কোনও কোনও কাব্যগ্রন্থ পড়ার পর, তার মৌলিক সুবাস কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে। কবিতা ‘Memorable speech’ হয়ে উঠলে তার অনেক সম্ভাবনাই থেকে যায়—জনপ্রিয় হয়ে ওঠা, শ্লোগান হয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ক্রমশ কাব্য ও কবি ছিনতাই হয়ে যাওয়া অথবা একটি বা দুটি লাইন বা কবিতার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট কবির কবিকৃতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া। আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ ঋক অমৃতর ‘ভাষা বিচারক যার’, এসব সম্ভাবনার আশঙ্কা উড়িয়ে অন্তর্লীন সুবাসে পাঠককে শুধুমাত্র আকৃষ্ট করে না, রাত্রির ফুলের মতো অন্ধকারেও দৃশ্যমান হয়।কারণ এই অনুভূতি কবি ধারণ করতে পারেন – “মানুষের দুঃখের ভিতর এখনও বিভেদ নেই”৷ এই বইয়ের কবিতাগুলি পাঠকের কাছে মূলত এক ‘সান্দ্র সংকট’ সৃষ্টি করে। ঋকের কল্পনার পরিসর এতটাই বিস্তৃত যে, তার কবিতার গতিপ্রকৃতি আগাম অনুমান করা কঠিন।
ধ্যানের মধ্যে যদি কোনও মানুষ তারই নিজস্ব দেহকে মৃতদেহ হিসাবে নিজেরই সামনে পড়ে থাকতে দ্যাখে, তখন সেই অনুভূতিকে মৃত্যুচেতনা নয়, মৃত্যু সচেতনতার দৃশ্যরূপ বলা যেতে পারে। ঋক এই বইয়ের কিছু কবিতায় সেই দৃশ্যরূপ আঁকেন শুধু নীরস দার্শনিকতা বা কোনও মায়ামৃদঙ্গের সাহায্যে নয়। মফসসলের স্থিতি জাড্য থেকে বহির্মুখী বিচরণের ছায়াচরাচর, আশ্চর্য শ্লেষ, স্মৃতিচারণ, সমাজমনস্কতা বা বলা যায় সমসাময়িক প্রবণতার ভিতরে দাঁড়িয়ে ঐতিহ্য ও ভারতীয়ত্বের প্রতি হেলে পড়তে গিয়েও কলোনিয়াল হ্যাংওভারের মুখোমুখি দাঁড়ানো—সমস্তই ঋকের কবিতার আদ্যাশক্তি ও মহামায়া। “যেভাবে ভেঙে পড়ে সরকার অথবা দেশ কিংবা বাবা অথবা কনফিডেন্স”, তারই নির্মোহ ধারাভাষ্য দিতে গিয়়ে আত্মজলের বিন্দুতে নিজেকে খোঁজা এক কবি “দারুব্রহ্মে স্থান পাবে না জেনেও” হৃদয়় জ্বালান।

“ভৌম রামনগরে বসে বেনারসের দিকে তাকালে, তাকে অপ্রাকৃত বোধ হয়। চুরাশি আঙুলের শরীর চুরাশি ঘাট দিয়ে সাজানো, অলিগলি স্নাযু, আরতির অলংকারে আভূষিত অঙ্গহার—সন্ধের অবকাশ করে আয়োজন...”, এমনই শব্দের প্রয়োগ, কল্পনা এবং ভারতীয় মিথ আর সাধনতত্ত্ব—সমস্ত দিয়েই ঋকের কবিতা সাজানো।
ঋকের কবিতায় প্রেম সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়েই বিচরণ করে হয়তো, কারণ যখন নারীর থেকে বা বলা ভাল, নারীর প্রেমের থেকেও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে রোজগার এবং দিনশেষের উপার্জনের প্রায় পুরোটাই মাপা হয় গাণিতিক ছন্দে, তখন সত্যবদ্ধ অভিমানের নান্দনিকতার রেলিং ছেডে তাঁর প্রেমের কবিতা পথ চলে কিন্তু পদস্খলনের ভয়ও যেন তার নেই। তার একটা বড় কারণ ভালোবাসার কাছে কবির এক্সপেকটেশনও খুব বেশি নয়। তৎসম, প্রায় অব্যবহৃত শব্দের পাশে ঋক বসিয়ে দিতে পারেন বৈদেশিক শব্দের আপাতকঠিন এবং গোত্রছাড়া প্রয়োগ যা মিলেও যায় চমৎকার।
পূর্ববর্তী বইয়ে (কলেজ স্ট্রিটের চ্যাপলিন), যতদূর মনে পড়ে, ঋক লিখেছিলেন, “আসলে মানুষ যেভাবে মরে, ভাষা তো ঠিক মরে না সেভাবে”। আর এই বইয়ে যে ভাষার প্রসঙ্গ কবি নাম ভূমিকায় রেখেছেন, মনে হয়, তা ঠিক কোনও প্রাদেশিক ভাষা নয় বরং এক আত্মনিরীক্ষা ও চিৎকার করে ওঠা মানবজমিনের মাটির ভাষা।
ভাষা বিচারক যার
প্রকাশক- ধানসিড়ি