নিকষ তমিস্রায় ঢাকা দেবনগরী ল্হাসা। পোতালা আর নরবুলিংকার বাতাস তখনও লক্ষ তিব্বতবাসীর রক্তের আঁশটে গন্ধে ভারী। পাহাড়ের পাদদেশে যেখানে ছিন্নভিন্ন দেহাংশের স্তূপ জমে আছে, শিবাকুল নেমেছে নরমাংসের লোভে। ঐ তাদের ভয়ঙ্কর উল্লাসহাস্য শোনা যাচ্ছে।
তন্দ্রার ঘোরে স্বপ্ন দেখছিল তেনজিন, তার মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছে ঐ শ্মশানপ্রান্তরে। অমানিশার শেষ যামে একে একে শকুন নামছে। অন্য কেউ অমন স্বপ্ন দেখলে ভয়ে হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হত, কিন্তু তেনজিন জানে ওতে ভয়ের কিছু নেই। ঐ শকুনের দল স্বয়ং ধর্মপালিকার অনুচর। ওরা মৃতদেহ ভক্ষণ করলে মৃতের স্থান হবে ডাকিনীলোকে।
“হা শ্রীল্হামো, যারা রাক্ষসের হানায় প্রাণ হারাল তাদের তোমার কোলে ঠাঁই দিও মাগো…” বিলাপ করতে করতে তন্দ্রার মধ্যেও তেনজিনের চোখের কোল জলে ভিজে উঠেছে।
ল্হাসা থেকে বহু যোজন দূরে রাঢ়বঙ্গে কোনো শতাব্দীপ্রাচীন কালীমন্দিরের উঠোনে বসে দীপান্বিতার সন্ধ্যায় এক বৃদ্ধ পুরোহিত এক অষ্টমবর্ষীয়া বালিকাকে গল্প বলছেন। সে প্রায় সাত-আটশ’ বছর আগের কথা। তখনও বাংলা থেকে সহজাচার পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। বিধর্মী হানাদারের আক্রমণে বেশিরভাগ সাধক উত্তর দিকে সরে গেলেও অল্পবিস্তর বৌদ্ধ তান্ত্রিকের যাতায়াত এদিকে লেগে আছে। মগধ থেকে বিক্রমপুর যাবার পথে পাল আমলে জমি পাওয়া বারেন্দ্রী ব্রাহ্মণদের ছোট্ট একটি বসতি পড়ে, হানাদারের ভয়ে সে বসতিও এখন জনশূন্য। একজন মাত্র অশীতিপর ব্রাহ্মণ এই মন্দিরটিকে আগলে মাটি কামড়ে ধুঁকছেন।
সেও ছিল এক দীপান্বিতা অমাবস্যা। মন্দিরের দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনে ব্রাহ্মণ কম্পমান হাতে কালীর খড়্গ তুলে নিয়ে এগিয়েছিলেন। “ঐ সর্বখেকো নরপিশাচের দল আবার এসেছে! শরীরে শক্তির শেষ বিন্দু থাকতে আমি আমার মেয়ের বিগ্রহে একটা আঁচড়ও লাগতে দেব না। আয় কে আছিস, গর্ভগৃহে পা বাড়া। কেটে টুকরো করে ফেলব। আয়! দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“স্বস্তি— স্বস্তি—” আধভাঙ্গা ভাষায় আগন্তুক বলে, “আমি মুসলমান নই, আমি তিব্বতী বৌদ্ধ। তেনজিন আমার নাম। অধ্যয়ন করতে ভারতে এসেছিলাম। নালন্দা তমসাচ্ছন্ন। একটাও প্রদীপ জ্বলেনি। বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী খুঁজে পাইনি। তাই পুবে বজ্রযোগিনী গ্রামে চলেছি গুরু অতীশ দীপঙ্করের জন্মভিটেয় মাথা ঠেকাতে। রাতটুকুর জন্য আশ্রয় পাওয়া যাবে?”
পরনে চীবর দেখেও প্রথমে ভরসা হয় না ব্রাহ্মণের। বর্বরের জাত কোন মুখোশ পরে আসে, কোনো বিশ্বাস নেই। এক হাতে খাঁড়া, অন্য হাতে কালিমাখা পিলসুজখানা তুলে আরো কাছে এগোন। ছানি পড়া চোখে অনেক কষ্ট করে অনেকক্ষণ ধরে আগন্তুকের মুখ দেখেন। নাহ্, এ তো সত্যি তিব্বতী গড়নেরই মুখ। বৌদ্ধ শ্রমণদের মতো শ্মশ্রুগুম্ফহীন। হাতের খাঁড়া, পিলসুজ পড়ে যায় তাঁর। সস্নেহে ভিক্ষুর কপোল ধরেন। বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদেন। এই তো সদ্য পরিচয়! অথচ এ ছেলে যেন তাঁর বহু জন্মের আপন সন্তান, বহু অসহায়তার ভরসা, আজ এই পরিত্যক্ত থানে তাঁর এক রাত্তিরের সঙ্গী হতে এসেছে।
ভাগবাঁটোয়ারা করে মায়ের প্রসাদ খেয়ে দু’জনে ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝরাতে তেনজিন স্বপ্ন দেখে, অতীশ নিজে তার শিয়রে দাঁড়িয়ে আদেশ দিচ্ছেন, “বজ্রযোগিনী গ্রাম অবধি তোমায় যেতে হবে না, বৎস। তুমি এখানেই যে বজ্রযোগিনীর প্রসাদ পেয়েছ তাঁর বিগ্রহ নিয়ে অবিলম্বে তিব্বতের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করো।”
তেনজিন কালীমূর্তিটি কোলে তোলে, ব্রাহ্মণকে তোলে পিঠে। মনে মনে সুগতকে স্মরণ করে বলে, “হে ভগবান, আমায় মার্গ দর্শাও।” অমনি পাশের ডোবার জলে কোথা থেকে অষ্টপিদিম ভেসে ওঠে। ঊর্ধ্বে অন্তরীক্ষে তাদের প্রতিবিম্ব ফোটে। অন্ধকারে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
আজ পোতালা প্রাসাদের শয্যায় শুয়ে তেনজিনের মনে হয়, শিয়রে রাখা সেই মূর্তি হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মা তাকে ডাকছেন, তার সূক্ষ্ম শরীর কোলে তুলে নিয়ে আকাশপথে চলেছেন ল্হামো-লাসোর দিকে। হ্রদের ধারে বসে সে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। পাশে এসে বসল কুঁচবরণ এক বালিকা। পূর্ণ উদোম গা। একটি সুতো পর্যন্ত নেই। তার বুঝি শীত টীত করে না। সে যে নিজেই শীতলতা! সে যে শ্মশানে নৃত্যরতা মৃত্যু!
“পালিয়ে যাও…” তেনজিনকে ধমক মারে সেই মেয়ে। তেনজিন দৃপ্ত স্বরে উত্তর দেয়, “না। আমি পালাব না। তোমরা কী ভাবো, আমি মৃত্যুকে ভয় করি! হুঁহ্, মৃত্যু আমার ইষ্টদেবী। আমি মৃত্যুর পূজারী। আজ আকাশ যে আঁধারে ঢেকে আছে সে আমার মায়েরই কালো চুল। মা থাকতে আমার কীসের ভয়!”
“এই, শোনো! মেলা বোকো না!” মেয়ে চোখ পাকায়। “তোমার ভারী বিপদ। চীনি দস্যুরা তোমায় বন্দী করতে ছক কষছে।”
“জানি তো। আমার দেশকে শ্মশান করে নৃশংস উদ্যাপনে মাতল, আমাকেই আবার সেই উদ্যাপনের অংশীদার হতে নিমন্ত্রণ করল। আমি কি কিছু বুঝি না!”
“তুমি কী বললে?”
“বললাম, ধর্মপালিকার কাছে অনুমতি চাইব। তিনি অনুমতি দিলেই আমার যাওয়া। না দিলে, নয়। ওরা হাসল। ওরা আমার দেশকে কুসংস্কারমুক্ত করতে এসেছে কি না! আমার দেশ ধর্মের মোহে আচ্ছন্ন। আমি নিজেও যে এক কুৎসিত রাক্ষসীর পুজো করি! ওরা বলে, পিশাচিনী।”
“আর তুমি কী বলো, শুনি!”
“দুঃখ… মৃত্যু… নির্ঋতি… নৈরাত্মা… কদর্য… সেই আবার সুরসুন্দরী পরমালক্ষ্মী। অন্য কোনো বিকল্প রূপে নয়, এমন বিবসনা শ্মশানচারিণী খড়্গধারিণী করাল রূপেই সে লক্ষ্মী। নরমুণ্ড কাঁচা চিবোনোর সময়েও সে লক্ষ্মী, অভাব হয়ে জগতকে গ্রাস করার সময়েও সে লক্ষ্মীই। সে উগ্র রূপ নিলে আমি তাকে অলক্ষ্মী কী করে বলি? আমার ধর্ম রক্ষার জন্যই যে সে অস্ত্র ধারণ করেছে!”
বলতে বলতে তেনজিনের কণ্ঠ অশ্রুরুদ্ধ হয়। সুর বেসুর হয়।
“মারে, মা, তোর ডরায় অসি,
তাই তো ভাবে, তুই রাক্ষসী।
বুদ্ধ হেরেন শূন্যে আলো, সেথা
নাইকো অভাব, নাইকো মসী॥—”
সেইক্ষণে দেবী পুত্রকে স্বরূপে দেখা দেন। তেনজিন আকুল হয়ে পদপ্রান্তে আছড়ে পড়ে। দেবী বলেন, “তুই পালিয়ে যা। তোর মরার সময় এখনো আসেনি। সদ্ধর্মের তোকে প্রয়োজন।”
“আমার দেশের কী হবে, মা?”
“আমি আছি তো। আমার ওপর তোর আস্থা নেই?”
“নিজের চেয়েও বেশি!”
“তবে যা, দূর হ। আর পিছনে ফিরে তাকাবি না।”
দিনে রাতে বিরাম নেই, পালকি চলে তিব্বতের মাঠঘাট পেরিয়ে। তেনজিনরাই তার কাহার, আবার তেনজিনরাই তাতে সওয়ার। কত তেনজিন যাচ্ছে আসছে, কত তেনজিন সাক্ষী থাকছে। কত তেনজিন পালাচ্ছে, কত তেনজিন মার খেয়েও জন্মভূমি আগলে পড়ে রয়েছে।
কোনো তেনজিন অগ্নিকুণ্ডে আহুতি দিয়ে অপদেবতাদের ডাকছে, কোনো তেনজিন তাকে বিরত করে বলছে, “মা দ্বিষ! অপদেবতাদের ডেকো না। অপদেবতাদের ডাকার অর্থ ধর্মপালিকার অপমান। শ্রীল্হামোর ওপর বিশ্বাস রাখো। ধর্ম তার আপনার নিয়মে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।”
“হবে না! ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবে না। কালীকে তোমরা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছ। নির্মম কারুণ্যের মর্ম ভুলেছ। অক্ষমতা ঢাকতে অহিংসার অবগুণ্ঠন টেনেছ। শক্তিপূজার অযোগ্য তোমরা! কালী কে? সে কি আকাশপারের কোনো পৃথগ্ সত্ত্ব, যে যাদুমন্ত্রে এসে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়ে যাবে! সে তো আমাদেরই অন্তর্নিহিতা শক্তি! আমাদেরই চিত্তে তাকে বীরাচারে জাগাতে হবে। কালী রক্ষাকর্ত্রী, তাই কালী রক্ত চায়। যারা মৃত্যুর নাম শুনলে ভয়ে কুঁকড়ে যায় তাদের কালীকে মা ডাকার অধিকার নেই। যাও, বলির খড়্গ ধরো। রক্ত দ্যাখো। কালী বলিপ্রিয়া।”
“মা শেষে ধর্মবৈরীদের ছেড়ে তার নিরীহ সন্তানদের বলি নেবে!”
“হ্যাঁ, নেবে। মা নিরীহ সন্তানেরও বলি নেবে। জগতের সব জীবই জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যুর চরণে বলিপ্রদত্ত।”
বলতে বলতে একসময় সত্যিই মায়ের বলিগ্রহণের সাধ হয়। লালচোখো রাক্ষসেরা মঠে আক্রমণ করেছে। ঐ যে সিংহতোরণ গুঁড়িয়ে সব হুড়মুড়িয়ে প্রার্থনাকক্ষে ঢুকছে, বুদ্ধমূর্তি ভাঙ্গতে এগিয়ে আসছে। তেনজিন মায়ের নামে গগনবিদারী বিজয়গর্জন তুলে খড়্গহাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একের পর এক শত্রুর মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দিতে লাগল।
হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে গুলি চলার শব্দ হল। তেনজিন ঢলে পড়ল বুদ্ধমূর্তির কোলে। তার বাঁ দিকের পাঁজর এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে। চীবর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সন্তানের যন্ত্রণায় শাক্যনাথও বুঝি কাঁদছেন! তাঁর দু’চোখে যেন জলের ধারা। চোখ বোজার আগে দেখল তেনজিন, শাস্তার হৃদয়পদ্ম থেকে বেরিয়ে আসছে এলোকেশী এক কালো মেয়ে। মহোগ্রা হয়েও পরমালক্ষ্মী। নির্মম হয়েও অসীম স্নেহময়ী। সেই মেয়ে তাকে আঁচলে ঢেকে নিয়ে সুখাবতীর পথে পা বাড়াল।
সেদিন সারা মঠ ক্রোধে ফুঁসে উঠল। সহস্রাধিক লামা, ত্রাপা, সাধারণ জনতা কেউ পদ্মসম্ভবের মূর্তি থেকে ত্রিশূল তুলে, কেউ মঞ্জুশ্রী আর মহাকালের মূর্তি থেকে তরবারি তুলে, কেউ বজ্রযোগিনীর হাতের কর্তরিকা তুলে হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে চীনি স্কন্ধাবার ঘিরল। এক তেনজিন নিজের রক্ত দিয়ে অগণিত তেনজিনের অন্তরের কালীকে জাগিয়ে গেল।
যে তেনজিনরা পালিয়ে এল, তারা আজও তিব্বতে পড়ে থাকা তেনজিনদের জন্য মহাকালীর চরণে প্রার্থনা করে। আর তাদের সাথে প্রার্থনা করে রাঢ়বঙ্গের সেই অষ্টমী বালিকা। আজ অবশ্য সে আর অষ্টমবর্ষীয়া নেই। অনেক বড় হয়েছে। কিন্তু শৈশবে শোনা সেই গল্প ভুলতে পারেনি। কোন প্রাচীনকালে তার জ্ঞাতিরা সব হানাদারের ভয়ে পালিয়েছিল, তারই কোনো পূর্বপুরুষ একলা পড়ে ছিলেন ইষ্টদেবীকে আগলে। সেদিন এক তেনজিন এসে সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের পুত্রের কর্তব্য করেছিল। সেদিন থেকেই তেনজিনরা তার জ্ঞাতিভ্রাতা, তেনজিনদের কাছে সে ঋণী।
আজও দীপান্বিতার সন্ধ্যা এলে সেই এঁদো ডোবার ধারে সে আড়ি পাতে লোকচক্ষুর আড়ালে। আজও কেতকী অমাবস্যায় সেখানে অষ্টপ্রদীপ জ্বলে। আকাশে যখন তাদের প্রতিবিম্ব ফোটে, সেই মেয়ের বুকে আকুতি ঠেলে ওঠে, “ভগবান, পৃথিবীর সব তেনজিনকে ভালো রেখো।”