শনিবার আর রবিবার—এই দুটো দিন ক্লাবে আড্ডাটা বেশ জমে। সেইমতো কলকাতার বাগবাজারে আমাদের ‘জাগরণী ক্লাবে’ আজ অনেকেই জমা হয়েছি। বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে মুষলধারে বৃষ্টি।
হঠাৎই বিকট শব্দে আকাশ কেঁপে উঠল, আর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকার কারেন্ট অফ! চারদিক এক মুহূর্তে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমাদের এখানে লোডশেডিং সাধারণত হয় না, কিন্তু হলে অনেকক্ষণের ব্যাপার। আর এরকম অবস্থায় বাঙালিদের প্রথম মাথায় আসে খাবারের থালায় খিচুড়ি আর আড্ডায় অলৌকিক গল্প।
“ধুর ছাই!” বলে তন্ময় নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশলাইটটা অন করতেই অনাদি হাঁ-হাঁ করে উঠল, “ওহে তরুণ ফটোগ্রাফার, মোবাইল বন্ধ করো! এই ঝড়ের রাতে ওই কৃত্রিম আলো দিয়ে গা-ছমছমে মেজাজটা নষ্ট করে দিও না।”
সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে অনুপম বলে উঠল, “এই অনাদির এক দোষ! বাইরে এত সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে, আর তার মধ্যে ওঁর গা-ছমছমে ভাব জেগে উঠল। যত্তসব!”
সাধনজেঠু শান্ত গলায় বলে উঠলেন, “কে বলেছে সুন্দর জিনিস গা-ছমছমে ভাব জাগাতে পারে না?”
অনুপম মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলল, “আবার শুরু হবে আজগুবি গল্প!”
অনুপমের কথায় একগাল হেসে সাধনজেঠু বললেন, “শোনো অনুপম, চোখ দুটো দিয়ে আমরা যতটুকু দেখি, পৃথিবীর রহস্য তার চেয়ে অনেক বড়।”
কথাটা শেষ করেই তিনি দরজার বাইরের অঝোর ধারায় পড়তে থাকা বৃষ্টির দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। গল্পের আশায় আমরা এবার বেশ জাঁকিয়ে বসলাম; কারণ আমরা ভালো করেই জানতাম—সাধনজেঠু যখন এভাবে থামেন, তখন তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে উঠে আসতে চলেছে কোনো না কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনা।
সাধনজেঠু সম্পর্কে এখানে কিছু কথা বলে রাখা ভালো। সাধনজেঠু মানে সাধন সমাদ্দার। বয়স পঁচাত্তরের কম হবে না। কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই; চুলে এখনও পুরো পাক ধরেনি, খালি চোখেই স্পষ্ট খবরের কাগজ পড়তে পারেন। বাবা-কাকাদের মুখে শুনেছি, চরম দারিদ্র্যের মধ্য থেকে লড়াই করে আজ তিনি এই প্রতিপত্তি আর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। কখনও চাকরির খোঁজে, আবার কখনও ব্যবসার খাতিরে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। জীবনের নানা ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতাই না সঞ্চয় করেছেন! তাই তাঁর মুখ থেকে বেরোনো গল্প যে সাধারণ কিছু নয়, সেটা আমরা জানতাম।
জেঠু মনে মনে সবটা গুছিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “তখন টাকার অভাবে কলেজ মাঝপথে ছেড়ে চাকরির আশায় এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা চার ভাই-বোন। বাবা যা রোজগার করতেন, তাতে বোনদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আর তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। তাই যেমন করেই হোক, একটা চাকরি আমার চাই-ই চাই!
“ঠিক তখনই একদিন খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। নদীয়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে কাঠ ও কৃষিজাত পণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী অসীম চৌধুরীর একজন বিশ্বস্ত হিসাবরক্ষক প্রয়োজন। বেতন খুব বেশি না হলেও থাকা-খাওয়ার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা ছিল।
“তখন আর বেশি কিছু ভাবার অবস্থায় ছিলাম না। আবেদন করে দিলাম। ভাগ্য ভালো, কয়েক দিনের মধ্যেই সাক্ষাৎকারের ডাক এল। আমার হিসাব করার ক্ষমতা বেশ ভালো ছিল, তাই চাকরিটা পেয়ে গেলাম।
“নদীয়া জেলার একদম প্রান্তভাগে, জলঙ্গী নদীর একেবারে বাঁকের মাথায় গড়ে উঠেছে ‘শিবপুর’ গ্রামটি। গ্রামটি বড়ই শান্ত, ছবির মতো আঁকা বললেও ভুল হবে না। গ্রামের একপাশ ঘেঁষে অলস ভঙ্গিতে বয়ে চলেছে জলঙ্গী।
“গ্রামের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি আম, কাঁঠাল আর মেহগনি গাছের ছায়াঘেরা সবুজ পরিবেশ। নদীর দিক থেকে ভেসে আসা জলছোঁয়া হিমেল হাওয়া সারাটা দিন গ্রামটাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। মেঠো পথের দু-পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাটির বাড়ি, বাঁশবাগান আর সাঁঝের বেলায় তুলসীতলায় শাঁখের শব্দ—সব মিলিয়ে শিবপুর গ্রামটি যেন একটি রূপকথা।
“কলকাতার কোলাহল থেকে এসে এই নিস্তব্ধতা বেশ ভালোই লাগত। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ির লোকের কথা, বন্ধুদের কথা ভেবে মন উদাস হয়ে যেত। তবে বেশ কিছুদিন যেতে না যেতেই নিজেকে মানিয়ে নিলাম। মাসমাইনের বেশিরভাগটাই বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম। হাতে যা থাকত, তা দিয়ে তখনকার দিনে গ্রামবাংলায় একজন মানুষের ভালোভাবে দিন চলে যেত। মনে একটা অদ্ভুত শান্তি পেতাম।
“গ্রামের বেশ কিছু লোকের সঙ্গে ভালো আলাপ জমে গেল। সন্ধেবেলায় শিবমন্দিরের চাতালে মাঝে মাঝে আড্ডা জমে উঠত।
“এই করে বেশ কিছু মাস কেটে গেল। বৈশাখ মাস আসতেই জলঙ্গীর সে এক অন্য রূপ! ভাটার সময় মাঝে মাঝে নদীর বুক চিরে জেগে ওঠে ধূ-ধূ বালির চর। নদীর ওপরের ওই জনমানবহীন, নির্জন বালির চরটার দিকে তাকালে কেমন যেন একটা গা-ছমছমে উদাস ভাব ছড়িয়ে ধরে।
“এমনি এক বৈশাখের রাতে আমি আর গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ফণীভূষণবাবু পাশের মণ্ডলপাড়ার হরিনামের আসর থেকে ফিরছিলাম।
“আঁকাবাঁকা একফালি মাটির রাস্তা—তার একপাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু অন্ধকারে ডুবে থাকা ধানের ক্ষেত আর ঘুটঘুটে বাঁশবাগান, আর অন্যপাশ দিয়েই গা ঘেঁষে বয়ে গেছে জলঙ্গী।
“দিনদুই আগেই পূর্ণিমা গেছে, তাই আকাশে তখনও চাঁদের বেশ উজ্জ্বল আলো। সেই উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় রাতের মেঠো পথ চিনে চলতে এতটুকু অসুবিধা হচ্ছিল না। চাঁদের আলোয় জলঙ্গী যেন রূপালি ফিতের মতো অলসভাবে হেলেদুলে বয়ে চলেছে। সব মিলিয়ে চারপাশটা যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। বৈশাখের সারাদিনের অস্বস্তিকর গরমের পর নদী পেরিয়ে ভেসে আসা ঠান্ডা মৃদু বাতাসটা গায়ে লাগতেই শরীর আর মন দুটোই জুড়িয়ে যাচ্ছিল।
“চলতে চলতে ফণীভূষণবাবু হঠাৎ থেমে গিয়ে নিচু গলায় বললেন, ‘একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছ, সমাদ্দার? চারপাশটা কেমন অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ!’
“আমি একটু দাঁড়িয়ে মজার ছলেই বললাম, ‘এত রাতে নিস্তব্ধ তো হবেই।’
“তিনি এবার একটু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তুমি শহরের ছেলে, তাই ঠিক বুঝতে পারছ না। একটু ভালো করে শোনো, কোথাও একটা রাতচরা পাখি তো দূরের কথা, একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও শোনা যাচ্ছে না!’
“তাঁর কথা শুনে আমিও চারপাশের অন্ধকারের দিকে কান পাতলাম। বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন ছ্যাঁত করে উঠল। সত্যিই তো! আমাদের নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া চরাচরের সমস্ত শব্দ যেন কোনো জাদুমন্ত্রে থমকে গেছে। এক অদ্ভুত, জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা গিলে খেয়েছে চারপাশটাকে।
“আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ফণীভূষণবাবু আমার কাঁধে হালকা টোকা দিয়ে ডাকলেন। আমি তাঁর দিকে ঘুরতেই তিনি অবাক চোখে নদীর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘নদীর চরে ওটা কী?’
“তাঁর আঙুল অনুসরণ করে তাকাতেই দেখি, চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে নদীর বুক চিরে মাথা তোলা বালির চরটার ওপর। জ্যোৎস্নার আলো পড়ে চরের সাদা বালিগুলো মুক্তোর মতো চকচক করছে। আর তার ওপর হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে অজস্র জোনাকির মতো কিছু আলো। তাদের থেকে এক মায়াবী নীলচে দ্যুতি বের হচ্ছে—দেখে মনে হচ্ছে যেন অনেকগুলো তারা একসঙ্গে মাটিতে নেমে এসেছে।
“ঠিক তখনই নদীর চরের দিক থেকে ভেসে এল এক অপরিচিত সুর।
“আস্তে আস্তে চোখের সামনে সবকিছু আরও স্পষ্ট হতে লাগল। সুরের উৎসও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠল। এবার দেখতে পেলাম, সেই তারার মতো আলোগুলোর মাঝখানে কয়েকটি আবছা অবয়ব। মুহূর্তের মধ্যেই অবয়বগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল—অপরূপ সুন্দরী চারটি নারীমূর্তি। মনে হচ্ছিল, জ্যোৎস্নার আলোয় ওরা যেন ক্রমশ আরও কাছে ফুটে উঠছে। তাদের রূপে এমন এক অচেনা লাবণ্য ছিল, যা কোনো সাধারণ মানুষের মধ্যে আমি কখনও দেখিনি। গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, মনে হচ্ছিল, তাদের শরীর থেকে যেন নিভু-নিভু নীলচে আলোর আভা ছড়িয়ে পড়ছে।
“এমন অপার্থিব দৃশ্য চোখে পড়তেই শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠল।
“তাদের মধ্যে একজন মাটি ছেড়ে নিশ্চল ভঙ্গিতে শূন্যে ভেসে আছে। কোনো ডানা নেই, কোনো অবলম্বন নেই—ঠিক যেমন করে নদীর শান্ত জলে পদ্মফুল ভেসে থাকে, ঠিক তেমনিভাবেই সে চরের বালি থেকে হাত চারেক ওপরে বাতাসে ভেসে আছে।
“তার কাছ থেকেই ভেসে আসছে সেই অলৌকিক সুর।সে গান গাইছে!
“গানের ভাষাটা আমার সম্পূর্ণ অচেনা। একটা শব্দও বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু সেই গানের সুরের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল, যা আমার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল, নিজের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। যেন আমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিলাম এক অচেনা, অজানা মায়ার জগতে।
“আর ঠিক সেই মুহূর্তে যেন বহু দূর থেকে ভেসে এল হরিনামের এক সুরেলা আওয়াজ। আর তাতেই যেন একমুহূর্তে আমার মোহাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। ঘোর কাটতেই প্রথমে এক হিমশীতল অনুভূতি হলো। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি—কখন যেন আমি জলঙ্গীর একবুক জলে নেমে এসেছি! হতভম্ব হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখি, নদীর জল ফণীভূষণবাবুর প্রায় গলা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
“আমি ফণীভূষণবাবুকে জোরে ঝাঁকিয়ে ডাকতেই তিনি যেন গভীর কোনো ঘোর থেকে চমকে জেগে উঠলেন। কয়েক মুহূর্ত বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। তারপর হঠাৎই চারপাশে তাকিয়ে নদীর জল নিজের গলা ছুঁয়ে আছে বুঝতে পেরে তাঁর মুখটা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি। তাঁর হাত শক্ত করে ধরে টানতে টানতে দুজনে কোনোমতে জলের তোড় সামলে পাড়ের দিকে এগোতে লাগলাম। ভিজে কাদামাটিতে বারবার পা পিছলে যাচ্ছিল, তবু প্রাণপণে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে শেষ পর্যন্ত নদীর পাড়ে উঠে এলাম। পাড়ে উঠে দুজনেই কিছুক্ষণ হাঁপাতে হাঁপাতে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“তারপর ধীরে ধীরে ঘোর কাটতে লাগল। তখনই টের পেলাম, চারপাশ যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কানে ভেসে আসছে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, নদীর জলের ছলাত-ছলাত শব্দ, আর পেছনে মণ্ডলপাড়া থেকে ভেসে আসা মন শান্ত করা হরিনাম। তখনই মনে পড়ল, মণ্ডলপাড়ায় তো আজ রাসলীলা!
“অজস্র প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আবার নদীর চরের দিকে তাকালাম। কোথায় সেই অপার্থিব দৃশ্য! কোথায় সেই মন-মাতাল করা সুর! সামনে শুধু জলঙ্গীর জোয়ারের জলে কোনোমতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে জেগে আছে একটুকরো বালির চর।
“হঠাৎ পাশের বাঁশবাগান থেকে একটা পেঁচা কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল— ‘হু-ঊ-ঊ।’
“তারপর আরও কতক্ষণ যে আমরা স্তব্ধ হয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, জানি না। ভিজে শরীরে নদীর ঠান্ডা হাওয়া লাগতেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে, কিছু না বলেই আবার চুপচাপ গ্রামে ফেরার পথ ধরলাম।
“আমাদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটল, কী দেখলাম, কী শুনলাম—তা নিয়ে একে অপরকে একটা প্রশ্ন করার মতো মানসিক অবস্থাটুকুও যেন তখন আর অবশিষ্ট ছিল না।”
এই বলে জেঠু থামলেন। ঠিক সেই সময়ই খেয়াল করলাম, কখন যে ক্লাবের আলোটা জ্বলে উঠেছে, তা আমাদের কারও নজরেই পড়েনি।
তন্ময়ই প্রথম নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা জেঠু, তোমাদের সঙ্গে সেই রাতে কী হয়েছিল? যাদের দেখেছিলে, তারা আসলে কারা ছিল—তা কি পরে জানতে পেরেছিলে?”
জেঠু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “পরের দিন আমি আর ফণীভূষণবাবু নদীর পাড়ে, যেখানে আগের রাতে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে আবার গিয়েছিলাম। একপাশে ধানের ক্ষেত আর বাঁশবাগান, আর অন্যপাশে জলঙ্গীর বুকে জেগে থাকা সেই জনমানবহীন, নির্জন বালির চর। দিনের আলোয় জায়গাটাকে দেখে আগের রাতের সেই দৃশ্যের সঙ্গে কোনো মিলই খুঁজে পেলাম না।
“তারপরও বহু রাতে মনে হয়েছে, যেন আমি দূর থেকে ভেসে আসা সেই মন-মাতাল করা সুর শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, যাদের দেখেছিলাম তারা কী—ভূত, প্রেত, ডাকিনী, যোগিনী, নাকি কোনো স্বর্গের দেবী বা অপ্সরা—তার কোনো উত্তর আমি আজও পাইনি।”
অনুপম একটু বাঁকা হেসে ঠেস মেরেই বলল, “আপনাদের সঙ্গেই ঘটনাটা কেন ঘটল? গ্রামের আর কারও সঙ্গে কোনোদিন ঘটেনি কেন?”
জেঠু ক্লাব থেকে বেরোতে বেরোতে একটু গম্ভীর গলায় বললেন, “কোনোদিন রাস্তায় যেতে যেতে হোঁচট খেয়েছ?”
অনুপম একটু হেসে বলল, “কেন খাব না? এ তো খুব সাধারণ ব্যাপার!”
জেঠু দরজার কাছে গিয়ে একবার থামলেন। তারপর অনুপমের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বললেন, “কোনোদিন ভেবে দেখেছ, ওই রাস্তায় তো আরও কত শত লোক হেঁটে যায়... তাহলে তুমিই কেন হোঁচট খেলে?”
এইটুকু বলেই জেঠু ক্লাব থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির রাস্তা ধরলেন।
আর আমরা সবাই চুপচাপ খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেউ আর কোনো কথা বলল না। আর অদ্ভুতভাবে, সেই বৃষ্টির শব্দের ফাঁকে আমার মনে হলো যেন বহু দূর থকে ভেসে এল—একটা খুব ক্ষীণ, অচেনা সুর।