Skip to main content
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার · ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
আসন্ন অনুষ্ঠান 31 Oct 2026
Exploring the Place of Devotion: Siting and Experiencing Divinity in Bengal-Vaishnavism
Sukanya Sarbadhikary
লেখা পাঠান

পঞ্চপ্রয়াগ দর্শনের প্রাপ্তি জীবন দর্শন

অরূপ কুমার দে-র ‘পঞ্চপ্রয়াগ দর্শনের প্রাপ্তি জীবন দর্শন’ একটি ভ্রমণকাহিনি, যেখানে উত্তরাখণ্ডের পঞ্চপ্রয়াগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পৌরাণিক আখ্যান ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য একসূত্রে মিলেছে। বিষ্ণুপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ ও দেবপ্রয়াগের নদীসঙ্গম দর্শনের মধ্য দিয়ে লেখক উপলব্ধি করেন, ভিন্নতা ও বৈপরীত্যের সমন্বয়, অহংবর্জন এবং অন্তর্জগত ও বহির্জগতের মেলবন্ধনই পূর্ণতর জীবনবোধের পথ।
পঞ্চপ্রয়াগ দর্শনের প্রাপ্তি জীবন দর্শন
AIচিত্রটি প্রতীকী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তায় নির্মিত

শরতের নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসার সাথেই মনের ভেলার পালেও পড়ে পালিয়ে যাবার হাওয়া। আবারও চলি উত্তরে হিমালয়ের হাতছানিতে। এবারের ভ্রমণ গাড়োয়ালের পঞ্চপ্রয়াগ দর্শনে। উত্তরাখণ্ডবাসীদের বিশেষ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য নদীর সঙ্গমস্থলকে প্রয়াগ বলে থাকে। কয়েকবার দূর থেকে দর্শন সেরে চলে গেছি বিভিন্ন দিকে কিন্তু দেখা হয়নি সঙ্গমস্থল, শোনা হয়নি তাদের কলধ্বনি।

৪৪০০ মিটার উঁচুতে ত্রিদেব ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের নামাঙ্কিত ত্রিকোণাকৃতি সরোবর সতোপন্থ আর নন্দাদেবী শৃঙ্গের নীচে অবস্থিত ভাগীরথী খড়ক পর্যন্ত প্রায় ২৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত হিমবাহ ও গঙ্গোত্রি হিমাবাহ থেকে সৃষ্টি জলধারায় অবস্থান এই পঞ্চপ্রয়াগের। সমস্ত প্রয়াগই ধর্মস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তবে বিষ্ণুপ্রয়াগেই কোনো শহরের পত্তন হয়নি এখনও পর্যন্ত। তীর্থযাত্রীরা যোশীমঠ থেকে বদ্রীনারায়ন যাওয়ার পথেই বিষ্ণুপ্রয়াগ দর্শন করেন। আমরা প্রথমে বিষ্ণুপ্রয়াগ দেখব সেই মতন হরিদ্বার থেকে গাড়ি ছুটল নিজেদের তৈরী করা রুটে।

বিষ্ণুপ্রয়াগ

“পঞ্চপ্রয়াগ দেখে তো ফিরলেন কিন্তু কেবলমাত্র দুটো বা ততোধিক নদীর সঙ্গম ছাড়াও ‘প্রয়াগ’ কথাটার একটা গভীর অর্থ আছে, সেটা জানেন কি”? প্রশ্ন করলেন সৌম্যদর্শন এক ব্যাক্তি যিনি আমাদের কথা শুনছিলেন। চমকে উঠে তাকাতে জানলাম উনি বাঙালি নন কিন্তু বেশ কয়েক বছর বাংলায় ছিলেন তাই এই মিষ্টি ভাষাকে ভোলেননি। পবিত্র নদীদের সঙ্গমে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের প্রকৃতস্থান হল প্রয়াগ বলাতে স্মিত হেসে মাথা নেড়ে বললেন –‘ঠিক; তবে সেটা প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সঙ্গমের কথা, পুরাণের জগতপিতা ব্রহ্মার যজ্ঞবেদীস্থল’।

বিষ্ণুপ্রয়াগ

সতোপন্থ হিমবাহ থেকে উৎসরিত হয়ে বদ্রীনারায়ণের চরণ ছুঁয়ে ক্ষিপ্রগতিতে নিম্নগামী অলকানন্দা আর অন্য দিকে তিব্বতের নিতিপাস থেকে বেরিয়ে ধৌলি গঙ্গা সগর্জনে ছুটে চলেছে। মনে হবে যেন দিশেহারা দুই বন্ধু খুঁজে চলেছে নিজেদের আর সেই অন্বেষণের সমাপ্তি এই বিষ্ণুপ্রয়াগে। একে অপরের জলে পুষ্ট হয়ে নতুন ধারায় বয়ে যাবে অনন্তকাল।বহুপ্রাচীন যুগে বলা আছে অলকানন্দা নামকরণ হয় এই প্রয়াগের সঙ্গমের পর। আগে বদ্রীনারায়ণের নিচের নদীর নাম ছিল বিষ্ণুগঙ্গা। বিষ্ণুগঙ্গা ও ধৌলি গঙ্গা সঙ্গমের পর অলকানন্দা নামকরণ। আবহমান জনশ্রুতি দেবর্ষি নারদ ব্রহ্মার আদেশে সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলে ব্রহ্মশাপে তার মানবজন্ম হলেও তিনি বিষ্ণুকে ভোলেননি। এই প্রয়াগে বসে কঠিন তপস্যার পর ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে মুক্ত হলেন। সেই থেকে দুই নদীর সঙ্গমের নাম হল বিষ্ণুপ্রয়াগ। হোলকারের রানী অহল্যাবাঈ এখানে একটা আটকোনা ছোট মন্দির তৈরি করেন। জলধর সেনের লেখায় জানা যায় যে তিনি শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন; এখন বিষ্ণুমন্দিরও তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ির ধাপ নেমে গেছে সঙ্গমের স্থির জলের ‘বিষ্ণুকুণ্ডে’। নদীদ্বয় খরস্রোতা হওয়ার কারণে সাধারন ভাবে পুণ্যস্নান করা থেকে বিরত থাকেন তারা। তবে মকর সংক্রান্তি, উত্তরায়ন তিথি, বসন্তপঞ্চমী ও রামনবমীতে ভক্তরা পুণ্যস্নান করে থাকেন এই পঞ্চপ্রয়াগ তীর্থে। চারদিকের প্রকৃতির রূপ সময় ভুলিয়ে পথিককে করবে মোহাবিষ্ট।

নন্দপ্রয়াগ

নন্দপ্রয়াগ

নানা জনশ্রুতিতে সমৃদ্ধ এইপ্রয়াগ। একটা হল নন্দ নামে এক রাজা যজ্ঞ করে দেবতাদের বরলাভ করেন আর অন্যকথায় শ্রীকৃষ্ণের পালক পিতা নন্দরাজের নামে এই প্রয়াগ। বিষ্ণু বর দিয়েছিলেন যে তিনি স্বয়ং পুত্র হিসেবে জন্ম নেবেন যশোদার কোলে। বেহিসেবি বর দানে মহাদেবের বদনাম ছিল কিন্তু দেখা গেল মহামতি বিষ্ণু এই একই বর আগেই বাসুদেব ও দেবকীকে দিয়ে রেখেছেন। অগত্যা বুদ্ধির জালে দেবকীর গর্ভে জন্মে কৃষ্ণ পালিত হলেন যশোদার কাছে। আরও কথিত আছে এই নন্দ প্রয়াগেই ছিল কণ্বমুনির আশ্রম। এখানের আশ্রমেই শকুন্তলার বিবাহ হয় রাজা দুষ্মন্তর সঙ্গে। সরকারি নথিতে কণ্বাসু নামে পরিচিত এই নন্দপ্রয়াগ। স্কন্ধ পুরাণের কথায় নন্দগিরি থেকে উৎপত্তি এই নন্দকিনী নদী। সুললিত ছন্দে মিশে যাবে অলকানন্দার কোলে। এই প্রয়াগের পরিবেশে এক আধ্যাত্মিকতার পরশ পাওয়া যায়। সিস্টার নিবেদিতার লেখা হিমালয় ভ্রমণ থেকে বলা যায়-

“Peasantry of Nandprayag also suddenly grew handsome, not unlike the Kashmiris. The town itself is new, rebuilt since the Gohna Flood, and its temple stand far out accross the fields on the shore of the Prayag. But in the short time, a wonderful energy has been at work…..”

কিন্তু সিস্টারের দেখা সে মন্দিরও ভেসে গেছে ১৯৭০ এর মেঘফাটা বানের তোড়ে। এখন শুধুই গোপালজীর মন্দির।

কর্ণপ্রয়াগ

কর্ণপ্রয়াগ

পিন্ডার হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে পিন্ডার নদীর গাড়ওয়ালে এসে নতুন নাম হল কর্ণগঙ্গা। ধৌলিগঙ্গা আর নন্দাকিনীর জলধারায় পুষ্ট হয়ে অলকানন্দা তাকে নিজের বুকে ধারণ করল এই প্রয়াগে। মহাভারতের কর্ণ সূর্যদেবের তপস্যা করে সূর্য দেবের কাছ থেকে কবজ ও কুন্ডল পেয়ে প্রবল বিক্রমী হন। যে পাথরের উপর বসে তিনি তপস্যা করছিলেন সেটা এখনো বিদ্যমান। আদি শংকরাচার্য একটা মন্দির তৈরি করে পার্বতী, শিব, গনেশ, উমাদেবী ও কর্ণের মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। জানা যায় গুরুভাইদের নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ১৮ দিন তপস্যা করেন এই প্রয়াগে। এখানে বারো বছর অন্তর উমাদেবীকে শোভাযাত্রা করে ঘোরান ভক্তরা। একথাও বলা হয় যে মহাভারতের যুদ্ধ শেষের পর শ্রীকৃষ্ণ এখানে কর্ণের শেষকৃত্য করেন। চারদিকের সবুজবনানীর মাঝে উঁকিঝুঁকি তুষারচুড়ার প্রেক্ষাপটে দুই নদী কলকল রবে মিলিত হয়ে ছুটে চলেছে অতীতের কথকতার শব্দ করে। আহা মনভোলানো সে দৃশ্য, মনে হবে অনন্তকাল ধরে বসে ওদের বলা গল্প শুনি।

রুদ্রপ্রয়াগ ১

রুদ্রপ্রয়াগ

কেদারশৃঙ্গ অঞ্চলের হিমবাহ থেকে বেরিয়ে মন্দাকিনী মাত্র ৭২ কিমি পথ পেরিয়ে নিজেকে এই প্রায়াগে সঁপে দিয়েছে অলকানন্দায়। কেউ বলেন সতীর দেহত্যাগের পরে রুদ্ররূপে শিব এখানে তাণ্ডব নৃত্য করেন রুদ্রবীনা বাজিয়ে আবার অন্য মতে মহর্ষি নারদ এক শিলার ওপর বসে সংগীতে শ্রেষ্ঠপারদর্শী হবার বাসনায় তপস্যাকালে মহেশ সন্তুষ্ট হয়ে রুদ্রবীণা বাজিয়ে রুদ্রনাথ রূপে আবির্ভূত হয়ে বরদান করেন। ২০১৩-র জলোচ্ছ্বাসে সেই নারদ শিলাচলে গেছে কালের গর্ভে। নানা জনশ্রুতি,পুরাণ মিলেমিশে এখনে এক মহাসঙ্গম।রুদ্রনাথের স্ত্রী চামুন্ডা বা জগদম্বাদেবীর মন্দির আছে এখানে।

রুদ্রপ্রয়াগ ২

মন্দির চত্বর থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে সঙ্গম ঘাটে। এখানে প্রতিদিনের ভক্তি পূর্ণ সন্ধ্যারতি দেখলে মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।অপরদিকে রুদ্রনাথের প্রাচীন মন্দির, তারও সংস্কার করেন আদি শংকরাচার্য। গর্ভগৃহে আছে নারদেশ্বর ও কামেশ্বরের জোড়া শিবলিঙ্গ।প্রধান দ্বারে দুটো নন্দীমূর্তির অবস্থান অন্য কোথাও দেখিনি। গর্ভগৃহে বিরাজ করছেন দেবীপার্বতী ও গণেশজী। পুরোমন্দির চত্বর জুড়ে আছে ভৈরবনাথ, শিবঠাকুর, লক্ষীনারায়ণের মন্দিরগোষ্ঠী। পুজো পাঠের দায়িত্বে এখানে নিযুক্ত আছেন দক্ষিণ ভারতীয় পুরোহিত।স্থানীয় লোকেরা মনে করেন পান্ডবরা ভ্রাতৃহত্যার শোকে এখানে শিবের উপাসনা করেন। সেই ঘটনাকে স্মরনীয় করে বিশেষ তিথিতে ‘পান্ডবলীলা’ নামে মহাভারতের পালা হয় জেলার বিভিন্ন জায়গায়। কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের রাস্তাও এখান থেকে বিভক্ত হয়ে চলে গেছে দু’দিকে।

দেবপ্রয়াগ ১

দেবপ্রয়াগ

উচ্ছ্বলবেগে ভাগীরথী এসে মিলিত হচ্ছে শান্ত যেন সমাহিত অলকানন্দার সাথে এই প্রয়াগে। মনে হবে নীলাম্বরী সুন্দরীর মিলন হচ্ছে গেরুয়া বরণ সন্ন্যাসীর সঙ্গে। দুইনদীর এই বিপরীত রং সত্যিই আশ্চর্য করে দেয়, মনে হবে বেগবতী ভাগীরথী অলকানন্দাকে জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সমতলের দিকে। এখান থেকেই মিলিত জলধারার নাম হবে গঙ্গা। দেব শর্মা নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ শ্রীরামচন্দ্রের তপস্যা করে তার আশীর্বাদ লাভ করেন; তার নামেই সঙ্গমের নাম হয় দেব প্রয়াগ। সঙ্গমে ভাগীরথীর বুকে কুণ্ডের নাম বশিষ্ঠকুণ্ড আর অলকানন্দার তীরে আছে ব্রহ্মকুণ্ড। কথিত আছে এটাই নাকি বিষ্ণুর নাভি, ব্রহ্মাও এখানে তপস্যা করেছিলেন। রাবণবধের পর শ্রীরামও এখানে এসে পাপমুক্ত হবার জন্যে তপস্যা করেন। গ্রানাইট পাথরে যুদ্ধবেশী শ্রীরামের একক বিগ্রহেরে পূজো হয় এখানকার রঘুনাথজীর মন্দিরে। নানান গল্প গাথায় ভরা এই মন্দিরের ইতিহাস। আদি শংকরাচার্য থেকে শুরু করে অধুনা ১৯৮৭ সালে কাঞ্চিমঠের শংকরাচার্য পর্যন্ত অনেকেই এই মন্দিরের সংস্কার করান। গোটা মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে অন্নপূর্ণা, মহাদেব, কালভৈরব, বদ্রিনাথ প্রতিষ্ঠিত আছেন ছোট ছোট মন্দিরে। এমনকি শ্রীরামচন্দ্র যে শিলায় বসে তপস্যা করেছিলেন সেটাও স্পর্শ করে আপনিও ফিরে যেতে পারেন ত্রেতাযুগে। একটু দূর থেকে এই প্রয়াগ দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

দেবপ্রয়াগ ২

আমরা তিন দিনে পঞ্চপ্রয়াগ দর্শন করে ফিরলাম হরিদ্বারে তখনও জানিনা এক মহাপ্রাণ ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাবো আগামী দিনে। গঙ্গার ঘাটে এসে আশাহত হলাম দেখলাম অগুন্তি মানুষের কোলাহল পূর্ণ ভক্তি,গঙ্গা সেবার জন্য বিলবই হাতে সদস্যদের রূঢ় ব্যবহার, নাঃ ভালো লাগছিলনা। মোবাইল ফোনের ভিড়ে হারিয়ে গেল আরতির মাহাত্ম্য, মনে হলো ভক্তির দুধেও জল মিশছে। একটু নির্জনতার খোঁজে পরদিন চলে গেলাম গঙ্গার আসল গতিপথ নীলধারার তীরে। যেখানে হর-কি-পৌরীতে থিকথিক করছে ভীড় এখানে তখন জনশূন্য।এবার আমরা গাড়োয়াল যাত্রায় সব কটা প্রয়াগ ভালো ভাবে দেখে গঙ্গারঘাটে বসে আলোচনা করছি। “পঞ্চপ্রয়াগ দেখে তো ফিরলেন কিন্তু কেবলমাত্র দুটো বা ততোধিক নদীর সঙ্গম ছাড়াও ‘প্রয়াগ’ কথাটার একটা গভীর অর্থ আছে, সেটা জানেন কি”? প্রশ্ন করলেন সৌম্যদর্শন এক ব্যাক্তি যিনি আমাদের কথা শুনছিলেন। চমকে উঠে তাকাতে জানলাম উনি বাঙালি নন কিন্তু বেশ কয়েক বছর বাংলায় ছিলেন তাই এই মিষ্টি ভাষাকে ভোলেননি। পবিত্র নদীদের সঙ্গমে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের প্রকৃতস্থান হল প্রয়াগ বলাতে স্মিত হেসে মাথা নেড়ে বললেন –‘ঠিক; তবে সেটা প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সঙ্গমের কথা, পুরাণের জগতপিতা ব্রহ্মার যজ্ঞবেদীস্থল’। 

গঙ্গার সুনীলধারা

আমরা সাগ্রহে পঞ্চপ্রয়াগের গভীর অর্থের কথা জানতে চাইলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বললেন-‘প্রয়াগ এই তিনটে বর্ণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃষ্ট জ্ঞানের পথনির্দেশ, অর্থাৎ PRAYAGA হল প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করে জীবনকে সঠিক বা আধ্যাত্মিক পথে এগিয়ে নিয়ে চলা। প্রয়াগ মানে দুই বা ততোধিক ফ্যাক্টরের মিলন। আমাদের অন্তরনিহিত জগত আর বাইরের জগতকে মিলিয়ে জীবনপথে চলা এক কঠিন কাজ। এটা সম্ভব হবে যখন আমরা সমস্ত মন প্রাণ ঢেলে চেষ্টা করব দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত জগত বা চরিত্রকে মানিয়ে নিয়ে চলতে। সেটা তখনই বাস্তব হবে যখন আমরা আমাদের অহংকে বশীভূত করতে পারব’। আমরা সম্মোহিত ওনার এই ব্যাখ্যা শুনে। শিবালিক পর্বত শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে আবার বলতে লাগলেন-‘হিমালয় অঞ্চল থেকে যখনই দুটো নদী মিলিত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তখনই বলছি ‘প্রয়াগ’ কারণ দুটো ভিন্ন জলধারা অন্য দিক থেকে আসছে নানা রকমের গিরিপথ পেরিয়ে নানা ছন্দে। তাদের গভীরতা তাদের বয়ে আনা খনিজ পদার্থকে মিশিয়ে নিয়ে সাবলীল ভাবে পরিণত হচ্ছে এক বড় নদীধারাতে। কী অপূর্ব ঐ মিলিতধারা, খানিক দূরের সগর্জন সঙ্গমের তুফান এখন স্তিমিত, তাদের সব অহং ত্যাগ করে শান্ত হয়ে ছলেছে আপন পথে। এই মিলিত হওয়ার মুহূর্তে আমাদের অন্তরাত্মার বোধোদয় হওয়া উচিত যে জাতির বিভিন্নতা, চিন্তা, ভাবধারা, কালচার সব একসাথে মিলিয়ে নিয়ে একদুকুল ছাপানো পূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে হবে নিজেদের জীবনকে ঠিক নদীর মতই’। একদম অন্য দৃষ্টিকোণ দিয়ে যেন নতুন করে প্রয়াগদর্শন হল আমাদের। স্বর্গীয় হিমালয়ের পরিমণ্ডলের বাইরে মনের এই বোধোদয়ের পবিত্র জায়গা আর কোথায়! অন্যভাবে জীবনকে বুঝতে হলে সবাইকে আসতে হবে এই ধ্যানগম্ভীর ভূধর-এর কাছেই। নীল ধারার দিকে তাকিয়ে ওঁর নিজের উপলব্ধি এত সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার পর আমরা যেন অন্যএক জগতে চলে গিয়েছিলাম। স্বাভাবিক হয়ে দেখলাম যেমন নিঃশব্দে এসেছিলেন তেমন ভাবেই উনি কখন চলে গেছেন। ওদিকে ছলছল শব্দে সুরনদী মাগঙ্গাও যেন বলছেন- “চলো হে পথিক জীবনটাই তো চরৈবেতি”। পঞ্চপ্রয়াগ দর্শন শেষ হলো আমাদের সমবেত কণ্ঠে –

“দেবী সুরেশ্বরি ভগবতী গঙ্গে

ত্রিভুবনতারিণী তরল তরঙ্গে”।

ছবি: লেখক

A
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Arup Kumar Dey

জন্ম কলকাতায় ১৯৫৪ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মী। অল্প বয়স থেকেই ভ্রমণ ও ট্রেকিং এ উৎসাহী; সেই অভিজ্ঞতা ছাপার অক্ষরে বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়।ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে।এছাড়াও জাতীয় স্তরে Contract Bridge প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে থাকেন।

স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি CC BY-NC-ND 4.0 লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব; তা Poorvam-এর নীতি বা অবস্থান প্রতিফলিত করে না।

আপনার লেখা পাঠান

গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন।