বুদ্ধধর্মের মান্ত্রিক ধারা: মহাযান-বজ্রযানের উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ
পর্ব ২
মহাযানপূর্বে বৌদ্ধের নিকায়ভেদ
ভারতবর্ষের বুদ্ধধর্মের সামগ্রিক ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করা চলে। বুদ্ধের সশরীরে ধর্মপ্রচার এবং লোকত্যাগের পরবর্তী একশো বছর পর্যন্ত প্রথম যুগ। তখনো বৌদ্ধ সঙ্ঘে ভাঙ্গন ধরেনি। বুদ্ধের পরিনির্বাণের মাস তিনেক পর অনুষ্ঠিত রাজগৃহের মহাসঙ্গীতিতে মহাকাশ্যপ প্রথম বুদ্ধবচন সংকলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মহাস্থবির আনন্দের নেতৃত্বে সূত্রপিটক এবং মহাস্থবির উপালির নেতৃত্বে বিনয়পিটক সংকলিত হয়েছিল। মতানৈক্য আরম্ভ হল অভিধর্মের দরুণ। বৌদ্ধরা বুদ্ধের দ্বাসত্যময় শিক্ষায় বিশ্বাস করতেন। একটি সত্য সংবৃতি—সংসার, অপর সত্য পরমার্থ—নির্বাণ। সূত্রপিটকের বুদ্ধবচন সাধারণ সংসারীর জন্য।
অপরদিকে অভিধর্ম দুধ থেকে সর কাচিয়ে নেবার মতো বুদ্ধের শিক্ষার পারমার্থিক সারকে পৃথক করার প্রয়াস। অভিধর্মে “ধর্ম” শব্দ লৌকিক ও লোকোত্তরের বিশ্লেষণযোগ্য মৌলিক ঘটনা বা উপাদানের প্রেক্ষিতে প্রযুক্ত হত। প্রত্যেক ধর্মের উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য ও পারস্পরিক সম্বন্ধের বিচার করে অস্তিত্ব ও জগতপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হত। উদাহরণস্বরূপ লাল গোলাপ দেখে কারো পছন্দ হবার ঘটনার মধ্যে গোলাপের লাল রঙ একটি ধর্ম, দর্শনেন্দ্রিয়ের সংস্পর্শ একটি ধর্ম, চক্ষুর্বিজ্ঞান— অর্থাৎ লাল গোলাপ দেখে উৎপন্ন চেতনা একটি ধর্ম, বেদনা— অর্থাৎ সুখকর অনুভূতিটি একটি ধর্ম। কিন্তু এই ধর্মগুলির স্বতন্ত্র প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে বসে বৌদ্ধরা দ্বিধা হলেন। জন্ম নিল সর্বাস্তিবাদ এবং বিভাজ্যবাদ।[1]
ধরা যাক, কোনো সদ্যোজাত শিশু লাল গোলাপ ফুটতে দেখছে। লাল গোলাপ নিয়ে তার পূর্বের কোনো সংস্কার সঞ্চিত নেই। এই প্রথম লাল গোলাপ ফুটতে দেখে তার মনে সংস্কার তৈরি হল, লাল গোলাপ খুব সুন্দর। গোলাপটি দু’দিন পর শুকিয়ে ঝরে গেলে সাধারণের চোখে তার স্বভাবধর্ম অবিদ্যমান বস্তু হয়ে যাবে। কিন্তু সর্বাস্তিবাদী বলবেন, গোলাপটির স্বভাবধর্ম শিশুর স্মৃতিতে সংস্কার হয়ে বিদ্যমান। সর্বাস্তিবাদীর দর্শনে ধর্মস্বভাবের কার্যকারিতা ও কালগত অবস্থা পরিবর্তিত হলেও অস্তিত্ব নষ্ট হয় না। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ তিন সময়েই ধর্মস্বভাব সদ্। সর্বে ধর্মাঃ স্বরূপতঃ সন্তি, ইতি সর্বাস্তিবাদঃ।
বিপরীতে বিভাজ্যবাদী মতে কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে ধর্মস্বভাবের অস্তিত্ববিচার হয়। বর্তমানে কার্যকর ধর্ম সদ্। কার্যকারিতা অতীত হয়ে গেলে ধর্ম অসদ্। ধর্ম অতীত হয়ে গেছে, অথচ তার কার্যকারিতা এখনো রয়েছে— যে কর্মের ফল এখনো পরিপক্ব হয়নি সেই কর্মকে বিদ্যমান বলা চলে। কিন্তু যে কর্ম ইতোমধ্যেই পরিপাচিত, সেই কর্মকে বিভাজ্যবাদী বিদ্যমান বলেন না। বিভাজন পদ্ধতিতে ধর্মস্বভাব গ্রহণের কারণে বিভাজ্যবাদ নাম। তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির তত্ত্বাবধায়ক মোগ্গলিপুত্ত তিস্সের রচিত কথাবত্থু গ্রন্থ সর্বাস্তিবাদী দর্শনকে নামোল্লেখহীন উপস্থাপন ও খণ্ডনের মাধ্যমে বিভাজ্যবাদী অবস্থান রক্ষা করেছে। অশোকের রাজত্বকালে গাঙ্গেয় সমতল জুড়ে বিভাজ্যবাদীরা প্রাধান্য পেতেন। অশোকের পুত্র-কন্যা (মতান্তরে, ভ্রাতা-ভগিনী) মহীন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রা শ্রীলঙ্কায় বিভাজ্যবাদী শাখারই ত্রিপিটক নিয়ে গেছিলেন। শ্রীলঙ্কায় বিভাজ্যবাদ আরো উপশাখায় ভেঙ্গেছিল, তার মধ্যে একটি শাখা বর্তমানের থেরবাদ, যাদের পালি নিকায় আমরা পড়ে থাকি সচরাচর।
অন্য দিকে সর্বাস্তিবাদীরা বিস্তারলাভ করেছিলেন ভারতের উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মীর, গান্ধার জুড়ে। তাদের নিকায়ের অনুবাদ চীন ও তিব্বতী পিটকে এখনো সংরক্ষিত। তিব্বতী বৌদ্ধরা আজও মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয় অনুসরণ করেন। বুদ্ধের পরিনির্বাণের শতাব্দীপূর্তি থেকে অশোকের রাজত্বকাল পর্যন্ত বুদ্ধধর্মের ইতিহাসের দ্বিতীয় যুগ ধরা যেতে পারে। এই সময় সঙ্ঘবিভাজনের এবং মহাযানের উদ্ভবের। এরপর আসমুদ্র হিমাচলের বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি একপ্রকার মহাযান-বজ্রযানের একক আধিপত্যে নিয়ন্ত্রিত হবে।
যুগ | কালসীমা | ঐতিহাসিক গুরুত্ব |
ত্রিপিটক সংকলনের যুগ | বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরবর্তী ১০০ বছর। | বুদ্ধের শিক্ষার সংরক্ষণ, সংকলন ও প্রাথমিক সাংগঠনিক বিকাশ। |
নিকায়ভেদের যুগ | দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির মধ্যবর্তী সময়; আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৩–২৫০ অব্দ। | বৌদ্ধ সঙ্ঘের মধ্যে বিভিন্ন নিকায়ের উদ্ভব ও মতবাদগত বিভাজন। |
মহাযানের যুগ | নাগার্জুনের আবির্ভাব[2] থেকে পঞ্চম–ষষ্ঠ শতক অবধি। | মহাযানী দর্শন, বোধিসত্ত্বচর্যা এবং বিভিন্ন গূঢ়মন্ত্রসম্বলিত সূত্র-সাধনাপদ্ধতির বিকাশ। এরপর বৌদ্ধের মান্ত্রিক ক্রম ধীরে ধীরে তন্ত্রাচারে পর্যবসিত হয়। |
বুদ্ধবচন সংকলনের সময়ে পিটক লিখিত আকারে ছিল না। বিভিন্ন সঙ্ঘারামে শ্রমণরা কানে শুনে পিটক অধ্যয়ন করতেন, সে পাঠই পারম্পরিকভাবে স্মরণে রাখা হত। কানে শোনার পরম্পরা মারফত কখনো সখনো বেনোজলও ঢুকে যেত। সঙ্ঘগুলিকে স্থাননাম বা উপাধ্যায়-নাম অনুসারে চিহ্নিত করা হত। যেমন, বৃজিদেশের সঙ্ঘ বজ্জিপুত্তক, বাৎসীপুত্রের অনুগামী সঙ্ঘ বাৎসীপুত্রীয়। পালি বিনয়পিটক ও বংশ সাহিত্য বৈশালীর দ্বিতীয় সঙ্গীতিতে কতিপয় বজ্জিপুত্তক শ্রমণের সঙ্গে বিনয়ের দশটি বিচ্যুতি নিয়ে বরিষ্ঠ স্থবিরদের মতসংঘাতের কথা উল্লেখ করে। এই দশ বিচ্যুতিকে একত্রে বলা হয় দসবত্থুনি।
দসবত্থুনি কী কী?—
১. সিঙ্গিলোণ কপ্প: পিণ্ডাচরণে ক্বচিৎ কদাচ লবণহীন খাদ্য মিলত। তাই উক্ত বজ্জিপুত্তক শ্রমণরা ঘোড়ার শিঙ্গের মধ্যে লবণ নিয়ে ঘুরতেন। বিনয়ে ভিক্ষুদের খাদ্যসঞ্চয়ে নিষেধ থাকায় বজ্জিপুত্তক শ্রমণদের এহেন আচরণ বিনয়বিরোধী গণ্য হয়েছিল।
২. দ্বাঙ্গুল কপ্প: সূর্যঘড়ির দণ্ডের ছায়া দুই আঙ্গুল সরে যাবার পরও অন্নগ্রহণে ছাড়। বিনয় অনুযায়ী দুপুরের পর কঠিন খাদ্য গ্রহণ করা যায় না। বজ্জিপুত্তক শ্রমণরা উক্ত পাচিত্তিয় লঙ্ঘন করতেন।
৩. গামন্তর কপ্প: দিনে একবার খাদ্যগ্রহণের পরও দ্বিতীয়বার, দ্বিতীয় কোনো গ্রাম থেকে নিমন্ত্রণ এলে সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা। দিনে দুইবার খাদ্যগ্রহণে পরিমিত আহারের পাচিত্তিয় লঙ্ঘিত হয়।
৪. অবাস কপ্প: বিনয় অনুযায়ী নির্দিষ্ট সঙ্ঘের উপবসথ, উপসম্পদা প্রভৃতি অনুষ্ঠান সে সঙ্ঘের জন্য নির্দিষ্ট পরিবেণ-পরিসরের মধ্যেই নির্বাহ করার নিয়ম। বজ্জিপুত্তকরা উক্ত নিয়ম ভঙ্গ করতেন।
৫. অনুমতি কপ্প: সঙ্ঘের নাম সাক্ষ্য রেখে কোনো কাজ ইতোমধ্যেই করে ফেলার পর তার জন্য সঙ্ঘের অনুমোদন প্রার্থনা করা। এতেও বিনয় লঙ্ঘিত হয়। বজ্জিপুত্তকরা একে সামান্য লঙ্ঘন বলে মানতেন।
৬. আচিণ্ণ কপ্প: কোনো সঙ্ঘের উপাধ্যায় কোনো বিশেষ রীতি অনুসরণ বা প্রবর্তন করলে সঙ্ঘের বাকি শ্রমণরাও সে রীতি গ্রহণ করতে পারে বলে বজ্জিপুত্তকরা মানতেন। অপরদিকে বিরুদ্ধপক্ষের মতে, বজ্জিপুত্তকদের নিত্যনতুন নিয়ম প্রবর্তন করে বিনয় শিথিলতা আনার অসদুদ্দেশ্য ছিল।
৭. অমথিত কপ্প: দ্বৈপ্রাহরিক আহারের পর মাখন, দই প্রভৃতি কঠিন ও তরলের মধ্যবর্তী স্তরের খাদ্য গ্রহণ। একেও বিরুদ্ধপক্ষ অপরিমিত আহারের দোষ এড়াবার কৌশল বলে মনে করতেন।
৮. জলোগিং পাতুং: তাল জাতীয় ফলের রস সদ্য নিষ্কাশিত অবস্থায়, মাদক দ্রব্যে পরিণত হবার আগে অবধি পানীয় হিসেবে ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন বজ্জিপুত্তকরা। অপরদিকে বিরুদ্ধপক্ষ সদ্য নিষ্কাশিত ফলের রসকেও মাদক দ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন।
৯. অদসকম্-নিসীদনং: পাড় না থাকা কাপড়ের ব্যবহার। এতেও সরাসরি পাচিত্তিয় লঙ্ঘিত হত।
১০. জাতরূপরজতং: সোনা-রুপোর দানসামগ্রী গ্রহণ, যা প্রাতিমোক্ষে পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
এই দশ প্রকারে বজ্জিপুত্তকগণ বিনয় লঙ্ঘন করতেন বলে যস কাকণ্ডকপুত্ত নাম্না জনৈক রক্ষণশীল শ্রমণ অভিযোগ তোলেন। যসের তৎপরতায় অপরাপর স্থানের বৌদ্ধ সঙ্ঘের মতামত সংগ্রহ করে বজ্জিপুত্তকদের ভিন্নমতাবলম্বী ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শ্রীলঙ্কার মহাবিহারবাসী পরম্পরা এই বহিষ্কৃত বজ্জিপুত্তক সঙ্ঘটিকে মহাসাঙ্ঘিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সর্বাস্তিবাদের নিকায়ে স্থবির-মহাসাঙ্ঘিক বিভাজনের গল্প আবার ভিন্ন। সর্বাস্তিবাদী মহাবিভাষা শাস্ত্র পাটলিপুত্রের কুক্কুটারাম মঠে সংঘটিত একটি বিবাদের উল্লেখ করে। কিন্তু সে বিবাদ বিনয় নিয়ে নয়, বরং অর্হতের স্তরকে হেয় করা নিয়ে। অর্হত বলা হত সম্যকসম্বুদ্ধের শ্রাবক[3] শিষ্যদের। শাক্যমুনি মার্গদর্শক ছাড়াই বোধিলাভ করেছিলেন, তাই সম্যকসম্বুদ্ধ। শারিপুত্র, মৌদ্গল্যায়ন, মহাকাশ্যপ প্রমুখ বরিষ্ঠগণ শাক্যমুনির দেশিত মার্গ অনুসরণ করে বোধিতে উপনীত হয়েছিলেন— তাই তাঁরা অর্হত শ্রাবক। পূর্বতন বৌদ্ধ পিটকে অর্হতের স্তরকেই সম্যকসম্বুদ্ধের পর সর্বোচ্চ মানা হত। কুক্কুটারামের বিবাদী পক্ষ বললেন, সম্যকবোধি লাভের জন্য অর্হত্ত্ব যথেষ্ট নয়।
১. অর্হতের মধ্যেও মার বা অপর সত্ত্বের প্ররোচনায় বিপথগামী হবার প্রবণতা দেখা যায়।
২. অর্হতের স্তরেও অবিদ্যার লেশ থাকে। মহাযান এই অবিদ্যালেশকে জ্ঞেয়াবরণ বলে ব্যাখ্যা করে। অর্হত ক্লেশাবরণ অতিক্রম করে ভবপাশ ছেদনে সক্ষম, কিন্তু জ্ঞেয়াবরণ অতিক্রম করার ক্ষমতা একমাত্র বোধিসত্ত্বের বলে মহাযানে মান্য।
৩. অর্হত স্তর সংশয়মুক্ত নয়। সাংবৃতিক সংশয় অতিক্রম করলেও অর্হতদের পারমার্থিক সংশয় বিদ্যমান।
৪. অর্হত স্তরের জ্ঞান সম্যকসম্বুদ্ধের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় অর্হতের নির্বিকল্প সর্বজ্ঞতা অসিদ্ধ।
৫. অর্হতের অন্তর্দৃষ্টি থাকবেই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময়ে অন্যের মুখে ধর্মবাক্য শ্রবণ বা বিশেষ শব্দের উচ্চারণও অর্হতমার্গ লাভের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, অর্হতের উপলব্ধি অগভীর।
এই পাঁচ বিতর্কিত দাবিতে যাদের স্বীকৃতি ছিল তারাই মহাসাঙ্ঘিক। মহাবিভাষার প্রথম দিকের চীনা অনুবাদগুলিতে নাগ, প্রত্যয় ও বহুশ্রুত নামে তিন ভিক্ষুকে মহাসাঙ্ঘিক মতের প্রচারক বলা হয়েছে। অশ্বঘোষ বহুশ্রুতীয় শাখার অনুসারী ছিলেন। নাগার্জুন হিমালয়ে জনৈক নাগ বোধিসত্ত্বের কাছে মহাযানী শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন বলে কুমারজীব অনূদিত জীবনীতে উল্লেখ মেলে। মহাবিভাষার এই গল্প দসবত্থুনির তুলনায় অধিকতর নির্ভুল মনে হয়। মহাযানের উত্থান বাস্তবিকই অর্হতমার্গের বিপরীতে হয়েছিল। মহাসাঙ্ঘিকরা বলতেন, অর্হতমার্গ কেবল আত্মমুক্তির চিন্তা করে, বহুর সুখহিতের প্রয়াস করে না। শ্রাবকজ্ঞান যেহেতু নির্বিকল্প নয়, এবং সম্যকবোধি কেবল বোধিসত্ত্বেরই লব্ধ হয়, মহাযানের বিচারে বোধিসত্ত্বচর্যা অর্হত ও প্রত্যেকবুদ্ধ মার্গদ্বয়ের ঊর্ধ্বতন।
স্থবির নিকায়ের চরিয়া পিটকে বোধিসত্ত্বের দশ পারমী পূরণের যে চর্যা বর্ণিত, অর্হত্ত্বলাভের সে শর্ত ছিল না। অর্হত তাঁর সাধনার লক্ষ্য অর্জন করলে আর ভবিষ্যত বুদ্ধত্বের জন্য বোধিসত্ত্বচর্যা সম্পূর্ণ করার প্রয়োজন থাকে না বলে স্থবিরবাদীরা মানতেন। অর্থাৎ, যে বোধির জন্য বোধিসত্ত্বকে অপরিমেয় কল্প তপস্যা করতে হয়েছিল, স্থবিরবাদী মতে সেই একই বোধি অর্হতের অপেক্ষাকৃত সামান্য সাধনাতেও মিলত। বোধিসত্ত্বচর্যা কোথায় বিশিষ্ট, স্থবির নিকায় স্পষ্ট করেনি।
বোধিসত্ত্ব অন্তিম জন্মে বুদ্ধ হন বলে সেই দেহে স্থবিরবাদীরা কিছু বিশেষত্ব আরোপ করতেন বটে। অচ্ছরিয় অব্ভুত সূত্রে বর্ণিত আছে, বোধিসত্ত্ব অন্তিম জন্মে গর্ভধারিণীর যোনিদেশের পরিবর্তে কুক্ষিদেশ দিয়ে নির্গত হন। ভূমিষ্ঠ হবার পর মর্ত্যলোক তাঁকে স্পর্শ করার আগে দেবতারা তাঁর পরিচর্যা করেন। সদ্যোজাত বোধিসত্ত্ব উত্তরমুখে সাত পা অগ্রসর হয়ে বৃষস্বরে নিজেকে সর্বজ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করেন। বোধিসত্ত্বের অন্তিম দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ থাকে। কিন্তু অচ্ছরিয় অব্ভুত সূত্রের বোধিসত্ত্ব লোকজ্যেষ্ঠ হলেও লোকোত্তর নন। স্থবির নিকায়ের বোধিসত্ত্বকে বোধিলাভের পূর্বাবধি কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হয়।
অপরদিকে মহাসাঙ্ঘিক লোকানুবর্তন সূত্র বোধিসত্ত্বকে সরাসরি লোকোত্তর ভগবান বলে প্রতিষ্ঠা করে। মহাসাঙ্ঘিকের বোধিসত্ত্বের সংসারাবতার সঞ্চিত প্রারব্ধের বন্ধনপ্রসূত নয়। মহাসাঙ্ঘিকের বোধিসত্ত্ব চিরমুক্ত। ভবের উপাদান তাঁকে কখনো স্পর্শই করতে পারেনি। সংসারদুঃখ দেখে মহাকরুণার তাগিদে তিনি বদ্ধ জীবের পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় ভবপাশ গ্রহণ করেছেন। সদ্ধর্মপুণ্ডরীক মহাযানের একেবারে জন্মলগ্নে রচিত শাস্ত্রগুলির অন্যতম। সদ্ধর্মপুণ্ডরীকে দেখা যায় শারিপুত্র, মহাকাশ্যপ, আনন্দ প্রমুখ বরিষ্ঠ শিষ্যকে বুদ্ধ অর্হতমার্গ থেকে সরিয়ে এনে বোধিসত্ত্বের মার্গে দীক্ষা দিচ্ছেন।
দুটিই স্থবিরবাদের শাখা। ↑
১০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ আনুমানিক। অকুতোভয়ার ভূমিকায় “নাগার্জুনের সময়কাল” দ্রষ্টব্য। ↑
বৌদ্ধ শাস্ত্রে চারটি আধ্যাত্মিক স্তর যথাক্রমে শ্রাবকবুদ্ধ, প্রত্যেকবুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব এবং সম্যকসম্বুদ্ধ। শাক্যমুনি পূর্ব-পূর্ব জন্মে বোধিসত্ত্বচর্যার মাধ্যমে দশ পারমিতা পূর্ণ করে সম্যকসম্বোধিতে উপনীত হয়েছিলেন, তাই তিনি সম্যকসম্বুদ্ধ। সম্যকসম্বুদ্ধের জ্ঞান নির্বিকল্প হয়। সম্যকসম্বুদ্ধের ধর্মোপদেশ অনুযায়ী সাধনা করে যাঁরা মুক্ত হন তাঁরা অর্হত বা শ্রাবকবুদ্ধ। অর্হতের জ্ঞান সবিকল্পক, যেহেতু সম্যকসম্বুদ্ধের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে প্রত্যেকবুদ্ধের জ্ঞান সম্যকসম্বুদ্ধের মতোই নির্বিকল্প। কিন্তু প্রত্যেকবুদ্ধগণ সম্যকসম্বুদ্ধের মতো বহুর সুখহিতের চর্যা সম্পন্ন করেন না। প্রথম বোধিচিত্তের উৎপত্তি থেকে বোধিলাভ অবধি দীর্ঘ যাত্রায় সম্যকসম্বুদ্ধকে বলা হয় বোধিসত্ত্ব। স্থবির নিকায় এই চার স্তরের প্রজ্ঞার পরিধি ভিন্ন মানলেও সকলের অন্তিম উপলব্ধি এক নির্বাণকেই নির্দিষ্ট করে। অন্য দিকে মহাযানমতে সম্যকসম্বুদ্ধের পর একমাত্র বোধিসত্ত্বমার্গীই নির্বাণের অধিকারী, কারণ নির্বিকল্প জ্ঞান ও দশের সুখহিতসাধনের চর্যা উভয়ে একমাত্র বোধিসত্ত্বমার্গেই বিদ্যমান। শ্রাবকের নির্বিকল্প জ্ঞান নেই, প্রত্যেকবুদ্ধের দশের সুখহিতসাধনের চর্যা নেই। তাই এই দুই মার্গ অনুত্তর সমাধিলাভে অক্ষম। ↑