মহালয়ার ভোর মানেই তাই শুধু একটি ধর্মীয় তিথি নয়; বাঙালির কাছে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পিতৃস্মরণ, তর্পণ, দুর্গাপূজার আগমনী আবহ এবং ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। মহালয়া মূলত পিতৃপক্ষের অবসান ও পিতৃপুরুষকে স্মরণের সঙ্গে যুক্ত তিথি। এই দিনে বহু মানুষ নদী বা জলাশয়ের ঘাটে গিয়ে তর্পণ করেন। কোথাও চলে প্রার্থনা ও পারিবারিক আচার। আর এই সমস্ত কিছুর পাশাপাশি বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোরের অন্যতম পরিচিত রীতি হয়ে উঠেছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনা। বছরের পর বছর ধরে এমন এক সাংস্কৃতিক অভ্যাস তৈরি হয়েছে যে, অনেকের কাছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ না শুনলে যেন দুর্গাপূজার আগমনই সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যটির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। আজ যে অনুষ্ঠানকে বাঙালির দুর্গোৎসবের সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছেদ্য বলে মনে হয়, তার জন্ম কিন্তু এত সহজ ছিল না। এর পেছনে ছিল নতুন কিছু করার চেষ্টা, শিল্পীদের সৃজনশীল পরীক্ষা, ধর্মীয় আপত্তি, সম্প্রচারের নানা পরিবর্তন।
গল্পের শুরুটা ১৯৩০-এর দশকের কলকাতা বেতারে। তখন বেতার ছিল একেবারেই নতুন মাধ্যম। শ্রোতাদের কাছে গান, নাটক, আবৃত্তি ও ধর্মীয় বিষয়কে নতুনভাবে পৌঁছে দেওয়ার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। এই সময় বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য, যিনি ‘বাণীকুমার’ নামে পরিচিত, শ্রীশ্রী মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর আখ্যান অবলম্বনে ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে একটি অনুষ্ঠান রচনা করেন। ১৯৩১ সালে প্রচারিত সেই অনুষ্ঠানে চণ্ডীর কাহিনি, আবৃত্তি ও সংগীতকে একত্র করার একটি নতুন রীতি দেখা যায়। অনুষ্ঠানটি সাড়া ফেলেছিল। সেখান থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে অনুরূপ একটি প্রভাতী অনুষ্ঠান তৈরির ভাবনা আসে। পরের বছর, ১৯৩২ সালে, দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর ভোরে মহিষাসুরবধের কাহিনিকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ প্রভাতী গীতিআলেখ্য সম্প্রচারিত হয়। তখনও সেটির নাম আজকের মতো প্রতিষ্ঠিত ছিল না। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠানটি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন সূত্রে নামকরণ ও সম্প্রচারের সাল নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও ১৯৩১-এর ‘বসন্তেশ্বরী’ এবং ১৯৩২-এর শারদীয় প্রভাতী অনুষ্ঠানকে এর গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ধরা হয়। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রবাদপ্রতিম তিনজন মানুষ হলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক, বাণীকুমার, এবং এক ও অদ্বিতীয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বাণীকুমারের রচনা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনা এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে শুরু করল। সংস্কৃত শ্লোক ও চণ্ডীপাঠের সঙ্গে বাংলা ভাষ্য, গান, আবহসংগীত এবং নাটকীয় উপস্থাপনাকে মিলিয়ে তৈরি হল এক অভিনব বেতার-শিল্পরূপ। কিন্তু অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ বেছে নেওয়ার সময়ই দেখা দিল আপত্তি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন কায়স্থ। তাঁর কণ্ঠে সংস্কৃত শ্লোক, স্তোত্র এবং চণ্ডীপাঠ করানো হবে—এই সিদ্ধান্তে তৎকালীন সমাজের একাংশ প্রবল আপত্তি জানাল। প্রশ্ন উঠেছিল, একজন অব্রাহ্মণের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ কীভাবে সম্প্রচারিত হতে পারে? অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছিল। কিন্তু বাণীকুমার নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কণ্ঠের উপযুক্ততা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে যে গাম্ভীর্য, আবেগ ও উচ্চারণের শক্তি ছিল, সেটিই তাঁকে এই কাজের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছিল। রিহার্সাল চলল, তৈরি হল পাঠের ধরন। সংস্কৃত উচ্চারণের যথার্থতা নিয়ে অধ্যাপক অশোকনাথ শাস্ত্রীও দলটিকে সাহায্য করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ যে কণ্ঠকে ঘিরে একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সেই কণ্ঠই হয়ে উঠল অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ধীরে ধীরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ পৌঁছে গেল বাঙালির ঘরে ঘরে। মহালয়ার ভোর, শরতের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ, পুজোর প্রস্তুতি এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ—এই চারটি বিষয় যেন একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেল। একসময় মহালয়ার ভোরে রেডিয়ো চালানো বাঙালি পরিবারের স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে উঠল। শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, এটি হয়ে উঠল এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। যে মানুষ তর্পণ করতে গঙ্গার ঘাটে যাচ্ছেন, তিনিও হয়তো ভোরের আগে রেডিয়োতে অনুষ্ঠান শুনে বেরোচ্ছেন। যে পরিবারে পূজোর প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে, সেখানেও একই কণ্ঠ ভেসে আসছে। প্রায় চার দশক ধরে মহালয়ার ভোরের সঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনী এভাবেই চলল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ, বাণীকুমারের রচনা এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত—এই সমন্বয় শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। সাল ১৯৭৬। ভারতজুড়ে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। মহালয়ার ভোরে রেডিয়ো খুলে বাঙালি শুনল না ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। তার পরিবর্তে সম্প্রচারিত হল নতুন একটি অনুষ্ঠান— ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’। এটি লিখেছিলেন ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল গুপ্ত এবং আরও বহু বিশিষ্ট শিল্পী। ভাষ্যপাঠের অংশে ছিলেন উত্তমকুমার। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে-সহ বহু জনপ্রিয় শিল্পীর অংশগ্রহণও ছিল এই প্রযোজনায়। শিল্পীদের তালিকা দেখলে নতুন অনুষ্ঠানটির আকর্ষণ নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু মহালয়ার ভোরে রেডিয়ো খুলে শ্রোতারা পেলেন না সেই বহু পরিচিত কণ্ঠ। এ অনুষ্ঠান শ্রোতারা একেবারেই গ্রহণ করেননি। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’কে বাদ দেওয়ার জন্য ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। তৎকালীন আকাশবাণীর জনপ্রিয় উপস্থাপক মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখেছেন, ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’ সম্প্রচারের মধ্যপথেই টেলিফোনে শ্রোতাদের অবর্ণনীয় গালিগালাজ আসতে শুরু করে অকথ্য ভাষায়। অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই আকাশবাণী ভবনের সামনে সমবেত হয় বিশাল জনতা। ফটকে নিয়োজিত প্রহরীরা সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যান। ফটকের গেট ভেঙে ঢুকে পড়তে চায় উত্তাল মানুষের দল’। শ্রোতাদের এই প্রবল প্রতিক্রিয়া কেন? শুধু কি নতুন অনুষ্ঠানটি ভালো লাগেনি? সম্ভবত বিষয়টি তার চেয়ে অনেক গভীর।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ মানুষের মহালয়ার অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল পারিবারিক স্মৃতি, ছোটবেলার ভোর, পুজোর আগের উত্তেজনা, শরতের গন্ধ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত। তাই একটি অনুষ্ঠান বদলে যাওয়া অনেকের কাছে কেবল একটি রেডিয়ো অনুষ্ঠান বদলে যাওয়া ছিল না; বদলে যাচ্ছিল তাদের পরিচিত মহালয়ার সকাল।
শেষ পর্যন্ত প্রচলিত অনুষ্ঠান ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালেই ষষ্ঠীর দিনে আবার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচারিত হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। পরবর্তী বছর মহালয়ার ভোরে পুরনো অনুষ্ঠানটি আবার ফিরে আসে।
বাণীকুমারের লেখা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে তৈরি সেই অনুষ্ঠান আজ আর শুধু আকাশবাণীর একটি পুরনো প্রযোজনা নয়। এটি বাঙালির দুর্গোৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মহালয়ার ভোরে আজও কোথাও গঙ্গার ঘাটে তর্পণ চলছে, কোথাও বাড়িতে পূজোর প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে। আর একই সময়ে কোনও ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসছে সেই বহু পরিচিত কণ্ঠ। প্রযুক্তি বদলেছে, শোনার মাধ্যম বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও বদলেছে; কিন্তু সেই কণ্ঠের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুভূতিটা বদলায়নি।
একসময় যে কণ্ঠকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই কণ্ঠই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল বাঙালির মহালয়ার প্রতীক। যে অনুষ্ঠানকে একদিন অন্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠানই আজ বাঙালির দুর্গোৎসবের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মহালয়ার ভোরে তাই যখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ ভেসে আসে, তখন শুধু দেবীর আগমনী বার্তা শোনা যায় না—শোনা যায় প্রায় এক শতাব্দী ধরে বয়ে চলা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।