপাড়া।
চালককে সেখানকার রাস্তা জিজ্ঞাসা করতেই সে জানাল, সামনের সরু মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে
গেলেই মুখুজ্জেপাড়া। সে আরও জানাল, এরপর আজ আর ফেরার কোনো গাড়ি পাব না।
সেই
রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা, মাঝে মাঝে দু-একটা বাড়ি।
দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল। দিনের বেলায় এই পথ দিয়ে এলে হয়তো কিছুই মনে হতো
না, কিন্তু সন্ধে পেরিয়ে রাত নামার পর জায়গাটাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল।
আরও
কিছুটা হাঁটার পর ডান দিকে একটা রাস্তা চলে যেতে দেখলাম। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা,
তার ফাঁকে ফাঁকে বিস্তীর্ণ ধানজমি। রাতের অন্ধকারে যতদূর চোখ যায়, শুধু কালো মাঠ আর
গাছের অস্পষ্ট ছায়া ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছিল না। আকাশে চাঁদ থাকলেও তার আলো যেন
মাটিতে পৌঁছনোর আগেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল। দূরে কোথাও একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে উঠল,
তারপর আবার সব চুপচাপ।
সেই
নির্জন রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে দূরে একটা আলো চোখে পড়ল। সেদিকে যত এগোতে লাগলাম, ততই
বুঝতে পারলাম, ওটা কোনো সাধারণ বাড়ি নয়। অন্ধকারের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে
বিশাল এক পুরোনো বাড়ি। বাড়িটা হলদে আলোয় সাজানো। কিন্তু তার চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা
যে, দূর থেকে তাকালে মনে হচ্ছিল, গোটা পৃথিবীতে যেন ওই একটিমাত্র বাড়িই জেগে আছে,
আর বাকি সবকিছু ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি
সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম। পথের দুপাশে ঝোপঝাড় আর বড় বড় গাছের ছায়া। মাঝে মাঝে
শুকনো পাতার ওপর পা পড়তেই মড়মড় শব্দ উঠছিল। নিজের পায়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে
আসছিল না। আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় একটা বাড়িতে এত আলো জ্বলছে, অথচ কোথাও মানুষের
গলার আওয়াজ নেই, হাসি-ঠাট্টা নেই, এমনকি বিয়েবাড়ির কোনো ব্যস্ততার চিহ্নও চোখে পড়ছে
না। অথচ আজই তো অরিন্দমের মেয়ের বিয়ে!
মনের
মধ্যে একটু খটকা লাগলেও ভাবলাম, হয়তো বিয়ের অনুষ্ঠান বাড়ির ভেতরেই হচ্ছে, তাই বাইরে
থেকে কিছু শোনা যাচ্ছে না। কিংবা এত রাত হয়ে যাওয়ায় সবাই ভেতরে ব্যস্ত। নিজেকে এইসব
বুঝিয়ে বাড়িটার দিকে আরও এগিয়ে গেলাম।
বাড়ির
কাছে পৌঁছে তার বিশাল চেহারা দেখে থমকে দাঁড়ালাম। পুরোনো আমলের বাড়ি। উঁচু পাঁচিল,
লোহার বড় ফটক, আর তার ওপারে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা অট্টালিকা। দেওয়ালের গায়ে
বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, আবার কোথাও শ্যাওলা জমে দেওয়াল
কালচে হয়ে গেছে। তবু বাড়িটার মধ্যে একটা আভিজাত্য ছিল, যেন বহু পুরোনো কোনো বনেদি
পরিবারের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ফটকের
সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ পড়ল দেওয়ালে লাগানো নামফলকে। আবছা আলোতেও অক্ষরগুলো স্পষ্ট
বোঝা যাচ্ছিল— ‘মুখার্জি বাড়ি’।
নামটা
দেখে বুকের ভেতর থেকে যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। ঠিকানাটা ভুল হয়নি।
এটাই অরিন্দমের বাড়ি।
ফটকের
সামনে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ভেতরে কাউকে দেখতে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত
ফটকটা ঠেলে খুললাম। কবজায় বোধহয় মরচে ধরেছিল, খোলার সময় মৃদু কড়কড় শব্দ উঠল। রাতের
নিস্তব্ধতায় শব্দটা বেশ স্পষ্ট শোনাল। তবু কেউ এগিয়ে এল না।
বাইরের
উঠোনটা পেরিয়ে বাড়ির মূল দরজার সামনে এসে দেখলাম, দরজাটা ভেজানো রয়েছে, কিন্তু বন্ধ
নয়। একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আর বেশি কিছু না ভেবেই দরজাটা ঠেলে
ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
ভেতরে
ঢুকেই বিশাল হলঘরটা দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম। ঘরের মাঝখানে বেশ কয়েকজন লোক
দাঁড়িয়ে বা বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। একদিকে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ চেয়ারে বসে
গল্প করছেন, অন্যদিকে দু-একজন যুবক এদিক-ওদিক যাতায়াত করছে। দূরে দু-একজন মহিলা দাঁড়িয়ে
নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। সব মিলিয়ে বিয়েবাড়ির পরিবেশই, তাতে সন্দেহ নেই।
তবু
কোথায় যেন কিছু একটা স্বাভাবিক নয়।
সাধারণত
বিয়েবাড়িতে যেমন হাসি-ঠাট্টা, হইচই আর লোকজনের ব্যস্ত ছোটাছুটি থাকে, এখানেও সেসবের
অভাব ছিল না। অথচ সবকিছুর মধ্যেই কেমন যেন একটা চাপা ভাব। এত বড় একটা বাড়ি, এত লোকজন,
অথচ মনে হচ্ছিল, গোটা হলঘরটা যেন কোনো অদৃশ্য ভারে চাপা পড়ে আছে। চারপাশের আলোও কেমন
ম্লান। দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিগুলোর মুখ সেই আলোয় আরও গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
শুধু
একটা শব্দই একইভাবে আমার কানে আসছিল।
সানাইয়ের
সুর।
আমি
অবশ্য তখন এসব নিয়ে বেশি মাথা ঘামালাম না। এতটা পথ পেরিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে
পেরেছি, সেটাই বড় কথা।
চোখ
বুলিয়ে হলঘরের মধ্যে অরিন্দমকে খুঁজতে লাগলাম। এত লোকের মধ্যে তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ
ছিল না। কয়েকজনের পাশ কাটিয়ে একটু এগোতেই হঠাৎ চোখে পড়ল পরিচিত একটা মুখ।
অরিন্দম!
ঘরের
অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছিল ও। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু
মুখটা চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না। কত বছর পর দেখছি বন্ধুকে! মুহূর্তের জন্য পুরোনো
দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে হলো, এত বছর যেন এক নিমেষেই পেরিয়ে গেল।
মুখে হাসি
ফুটিয়ে হাত তুলে ডাকলাম, “অরিন্দম!”
আমার গলা শুনে ও মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ওর মুখে ফুটে উঠল অবিশ্বাস আর আনন্দের এক অদ্ভুত মিশ্র অভিব্যক্তি। যেন আমাকে এখানে দেখার আশা ও ছেড়েই দিয়েছিল। অরিন্দমের মুখের সেই অভিব্যক্তি অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পরক্ষণেই হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে এল। তারপর দুহাত বাড়িয়ে আমার হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর হাতের স্পর্শ পেতেই কেমন যেন চমকে উঠলাম। হাত দুটো অসম্ভব ঠান্ডা! যেন বরফের টুকরো ছুঁয়ে আছি। জ্যৈষ্ঠ মাসের এই গরমেও কারও হাত এত ঠান্ডা হতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে। কিছু বলব কি না ভাবছি, এমন সময় অরিন্দমই প্রথম মুখ খুলল।
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
কথাটা
শুনে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। বললাম, আর বলিস না! রাস্তায় যে কী ঝামেলায় পড়লাম,
তোকে বলে বোঝাতে পারব না। তবে শেষ পর্যন্ত এসে তো পড়েছি!
এরপর
আরও কিছুক্ষণ নানা কথাবার্তা চলল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তুই কেমন আছিস? এত বছর কেটে
গেল, অথচ আমাদের আর দেখাই হলো না! বাকিরা কোথায়?
এই
রকম নানা কথা বলতে বলতে সময় কেটে গেল। তারপর অরিন্দম আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “বিয়ের
অনুষ্ঠান তো অনেক রাত পর্যন্ত চলবে। চল, তোকে মেয়ে আর জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করিয়ে
দিই।”
ওর
সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে হলঘরটার শেষের দিকে এগিয়ে গেলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, এতক্ষণ যাঁরা
নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, তাঁরা এখন আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কেউ সরাসরি, কেউ
আবার আড়চোখে। তাঁদের মুখের ভাবটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমাকে দেখে তাঁরা
যেন অবাক হয়েছেন, কিংবা আমার এখানে আসাটা তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত।
এত
বছর পর বন্ধুর বাড়িতে এসেছি, তার ওপর বিয়েবাড়ি—এসব নিয়ে তখন আর মাথা ঘামাতে ইচ্ছে
করল না।
অরিন্দম
আমাকে নিয়ে হলঘরটা পেরিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরের একটা ঘরে অরিন্দমের
মেয়ে ও আরও কয়েকজন মহিলা ছিলেন। ওর মেয়ের সঙ্গে দেখা করে পাশের ঘরে গিয়ে জামাইয়ের
সঙ্গেও আলাপ করলাম।
তারপর
অরিন্দম আমাকে ওপরের একটা ঘরে বসতে বলে বলল, “তুই একটু বিশ্রাম কর। আমার নিচে একটু
কাজ আছে, দেখে আসি। তারপর আবার আসছি।”
আমি
মাথা নাড়লাম। ও ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবার পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। তারপর
দরজাটা টেনে দিয়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ
পর অরিন্দমের স্ত্রীও এসে দেখা করে গেলেন। সবকিছু বেশ ভালোই লাগছিল।
সারাদিনের
ক্লান্তি আর দূর থেকে ভেসে আসা সানাইয়ের একটানা সুরে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল, বুঝতেই
পারিনি।
ঘুমের
মধ্যে হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমাকে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকিয়ে তুলছে। প্রথমে ঘোরের মধ্যে
কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তারপর বিছানার ওপর উঠে বসতেই টের পেলাম, শুধু আমি নই, গোটা
ঘরটাই যেন দুলছে। দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো একবার এদিকে, একবার ওদিকে হেলে পড়ছে। ছাদের
ঝাড়বাতিটা দুলতে দুলতে কেমন একটা কটকট শব্দ করছে।
কয়েক মুহূর্তের
মধ্যেই বুঝতে পারলাম, ভূমিকম্প হচ্ছে!
আর
এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। বিছানা থেকে নেমে ছুটে দরজা খুললাম। তারপর সিঁড়ি বেয়ে
দ্রুত নিচে নামতে শুরু করলাম। সিঁড়ির রেলিং ধরে কোনোরকমে ভারসাম্য বজায় রাখছিলাম।
পায়ের তলায় মেঝেটা এমনভাবে কেঁপে উঠছিল, যেন যে কোনো মুহূর্তে সবকিছু ভেঙেচুরে ধসে
পড়বে।
কিন্তু হলঘরে পৌঁছেই আমি থমকে দাঁড়ালাম। সামনে যা দেখলাম, তার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না।
গোটা হলঘরটা দুলছে। দেওয়াল থেকে একের পর এক ছবি খুলে মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। কাচ ভাঙার শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছে। মাথার ওপর বিশাল ঝাড়বাতিটা দুলতে দুলতে এমনভাবে নিচে নেমে আসছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি ছিঁড়ে পড়বে। ঠিক আমার চোখের সামনেই একটা ভারী কাচের ফুলদানি টেবিল থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, হলঘরে উপস্থিত মানুষগুলোর মধ্যে কোনো হেলদোল নেই!
কেউ যেন কিছুই টের পাচ্ছে না। চারপাশে এত বড় বিপর্যয় ঘটে চলেছে, অথচ তাদের মুখে আতঙ্কের সামান্য চিহ্নটুকুও নেই। একজন মানুষও উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন না। আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। এরা কি কেউ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে? ঠিক সেই সময় চোখে পড়ল অরিন্দমকে। হলঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। আর দেরি না করে ছুটে গেলাম তার দিকে। অরিন্দম! কী করছিস তুই? সবাইকে বাইরে বের কর! ভূমিকম্প হচ্ছে! বাড়িটা তো মনে হয় ভেঙে পড়বে! অরিন্দম ধীরে ধীরে আমার দিকে মুখ ফেরাল। তারপর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল।
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
- কী বলছিস তুই? পাগল হয়েছিস নাকি? চল, বাইরে চল!
আমি ওর হাতটা ধরতে গিয়েও থমকে গেলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনেই অরিন্দমের মুখটা বদলে যেতে শুরু করল। প্রথমে তার গালে সরু একটা ফাটলের মতো দাগ দেখা দিল। তারপর সেই দাগ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল কপাল, গলা আর চোয়াল বেয়ে সেটা বাড়তে থাকল। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। পরক্ষণেই তার গাল থেকে এক টুকরো মাংস খসে পড়ল মেঝেতে। তারপর আরও একটা। তারপর আরও।
আমার চোখের সামনেই অরিন্দমের শরীর থেকে একের পর এক মাংসের টুকরো খসে পড়তে লাগল। অথচ সে একইভাবে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আমি চিৎকার করতে চেয়েও পারলাম না। গলার ভিতর থেকে শুধু একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার শরীরের সমস্ত মাংস ঝরে পড়ল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল শুধু একটা নরকঙ্কাল। চোখের জায়গায় গভীর অন্ধকার দুটো গর্ত, আর ঠোঁটের জায়গায় ফাঁকা দাঁতের সারি। অথচ সেই দাঁতের ফাঁক দিয়েই ভেসে এল অরিন্দমের গলা।
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। প্রাণপণে পিছিয়ে যেতে গিয়ে কারও সঙ্গে ধাক্কা খেলাম। ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। কোনওমতে নিজেকে সামলে পিছন ফিরে তাকাতেই বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল। আমার পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর একটা নরকঙ্কাল! তার গায়ে তখনও মানুষের পোশাক। কঙ্কালের ফাঁকা চোখের কোটর দুটো আমার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। আতঙ্কে আমি আরও কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম। আর ঠিক তখনই চোখের সামনে ঘটে গেল আরও ভয়ংকর একটা ঘটনা। কেউ চেয়ারে বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আবার খাবারের টেবিলের পাশে—হলঘরের প্রত্যেকেই যেন একই অভিশাপের শিকার। তাদের শরীর থেকে মাংস ঝরে পড়ছে, অথচ কেউ নড়ছে না, কেউ চিৎকার করছে না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গোটা হলঘরটা যেন মানুষের বদলে নরকঙ্কালে ভরে গেল।
তারপর সবাই একসঙ্গে আমার দিকে মুখ ফেরাল। হলঘরে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। এমন নীরবতা, যার মধ্যে নিজের বুকের ধুকপুক শব্দটাও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। চারদিকে তখনও ভূমিকম্পের দাপট চলছে। মাথার ওপর ঝাড়বাতি দুলছে, দেওয়ালে ফাটল ধরছে, মেঝে কাঁপছে। অথচ নরকঙ্কালগুলো একটুও নড়ছে না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। পরক্ষণেই তারা সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
শুকনো হাড়ের ঠোকাঠুকি, ফাঁপা গলার ঘড়ঘড় শব্দ আর বিকট চিৎকার মিশে তৈরি হলো এক অসহ্য আওয়াজ। আমি দু’হাতে কান চেপে ধরলাম। কিন্তু তাতেও সেই শব্দ থামল না। বরং মনে হলো, হাসিটা যেন আমার মাথার ভিতরেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পা দুটো অবশ হয়ে আসছিল, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আর এক মুহূর্ত এখানে থাকলে পাগল হয়ে যাব। কোনওরকমে ঘুরে দাঁড়িয়ে সদর দরজার দিকে ছুটলাম। পিছন থেকে তখনও সেই বীভৎস হাসি ভেসে আসছে। কাঁপতে থাকা মেঝের ওপর দিয়ে দৌড়তে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম। একবার প্রায় পড়েই গিয়েছিলাম, কিন্তু থামিনি। শুধু প্রাণপণে ছুটছিলাম দরজার দিকে। অবশেষে সদর দরজার কাছে পৌঁছলাম। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা রাখার ঠিক আগের মুহূর্তে পিছন থেকে আবার ভেসে এল সেই চেনা গলা।
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
পিছনে তাকানোর সাহস হলো না। পরমুহূর্তেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে অন্ধকার রাস্তা ধরে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করলাম। পিছনে সেই অট্টহাসি তখনও থামেনি। আর সেই হাসির ভিতর থেকে বারবার ভেসে আসছিল অরিন্দমের গলা—
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
আমি
ছুটেই চলেছিলাম। কতক্ষণ ছুটেছিলাম, কোন রাস্তা ধরে ছুটেছিলাম, তার কোনও হিসেব নেই।
শুধু মনে হচ্ছিল, অরিন্দম আর ওই নরকঙ্কালগুলো আমার ঠিক পিছনেই রয়েছে। এই বুঝি কেউ
আমার কাঁধে হাত রাখবে, এই বুঝি কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলবে—
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
কতক্ষণ ধরে ছুটেছিলাম, তা আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, একসময় দৌড়নোর শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট রইল না। হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বুকের ভিতরটা তখনও ধড়ফড় করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু ধাতস্থ হয়ে চারদিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, জায়গাটা আমার চেনা। এখানেই তো আসার সময় রিকশা থেকে নেমেছিলাম!
কীভাবে আবার এখানে ফিরে এলাম, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। একবার পিছন ফিরে তাকালাম। দূরে অন্ধকারের মধ্যে শুধু ফাঁকা রাস্তা পড়ে রয়েছে। মুখার্জি বাড়ির কোনও চিহ্ন চোখে পড়ল না। আর ভাবার শক্তি ছিল না। রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। দোকানের বাইরে লম্বা কাঠের বেঞ্চ রাখা ছিল। কোনওরকমে সেখানে গিয়ে বসলাম। তারপর ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা বেঞ্চের ওপর এলিয়ে দিলাম। চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছিল। এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর শরীর যেন আর আমার কথা শুনছিল না।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, জানি না। ঘুম ভাঙল কারও ডাকে। চোখ মেলে দেখি, চারদিকে সকালের আলো ফুটেছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একজন লোক আমাকে ডাকছে। সম্ভবত দোকানের মালিক। দোকান খুলবে বলে আমাকে ডেকে তুলেই সে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। শরীরটা তখনও বেশ দুর্বল লাগছিল। রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই বুকের ভিতরটা আবার কেঁপে উঠল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, এখানে মুখার্জি বাড়িটা কোন দিকে বলতে পারবেন? লোকটা দোকান খুলতে খুলতেই বলল,
- “কোন মুখার্জির কথা বলছেন?”
- “অরিন্দম
মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি।
নামটা
শুনে লোকটা একবার আমার দিকে তাকাল। তারপর তার মুখের ভাব কেমন যেন বদলে গেল। কয়েক মুহূর্ত
চুপ করে থেকে বলল, - “অরিন্দমবাবু? তিনি তো মারা গিয়েছেন। আজ এক বছর হয়ে গেল।”
- “কথাটা শুনে বিশেষ অবাক হলাম না। আগের রাতের অভিজ্ঞতার পর এমন একটা উত্তর যেন কোথাও প্রত্যাশা করছিলাম। তবু মনের ভিতরের দোলাচল চেপে রেখে যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞাসা করলাম,
- “কীভাবে মারা গেলেন?”
লোকটা একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,
- “গত বছর এই মাসের সতেরো তারিখে তাঁর মেয়ের বিয়ে
ছিল। সেই রাতে আমাদের এদিকে ভয়ানক ভূমিকম্প হয়। অনেক জায়গাতেই বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল মুখার্জি বাড়িতে। পুরোনো বাড়িটা একেবারে ধসে পড়ে।
বিয়ে উপলক্ষে বাড়িতে অনেক লোকজন এসেছিলেন। বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন—কেউই বাঁচেননি।
অরিন্দমবাবু আর তাঁর পরিবারের সবাই সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়েছিলেন।”
কথাগুলো
শুনতে শুনতে আমার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল সেই দুলতে থাকা হলঘর, একের পর এক ঝরে পড়া
মাংসের টুকরো আর অরিন্দমের সেই কঙ্কালসার মুখ।
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
কথাটা যেন আবার কানের কাছে বাজতে লাগল। কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালাম। দোকানির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলাম। একটু দূরে একটা রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। সেটায় উঠে নৌকা ধরার জন্য ঘাটের দিকে রওনা দিলাম।
রিকশা চলতে শুরু করল। সকালের আলোয় চারপাশের গাছপালা, মাঠঘাট আর গ্রামের বাড়িগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, আমি এখনও সেই অন্ধকার বাড়িটার ভিতরেই আটকে আছি। বারবার যেন কানে ভেসে আসছিল অরিন্দমের সেই কথাটা।
- “বড্ড দেরি
করে ফেললি, বন্ধু!”
এই পর্যন্ত বলে সাধনজেঠু থামলেন। দেখলাম, তাঁর চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটা আমাদের এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিলেন, এই মুহূর্তে তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন আবার ফিরে গিয়েছেন সেই পুরোনো দিনে, সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর কাছে। তন্ময়ই প্রথম নীরবতা ভাঙল।
- “আচ্ছা জেঠু,
চিঠিটা তাহলে কে পাঠিয়েছিল?”
জেঠু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
- “চিঠিটা অরিন্দমই পাঠিয়েছিল।
তবে তাড়াহুড়োর মধ্যে প্রথমবার চিঠিটা হাতে নিয়ে তারিখটা খেয়াল করিনি। পরে বাড়ি
ফিরে চিঠিটা আবার ভালো করে দেখেছিলাম। তখন বুঝতে পেরেছিলাম, ওটা এক বছর আগের লেখা।”
একটু থেমে তিনি আবার বললেন, “পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, ডাকঘরের কোনও গোলযোগের কারণেই চিঠিটা আমার কাছে পৌঁছতে এত দেরি হয়েছিল। তত দিনে অরিন্দম আর এই পৃথিবীতে নেই। অথচ আমি কিছুই জানতাম না। ভেবেছিলাম, বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে যাব, কত দিন পর দেখা হবে, কত কথা হবে! কে জানত, সেই দেখা হওয়ার জন্য সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ও আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে!
কথাগুলো বলে সাধনজেঠু আবার চুপ করে গেলেন। এরপর আর কারও কিছু বলার ছিল না। দেখলাম, আজ অনুপমও আর কোনও রসিকতা করল না। সবাই চুপচাপ বসে রইলাম। ক্লাবঘরের বাইরে দিয়ে একটা গাড়ি চলে গেল। তারপর আবার চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমরা
শুধু জেঠুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তাঁর চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু যেন আমাদের সবার মনেই
একটা প্রশ্ন রেখে গেল—বন্ধুত্বের টান কি সত্যিই মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে মানুষকে ফিরিয়ে
আনতে পারে?
আর সেই নীরবতার
মধ্যে আমার মনে কেবল একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল—
কিছু কিছু দেখা হওয়ার জন্য মানুষ সত্যিই বড্ড দেরি করে ফেলে।