Skip to main content
Search
Author
Literature · 19 Sep 2026 · বাংলা · Anupurvi

হোমারের অন্তরে বাল্মীকি ও ব্যাসের অন্বেষণ সম্ভব কি?

হোমারের অন্তরে বাল্মীকি ও ব্যাসের অন্বেষণ সম্ভব কি?
এই বইয়ের পাঠক তথা অধিকারী কে? আমার মনে হয়েছে রসিক, প্রেক্ষক এবং সাহিত্য তথা শিল্প সম্বন্ধে কৌতূহলী যে কোনও ব্যক্তিই এই বইটির পাঠক হতে পারেন, এবং তার জন্য যাতে ইলিয়াড ও ওডিসির পাঠ অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায় অর্জুন ভরদ্বাজ সেই খেয়ালও রেখেছেন বইটির...

যেকোনো শিল্পের গুণগত মান প্রথমত সামাজিক তথা ঐতিহাসিক এবং দ্বিতীয়ত নন্দনতাত্ত্বিক এই দুই ডায়ালেক্টিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গীর দ্বারা বিচার্য। আপাতভাবে এই দুইটিকে আলাদা বলে মনে হলেও, তারা আসলে যে একই উদ্দেশ সাধন করে এই নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। শিল্পের এই সামাজিক উপাদানগুলিকে ব্যতিরেকে নিছক নন্দনতাত্ত্বিক উপাদানগুলির চর্চার কথা ভাবা নিছক তাই অপ্রগলভ বলেই মনে হয়। সামাজিক উপযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে শিল্পকে বিচার করার ক্ষেত্রে রসিক তথা পাঠক বা প্রেক্ষক তথা সামাজিক যে প্রশ্নটি করেন তা হলো, শিল্প সত্য হলো কিনা, আর নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে প্রশ্নটি হলো, শিল্প সুন্দর হলো কি? অবশ্যই এই সত্য এবং সুন্দর কথাদুটি বাজার প্রচলিত বিজ্ঞাপণের ভাষা নয়, বরং তা আসলে দার্শনিক পরিভাষা। ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের কয়েকহাজার বছরের ইতিহাসে শিল্পের দ্বারা কীভাবে এই সত্য ও সুন্দরকে ধরা যায়, তারই খোঁজ করেছেন ভামহ, দণ্ডী, আনন্দবর্ধন, অভিনবগুপ্ত প্রমুখ শিল্পসাধকেরা। আমরা আজ যে বইটি সম্বন্ধে আলোচনা করতে উদ্যত হয়েছি, তাতে আমাদের বর্তমান সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য শিল্পসাধক এবং কবি শ্রী অর্জুন ভরদ্বাজ ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের সেই চিরন্তন সত্য এবং সুন্দরকে খুঁজতে চেয়েছেন, হোমার রচিত দুইটি মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসি-র ভিতর। বইটি পড়ার পর বরং পাঠকের মনে হতেই পারে লেখক আসলে হোমারের অন্তরেই খুঁজতে চেয়েছেন বাল্মীকি এবং ব্যাসকে। লৌকিক (স্পেশিও-টেম্পোরাল) দূরত্ব দ্বারা রচিত দুইটি সভ্যতার বিচিত্রতার মধ্যে তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছেন কি কোন ঐক্য?

বইটির সম্পূর্ণ নাম ইন্ডিয়ান পার্স্পেক্টিভ অফ ট্রুথ অ্যান্ড বিউটি ইন হোমার'স এপিকস, যেখানে ট্রুথ এবং বিউটি কথাদুটি বোল্ড ফন্টে লেখা। এই নামখানিই আসলে বইটির বিষয়। প্রয়োজন আগেই উল্লেখ করেছি, লৌকিক দূরত্বের বাইরেও দুটি ভিন্নধর্মী সভ্যতার অন্তর্গত ঐক্য ও তার অন্বেষণ যা আমাদের শিল্পের যে সামাজিক ইতিহাস তার সম্বন্ধে আলোকিত করে। এই বইয়ের পাঠক তথা অধিকারী কে? আমার মনে হয়েছে রসিক, প্রেক্ষক এবং সাহিত্য তথা শিল্প সম্বন্ধে কৌতূহলী যে কোনও ব্যক্তিই এই বইটির পাঠক হতে পারেন, এবং তার জন্য যাতে ইলিয়াড ও ওডিসির পাঠ অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায় অর্জুন ভরদ্বাজ সেই খেয়ালও রেখেছেন বইটির লেখনীতে।

এখন ভারতবর্ষের নন্দনতত্ত্ব কোনও ব্যক্তি বিশেষের দৃষ্টিভঙ্গীর এক থিসিস নয়। বরং তা কয়েকহাজার বছরের শিল্পসম্বন্ধীয় যে কৌতূহল এবং শিল্পের দ্বারা অ্যাবসোলিউটকে পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তাঁরই পরিণাম। শিল্প এখানে সাধন, শিল্পী সাধক। কপিলা বৎসায়নের মতে, যেকোনো সাধনার মূল প্রেরণাই হলো নিজের ইয়ত্তা থেকে স্বাতন্ত্র্য এবং সেই স্বাতন্ত্র্যের দ্বারা সামরস্যের আস্বাদ। যোগীর ক্ষেত্রে হলেও একজন শিল্পসাধকের জন্য কখনওই তা চিত্তবৃত্তিনিরোধের মাধ্যমে নয়, বরং বিপরীত, যাবতীয় ইন্দ্রিয়কে করণ হিসেবে ব্যবহার করে শিল্পী এবং রসিক সগুণ থেকে নির্গুণের রসাস্বাদনের অনুভব করেন। তাই শিল্পই শিল্পীর যোগ, যাগ এবং পূজা।

বেদরক্ষা ছিল ভরতের শাস্ত্র রচনার ক্ষেত্রে মূল প্রয়োজন। উদ্দেশ ছিল রসাস্বাদনের দ্বারা যারা নিবৃত্তি মার্গের পথিক নন, সেই সামাজিককে আধ্যাত্মিক মার্গে চালিত করার। উপরে উল্লিখিত প্রমুখ শিল্পসাধকদের প্রয়োজন ছিল রসাস্বাদনে যদি কোন ব্যাঘাত থেকে থাকে তার দূরীকরণ। আধিভৌতিক এলিমেন্ট নিয়ে শিল্পী তার শিল্প রচনা করেন আধিদৈবিকতায়। সাধারণ করে বললে সত্য এবং সুন্দরের বোধই যা কিছু আধিভৌতিক তাকে আধিদৈবিক করে তোলে। আধিভৌতিক থেকে আধিদৈবিকতার দিকে এই জার্নিকে আমরা ডঃ আর গণেশ-এর কথা মতন আধিযাজ্ঞিক বলতে পারি, যেখানে শিল্পচর্চা আসলে এক যজ্ঞই। এই আধিদৈবিক শিল্পবোধ এবং রসাস্বাদনের দ্বারা এক আধিরসাত্মক উপলব্ধি হয় রসিকের। এই আধিরসের মধ্যেই রসিক প্রথমে পান সগুণ রসের আস্বাদ এবং তদুপরি নির্গুণ রসের আভাস। নির্গুণের এই আভাসের মাধ্যমেই রসিক উপলব্ধি করেন অধ্যাত্ম তথা পরম সত্য ক্ষণিকের জন্য হলেও। সেক্ষেত্রে এরকম কোন কোন নন্দনতত্ত্বের পারম্পরিক ইতিহাস ভারতবর্ষ ছাড়া অন্য কোন সভ্যতায় আছে বলে আমার জানা নেই। এমনকি অ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্স-এর বিস্তারও এত বিরাট নয়। পশ্চিমের সত্য, বাস্তব ও মিথ্যা সম্বন্ধীয় ধারণা এক্ষেত্রে ভারতবর্ষীয় ধারণার থেকে কিছুটা আলাদা। তদুপরি ভারতীয় সভ্যতার উপর হেলেনিক সভ্যতার প্রভাব কতখানি এই খোঁজই তো চলছে শেষ দুশো বছর ধরে। অর্জুন ভরদ্বাজ বরং যে চেষ্টাটি করেছেন তা কিছুটা বিপরীত। সেক্ষেত্রে আর্য মাইগ্রেশন থিয়োরি কিছুটা আঘাত প্রাপ্ত হয় বটে।

এখন ভরতের রসাস্বাদনের মধ্যে দিয়ে রসিককে বেদজ্ঞ করে তোলার চেষ্টা, ও নন্দনতাত্ত্বিকদের সেই রসাস্বাদনে যদি কোন বাধা থেকে থাকে, তার দূরীকরণের প্রচেষ্টার উপর আধার করে অর্জুন আরেক ধাপ এগিয়ে সেই রসাস্বাদনের সার্বজনীনতার খোঁজ করতে চেয়েছেন। অর্জুনের কাছে তাই সুন্দর (বিউটি) ও সত্য (ট্রুথ) কেবলমাত্র সাহিত্যের তথা কাব্যের গুণ (অ্যাট্রিবিউট) মাত্র নয়, বরং তা শিল্পের মূল্যবোধ (ভ্যালু)। ট্রুথ তাই তার কাছে কেবলমাত্র ফ্যাক্টস নয়, বরং পুরুষার্থ। অর্জুন হোমারের কাব্যে যে ট্রুথ ও বিউটি খুঁজতে চেয়েছেন তা হলো ভাষাকে অবলম্বন করে থাকা এক নিত্যতা, কাব্যের পরম।

এপিকের প্রধানতম চরিত্রই হলো যে সে বৃহৎ। কেবল আকারে নয়, বরং তার সামগ্রিক ব্যাপ্তিতে। বাল্মীকির রামায়ণ রচনার আগেও যোগশাস্ত্র ছিল, এবং সুবৃহৎ ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির রচনাও হয়ে গেছে। এমনকি ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ভিতর নানান আখ্যানধর্মী যেসমস্তকথা আছে তা থেকে পুরাণের অস্তিত্ব অনুমান করাও অমূলক নয়। অর্থাৎ বাল্মীকি ও ব্যাসদেবের জন্য মহাকাব্য রচনার প্রেক্ষাপট যে আগেই রচিত হয়ে ছিল একথা বলার মধ্যে কোনও মিথ্যাচার নেই। কিন্তু পশ্চিমে হোমারের ক্ষেত্রে বরং এই কথাটি খাটে না। তার নিজের সংস্কৃতিতে তিনিই প্রথম। এক্ষেত্রে তার অন্ধত্ব ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধত্বের মতনই অজস্র প্রশ্নের উত্থাপন করে। হোমার তার রচনা দিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামগ্রিক পাশ্চাত্যের সাহিত্য, শিল্প এমনকি বিজ্ঞানকেও প্রভাবিত করেছেন হাজার বছর ধরে। হোমার ইওরোপীয় রেনেসাঁ-র ক্ষেত্রেও যথেষ্ট প্রভাবশালী। তাই অর্জুনের এই দৃষ্টিভঙ্গী অমূলক নয়, “The Greek poet Homer occupies a stature similar to that occupied by the seer-poets Vyāsa and Välmīki in India-he is the first epic poet of the West and occupies the highest echelons among the best poets the world has ever seen. Just as Vyāsa and Valmiki laid the foundations for everything Indian, Homer laid the foundation for the classical culture of the west”.

অর্জুনের এই কম্প্যারেটিভ লিটারেরি অ্যানালেসিস কেবলমাত্র যে সিদ্ধান্তপক্ষেই উপযোগী তা শুধু নয়, বরং কাব্যের ব্যাবহারিক দিকেও অর্জুন এক ব্যালেন্সড দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে তাকিয়েছেন। তিনি ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের বিশেষত অর্থালঙ্কার (অর্থাগত অলঙ্কার)-এর প্রয়োগের মাধ্যমে হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসির অলঙ্কারশাস্ত্রীয় উপাদানগুলিকে বিশ্লেষণ করেছেন। অর্জুন ভরদ্বাজ লক্ষ করেছেন যে, হোমার, বাল্মীকি এবং ব্যাস—এই তিন কবিরই বিশেষত্ব তাঁদের অভিব্যক্তির সূক্ষ্মতা এবং বহুমাত্রিকতা। গ্রন্থকার ইলিয়াড ও ওডিসির পাঠ বিশ্লেষণের জন্য লোব ক্ল্যাসিক্যাল লাইব্রেরির অনুবাদ ব্যবহার করেছেন এবং মূল গ্রিক পাঠের সঙ্গে তার তুলনাও করেছেন।

এই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে গ্রিক ভাষার ধ্বনিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে শব্দালঙ্কারের প্রাচুর্য তুলনামূলকভাবে কম; বরং অর্থালঙ্কারই এখানে অধিক প্রধান এবং বিস্তৃত। ভারতীয় কাব্যতত্ত্বের আলোকে গ্রিক সাহিত্য ব্যাখ্যা করার এই অভিনব আন্তসংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন হোমারের কাব্যরীতিকে নতুন করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি দেয়, তেমনই বিভিন্ন অলঙ্কারশাস্ত্রীয় উপাদানগুলির একটি সুসংবদ্ধ তালিকা ও বিশ্লেষণও উপস্থাপন করে।

বইটির মূল অধ্যায় সংখ্যা চার। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জুন ভারতীয় নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং পুরুষার্থের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন ইলিয়াড ও ওডিসিকে, তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে ভারতীয় এবং গ্রীক মহাকাব্য চতুষ্টয়ের এক তুলনামূলক অধ্যয়ন। চতুর্থ অধ্যায়ে ইলিয়াড ও ওডিসির ভিতর দণ্ডীর অর্থালঙ্কারের খোঁজ করেছেন কবি অর্জুন ভরদ্বাজ। আমি তাঁরই কথা মতন (বইয়ের ভূমিকায় যেমন তিনি বলেছেন) প্রথমে তৃতীয় অধ্যায়, তারপর চতুর্থ এবং অবশেষে প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ের পাঠ করেছি। আমার যেটি আরও ভালো লেগেছে তা হলো পরিশ্রমী এবং কৌতূহলী পাঠকের জন্য বইটির অ্যাপেন্ডিক্স, ইনডেক্স ও গ্লোসারি সেকশনগুলি, এবং নবীন পাঠকের জন্য “ এ নোট অন্য টেকনিক্যালটার্মস অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ইন্ডিয়ান এস্থেটিক্স” অধ্যায়টি। পুস্তকনির্মাণের এহেন যত্ন সত্যিই আজকাল প্রকাশনীর ভিড়ের ঠেলায় কিছুটা অপ্রত্যাশিত হলেও বেশ আনন্দদায়ক।

যাহা সত্য, তাহা সুন্দর। যাহা সত্য এবং সুন্দর তাহাই শিব। এই শিবকে হোমারের লেখনীর ভিতর অর্জুন ভরদ্বাজ আদৌ কি খুঁজে পেলেন বা যদি পেলেন তাহলে কীভাবে তা জানতে হলে কৌতূহলী পাঠকের বইটির পাঠ অবশ্য কর্তব্য। অর্জুন কবি, কেবল স্কলার মাত্র নন। বইটি পড়তে পড়তে তাই মনে হয় এ আসলে বাল্মীকি-ব্যাসদেব, হোমার ও অর্জুনের কথোপকথন। হাজার বছরের ব্যবধানে হোমারের কবিচিত্ত, বাল্মীকি ও ব্যাসদেবের ঋষি-দ্রষ্টা এবং অর্জুনের শব্দ সংস্কার তানাবানা-র মতন করে নতুন কোন বস্ত্র বুনছেন। গ্রীক হোক কি সংস্কৃত, সত্য ও সুন্দরই আসলে একজন শিল্পীর কাছে তার শিল্পের পাথেয়। তাই সত্য এবং সুন্দর কেবল শিল্পের অ্যাট্রিবিউটমাত্র নয়, বরং ভ্যালু। পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চল, যেকোনো ভাষার কবি, শিল্পী এই সত্য ও সুন্দরের চর্চার দ্বারায় ইউনিভার্সাল সৃষ্টির সৃজন করেন। সত্য যদি তার ঈশ্বর হন, সুন্দর তাহলে তার সাধনা।

Discipline / Topic বাংলা

Explore more on Charcha

Discover the latest writings, journal papers, talks, and literary discussions from all Poorvam contributors.

Go to Charcha feed

Publish with Poorvam

Double-blind peer review, open access, and a platform built for Indic scholarship.