কখনও কখনও ভ্রমণ মানে শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে যাওয়া নয়। কিছু পথ আমাদের নিয়ে যায় নিজের ভেতরে। শহরের ব্যস্ততা, পরিচিত গলির শব্দ, প্রতিদিনের হিসাব-নিকাশ পেরিয়ে যখন অচেনা কোনো পথ ধরেএগিয়ে চলি, তখন পথের দু’ধারে শুধু দৃশ্য বদলায় না—বদলে যেতে থাকে আমাদের দেখার চোখও।
ত্রিপুরার উদয়পুরের মাতাবাড়ির পথে আমার যাত্রাটিও তেমনই এক অভিজ্ঞতা। বহুবার নাম শুনেছি—মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতাবাড়ি, দীঘি, মন্দির, পুজো, ভক্তসমাগম। কিন্তু কোনো একটি স্থানকে কেবল তার নাম দিয়ে চেনা যায় না।তাকে জানতে হলে তার পথে হাঁটতে হয়, মানুষের মুখ দেখতে হয়, বাতাসের গন্ধ নিতে হয়, ইতিহাসের নীরবতাকে শুনতে হয়।
সেই টানেই একদিন রওনা হলাম উদয়পুরের পথে।
আগরতলা শহর ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছিল। শহরের পরিচিত ব্যস্ততা ছেড়ে রাস্তা যখন দক্ষিণ ত্রিপুরার দিকে এগিয়ে গেল, তখন চারপাশের দৃশ্যও বদলে যেতে শুরু করল। কোথাও সবুজের বিস্তার, কোথাও ছোট ছোট জনপদ, কোথাওরাস্তার ধারে দোকান, চায়ের ভাঁড় হাতে মানুষের আড্ডা। পথের সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছিল, ত্রিপুরাকে যেন নতুন করে পড়ছি।
ভ্রমণের সৌন্দর্য এখানেই। গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই পথ আমাদের অনেক কিছু দিয়ে দেয়।
উদয়পুরের দিকে এগোতে এগোতে প্রকৃতির সবুজ আরও ঘন হয়ে উঠল। এই অঞ্চল একসময় ত্রিপুরার রাজন্য-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ইতিহাসের সেই দীর্ঘ ছায়া আজও উদয়পুরের মাটি, জল আর স্থাপত্যের মধ্যে অনুভব করাযায়।
আর তারপর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত—মাতাবাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম।
দূর থেকেই ভক্তদের আনাগোনা চোখে পড়ল। কেউ পরিবারের সঙ্গে এসেছেন, কেউ মানত পূরণ করতে, কেউ নিছক দর্শনের উদ্দেশ্যে। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রসাদের সামগ্রী। কারও চোখে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার ক্লান্তি, আবারসেই ক্লান্তির মধ্যেই এক ধরনের প্রশান্তি।
মাতাবাড়ির প্রাঙ্গণে পা রাখার পর প্রথম যে অনুভূতিটি হয়েছিল, তা হল—এখানে সময় যেন একটু ধীরে চলে।
মন্দিরের স্থাপত্যে ত্রিপুরার নিজস্ব ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। ছোট্ট পাহাড়ের মতো উঁচু ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটি চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে তাকে আলাদা কোনো স্থাপনা বলে মনে হয় না; বরং মনে হয়, বহুদিন ধরে এই মাটিরই একটি অংশ হয়ে আছে।
মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হল, একটি স্থানের মাহাত্ম্য কেবল তার স্থাপত্যে নয়, মানুষের বিশ্বাসে তৈরি হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ এখানে এসেছে, প্রার্থনা করেছে, আনন্দের কথা জানিয়েছে, দুঃখের কথা মায়ের কাছে রেখেগেছে। সেই অগণিত মানুষের পদচিহ্নই হয়তো একটি তীর্থকে তীর্থ করে তোলে।
মাতাবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস ও শক্তিপীঠের বিশ্বাস। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সতীর ডান পা বা পায়ের অংশ এখানে পতিত হয়েছিল। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির বহুদিন ধরে মানুষের গভীরধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্র হয়ে আছে।
ইতিহাস ও বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে তাদের প্রভাব কখনও কখনও একসূত্রে বাঁধা পড়ে। একজন ইতিহাসের অনুসন্ধান নিয়ে এখানে আসতে পারেন, আর একজন আসতে পারেন নিঃশর্ত বিশ্বাস নিয়ে। কিন্তুমন্দিরের সামনে দাঁড়ালে দুজনেরই চোখে হয়তো একই দৃশ্য ধরা পড়ে—শতাব্দী পেরিয়ে টিকে থাকা মানুষের এক গভীর আকর্ষণ।
মন্দির দর্শনের পর চোখ আটকে গেল সামনের বিশাল জলাশয়ের দিকে—কল্যাণ সাগর।
জলের ওপর আকাশের প্রতিচ্ছবি। চারপাশে গাছপালা। মাঝে মাঝে জলের ওপর হাওয়ার ছোট ছোট ঢেউ। মন্দিরের গাম্ভীর্যের পাশে এই জলাশয় যেন প্রকৃতির এক শান্ত উত্তর।
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভ্রমণের সময় আমরা অনেক ছবি তুলি। কিন্তু সব দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা যায় না। কিছু দৃশ্য মনে রাখতে হয় চোখ বন্ধ করে। কল্যাণ সাগরের সেই বিকেলটিও আমার কাছে তেমনই একটি দৃশ্য।
জলের ধারে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনটাকেও যেন অন্যভাবে দেখতে ইচ্ছে করছিল। পাশে কেউ প্রসাদ নিয়ে বসেছেন, কেউ পরিবারের ছোটদের নিয়ে গল্প করছেন, কেউ দূর থেকে এসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। এক বৃদ্ধাকে দেখলাম ধীরে ধীরেমন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর হাতে ছোট্ট একটি থলে। পাশে থাকা একজনকে বললেন, “অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল, আজ এলাম।”
এই একটি বাক্যই যেন গোটা ভ্রমণের অর্থ বদলে দিল।
মানুষ কেন দূরে যায়?
শুধু নতুন জায়গা দেখার জন্য?
সবসময় নয়।
কখনও মানুষ যায় কোনো পুরোনো ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে। কখনও যায় প্রিয়জনের স্মৃতি নিয়ে। কখনও যায় নিজের দুঃখ একটু দূরে রেখে আসতে। আবার কখনও কোনো কারণ ছাড়াই—শুধু মন বলেছে বলে।
মাতাবাড়ির পথে তাই আমি শুধু একটি মন্দির দেখিনি; দেখেছি মানুষের বিশ্বাসের নানা রূপ।
মন্দিরের আশপাশের দোকানগুলিও ভ্রমণের একটি আলাদা অভিজ্ঞতা। ফুল, প্রসাদ, পূজার সামগ্রী, নানা ধরনের স্থানীয় খাবার—সব মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছে এক নিজস্ব জনজীবন। দোকানির সঙ্গে দু’কথা বললেই বোঝা যায়, এই তীর্থস্থান শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়; বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
এক কাপ চা হাতে নিয়ে রাস্তার পাশে বসে মনে হচ্ছিল, ভ্রমণের আসল গল্প হয়তো বড় বড় স্থাপত্যের মধ্যে নয়, এমন ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে।
একজন দোকানি বললেন, উৎসবের সময় এখানে মানুষের ভিড় অনেক বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। তাঁদের কথায় ছিল গর্ব, আবার ছিল আপন জায়গাটির প্রতি মমতা।
ভ্রমণ আমাদের শেখায়—একটি স্থানকে বাইরে থেকে দেখলে তার সৌন্দর্য দেখা যায়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বললে তার আত্মাকে একটু বোঝা যায়।
মাতাবাড়ি থেকে ফেরার সময় উদয়পুরের রাস্তা যেন আর আগের মতো লাগছিল না। আসার সময় যে রাস্তা শুধু গন্তব্যে পৌঁছনোর পথ ছিল, ফেরার সময় সেটিই হয়ে উঠল স্মৃতির পথ।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। গাছের ফাঁক দিয়ে শেষ আলো পড়ছে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট বাড়ি, দোকান, মানুষের চলাফেরা—সবকিছুতেই এক ধরনের শান্ত সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
গাড়ি এগিয়ে চলছিল, আর পিছনে পড়ে থাকছিল মাতাবাড়ি।
কিন্তু সত্যিই কি পিছনে পড়ে থাকছিল?
মনে হল, না।
কিছু স্থান থেকে ফিরে আসা যায়, কিন্তু সেই স্থানকে মন থেকে ফিরিয়ে আনা যায় না। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, কল্যাণ সাগরের জল, মানুষের মুখ, পুরোনো ইতিহাস আর নিজের কিছু নীরব অনুভূতি—সবকিছুই সঙ্গে করে নিয়ে ফিরতে হয়।
মাতাবাড়ি আমাকে তাই শুধু একটি ভ্রমণ দেয়নি। দিয়েছে দেখার একটি নতুন চোখ।
ইতিহাসকে শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের বিশ্বাসের মধ্যেও দেখতে শিখিয়েছে। প্রকৃতিকে শুধু সৌন্দর্য হিসেবে নয়, একটি স্থানের জীবনের অংশ হিসেবে অনুভব করতে শিখিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—ভ্রমণ যে কখনও কখনওনিজের কাছেই ফিরে আসার পথ, সেটাও বুঝিয়েছে।
আজও মাতাবাড়ির কথা মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মন্দির, সেই জলাশয়, সেই পথ আর অসংখ্য মানুষের মুখ।
পথের শেষে যে মন্দির ছিল, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে আমার কাছে সেই পথের গল্প।
কারণ ভ্রমণ শেষ হয় গন্তব্যে পৌঁছনোর সঙ্গে নয়।
ভ্রমণ শেষ হয় তখন, যখন ফিরে এসে আমরা বুঝতে পারি—যে মানুষটি রওনা হয়েছিল, সে আর ঠিক আগের মানুষটি নেই।
মাতাবাড়ি থেকে ফেরার পর আমারও মনে হয়েছিল—
কিছু পথ পায়ে হাঁটা হয়, কিছু পথ মনে।
আর কিছু পথ মানুষকে নিজের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।